৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুন ০৫২০১৭
 
 ০৫/০৬/২০১৭  Posted by

পিয়াস মজিদ-এর একগুচ্ছ ছোট কবিতা ও কিছু প্রশ্নোত্তর

১। কবিতা দিনদিন ছোট হয়ে আসছে কেন? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টি ও চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কারণ কী? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টির দম-দূর্বলতা-ই কি ছোট কবিতা বেশি বেশি লেখার কারণ? নাকি, ছোট কবিতা’র বিশেষ শক্তি এর অনিবার্যতা? কী সেই শক্তি?

পিয়াস মজিদ :

পিয়াস মজিদ

পিয়াস মজিদ

কাহিনিনির্ভরতার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার কারণে কবিতা ছোট হয়ে আসছে। দীর্ঘকবিতাও লেখা তো হচ্ছে অনেক, হয়তো বিন্দুতে সিন্ধু লাভের আগ্রহ বেড়েছে কবিদেরÑ সে কারণেই ছোটকবিতার প্রাবল্য হয়তো। দীর্ঘকবিতা সৃষ্টির দম বা দুর্বলতা মোটেও ছোটকবিতা লেখার অনুঘটক নয়। অবশ্যই ছোটকবিতার বিশেষ শক্তি এর অনিবার্যতা। ছোটকবিতার সীমায়িত অবয়বে অসীমের স্পন্দ ধরা থাকে।

২। এক লাইনেও কবিতা হয়, আবার সহস্র চরণেও। আকারে-অবয়বে দীর্ঘ বা ছোট হলেই কি একটি কবিতা দীর্ঘ কবিতা বা ছোট কবিতা হয়? ছোট কবিতা ও দীর্ঘ কবিতার বিশেষত্ব কী?

পিয়াস মজিদ :
আকারকে দীর্ঘ বা ছোটকবিতার একমাত্র সাপেক্ষ মনে করিনা। রশীদ করীম যেমন মনে করেন একটি কাহিনি উপন্যাস হয় তার অবয়বে নয় বরং বিশেষত্বে। ছোট ও দীর্ঘকবিতাও তাই।

৩। ক) ছোট কবিতা’র গঠন-কাঠামো কেমন হওয়া উচিত মনে করেন?

পিয়াস মজিদ :
কবির অনুভব ও কলমই নির্ধারণ করবে ছোটকবিতার গঠনকাঠামো।

খ) ছোট কবিতা পাঠে পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায় কি?

পিয়াস মজিদ :
অবশ্যই পাওয়া যায়। জাপানি হাইকুর যুগজয়ী সম্ভোগপরতা তার প্রমাণ।

গ) ছোট কবিতায় কি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া সম্ভব?

পিয়াস মজিদ :
আকার যাই হোক, কাব্যিক ব্যঞ্জনা নির্ভর করে কবির গভীর নির্জন ও মুখর মনোলোকের উপর।

৪। ক) আপনার লেখালেখি ও পাঠে ছোট কবিতা কীভাবে চর্চিত হয়েছে ?
 
পিয়াস মজিদ :
হয়তো কোন গভীর অন্তর্তাগিদে লিখেছি ছোটকবিতা অনেক। তবে তৃপ্ত নই; সার্থক ছোটকবিতার অনিঃশেষ পিপাসা বহমান হৃদয়নদীতে আমার।

খ) আপনার একগুচ্ছ (৫-১০টি) ছোট কবিতা পড়তে চাই।
 
পিয়াস মজিদ :


সুন্দরম

একটিই সূর্য প্রতিদিন,
আড়ালে-আবডালে
চাঁদনির কাটা মুণ্ডু
শত শত।


শাশ্বতী, সাম্প্রতিক

পৃথিবীর প্রতিটি বিগ্রহে
নৃশংস বোধনের সুর।
লাজুক চাঁদের চোখেও
সোনালি মর্গের স্বপ্ন।

কালের রাজা বৃদ্ধ ছত্রাক বলে
‘অপেক্ষায় থাকো,
মৃত্যু নামছে মুষলধারে
রেহাই নেই বৃষ্টিরও।’


