৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ২৭২০১৬
 
 ২৭/১০/২০১৬  Posted by
কবি হেনরী স্বপন

কবি হেনরী স্বপন

কবি পরিচিতি

হেনরী স্বপন। জন্ম : ২২-ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫ (বরিশাল নতুনবাজার মথুরানাথ বাবুর গলিতে)। নবগ্রাম রোড, গোলপুকুরপাড় – খ্রীস্টান কলোনী, বরিশাল ৮২০০।

প্রকাশিত গ্রন্থ :

কাব্যগ্রন্থঃ কীর্তনখোলা (একফর্মা ১৯৯৪),  মাটির বুকেও রৌদ্রজ্বলে (একফর্মা ১৯৯৪) এবং বাল্যকাল ও মোমের শরীরে আগুন (দুইফর্মা ১৯৯৮) – এগুলো জীবনানন্দ প্রকাশনী, বরিশাল থেকে প্রকাশিত। জংধরা ধুলি (২০০১), কাস্তে শানানো মোজার্ট (২০০৪), ঘটনার পোড়ামাংস (২০০৯) – এ গ্রন্থগুলি শ্রাবণ-প্রকাশনী, শাহবাগ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত। হননের আয়ু (২০১১) কথা প্রকাশ,ঢাকা। উড়াইলা গোপন পরশে (১৪১৮) শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা এবং ভাষাপ্রকাশ নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০১৫) ভাষাপ্রকাশ, ঢাকা থেকে বইগুলি প্রকাশিত।

গদ্যপ্রন্থ : ছোটকাগজের ক্রান্তিকাল ও অন্যান্য (২০১৬) শ্রাবণ-প্রকাশনী, শাহবাগ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।

লিটলম্যাগ : জীবনানন্দ কবিতাপত্রের সম্পাদনা, যা এখন অনিয়মিত !

হেনরী স্বপন -এর কবিতা-ভাবনা

কবিতার এই অনুভূতি স্বতন্ত্রের ভিত্তিভূমি হলেও স্বয়ম্ভু কিছু নয়

কবিতা হচ্ছে আমার অন্তরে বাপ্তাইজিত দীক্ষায় ধর্মান্তরিত…আরাধনা। ক্রমশ শিরদাঁড়া হতে হতে একদিন কবিতার নিয়তি মাথায় চড়ে বসে। সেই থেকে দায়বদ্ধতা ও কাব্যবিশ্বাসের জলসিঞ্চনে – কবিতার স্নান আবগাহনে পরিতৃপ্ত আমি। তাই, সিক্ত এই আসক্তিতে আজও অস্তিত্বের ফুসফুসে টের পাই কবিতার আধিপত্য। কিংবা মনে হয় কবিতাই হচ্ছে আমার আরও এক ধর্মজ্ঞান। ফলে অমোঘ-অপার এই বিশ্বাসে বেদনা তাড়িত হই। শিল্পের প্রেরণায় আলোকিত হই। স্রেফ ব্যাধিগ্রস্থও হই কখনো।
তাহলে, অনিবার্য এই প্রেরণার বশবর্তীতে নিজের লেখাগুলো : প্রথমত নিজের অন্তরবিহ্বল থেকে ওগ্রাই। প্রকাশের দায়-দ্যুতি ও তীব্র অনুভূতিতে তথাগত হই। আবার নিজেকে কখনো নিজের কবিতায় নিমজ্জিত করে, স্রেফ কিছু ক্রিয়ামুখী মস্তিষ্কের উপাদান ভেবে নিজেই তখন কবিতা হয়ে উঠি। নিজের বাঁচার উত্তাপে। স্বভাবত তাই, আমার ভেতরের সমস্ত সৃষ্টিশীলতা, আমার আত্মার ছায়া হয়ে ওঠে এবং লেখাই আমার আত্মনির্মাণ – আমাকে সে আত্মোন্মুখ করে। যে নির্মাণ আমাকে নিঃসঙ্গতার মুক্তি এনে দেয়। এনে দেয় সেই একই স্পর্শের আস্বাদ।

তাহলে আমিও কি? কবিতায় পয়ার-মুক্তকে স্বরে অক্ষরে অক্ষরে কম্পিউটার-ইন্টারনেট হয়ে একটু বেশি মাত্রায় ক্লিক হয়ে যাই। রিমোটের স্পর্শে চ্যানেলর সিরিয়াল খুঁজি না-কি শাহরুখ-কাজল বিনোদনে বিলীন হতে হতে অবাধ যৌনাচার দেখি। কিংবা মৌলবাদী জঙ্গি নিশংসতায় আঁতকে উঠি। অতিরিক্ত এই বাস্তব-পরাবাস্তবের মধ্যে প্রতিনিয়ত আমিও আমার কবিতা ধরার ফাঁদ মেলে দাঁড়াই। আমার শৈশবের জনপদ-মেঠোপথের পাশে ক্ষেতভরা দুধধান আর প্রতিবেশী সকলেই ছিলেন নিতান্ত গরীব কৃষক। আমার বাবাও খুব ভাল কৃষক ছিলেন। তার লাঙ্গলের ঈষে রোয়াকে ক্ষেতের বুক চিরে বুনানো একেকটি ধানের চারাও নিস্ফলা হয়নি কখনো। আমি তো সেই জমিনেই  ট্রাক্টর দিয়ে মাটি ভাঙ্গি, শব্দ ছড়াই, নতুন তৃণের কবিতায় নিজেকে হাইব্রীড বীজের ফসল ফলাই আর আমার এইসব প্রাত্যহিকতার সময়চেতনাকে, নানা অভিজ্ঞতায় লিখে অন্যকে শোনাই।

