৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ফেব্রু ২৮২০১৭
 
 ২৮/০২/২০১৭  Posted by

অপু মেহেদী’র কাব্যগ্রন্থ ‘ঘুমের প্রেসক্রিপশন’ থেকে একগুচ্ছ কবিতা

অপু মেহেদী'র কাব্যগ্রন্থ ‘ঘুমের প্রেসক্রিপশন'

‘ঘুমের প্রেসক্রিপশন’


পুনর্জন্মের জলীয় জাবেদা

বংশীয় পরম্পরায় আমি এখন রাজহাঁসের ঘরে ঘুমাই। এই যে আমি কথা বলি, এ কণ্ঠ আমার নয়। আমার অবয়ব আমি ফেলে এসেছি এক বিষণ্ন ধুতুরার ঝোপে।

ধুতুরার বিষে নীল হয়েছিল যে অদ্ভুত ক্রীতদাস, তার বেদনা নিয়ে উড়ে গেছে এক বিধবা সারস। আমি তো ঘুমিয়েই কাটিয়েছি অগণিত আগুনমাস। কিছুদিন চাঁদ সওদাগর রূপে, কিছুদিন কঙ্কাবতী।

এই যে তুমি তুতরঙা রাজহাঁস পোষো, সেই-ই আমি। নামে-বেনামে স্বাক্ষর করে খুঁজে ফিরি হরপ্পালিপি, হারাকিরি অতীত।

আমার জন্মের কোনো ইতিহাস নেই, মৃত্যুরও…
 


হেমলকপ্রিয় জাতিস্মর

পূর্বজন্মে আমি ছিলাম আসমানী রফরফ। উড়ন্ত রোদে তাই অভ্যাস করি ডানাহীন শালিকজীবন। আমার মখমল পালকে কেউ ঝুলিয়ে দিয়েছে হাজার কিউসেক অভিমান; পায়ে বাঁধা লাখো মেগাবাইট ট্রাফিকজ্যাম। রাগ-শোক-কামএসবের উর্দ্ধে নই। ব্যক্তিগত সংসারে আমি এক জোছনাজমির বর্গাচাষী। মৃত চাঁদের আলোয় ভাত আর পোলাওয়ের পার্থক্য শিখি। আমার গলায় ঝুলছে আত্মহত্যার বাউকুড়ানি খবর। পরজন্মে বেদুইন হব, নয়তো এক চন্দ্রগ্রস্ত বাজিকর।

অথচ হেমলকের পেয়ালায় স্বেচ্ছা চুমুক দিয়েই দেখি-
শত সহস্র মুখোশের ভিড়ে আমি এক অন্ধ জাতিস্মর!
 


ক্ষমা করবেন না প্লিজ

তারপর কুয়াশার জঙ্গলে পড়ে থাকে কিছু ভয়াল নীরবতা।

সারা গায়ে আকাশ মেখে যারা ভোর নামিয়েছিলো- তাদের পালক চুঁইয়ে পড়ে আছে তামাটে অন্ধকার। এখানে আজ নীল নীল শোকমিছিল; মেঘ ও বৃষ্টির মধ্যবর্তী শূন্যতা। থেমে গেছে গল্পের ক্লাস; পকেট পকেট বিষণ্নতা নিয়ে ছেড়ে গেছে ভোরপাখিদের স্কুলবাস।

বিষণ্ণতাও এক প্রকার মেঘ-এর অধিক কোনো নীরবতার জন্ম হয়নি পৃথিবীতে।

নীরবতাও এক প্রকার ক্ষমা।
ক্ষমাও এক প্রকার ঘৃণা।
 


উল্টো পৃষ্ঠার গল্প

সব জীবনেরই থাকে কিছু দাঁড়ি-কমা, ব্যক্তিগত যতিচিহ্ন।
নিজের প্রতিবিম্বের পেছনেই লুকিয়ে থাকে বেগুনি ইতিহাস।

একটি সবুজ চিঠির মৃত্যু চোখে ভাসে-
একট্রেন ঝমঝম নিয়ে যা মিলিয়ে গেছে শূন্যে।
একটি মিস করা টিকিট আজো বুকপকেটে হাই তোলে-
গন্তব্যে শুধু পড়ে আছে ভাঙা কাঁকর।

