৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ফেব্রু ২২২০১৭
 
 ২২/০২/২০১৭  Posted by

গদ্যকবিতার- গদ্যভাষা এবং চিত্রকল্প উপস্থাপনের অভিনবত্ব

॥ হেনরী স্বপন ॥

কবিতার শরীরে অলংকারের সাজগোজ এবং ভাষার মিহি বুননে ছন্দের নাচ করতে গিয়ে যদি পায়ের ঘুঙুর খুলে ফেলে, কিছুটা গভীর চিন্তার চিত্রকল্প ও রূপকের উপাখ্যান পুরোপুরি টানাগদ্যের কবিতার মতোন বাঙালি কাব্যের এই নারীটিকেও আমি মনেপ্রাণে খুব ভালোবাসি। তাই, যে কোনও গদ্যভাষায় রচিত হয়ে আমার চেতণাজগতের আবেগে সেই ঢেউ ভেসে উঠবেই প্রাণে। আবচেতণে হলেও যে কোনও সার্থক কবিতা আমাকে ভাবাবেই ভাবাবে…। ঠিক যেমনটি একজন বিধবার হৃদয়ে সুপ্ত থাকে আকাঙ্খা এবং তা বুদ্বুদি দিয়ে ওঠার অপেক্ষায় থাকে সেই যৌনস্পৃহার মতোই প্রত্যেক কবির ভাবনাগুলোও কবিতা হয়ে ওঠার অপেক্ষায় থাকে। ফলে কবির এই অপেক্ষা ও আরাধনা থেকেই সৃষ্টি হতে পারে গদ্য এবং পদ্য উভয়ই কবিতা।

যদিও পরম্পরা রূপে যে সব কল্পনা চিন্তা ও ভাবের স্বতন্ত্র সমন্বয়ের মাধ্যমে সজ্ঞায়িত হয়ে থাকে… টানাগদ্যের কবিতা এবং পয়ার পদ্যের অভিব্যাক্তিগুলি। তেমনি কবিতার যেমন বিভিন্ন শৈলিগত উপকরণ রয়েছে, গদ্যেরও আছে প্রকরণগত তেমনি কিছু পৈতে সর্বস্ব পরিচিতি। তবুও আকৃতিÑ প্রকৃতি এবং ছন্দ বিবেচনায় গদ্যকবিতার সম্পর্ক গদ্যের সঙ্গেই আঙ্গিক নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই যুক্ত। তাহলে, এ-ও দেখা যাচ্ছে যে, বাংলা গদ্যকবিতা ও বাংলা কাব্যের অধিকাংশ বৈশিষ্ট্য- বিশেষত…উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্পের ব্যবহার দ্বারা ভাবের বহুবর্ণিলতায় যে অন্তর্গত প্রাণস্পন্দনের সৃষ্টি হয়, তা-ও যেনো সাম্প্রতিক বৈশিষ্টের মাধ্যমেই খুব বেশি কবিতার মতোই। যা মূলত ইংরেজী ’ফ্রি ভার্সীয়’ ছন্দ বিবর্জিত কবিতা হিসেবেই গণ্য হয়। এখনকার অতি তরুণদের কবিতা এই বিভ্রান্তির দ্বৈততায় ঘুরপাক খাচ্ছে হামেশাই। কেননা, এরা সর্বত্রই ছন্দকে না জেনে, না বুঝেই ছন্দ নামক বিষ বর্জনের খেলায় মেতে উঠছে। ফলে ইংরেজী সাহিত্যের ধারায় যেমন ’প্রোজ পোয়েম’ হিসেবে পরিচিত একই ধারার কবিতাবেই ফরাসি সাহিত্যে একে ’পোয়েম এন প্রোজ’ বলে চিহ্নিত। তাই, সর্বত্রই আমরা আজও গদ্যকবিতাকে পাশ্চাত্যের সাহিত্যধারা হিসেবেই একে বিবেচিত করে পাঠ করছি এবং কেউ কেউ পাশ্চাত্যকে মনে রেখে এই ধারায় কবিতা লেখার ব্যাপক উৎসাহ বাংলাকবিতা চর্চার ক্ষেত্রে এপার-ওপার দুইবাংলায়ই সমান উৎসাহ দেখা যায়।