লিখে কি হয়? স্বপ্নকে ভাগ করে দেখাই? সমাজবদলের দায়ভার ভাগ করি? আমার বিশ্বাস, আনন্দ-দুঃখ-বেদনাকে লিখে লিখে আমার দায়বদ্ধতার সমান যাদের পাঠক হৃদয় সেই কম সংখ্যক কয়েকজনকে হয়তো বা খুঁজি। লিখে দেখাই। নিজেও দেখতে থাকি…সেই কবেকার চর্যা’র সূত্র ধরে এগিয়ে আসতে থাকি। ফলে আমি কখনো লেখক, কখনো পাঠক। এই দ্বি-মিশ্রিত সম্পর্ক থেকেই নিজের অবস্থানে লেখা একেকটি কবিতা আমার মধ্যেও সেই নিয়তি হয়ে ওঠে। যদিও ক্রিয়েটিভিটির এই কমিউনিকেশন সন্ধিটা দুরূহ কিংবা বেশ জটিল অতিক্রমণের সূত্রও…বটে।

তবুও, কালনির্ভর আদি ও মধ্যযুগ, আধুনিক, উত্তর-আধুনিকতায় বিশ্বস্ত আমিও এখন সেই ধারাবাহিকতায় ঐতিহ্যের মাঠ কেটে কেটে রোপণ করি আমার সমকাল। সময়ের দহনে যতোটুকু সেঁকে নিলে রুটির টোস্টার হয়। কবিতার সময়কে ততোটুকু বুঝতে চেষ্টা করি। তবে সেই চেষ্টা কখনো কালোনিয়াল তত্ত্ব কিংবা দর্শনে ইন্সট্যান্ট গুলে যাওয়ার মতো নয়। যেহেতু, প্রতিটি কবিতাকে ‘কবিতা’ করে তোলাই মুখ্য উদ্দেশ্য। তাই, এটি আমার মৌলিক সত্তার প্রবণতা হয়ে উঠেছে প্রতিনিয়ত। ফলে, আমার কবিতায় শব্দবিন্যাসের বিশ্বস্ত এই অনুভূতির কিছুমাত্র স্বতন্ত্রের ভিত্তিভূমি হলেও স্বয়ম্ভু কিছু নয়।

হেনরী স্বপন -এর কবিতা


বরখাস্ত কবি

বরখাস্ত কবি, চাকরিতে ছিল না তার মন
অধ্যাপক মানুষ কনেো, লিখলো নারীর স্তন!

চল্লিশ সাইজের ব্রা’গুলো ছিলো না তখন?


লাবণ্যের স্বামী

খাতায় ভরা লেখা আর ছিলো না তার আঁতলামি
গো-বচোরা সাত্ত্বিক কবি ছিলেনে, লাবণ্যের স্বামী।

কে বললো, কোন্ পাতালপঋর রাজকন্যে
অভিসারে আসবো আমি, কবির জন্যে…।


আপেলের গায়

উড়ে যাচ্ছ তবে ছড়ানো মেঘের এপ্রোন সেলাই খুলে
ছুঁয়ে দেখো,
ওষ্ঠের উত্তাপ ছিঁড়ে ফেলে-
ভুলে যাওয়া মৃতদেহ রেখে
স্নানের জলের সঙ্গে
মিশে যাওয়া…
মাতালের সঙ্গে কখনো সুরার পেয়ালায়
কামড়ের ক্ষত হলে যোনিমুখ খুলে
বেরিয়ে পালায় বেড়ালের ঘুম
ঝরে পড়লে আবার–

উড়ে যাচ্ছ, আপেলের গায়…!


