৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ১০২০১৬
 
 ১০/১২/২০১৬  Posted by
জাহিদ সোহাগ

জাহিদ সোহাগ

‘অসুখের শিরোনাম’: ক্লেদ ও শুশ্রুষার সৌরভ
– গৌরাঙ্গ মোহান্ত

নাগরিক জীবনের ক্লেদ ও নৈসর্গিক শুশ্রুষার সুবাস মাখা ‘অসুখের শিরোনাম’ কাব্যের প্রথম কবিতায় কবি জাহিদ সোহাগ মৃত্যুময় মেটামরফসিস ও নির্বেদকে মূর্তিময় করে তোলেন। নিঃসঙ্গ জীবনের অভীপ্সিত স্বপ্ন নিয়ে যে কবি বাঁচতে চেয়েছেন তাঁর অন্তর্গত সত্তা ‘শববাহকের কাঁধ থেকে নেমে’ আসে। তিনি তাঁর ইন্দ্রিয়কে পুনর্চালিত করেন ‘অমানুষের সংবেদ’ দিয়ে। ‘নিজের বাসনার ভাঁজে’ সহজে ডুবে যাবার জন্য মানব শরীরকে রূপান্তরিত করেন জলঢোঁড়ার দেহে। মানুষের স্বাভাবিক সংবেদনাকে কবি কেনো উপেক্ষা করেন? কী অসীম বেদনার বিষ মানুষের গৌরবকে পুড়ে ফেলে? তথাকথিত সভ্য সমাজে যেভাবে ষড়যন্ত্র, অসহযোগিতা ও স্বার্থচিন্তা প্রসার লাভ করেছে তা সংবেদনশীল মানুষের জন্য ভয়াবহ ও দুঃসহ। অপার প্রেম ও সৃজনশীলতার ধারক, তাই, খাপছাড়া মানুষ।
              
অপার নৈঃসঙ্গ্য কবিকে ব্যাধিগ্রস্ত করে তোলে। কবি সমাজ-দূরবর্তী জনপদে বাস করেন  না বলে বহির্জাগতিক ক্লেদে আক্রান্ত হন। ক্লেদের ভয়াবহতা কাক্সিক্ষত প্রশ্বাসকে করে চিরবিপন্ন, “অনেক অনেক ক্লেদ জমে আছে ফুসফুসে, স্তরীকৃত যেন বা কয়লাবাড়ি।” সামাজিক ক্লেদ-ব্যাধি সৃষ্টিশীল কবিকে রূপান্তরিত করে ‘আত্মরতির সারসে’ যে সত্তা পালকের গভীরে চঞ্চু ডুবিয়ে চিন্তা করে, “কোনো সুখ নেই বাসনায় যাকে দেখা যায়, ছোঁয়া যায় তার নীল শিরায় ঘোড়ার চলাচল – দু’হাত তুলে আছি শূন্যে, নৃত্যসমেত জ্বলছে আঙুল।” প্রিয়হীন প্রতিবেশ সুস্থির হতে  পারে না। কবি দীর্ঘদিন কয়লার সাথে লুকিয়ে থেকে ‘বিপন্ন হীরকের ‘ স্বভাব অর্জন করেন আর অন্তর্গত অস্থিরতার প্রাবল্যে চিৎকার করে ওঠেন, “বলো, বলো আমায়- কোথায় গেলে শান্তিপূর্ণ মরে থাকা যায়; নদী থেকে কিছুটা ঢেউ তুলে আঁচলেও বেঁধে দেব- তবু যেন একটা ছুরি এসে সাঁতার কেটে যায় আমার অস্থিরতায়।” বীতনিদ্র , ক্লান্ত, নিঃসঙ্গ কবি সমাজ ও মানুষ সম্পর্কে বীতরাগ হয়ে পড়েন,”হয়তো আসবাব ছিল না কিছুই- শূন্য দেয়ালে পেরেকে গেঁথে রাখা যায় আমাকে বা পেরিয়ে এসেছি যে নদী তার ঢেউ। আর দু’চোখে আতশবাজি রেখে সারারাত জেগে থাকি যদি বা সকালে একটা তেতো রঙ ছড়িয়ে থাকে ক্লান্তিকর জিভে ।… হ্যাঁ তোমাকেও বলি এখানে বেঁচে থেকে থেকে জঘন্য লাগে মানুষের মুখ।আমি কত দিন চোখে চোখ রেখে  খুঁজেছি শূন্য শূন্য আহা শূন্যতার কোরিওগ্রাফি!”