এক্ষেত্রে এ-ও বলা যায়, বাংলা কাব্যসাহিত্যের আধুনিক ধারায়- টানা গদ্যকবিতার সার্থক ফুলকিটি সর্বপ্রথম ছড়িয়েছেন কবি অরুণ মিত্র এবং আব্দুল মান্নান সৈয়দ। অবশ্য এই ধারার কবিতার আরম্ভটি করতে চেয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনিও কবিপুস্তক গ্রন্থে কিছু গদ্যকবিতা প্রকাশ করেছিলেন। বলা যায় এর থেকেই বাংলা কবিতায় গদ্যের সংস্কারকাল কেবল শুরু হয়েছিল। কিন্তু বঙ্কিমের লেখাগুলি তখন গদ্যকবিতা হয়েছে সে বিবেচনায় না গিয়ে বরং তার এই সাহসটিকে স্যারুট জানাতে হয়। কারন, সেই সময় এমোন সংস্কারের এই উদ্যমতাকে একটি বৈপ্লবিক কাজ হিসেবেও চিহ্নিত করা যায় এবং এরপর এই মহান জার্নির আভিযাত্রায় একে একে মাইকেল মধুসুদন দত্ত ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামটিও যুক্ত করতে হয়। কেননা, এই ইতিহাসের ধারায়- পুস্পাঞ্জলি (১৮৮৫) থেকে- লিপিকা (১৯২২) পর্যন্ত  বঙ্কিমচন্দ্র এবং রাবীন্দ্রগদ্যের ও কবিতার বিবর্তন ও বাঁক- পরিবর্তনকে যদি সে রকম বিবেচনায় নেওয়া যায়, তাহলে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে টানা গদ্যকবিতার উন্মেষকে ছন্দ- বিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে তেমনটা সম্পৃক্ত করা যায় না, যতোটা অঙ্গীভূত করা যায় শিল্প- আঙ্গিক বিষয়ের অনুসন্ধান ও ভাবনার সঙ্গে।

তাহলে, ফরাসি সাহিত্যের অন্যতম অনুবাদক ও সমঝদার কবি অরুণ মিত্র ১৯৫৫ সালে টানা গদ্যে লেখা কিছু কবিতার সমন¦য় যখন তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ- উৎসের দিকে’ প্রকাশ করেন। আধুনিক গদ্যকবিতার নিক্তিতে এটিকেই বাংলা সাহিত্যেও সচেতন গদ্যকাব্যের প্রথম প্রয়াস বলে ধরে নেয়া যায়। কবির এই রিলেটা তখন আব্দুল মান্নান সৈয়দের থেকে সিকদার আমিনুল হক আরও বেশি সার্থকতার সাথে এগিয়ে এনেছেন। ফলে এই প্রয়াসের মহিরুহকাল ধরে এই ধারার কবিতার ব্যপক চর্চা শুরু হয়েছিল নব্বইয়ের কবিদের মাধ্যমেও। তবে অতি সম্প্রতিক প্রায় প্রত্যেক কবির কবিতা চর্চার প্রধান মাধ্যম গদ্যকবিতা হওয়ায়, এখনকার গদ্যকবিতার প্রকরণটি- এখন প্রতিনিয়ত হয়ে উঠছে আরও অনেক বেশি বেশি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ও বৈচিত্রময় এবং সাম্প্রতিকও হয়ে উঠছে পাশ্চাত্যের মুখোমুখি রূপে। যদিও পাশ্চাত্য সাহিত্যের ক্ষেত্রে গদ্য ও কবিতা মিশ্রিত এই ফর্ম ও প্রকরণটি ওদের কাছে কবিতাভুক্ত হয়ে স্বীকৃত ও চর্চিত হচ্ছে বহু আগে থেকেই। তবুও বাংলা সাহিত্যের তুলনামূলক আলোচনায় গদ্যকবিতাকে সংকর প্রজাতির কব্যগুণহীন রচনা হিসেবেই পাঠক বিভ্রান্তি রয়েছে, আছেও এখনো। এক্ষেত্রে পঠন-পাঠন বিমুখ কিছু কবির জ্ঞানের সীমাবদ্ধতায় গদ্যকবিতা নামক এই লেখার প্রতি পাঠকের অস্বস্তিও বাড়ছে। নানা কারণে এই নিয়ে বিতর্কের অশেষ ও শ্লেষ দুই-ই চলছে বিভিন্ন আলোচনায়। যেহেতু সাম্প্রতিক কয়েক দশকে বাংলা গদ্যকবিতার চর্চা বাংলা ভাষাবাসী কবিদের লেখায় ব্যাপক হারে বেড়েছে। এতে খুব সহজেই বোঝা যায় গদ্যকবিতার এই ফর্মটি আতি নিকটেই পাঠক প্রিয়তা পাবে এবং আলোচক গ্রাহ্যতা তৈরি হবে। ফলে এই গদ্যকবিতার পরিচয় নিয়েও আর কোনও দ্বিধা ও সন্দেহ থাকবে না কোথাও- কিছুতেই।