মরণজাতক

পাহাড়;
ঘুমন্ত সুর।
দিগন্ত;
তা থৈ নাচের বিস্তার।

রাতদিন
এইসব ঘূর্ণির ছায়ায়
আমার
সোনালি
শবজীবনের
জন্ম হয়।


রক্তরাগ

উড়ে গেছে ময়ূরী
এখন আমার কেকাদগ্ধ দিনরাত।
পোড়া প্রহরের স্তূপে
এত তারাপাহাড়ের সিঁড়ি বুনে গেল কে !
নিরুত্তর চন্দ্রিমার শেষ মাথায়
অবচেতন-গোরস্তানের প্রস্ফুটন শুধু
আর দিকে দিকে নূতন নূতন মৃত্যুর কেতন।

সেই থেকে ময়ূরী মানে একপ্রকার নিঠুর রাগিণী।


চিত্ররূপ

সবুজ শস্যের চাষি হয়েও
জীবনভর এড়ানো যায় নি
নীলনদ।
তার টলটলে জলে
আমার সোনার তরী
ভাসাতে গিয়ে দেখি
প্রাকপুরাকাল থেকে
দুধ-ধবল স্বপ্নের তটে
ঝিকমিক করছো তুমি;
কালরাত্রিশিখা।


মালঞ্চ বিরচিত

১)
সমুদ্র ঘুমন্ত
ঘাসপাতার
তরঙ্গ-সবুজে।

২)
ফুল
ফুলের ভেতর
গুচ্ছ গুচ্ছ
গণকবরের গন্ধ।

৩)
গোলাপের কাঁটা আমার
তোমার সব
পুষ্পিত, রক্তিম প্রকৌশল।

৪)
সুপ্ত কুসুমে জাগ্রত আমি
মরণের বাহারি ছন্দ।

৫)
কালমেঘের কেতন ওড়ে
বুকের সরণিতে বকুলদহন
এই খরার দেশে স্মৃতির পাপড়ি শুধু
এখনও সজল।


দেহতত্ত্ব

এ দেহ
ছাই হলো
ভস্ম হলো
অনন্তের আগুনে
পুড়ল;
শেখা হলো
দাহের ভাষা।


চরাচর

ঘুমন্ত কোবরার গায়ে
ঝরে পড়ো তুমি;
ক্ষীণ-লাল তারা।

নেপথ্যে
নীল পাহাড়
কালো হাওয়া।

পাশের ঝরনাধারায়
বয়ে যাই আমি
সারি সারি
সবুজ তৃণ।


রাগিণী

আমার কবর
আনন্দভৈরবী।

যখন
মাতৃজঠরে পড়ে
ঘন
গরাদের
ছায়া।

১০
তরঙ্গ

একটা ঝরনা আমাকে আহত করে
আরেকটা ঝরনা শুশ্রুষা আমার

দুটো ঝরনা আসলে
পরস্পরের সৎ মায়ের সন্তান
আবার তারা
গত জনমের জমজ।

১১
আদিগন্ত

সামনে
ধু-ধু
নিষ্পত্র
মাঠ।
একটি
তারাবীথি
ধরে
ঝু
  ল
    ছি;
অন্ধকার।

১২
পারমিতা

আমি যতই যেতে চাই অন্ধকারের দিকে
চারদিকে ততই তারাদের আজন্ম প্রহরা।
আর কে যেন সন্ধ্যার শান্ত গান ছেনে
শিল্পহারা পিয়াসের জন্যে তুলে রাখে
রক্তিম রাগমালা।
আমি; বাস্তব ও স্বপ্নে মার খাওয়া মানুষ
ওই প্রভা এবং সুরশক্তির পায়ে
উপচার হিসেবে ঢলের মতো
ঢেলে দিতে পারি
আমার
একবিন্দু
অশ্রুকুমকুম।

