৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ২০২০১৬
 
 ২০/১০/২০১৬  Posted by
কবি ফেরদৌস মাহমুদ

কবি ফেরদৌস মাহমুদ

কবি পরিচিতি

ফেরদৌস মাহমুদ। জন্ম:  ২৩ অক্টোবর, ১৯৭৭। চরডিক্রি, মুলাদী, বরিশাল [নানা বাড়ি]। শিক্ষা: স্নাতকোত্তর, রাষ্ট্রবিজ্ঞান। পেশা: সাংবাদিকতা।
কাব্যগ্রন্থঃ সাতশো ট্রেন এক যাত্রী (২০০৬), নীল পাগলীর শিস (২০০৯), ছাতিম গাছের গান (২০১২), আগন্তুকের পাঠশালা  (২০১৬)।
জীবনীগ্রন্থঃ সত্যজিৎ রায় (২০০৯)।
ছোটদের বইঃ সন্ধ্যা তারার ঝি (ছড়া-কবিতা, ২০১৬)।
ইতিহাসঃ বিশ্বযুদ্ধ (২০১৬)।
ferdous.mahmud77@gmail.com

ফেরদৌস মাহমুদ -এর কবিতাভাবনা

কবিতায় ভাঙচুর ও চাঁদ দর্শন

বাসার সামনে কোনো নদী নেই, ভাবতে ভালো লাগে নদী আছে; রুমের মধ্যে কোনো পাখি নেই,
ভাবতে ভালো লাগে পাখিদের সাথে আড্ডা মারছি; শহরে কোনো নির্জন সরিষার ক্ষেত নেই,
ভাবতে ভালো লাগে- একটা লাল ফড়িং হয়ে নেচে বেড়াচ্ছি মাঠভর্তি সরিষার ফুল থেকে সরিষাফুলে।

এই যে এসব ভাবনা, এর ভিড়ে আসলে কবিতা নিয়ে আলাদা কোনো ভাবনা থাকার কথা নয়; অর্থাৎ কবিতাই কবিতাভাবনার উৎকৃষ্ট প্রকাশ। তবু ভাবি, নতুন ধরনের কবিতা কেমন হতে পারে তা নিয়ে ভাবনা খেলা করে। নতুন ধরনের কবিতা লেখার প্রসঙ্গে একটি বাক্য মাঝেমধ্যেই উচ্চারিত হতে শোনা যায়- কবিতায় ভাঙচুর করতে হবে।  ‘ভাঙচুর’ শব্দটা শুনলে আঁতকে উঠি, কেননা- ভাঙচুর শব্দটার মধ্যে বরাবরই ধ্বংসাত্মক একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়।
কিন্তু শিল্পের ক্ষেত্রে ভাঙচুর শব্দটা কী আদৌ ধ্বংসাত্মক? সাহিত্যের ভাঙচুর কী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি আমরা খুঁজি, দেখবো- শিল্পসাহিত্যের ভাঙচুর মানে আসলে নতুন কিছু সৃষ্টি হওয়া। এই সৃষ্টি হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ভাষায়, লিখন ভঙ্গিতে বা কখনো কখনো বিষয়ে বাধ্যতামূলক পরিবর্তন আনা। কেননা- শিল্প-সাহিত্যকে প্রতি মুহূর্তেই হয়ে উঠতে হয় বর্তমান সময়ের উপযোগী। এটা কখনোই তার প্রাচীন কিংবা মধ্যযুগীয় ভঙ্গিতে অবস্থান করে থাকে না। বিশ্বসাহিত্য বা বাংলাদেশের সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। শেক্সপিয়ার, কিটস বা বায়রন যে ভাষায়, যে ভঙ্গিতে বা বিষয় নিয়ে লিখতেন আজকের ইংরেজ সাহিত্যিকরা ওইভাবে লিখেন না। আবার মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দ দাশ যেভাবে বাংলায় লেখালেখি করেছেন আমরা সেভাবে লিখছি না। সময়ের সাথে সাথে বদলে গেছে আমাদের লেখার বিষয়, ভাষাভঙ্গি, কথনভঙ্গি, চিন্তা-চেতনা সমস্ত কিছুই। বিষয়টা যেন অনেকটা রিলে দৌড়ের মতো। একটি সময়ের লেখকরা তার পতাকা তুলে দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত পরবর্তী পরিবর্তীত সময়ের লেখকদের হাতে। অর্থাৎ প্রতিটি বর্তমানের গুরুত্বপূর্ণ লেখকের কাজ যেন আগামীর ক্লাসিক হয়ে ওঠা! এসবের মধ্যে সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তনকেই সম্ভবত বলা হয় সাহিত্যের ভাঙচুর।
এসব পরিবর্তনের মধ্যেও একজন কবি অপর কবি থেকে পৃথক হন তখনই, যখন তিনি নিজের কণ্ঠস্বরকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে পারেন। একই সময়ে দাঁড়িয়ে কবিতায় বিভিন্ন ধরনের ভাঙচুর হতে পারে এবং বিভিন্ন ধরনের কণ্ঠস্বরের আবির্ভাব ঘটতে পারে। এটা নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট ও জীবনাভিজ্ঞতা থেকে লেখা ব্যক্তি-কবির কবিত্বশক্তির উপর। কিন্তু এমনও তো হতে পারে, একজন কবি তার সময়ের সমস্ত কণ্ঠস্বরকে নিজের মধ্যে ধারণ করে বসে আছেন। যেমন-