তাহলে গদ্যকবিতা পদ্যকবিতা/ কবিতা থেকে কতোটা, কিভাবে আলাদা ভাবা যায় ? যেহেতু গদ্যকবিতার চেহারা পুরোপুরি গদ্যের সাঁচে গড়া ও এর ভাষাও মোটামুটি স্বতন্ত্র বলেই দেখতে পারা যায়…

“এখানে নামল সন্ধ্যা। সূর্যদেব কোন দেশে, কোন সমুদ্র পারে, তোমার প্রভাত হল ?

অন্ধকারে এখানে কেঁপে উঠেছে রজনীগন্ধা, বাসরঘরের দ্বারের কাছে অবগুণ্ঠিতা নববধুর মতো ; কোনখানে ফুটল ভোরবেলাকার কনকচাঁপা ?
জাগল কে ? নিবিয়ে দিল সন্ধ্যায়- জ্বালানো দীপ, ফেলে দিলো রাত্রেগাঁথা সেঁউতিফুলের মালা। এখানে একে একে দরজায় আগল পড়ল, সেখানে জানলা গেল খুলে। এখানে নৌকা ঘাটে বাঁধা , মাঝি ঘুমিয়ে ; সেখানে পালে লেগেছে হাওয়া।”…   …   …
( রবীনন্দ্রনাথ ঠাকুর : সন্ধ্যা ও প্রভাত )

রবীনন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার এই যে গদ্যভাষা এবং চিত্রকল্প উপস্থাপনের অভিনবত্বে যেনো এ ভাবেই তার গদ্যকবিতা কন্টিনেন্টাল স্তন্ত্রতায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। অবশ্য এ সম্পর্কে গদ্যকবিতার স্বাতন্ত্র আধুনিকতায় খ্যাত কবি অরুণ মিত্র নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বললেন,…“যখোন টানা গদ্যে লিখি তখন সমগ্রতাই প্রধান ভাবে শব্দাবলীর প্রকৃতিকে অবলম্বন করে এক অখ- ভাব বা বক্তব্য ফুটে উঠুক, এই ভাবি। সেখানে ব্যবহৃত শব্দের তাতপর্যই যতির নিয়ামক, বিন্যাসের আর প্রয়োজন দেখি না।” গদ্য কবিতায় এই যে সমগ্রতার নির্মাণ, যা কেবল সেইসব কাব্যের সমস্ত শব্দ ও পদ মিলিত প্রবাহ তৈরি করেই তার তাৎপর্যকে ফুটিয়ে তুলতে পারে। তা অরুণ মিত্র লেখায় এ ভাবেই তুলে আনতে পারেন…

“এ জ্বালা কখন জুড়াবে ?