এ সমাজ কবির আলোকময়, পেলব অস্তিত্বকে সতেজ ও সুস্থ রাখতে অক্ষম। সমাজের মানুষ ধারণ করে বুনোজন্তুর সম্ভাব্য স্বরূপ; তারা বাইনোকুলার চোখে প্রত্যক্ষ করে ফাটা নৌকার মতো কবির বিধ্বস্ত অস্তিত্ব। নিজের মানবিক অস্তিত্ব নিয়ে সংশয়াকীর্ণ কবি উচ্চারণ করেন: ‘এই ফসল কেটে নেয়া মাঠে লুকানো জলে দেহ ফেলে ভাবি, আসলেই কি মানুষের মতো ছিলো আমার দেহভরা প্রাণ!’ কবির অস্তিত্ব-সংকটের এক দুঃসহ বোধ নিবিষ্ট পাঠককে শিহরিত করে । কবি জন্ম ও যাপন নিয়ে করুণ শ্লেষ প্রকাশ করেন,”আমার তো শেষ, এই রৌদ্রের নিচে প্রিজমের বাহু মেলে অন্তত তোমাকে ডাকার দিনও – বিগত জন্মই তো যাপন করছি আমি  শুধু তোমাদের রঙপেন্সিল কোন খেয়ালে বারবার আমাকে এঁকে ফেলে মানুষ !”কবি-অস্তিত্বের এই বিপন্নতা আক্ষেপ-দীর্ণ কাল-চেতনাকে আভাসিত করে।

অসহনীয় পরিপার্শ্ব কবিকে অসুস্থ করে তোলে। তার অসুস্থতা শরীরের সীমা পেরিয়ে সমগ্র সত্তায় অমঙ্গল শেকড় চারায়। জীবনের উৎসবে নিভন্ত বাতির মতো তিনি বেমানান। প্রকৃতির নিরাময় কেন্দ্রে কবিকে কিছুটা স্বস্তি দান করে ‘নার্সের মতো সারস আর ঘুমের ওষুধের মতো ডাহুকের স্বর।’ নিরাময়হীন কবি যে যন্ত্রণা ভোগ করেন তা মৃত্যুর সমান। দেহের ভাঁজে ‘মাছের কঙ্কাল’ লুকিয়ে রেখে তিনি নিঃসঙ্গ, নির্জীব চিলের সাথে আপন সত্তার অন্বয় রচনা করেন , “ওদিকে একা চিল – ডেকে ডেকে – ডেকে ডেকে – আকাশের জমাট নীলে মরে থাকে; আর আমি রক্তের ভেতর গুঁড়ো গুঁড়ো ঘুমের ওষুধ। যাকে তুমি আজও পারনি জাগাতে ।”এই মৃতকল্প কবি-সত্তার ‘গ্রীবার কাছে’ শীতের এক মাকড়শা “বুনে চলে মৃত্যুর জামা।” মরনাপন্ন কবির কাছে নিসর্গ হয়ে ওঠে উপশমের অকৃত্রিম অবলম্বন: ‘দূরে, বৃক্ষের ঝোপ-ঝাড়ে পাখা ঝাপটায় নীড়ে ফেরা পাখি। সেই শব্দে আমিও জানি এতেই উপশম হয় মরে যাবার ব্যথা!’ জাহিদ সোহাগের মৃত্যুচেতনা শার্ল বোদলেয়ারের মৃত্যুবোধ থেকে ভিন্নতর। ‘The Death of the Poor’ (La Mort des Pauvres) কবিতায় বোদলেয়ার মৃত্যুকে ‘the glory of the gods’ এবং ‘the portico open on to the unknown Heavens’ বলে অভিহিত করেছেন। জাহিদ মৃত্যুকে বোদলেয়ারী মহিমা দান করেন নি । বোদলেয়ারের কাছে মৃত্যু সান্ত¡না ও জীবন-লক্ষ্য, “It is Death which consoles men, alas, and keeps them alive, Death is the aim of life; It is the only hope which, like an elixir, raises our spirits and intoxicates us, and gives us the heart to march until evening.” জাহিদের কাছে মৃত্যু বেদনার চরম আধার যা থেকে তিনি  উপশম প্রত্যাশী। বোদলেয়ারের মতো জাহিদ মনে করেন না যে মৃত্যু আমাদের বাঁচিয়ে রাখে এবং তা গতিপ্রদায়ী মহৌষধ।