কবির জন্য কাতর আমি : সৈয়দ হক

একতারা হাতে লালনের
নাই কোনো ঘর
কবির জন্য কাতর আমার
কান্না বুকের ভিতর।


রুটির টুকরো ভাগ করে খাই

হঠাৎ যেনো টের পাই,
বুকের ভেতর মোবাইল ফোনের রিংটোন কেউ
বাজিয়ে ডাকছে ধ্যানমগ্নতায়…!
প্রার্থনার গান শুনে, তখন কিছুটা নীরবতা ভেঙ্গে রুটির টুকরো
ভাগ করে খাই–

তবুও, বুকের মধ্যে বাজছে কেবল হৃৎপিণ্ডের এলার্ম দেওয়া ওয়াল ঘড়িটাই।


নির্জন ছাদের মালতীলতায়

একে একে সব পাদুকা হাঁটতে যাবে
মোঠোপথ শুয়ে আছে,
রুগ্ন বাঁকা গায়…

জানুর উপর মাছরাঙা পাখি এসে বসে
পুকুরের ওপাড় বাঁশের কঞ্চিতে দুলছে হাওয়ায়
কালোকেশী রাধার খোঁপায় বসে
বেণী বাঁধছে হলুদ বোলতার হুল ফোটানোর ভয়ে–

আঁচল উড়ছে পাশের বাড়ির নির্জন ছাদের মালতীলতায়…।


আফগানিস্থানে এখনো বিদ্যুৎ চমকায়…

অসময়ে বৃষ্টি আসবে বলে,
ছাতার কাপড় কালো করে মেলে রেখেছিলে।
মেঘটা তেমন সাধারণ– শ্যামলা মায়ের মুখ
বারবার মেকাপ বক্সটা খুলে ্দেখে নেয়…

রূপর্চচা নিষিদ্ধ কেবল আফগানিস্থানে এখনো বিদ্যুৎ চমকায়…।


আচাররে তেলে চকচকে হবে

গোধুলি রঙের একটা চমৎকার ব্রেসিয়ার খুলে
রৌদ্রের হ্যাঙ্গারে টাঙিয়ে দিয়েছি —
লম্বা দুপুরটা শুকিয়ে রাখবে খোঁপায় সাজিয়ে দিলে
আচারের তেলে চকচকে হবে অন্ধকার,
কামিজেরে ফেব্রিক ছড়ানো মেঘে ঢাকা পড়ে যাবে
লকলকে জিহ্বার নাচে নর্তকীর
পায়ের মুদ্রায়…

চর্বি লুকোবার ভয়ে, দেহের কোথাও চমকে উঠবে কি, নেকড়ের ডাক।


মাদার তেরেসা : যিনি মানবতার ঈশ্বর

থানশাড়ি আর নীল পাড়
তিনিই ঈশ্বর এবং অবতার।

ছোটখাট ছিলেন বুড়ো
আজকে তিনি এই পৃথিবীর
পাহাড়চূড়ো…!

১০
কামড়ের স্থাপত্যে গড়বে নিজের ভার্স্কয …!

ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছ,
হলুদ প্যাস্টেল রঙে দাগ কেটে আড়াল টানলে
কাছে পাবে বলে-
বুকের ভেতর পোকায় কাটলে রেশমের স্তন গুঁটিতে জড়িয়ে
নিতে তাঁতের বুনন জুড়ে…
ব্যস্ত ছিলে নির্ঘুম চুম্বনে সারাক্ষণ,

কিছুটা নিশ্চিন্ত গভীর তলপেট ভরে রেখেছিলে নাভির সৌর্ন্দয
সাজানো অনেক পুঁতির গহনা ছিলো,
অনেক কল্লোলে ভেসে ওঠা মীনের সাঁতার…

তবু, বক্ষ পেতে সর্বাঙ্গ দিয়েছো কার কামড়ের স্থাপত্যে গড়বে নিজের ভার্স্কয …!

১১
শহীদ কাদরীর জন্য শ্রদ্ধাঞ্জলি

কখনো তো বলিনি এখন অনেক রাতের দরকার,
এখন অনেক নক্ষত্র ঘুমুতে যা্বে…
অনেক গভীর ঘুম,
পরগাছা লতায় জড়িয়ে রাখবে কবির নিঃশ্বাস লুকানো দুঃখগুলো;

সেই বিউগলে বেজে ওঠা প্রাণবায়ু…এ্যাকুরিয়ামের জলে কেঁপে ওঠা ঢেউ,
কেঁপে ওঠা মন…
‘তোমাকে অভবিাদন…’
প্রিয়তমা, পাখি হয়ে উড়ে আসবে কখন…।

১২
বানের জলের সঙ্গে ঢুকে পড়া

সারারাত ফুলে ও পাতায় নগ্ন সবুজ উদোম ছিলো বলে,
ঝরেছে সার্কাস রমণীর নাচ…
সুঠাম দেহের সিরামিকে বানের জলের সঙ্গে ঢুকে পড়া
আমনের ক্ষেতে ঘুমিয়েছি
তলিয়ে যাওয়ার ভয়ে–
আলতো ছোঁয়ায় হঠাৎ আবার কেঁপে ওঠা
ঠোঁটে ও ললাটে হাত রখেে চমকে উঠেছি পাতার আগুনে জ্বলে

জানবে কখন, কেমন পুড়েছি?
কাল সরারাত বৃষ্টির অঝর…‘ঘনঘোর বরিষায়’–বাজছিলো পিয়ানোয়
সুর হয়ে সারাক্ষণ,
একটি খাঁচায় পোষা বাঘ গর্জেছিলো।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E