আমার এই বোবা মাটির দ্যুতি ফেটে চৌচির। উঠোনের ভালোবাসার ভোর এক মুঠো ছাই হয়ে ছড়িয়ে যায় শুকনো লাউডগার মাচা, খড়ের চালে কাঠবিড়ালীর মতো পালিয়ে অনেকদিনের আশা, শুধু ভাসা ভাসা কথার শূণ্যে লেগে থাকে এক জলমোছা দৃষ্টি দুপুরের সূর্য হয়ে। কোথায় সে আকাঙ্খাকে পোষবার সংসার, ভবিষ্যতকে আদর করবার সংসার গড়বার, আদর করবার ফুলে ফলে কাকলিতে মিলিয়ে দেবার। মিলিয়ে গেল তা এই ক্ষোভে।”…   …   …
( অরুণ মিত্র : এ জ্বালা কখন জুড়াবে  )

উপমা উৎপ্রেক্ষার সমন্বয় জারিত চিত্রকল্পের বুননে এমোনই বাস্তবতার মিশ্রণ যেনো আমাদের ভাবায় এবং স্বপ্নও দেখায়। “উঠোনের ভালোবাসার ভোর এক মুঠো ছাই হয়ে ছড়িয়ে যায় শুকনো লাউডগার মাচায়,…” কবিতার এমোন বক্তব্যই যেনো হয়ে উঠেছে গদ্যকবিতার এষণার বিষয়। আবার ফের বক্তব্যের বহতায় বয়ে চলে গদ্য- পদ্যের উভটান যেনো কব্যিকতাপূর্ণ ভাবাবেগের সূত্রও নয়। আবার প্রথাচ্ছাদিতো সংবেদনাও নয় বলেই এই কবিতা থেকে গদ্যকবিতার রূপ আলাদা হয়ে যায় । এ জন্যেই হয়তো সুধীন্দ্রনাথ দত্ত  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লিপিকা’র লেখাগুলি পড়ে গদ্যকবিতার এই ধারাটিকে বলেছিলেন,- গদ্যবেশী কাব্য। ভাগ্যিস,- ছদ্মবেশী বলেননি। বললে অবশ্য মন্দ কিছু হতো না। কারণ গদ্যকবিতায় কাব্যের ভাবটা ছদ্মবেশেই লুকিয়ে থাকে।

তাহলে, এখনকার কবিরা কি, আমাদের গদ্যকবিতার ফর্মকে- গদ্যবেশী করে তুলতে পারছি ? না কি…“জ্যোৎস্না কী ? – না, জ্যোৎস্না হয় জল্লাদের ডিমের চুলহীন জলবায়ুহীন মুণ্ডু, জোড়া- জোড়া চোখ, সাতটি আঙুলের একমুষ্টি হাত, রক্তকরবীর অন্ধকার, এবং একগুচ্ছ ভুল শিয়ালের সদ্যোমৃত যুবতীকে ঘিরে জ্বলজ্বল চিৎকার।” ( আবদুল মান্নান সৈয়দ : জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ খেকে জ্যোৎস্না )
কবিতাটির চিত্রকল্প আমাদের চেনাজানা হলেও এর উপস্থাপন পরাবাস্তবতার আবেগে জর্জরিতো হয়ে উঠেছে এবং আত্মপ্রশ্রয়ী আবেগে কবিতাটি আরও বেশি কবিতাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে নানা অনুসঙ্গের মাধ্যমে। ঠিক এমোনি ছাপ দেয়া গদ্যকবিতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে দেখি, কবি সিকদার আমিনুল হকের লেখার সহজসঞ্চারী সাবলীলতায় মুগ্ধ ‘সতত ডানার মানুষ’ গ্রন্থের অজস্র গদ্যকবিতায়।

তবে, এ কথা নির্দিধায় বলতে পারি, এখনকার তরুণ/ অতিতরুণ অনেক কবির শব্দরন্দ্রে গদ্যবেশী কাব্যের তীক্ষ্ণ নিশ্বাস তেমন টের পাই না। লঘু কিংবা মধুর বিষয়ে যতো গভীরতা দরকার সেও পাই না। সরল গল্প, ভাষার ভারহীন বাক্য- কাটা কাটা সরল- তরল কোনও প্রকার ছন্দাহ্লাদিতোও  নয় যেনো। তবুও খুব বেশি অপ্রত্যাহিক প্রকরণেই আটকে যাচ্ছে। আবার, কেউ কেউ যেনো তত্ত্বের গিঁটেই আটকে পড়ছে স্থুল কবিতা নির্মাণের ফতোয়ায়। তবুও তো, প্রতিনিয়তই গদ্য ও কাব্যের ছোপ ছোপ রঙের চিত্রকল্পে আঁকা হচ্ছে বহু গদ্যকবিতার ক্যানভাস জুড়ে, তবুও লেখা হচ্ছে ছন্দোহীন মতবাদ। এক্ষেত্রে সেই কবিতালোকে উদ্ভাসিত হয়ে দাঁড়াচ্ছেন যারা, তেমন অজস্র কবির কবিতা থেকে কয়েকজনের গদ্যবেশী কবিতায় চিত্রকল্পের প্রভাব খুঁজে এমোনই কিছু উদ্ধৃতি উদহরণ হিসেবে তুলে ধরছি মাত্র। তবে, এগুলিই গদ্যকবিতার শেষ বলেও কিছু নয়। এর চেয়েও উৎকৃষ্ট অরও উদহারণ থাকতেই পারে। হতেও পারে…