কবি জাহিদ সোহাগ কাব্যে যে ভূ-দৃশ্য রচনা করেন তা মৃত্যুজর্জর, শীতল পাথরের মতো নির্জন। টি. এস. এলিয়ট ÔThe Waste Land’  কবিতায় অবিস্মরণীয় শব্দমালায় জল-দুর্লভ পাথুরে পরিবেশের বর্র্ণনা দেন: “Here is no water but only rock/Rock and no water and the sandy road/The road winding above among the mountains/ Which are mountains of rock without water”  টি. এস এলিয়টের এই ঊষর বোধ জাহিদ সোহাগের কবিতায় সঞ্চারিত। অবশ্য এ বোধের সঙ্গে কবি অন্বিত করেন তাঁর অন্তর্গত বর্ষণ: ‘কোন জল এখানে পিপাসা মেটাতে এলে দীর্ঘতর সড়কের মতো পাথর হয়ে যায়। তখন আমার চোখ ফেটে ছোট ছোট মাছ লাফিয়ে পড়ে – যাকে তোমরা বলবে বর্ষা।’

আধুনিক কবিতায় অন্ধকারের চেতনা অর্জন করেছে দুর্মরতা। ÔFlowers of  Evil’ (Les Fleurs du Mal) কাব্যেরÔTo the Reader’ (An Lecteur) কবিতায় বোদলেয়ার উল্লেখ করেন, দুর্গন্ধময় অন্ধকারের ভেতর দিয়ে, আতঙ্কবোধ ব্যতীত আমরা প্রতিদিন ধাবিত হচ্ছি নরকের দিকে – Ôevery day we go a step further down towards Hell, without horror, through stinking darkness’. অন্ধকারের এ বোধ থেকে কবি জাহিদ সোহাগ মুক্ত নন।তবে জাহিদের অন্ধকার-চেতনা বোদলেয়ারের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। বোদলেয়ার বিশ্বাস করেন, মানবসত্তার গভীরে প্রোথিত দূষণ অপ্রতিকার্য, আদি পাপ এবং শয়তানের প্রভাববলয় থেকে মানুষের নেই কোনো পরিত্রাণ। ফলত অন্ধকার নরক মানুষের জন্য অনিবার্য হয়ে ওঠে। জাহিদের চেতনায় সত্তাস্থিত অপ্রতিকার্য দূষণ, আদি পাপ, শয়তান ও অন্ধকার নরকের অস্তিত্ব দুর্লক্ষ্য। জাহিদের অন্ধকার-চেতনা আন্তর-মূল্য ও প্রাতিস্বিকতায় ভাস্বর। জাহিদ যখন উচ্চারণ করেন,”বুনো বলে কিছু নেই – আমার অন্ধকার – পাকস্থলিতে ফলে উঠে রক্তিম আপেল আর ফিরে যায় পাখি” তখন অন্ধকারকে  প্রত্যক্ষ করার জন্য অন্তর্জগতে ফিরে যেতে হয়। কবি এখানে যে অন্ধকারের বর্ণনা দেন তা অনাস্বাদিত ও সংগুপ্ত। প্রেম, প্রতারণা ও মৃত্যুর সমন্বয়ে জাহিদ নির্মাণ করেন অসাধারণ একটি রূপকল্প: ‘কে আর ডাকবে পেছন থেকে! দেহ ফুরিয়ে গেলে যে নাম থেকে যায় পৃথিবীতে- বিগত পথে হেঁটে বেড়ায় যদিও সে লোকটা,তবু তার দেহ নয় ছায়া নয়; প্রেমে প্রতারণায় যে বৃক্ষ ছড়িয়েছে শাখা- ধীরে ধীরে আবার তাও ঢুকে যায় বীজের অন্ধকারে।’ বীজের অন্ধকার তাৎপর্যপূর্ণ। এ অন্ধকারের ভেতর উন্মেষের সম্ভাবনা বিদ্যমান। বোদলেয়ারের মতো আতঙ্কহীন এ অন্ধকার পরিপূর্ণভাবে ঋণাত্মক নয় হেতু কবির পংক্তিমালা সর্বত হতাশারঞ্জিত নয়। প্রথম কবিতায় যে ‘চায়ের পিপাসা’কে ঢেকে দেয় গোরখোদকের কোদাল, তা শেষ কবিতায় লাভ করে পুনর্জীবন।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E