কবে যেন হাঁটা শুরু করেছিলাম স্টেশনের দিকে। লুডু কোর্টের মতো পথেপথে শুধু ফেক আইডি, মিথ্যুক সাপ। ছোবলে ছোবলে বারবার ফিরে আসছি ফেলে আসা পথে।

মানুষ প্রতিনিয়ত পেছন দিকে হাঁটে…

 

নিঃসঙ্গতার জটিলপাঠ

পাশে বসে থাকাও একধরনের নিঃসঙ্গতা।

তোমার আমার যৌথ ডানার আকাশ। উড়তে উড়তে মেখে নিলাম উল্কার ঘাম, ফড়িং ডানার আর্তনাদ। ঋতুবতী মেঘেদের শরীরে তখন আলিঙ্গনের তীব্র নিনাদ।

যদিও আলিঙ্গন চোখে চোখেই সম্ভব; তবুও তোমার অপাপবিদ্ধ দৃষ্টিতে বাজে টিকটিকির দ্বন্দ্বময় বিষাদ।

তাই ফের জন্ম হলে-ও আমার রক্তপাখি,
তোমার অনিকেত চোখে এঁকে দেব নীল নির্জন মৃত্যুফাঁদ।
 


বৃষ্টি ও সমুদ্রের সমীকরণ

আকাশবন্দি মেঘেরা ভাসতে ভাসতে শেষ পর্যন্ত সমুদ্রেই হারায়। জোছনার মাদুলি ধার করে বৃষ্টি সারায় পুরানো অসুখ।

আমাদের প্রাচীন শামুকবাস। অতল থেকে তুলে আনছো পোয়াতি মাছের শোক, বিগত পুরুষের বিষাদ।

কান্না তো এক অধিবাস্তব বৃষ্টি- তার জলে ভেজে না কোনো পাখির ডানা।

তাই শীত এলেও কেউ কেউ শীতার্ত হয় না। কোনো কোনো ফুলের কখনোই খোপার ব্যাসার্ধ হয় না জানা। অ্যাকুরিয়ামের গোল্ডফিস কোনোদিনও বোঝে না সমুদ্রের আসল সীমানা।
 


ঘুমবিরোধী বালিশের লিরিক

একটি জেলফেরত স্বপ্ন টলতে টলতে বিছানায় হারিয়েছে-এই নিয়ে সিলিংয়ে সিলিংয়ে রটে গেছে অপবাদ।

কবে যেন বালিশের ভেতর ঢুকে পড়েছে অনিদ্রা- অগোচরে। সেই থেকে চিরকালের মেঘ হয়ে উড়ছি এই হত্যাপ্রবণ শহরে।

মেঘের গর্জন থেকে বৃষ্টির দূরত্ব যত, মানুষের স্বপ্নের আয়ু ততটুকু। তবু অর্থহীন স্বপ্নগুলোর শেষকৃত্যে নেমেছে কবেকার আগুন। আমি ছাই হতে হতে শুনি বিবিধ আর্তনাদ, বালিশের ভাঙন।

বালিশ- সকল স্বপ্নের এক মায়াবী মহাজন।
 


গোরখোদকের ছুরিচিৎকার

আজ বলছো হরপ্পা কাহিনি, জিউসের শক্তিমত্তা ও পৃথিবীর তাবৎ ভুল বিষয়ক গল্পাবলী। বলছো রোমের ইতিহাস, হেলেন ও ট্রয় ধ্বংসকাহিনি। ডারউইনের বিবর্তনবাদ কিংবা নিউটনের তৃতীয় সূত্রও এড়িয়ে যাওনি। অথচ বেমালুম ভুলে গেছো- তুমি নিজেই এক ভুলের ভাগাড়। ভুলে গেছো, তোমার জোঁকসর্বস্ব পাতানো চালে আমার ক্রমাগত হেরে যাওয়া আর খামখেয়ালি ইশারার আত্মঘাতী ছুরিচিৎকার।

মাত্র কয়েক অধ্যায় দূরে, ভুলশহরের সমাধিতে আমার বাস- যে সমাধির প্রদীপ জ্বালাতে গিয়ে পথ হারিয়েছে এক উন্মাদ লাশ। জ¦লন্ত রাত্রির দগ্ধ জানালায় চলছে টোটেম উৎসব। প্রদীপের আলোয় সমাধি হাতড়ে ফিরছে এক শববাহক- কাঁধে তার আত্মগত লাশ।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E