“নদীটা ছোট। ওপারে তার ঘর। নৌকায় দশ মিনিট। তার বিয়ে তেরই মাঘ। শীতে নদীতে খুব কুয়াশা পড়ে। চিঠিতে আমি লিখেছি মাত্র তো দশ মিনিটের পথ। তের সংখ্যাটা অশুভ।”…   …   …
( ইমতিয়াজ মাহমুদ : পেন্টাকল, চিঠি )

“বৃষ্টি এলে আমাদের সমস্ত গ্রাম নদী হয়ে যায়। যে নদীতে লতা-পাতা, ফুল-পাখি আর গাছেরা করে নেয় বাউল গোসল।”…   …
( ইমরান মাঝি : দুধভাই, বৃষ্টি )

“আজ আমার মৃত্যুদিবস, আজ আমার জন্মদিন। জঙ্গলের মাঝখানে কবরের দিকটায় একটু ফাঁকা ফাঁকা। সূর্যের লাল রশ্মি বনস্থালির সবুজ সিঁদুর বেয়ে হেঁটে যাচ্ছে নিরবে। আমার কবরের পাশেই তিনটি চালতা গাছ, ক্রমাগত কবরের উপর ফেলছে চালতা ফুল ; কোকিলের দল গাইছে গান গাছে চড়ে তিন… এর কাঁধে বসে।”…   …
( ফেরদৌস মাহমুদ : নীল পাগলীর শিস, নক্ষত্রদূতের গান )

“দুপুরটা যেনবা রৌদ্রের অফুরান ঢেউ। আর তুমি রিক্সার হুড ফেলে পুড়ে পুড়ে কয়লাবতী ? এখানে দাঁড়াবার সামান্য জায়গাও নেই, পার্কে পুড়ছে পাতার মজ্জা।”…   …
( জাহিদ সোহাগ : দুপুর, ০১ )

“কবিতার খাতার পাশে পাশে ঘুরছে কয়েক মিটার রাস্তা আর টিঙটিঙে লম্বা একটা সুর-
এই তো দুপুরবিশ্রাম ; জানালা হতে দেখা আকাশে ভেসে ওঠা মুখ আমাকে জানায় শরতদিন, জানায় লেখো নিজের স্বপ্ন থেকে আহত হবার স¤ভাবনা বাঁচিয়ে নিজেকে দেবার ডানা ও ঘুমÑ ভাবছি বসে ওয়েফার, নি:সঙ্গ বাগান, দূরের রেলব্রীজ, দেরাজভরতি না পাঠানো  চিঠি ; এতো চিঠি আজকাল কে লেখে কাকে?
ভাবছি এইসব ছায়াতমা কথাগুলির ভস্মমঠ…”
( তুহিন দাস : বাগান সিরিজ, বারো )

“দেখতে ঋষির মতো ; শব্দের পেয়ালা হাতে হেঁটে যায় স্বর্গেও প্রতিভা। পিরিেেচ উপমা ভরা, কৃস্টালের চাঁদ নাচে, মেঘের প্রতিভা। আস্তাবলে সাদা ঘোড়া, উড়ে যায় খোলা চিঠি, খুলে যায় হরিৎ কবিতা।”…   …
( তুষার কবির : কবিতা কুঠরি )

“বর্ষাকাল এল ছাতা নেই বলে সাহস ক্ষীণ। দিনদুপুরে রাতের অন্ধকার জমে থাকে ঘরে, তাই বেড়িয়ে এল বাইরে। বাইরে বিন্দু বিন্দু বৃষ্টি, কাদাজলের রাস্তা, ফুটপাত জুড়ে সস্তায় আনারস।”…   …
( আসমা বিথি : একটি নীলছাতা )

