৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুন ২০২০১৭
 
 ২০/০৬/২০১৭  Posted by

তৈমুর খান-এর প্রিয় কবিতাটি ও তার গল্প

বিবাহিতা প্রেমিকা
________________
বেজে উঠছে বাসনকোসন
অদ্ভুত তোমার রাঙা হাত
কৃষ্ণটি কোথায় গেছে?

টিউশান সেরে রোদে রোদে
আমার সাইকেল
সারাদিন আমাকে ঘোরায়

টেপে বাজছে হিন্দিগান
একা তুমি কলতলায়
কৃষ্ণের জন্য কি আজ মাংস-ভাত?

ঝকঝকে থালায় মুখ।
স্বপ্নে ঢুকে যাব —
তোমার পেটের ভ্রূণ হয়ে
ফিরে আসব আজকে রাতেই।

 

কবিতাটি রচনার প্রেক্ষাপট

একটা কবিতার জন্য একটা মুহূর্তই যথেষ্ট হলেও এর পেছনে থাকে বিরাট এক আয়োজন। প্রস্তুতি চলতে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে। তারপর জন্ম হয় কবিতাটির। এরকমই একটা কবিতা “বিবাহিতা প্রেমিকা”। প্রকাশিত হয় ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৭ জুন ২০০৩ সালে। কবিতাটি লেখা হয়েছিল তারও কিছু দিন আগে।

একটি ভিন্ন সম্প্রদায়ের মেয়ের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল প্রেম। আমি যখন কলেজের ছাত্র, সে তখন হাইস্কুলের। ওকে পড়ানোর সুযোগ ঘটেছিল। শিক্ষক ছাত্রী সম্পর্ক। কিন্তু তাহলে কী হবে ? জীবনের প্রথম প্রেম শিশির স্নাত গোলাপের মতো। স্বপ্ন হয়ে সে আমার জীবনকে উত্তাল করে দিয়েছিল। বিষণ্ণ একাকী মুহূর্তে হঠাৎ সে আমার নির্জন কক্ষে উপস্থিত হত। আর চুমুতে চুমুতে উষ্ণ করে তুলত আমাকে। তার আয়ত চোখের দিকে চেয়ে থাকতাম। লম্বা দুটি হাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলে মনে হত আমি বাঁশির মতো বেজে উঠছি। যৌবনের মাধুর্য ও মাদকতায় আচ্ছন্ন হয়ে যেতাম। কবিতায় বেজে উঠত সেইসব স্পর্শ ও ঘ্রাণ।

কলেজ জীবন এক সময় শেষ হল, কিন্তু ওর তো সবেমাত্র শুরু হল। কলেজ জীবনের পর উচ্চ শিক্ষার জন্য যেতে হল বাইরে। বাইরে গেলেও সম্পর্কের সুতো ঘুড়ির মতো টান দিতে থাকল। চিঠি লিখল। চিঠির উত্তরও পেল। ছুটিতে বাড়ি আসার পর সারাদিন চলল আড্ডা। প্রেমের শেষ নেই। কথারও শেষ নেই। কথার পিঠে কথা চেপে বসতে লাগল।

সব পড়া শেষ করে এক সময় বাড়ি ফিরে পেশা হিসেবে ধরতে হল টিউশানি। একটা পুরোনো সাইকেলই আমার সঙ্গী। সারাদিন শহরে অথবা ভিন্ন গাঁয়ে যেতে হয় টিউশানি করতে। একটা কলেজেও অংশকালীন শিক্ষক হিসেবে জুটল পড়ানোর কাজ। সারাদিন পর বাড়ি ফিরে অন্তত একবারও তার দেখা চাই। না দেখা পেলে প্রচণ্ড কষ্ট উপলব্ধি হল। মনে হল এক নিমেষও একে ছেড়ে থাকা যাবে না। সকালবেলা ঘর থেকে বের হবার মুখে ওর বাড়ির সামনে একবার দাঁড়াই। সরু মাজায় জল ভরা কলসি নিয়ে যাওয়ার মুহূর্তটি আমার কাছে অসম্ভব সুন্দর একটা দৃশ্য। উদাসীন হয়ে যাই। মনে মনে ভাবি, এ তো শুধু আমারই! পৃথিবীতে আর কেউকেই এর ভাগ আমি দেবো না!

২০০০ সাল পর্যন্ত আমার চাকরি হল না । একদিন ও এসে বলল, আমাকে সিঁদুর পরাও !
আমি বললাম, সিঁদুর তো নেই! তবে দাঁড়াও….
বলেই একটা নতুন ব্লেড এনে নিজের বুক অনেকটা চিরে ফেললাম। সেখান থেকেই রক্ত নিয়ে দিলাম ওর সিঁথি রাঙিয়ে।
ও আমাকে প্রণাম করে জড়িয়ে ধরল। তারপর প্রগাঢ় চুম্বন করল।
কিন্তু এই বাঁধন কি টিকবে? সত্যিই চাকুরি পেলে গ্রাম থেকে পালিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে ঘর বাঁধতে পারতাম। কিন্তু তা সম্ভব হল না। আমাদের প্রেমের সম্পর্ক জানাজানি হয়ে গেল। দুটি ভিন্ন সম্প্রদায়। ধর্ম আলাদা। কী করে সম্ভব?

ওর বাবা একদিন আমাকে বললেন, সবই তো জানি, কিন্তু একটা চাকুরি হল না আজ অবধি?
না হল না চাকুরি। ওর ঘর থেকে বেরোনোর দরজা বন্ধ হয়ে গেল। কয়েক মাসের মধ্যেই ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। আমি অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলাম। সেই থেকেই শুরু হল আমার আত্মহত্যার প্রস্তুতি। কিন্তু মায়ের মুখটি দেখে পারলাম না। আমি বেঁচে না থাকলে যে অনেকেই বেঁচে থাকবে না !

ওর বিয়ের আটদিন পর ওর বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে যেতে সাইকেলটি দাঁড় করিয়ে দেখতে লাগলাম ওকে। নতুন বেনারসি শাড়ি। রঙিন হাত ভরা চুড়ি। কলতলায় থালা মাজছে। ওর নতুন স্বামীটি কোথায় ? কিন্তু জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। তখন মনে হল এই কবিতাটি। যাকে বউ হিসেবে পেলাম না, তাকে অন্তত মা হিসেবে পাবার ভাবনাটি জেগে উঠল। যে পুরুষ্টু বুক আমি প্রেমিকের দৃষ্টিতে দেখেছিলাম, তা দেখলাম সন্তানের দৃষ্টিতে। তাই পেটের ভ্রূণ হয়ে জন্মাতে চাইলাম।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E