১৩
সুরভি

আমার
মৃত্যুমুহূর্তের
উপর
কে
যেন
জাফরান
ছিটিয়ে
যায়।

১৪
নিমজ্জন

ওই দূর চাঁদ।
চরকা কাটা হচ্ছে;
তিন লক্ষ
চৌষট্টি হাজার বছর যাবত।

এতক্ষণে বুড়ি সেলাই করে উঠল
পুরো একটা সমুদ্র।
ডুবব।

১৫
গম্ভীরা ২০১০

আর তুমি
পেনড্রাইভে
ভরে ফেলছ
এমনকি
সন্ধ্যার
সমস্ত
মাধুরী।

১৬
অভিজ্ঞান

তুমি
শুনতে শুনতে
মলিন হওয়া গান।

আমি
এক জনমের
মঞ্চক্লান্ত
নীল নটরাজ।

আসলে জানকী শুষে নেয়
তারাহারা দিগন্তের
গাঢ় অভিসার।

১৭
গোলাপে, মাংসে

যেদিকে কসাইখানা,
সেদিকেই ফুলের বাজার।
রক্ত আর পাপড়ির পাহাড়।
প্রতিদিন ওদিকে যাই।
ব্যাগ ভরে কিনে আনি
মাংস ও গোলাপ।
খবরের কাগজেও তো
একদিন ফুলবাড়ি
আরেকদিন নন্দীগ্রাম।
কিন্তু আমি রোজ মাংস খাচ্ছি,
গোলাপের গন্ধ শুঁকছি।

মাংসে-গোলাপে সফল হচ্ছে
মানুষজীবন।

১৮
কালো প্রপাতের কুঁড়ি

সমুদ্র
পাল তুলে কফিন
শত শত

২.
মরুভূমি
আমার রোদনে রাঙা
ডুবে যাবে জাহাজ তোমার

৩.
স্নানের কালে দেখি
ঝরনা ঘুমিয়ে আছে

৪.
তোমার মালঞ্চের
অস্তমিত ফুলটার
নিভৃততম পাপড়ির
ছাঁচে মিশে আছে সে;
আমি

৫.
কচ্ছপের খোলে আছড়ে পড়ে চাঁদ
তারপর আনন্দে ডানা মেলতেই
নিঠুর দিগন্ত চন্দ্রকে পুরে নেয় মুখে

৬.
ঘুমন্ত পৃথিবী
রাত একা
জেগে জেগে পড়ে যায়
আরব্য দুপুরের গল্প

৭.
আমি
তোমার
বাড়ির পিছে
দাঁড়িয়ে থাকা
নেহায়েত একটা
কালো আঙুর গাছ

৮.
এই রাত্রি
মৃত ভৈরবীর
স্মৃতি

৯.
সকল আনন্দগীত
সুরদাসের রোদনে রাঙা

১০.
জল
গত জনমের
মৃত দাবদাহ
১১.
আমি সমুদ্র এক
বুক ভরে জমা রাখি
লাশের কল্লোল

১২.
রক্ত শুকায়
জেগে থাকে
রক্তের
আলিম্পন

১৩.
চলি
স্বপ্নের দিকে।
স্বপ্নে সাতটা ঘোড়া
অকূল হ্রেষায়
আমি
দিগ্বিদিকহারা

১৪.
ভয় কী বেহুলা!
চাঁদের ছেলে-মেয়ে
জাগছে

১৫.
তারার ঔরসে
জন্ম আমার
বিপুল অন্ধকার

১৯
অপ্রকাশিত জীবনানন্দ

ওই ঘরে জাদুভস্ম।
ছাইয়ে, অঙ্গারে
সুতীর্থ
কারুবাসনা
নক্ষত্রের দোষ।
দরজাটা খুলে কে ঢুকল?
পাপ ও পুণ্যের সওদাগর।
আজ রাতেই বসবে
তোমাদের লাভালাভের মুশায়েরা।
আর আমার দোলনায় মা ছিটিয়েছিল
থোকা থোকা বলির কুসুম।
গন্ধের লোভে ট্রাংক ভেঙে বেরিয়ে পড়েছে
উৎপলা, মাল্যবান।

২০
শিমুলপুর থেকে

হায় ঈশ্বরী, হায় গায়ত্রী,
অনুনয় ও সমর্পণের ভঙ্গিকে ভস্ম করে দিয়ে
বিনয় মজুমদার ছাই হয়ে যাচ্ছে।
সুনীল মাছের ওমে
কে শুষে নেবে
তোমার গায়ের শীত?
ফুল ও চকোলেটের ঘ্রাণে ভুলে যেও
আকাশের অলীক আশ্বাস।

মাঠে এত ভুট্টা ফলেছে
তবু কারও শব্দেরা যাবে না আর
লোডশেডিং কিংবা নক্ষত্রের দেশে।

দুই
শিমুলপুর
          বিনোদিনী কুঠি
      কার্তিকের মিহি কুয়াশায়
                   গায়ত্রীর ন্যায় চাঁদ।
                          পৃথিবীতে
অঘ্রানের এমন অভূত ইন্দ্রজাল
              ছড়িয়ে যায়
                        উন্মাদ বিনয় মজুমদার।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E