“ফলত ক্ষেতের মটরশুঁটিতে যে ঢেউ লেগে থাকে তা ভরদুপুরের বিরাম চিহ্ন। একটা ঘুঘুর কথাই ধরোÑ শোকাচ্ছন্ন দিনে তার কোনো মৃত্যু নেই। কোনো হাসপাতাল নেই।”…   …
( শঙ্খচূড় ইমাম : ঈর্ষাপুর )

“বিধবা বৃক্ষের অভয়ারণ্যে স্বপ্নের শিলাবৃষ্টি- নিভে যাওয়া নক্ষত্রের কাছে শিখে নিও মৃত্যু হয়ে জন্মানোর গল্পগাছা- ডাঙার ঝরা পাতাদের গল্প কিন্তু জলের ঝিনুক জানে না।”…   …
( মোহাম্মদ জসিম : মৃত্যুকে জন্মাতে দেখলাম )

“দেহের সামনে পদ্মনগর। এই জল, এই দেহ, আচঞ্চল জমিন চর। সন্ধ্যা নামলেই প্রায়ান্ধ অন্ত:পুরে গৃহবাসনার মতো জ্বলে ওঠে। সন্ধ্যা পেরুলেই অদৃশ্য ধু ধু।”…   …
( নুসরাত নুসিন : পদ্মনগর )

সাম্প্রতিক এবং চলমান সময়ের অতিতরুণ কবিদের লেখা গদ্যকবিতার উদাহরণগুলি নেয়া হয়েছে এ সময়ের গদ্যকবিতার পরাবাস্তব আবহ বোঝাতে। মূলত, চিত্রকল্প ও রূপকের ভাষাকে সাধারণ গদ্যভাষায় কতোটা দূরবর্তী করে তুলছে। তাই, এখনকার  গদ্যকবিতায় আমরা যে ভাষা লক্ষ্য করি, তাতে কবিতার অস্পষ্টতা কিংবা রহস্য তৈরি হয়। কিন্তু নানা অনুসঙ্গে চিত্রকল্প ব্যবহারের বিশিষ্টতায় স্বতন্ত্র। অবশ্য… অতনু তিয়াস, অভিজিৎ দাস, আফরোজা সোমা, এমরন কবির, কাজী নাছির মামুন, চন্দন চৌধুরি, জাহানারা পারভীন, জুননু রাইন, জুয়েল মোস্তাফিজ, নির্লিপ্ত নয়ন, পিয়াস মজিদ, প্রবর রিপন, বিজয় আহমেদ, মামুন রশিদ, শুভাশিস সিনহা, সজল সমুদ্র, সৈয়দ আফসার, সোহেল হাসান গালিব, অনন্যা মন্ডল, অরবিন্দ চক্রবর্তী, গিরিশ গৈরিক, বিধান সাহা, মিছিল খন্দকার, হিজল জোবায়ের এবং আরও অনেকের কবিতার অনন্য উজ্জ্বল গদ্যের বৈশিষ্ট্যগুলোও তুলে ধরা সম্ভব ছিলো।

আমি তো এ-ও জানি যে, গদ্যকবিতার পূর্বসুরী হিসেবে নব্বইয়ের কবিতার উল্লেখযোগ্য ভূমিকার কথাও বলা দরকার। কারণ, এ সময়ের গদ্যকবিতার অনুকারীরা নব্বইয়ের কবি ও যাদের কবিতাগ্রন্থগুলি অনুসরণ করে এগুচ্ছেন, তাদের সবার  কথা না বললেও, অন্তত কয়েকজনের নাম উল্লেখ করলেই বা ক্ষতি কি ?… মুজিব ইরম- মুজিব ইরম ভনে শোনে কাব্যবান, মুজিব মেহদি- ময়দানের হাওয়া, ওবায়েদ আকাশ- প্রিয় কবিদের রন্ধনশালা, শিমুল মাহমুদ- কন্যকমলসংহিতা, জফির সেতু- স্যানেটোরিয়াম, শামীম রেজা- যখন রাত্তির নাইমা আসে, রহমার হেনরী- প্রকৃত সারস উড়ে যায়, মেস্তাক আহমাদ দীন- কথা ও হাড়ের বেদনা, মজনু শাহ- আমি এক ড্রপ আউট ঘোড়া, জাফর আহমাদ রাশেদ- যজ্ঞযাত্রাকালে, এইসব গ্রন্থের কবিতায় অসংখ্য প্রসঙ্গ ও বাক্য-উপবক্যে রচিত গদ্যকবিতার প্রামাণ্য হিসেবেও পাঠ করেন অনেকে। এ ছাড়াও নব্বইয়ের অরও কয়েকজন কবি,… টোকন ঠাকুর, সরকার আমিন, আলফ্রেড খোকন, মাহবুব কবির, তুষার গায়েন, ব্রাত্য রাইসু, আশরাফ রোকন, চঞ্চল আশরাফ, কবির হুমায়ুন, কামরুজ্জামান কামু এবং আরও অনেকের কবিতার প্রভাব এখনকার কবিদের সমৃদ্ধ করলেও, আমি  কেবল উল্লেখিত কবিদের তালিকাটি উপস্থাপন করলাম এই কারণে যে, এ সময়ের কবিদের মননের উৎকৃষ্টতার ক্ষেত্রে নিকটতম ও প্রতিবেশী কবি হসেবে এদেরকেই মুখ্য করে তুলবার প্রচেষ্টায়।

যদিও, প্রস্তুতিপর্বের এখনকার অনেক কবিরই কবিতা সম্পর্কে স্বচ্ছধারণা ও নিবিড় অনুশীলনের প্রজ্ঞা পরিশীলিত জ্ঞানের মসৃণতাও বহু কবির লেখায় দেখা গেছে। এদের আনেকের লেখায়ই ব্যাক্তিগত অভিপ্রয় জড়িত হলেও গদ্য- পদ্য উভয় কবিতা রচনার ক্ষেত্রে নিজস্ব চিন্তা ব্যক্ত করার ফলে গদ্যের ভাষা যতোই দর্বোধ্য হয়ে উঠুক না কেন ? পরিচ্ছন্ন গদ্যের চিত্ররূপময়তায়…একদিন এইসব কবিদের ভাবনাই হয়তো গদ্যকবিতার মৌলিক ভাবনারূপে সম্মানিত হয়ে উঠবে অপর কবি ও অগনিত পাঠকের আত্মায়…।

####

কবি পরিচিতি

 হেনরী স্বপন

হেনরী স্বপন

হেনরী স্বপন। জন্ম : ২২-ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫ (বরিশাল নতুনবাজার মথুরানাথ বাবুর গলিতে)। নবগ্রাম রোড, গোলপুকুরপাড় – খ্রীস্টান কলোনী, বরিশাল ৮২০০।

প্রকাশিত গ্রন্থ :

কাব্যগ্রন্থঃ কীর্তনখোলা (একফর্মা ১৯৯৪),  মাটির বুকেও রৌদ্রজ্বলে (একফর্মা ১৯৯৪) এবং বাল্যকাল ও মোমের শরীরে আগুন (দুইফর্মা ১৯৯৮) – এগুলো জীবনানন্দ প্রকাশনী, বরিশাল থেকে প্রকাশিত। জংধরা ধুলি (২০০১), কাস্তে শানানো মোজার্ট (২০০৪), ঘটনার পোড়ামাংস (২০০৯) – এ গ্রন্থগুলি শ্রাবণ-প্রকাশনী, শাহবাগ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত। হননের আয়ু (২০১১) কথা প্রকাশ,ঢাকা। উড়াইলা গোপন পরশে (১৪১৮) শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা এবং ভাষাপ্রকাশ নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০১৫) ভাষাপ্রকাশ, ঢাকা থেকে বইগুলি প্রকাশিত।

গদ্যপ্রন্থ : ছোটকাগজের ক্রান্তিকাল ও অন্যান্য (২০১৬) শ্রাবণ-প্রকাশনী, শাহবাগ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।

লিটলম্যাগ : জীবনানন্দ কবিতাপত্রের সম্পাদনা, যা এখন অনিয়মিত !

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E