আকাশে মস্ত চাঁদ উঠেছে আজ। ১৪ জন কবি চাঁদের দিকে তাকিয়ে।

কবি চাঁদ দেখছে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে
কবি চাঁদ দেখছে সি-বিচে দাঁড়িয়ে
কবি চাঁদ দেখছে গোরস্তানে দাঁড়িয়ে
কবি চাঁদ দেখছে খোলা মাঠে বসে
কবি চাঁদ দেখছে জাহাজের ছাদে বসে
কবি চাঁদ দেখছে মরুভূমির বালুতে নাচতে নাচতে
কবি চাঁদ দেখছে মদের বোতল হাতে হাসতে হাসতে
কবি চাঁদ দেখছে নগ্ন হয়ে শরীরে বালু মাখতে মাখতে
কবি চাঁদ দেখছে শীতের জ্যাকেট গায়ে মৃত্যুচিন্তায় বুদ হয়ে
কবি চাঁদ দেখছে ভিখিরির সাথে চা খেতে খেতে
কবি চাঁদ দেখছে আমলার স্ত্রীর সাথে পরকীয়া করতে করতে
কবি চাঁদ দেখছে ঋষির মতো ধ্যনী হয়ে
কবি চাঁদ দেখছে বিপ্লবীদের সাথে সান্ধ্যকালিন রাজপথে হাঁটতে হাঁটতে

কবি চাঁদ দেখছে …

কবি চাঁদ দেখছে…

চাঁদের দিকে তাকিয়ে ১৪ জনই পৃথক হয়ে গেছে!

উপরে ১৪ জন কবির ১৪ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে চাঁদ দর্শনের কথা বলা হয়েছে। এখন ওই কবিরা সকলেই যদি চাঁদ দেখা নিয়ে কবিতা লেখেন, নিশ্চিতভাবেই বলা যায় চৌদ্দ প্রেক্ষাপটের চৌদ্দ রকমের অনুভূতির কবিতা লেখা হবে। এবং এখানে চৌদ্দটি কণ্ঠস্বর পাওয়া যাবে। কিন্তু এদের মধ্যে তিনিই হয়ত সবার থেকে এগিয়ে যাবেন, যিনি কোনো একটা নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে থেকে চৌদ্দটি প্রেক্ষাপটকে নিজের মধ্যে কল্পনাশক্তির বলে কিংবা তীব্র অনুভূতিপ্রবণতার জোরে ধারণ করতে পারবেন! ফলে দেখা যাবে ওই এক কবির ছত্রছায়ায় ঢাকা পড়ে যাবেন বাকি ১৩ জন কবি। ওই ১৪ জন কবির সময়টা হয়তো উচ্চারিত হবে ওই একজন কবির নামের উপরই। আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমি আসলে নিজের ভেতর সেই কবি সত্তাকেই খুঁজে ফিরি যিনি নিজের মধ্যে সমগ্রতাকে ধারণ করতে পারেন।

ফেরদৌস মাহমুদ -এর কবিতা


শবেবরাত

এবারের শবেবরাতে কলোনির ছেলেদের সাথে
মোল্লাপাড়ার ছেলেদের মারামারি হলো।

সারা রাত আমি তারাবাতি জ্বালালাম,
নিজ হাতে বানানো মরিচা বোম ফুটালাম।
ভিখিরিদের দিলাম ৫০ টাকা। নামাজ পড়লাম ১২ রাকাত।

আমার একটি তারাবাতি উড়ে গেল চাঁদের দেশে, তিনটা মরিচা হারাল
গোপালদের বাড়ির উঠোনে। গোপাল আর আমি পেট ভরে খেলাম
সুজি-গাজরের হালুয়া, গরুর মাংস, চালের রুটি।

এবারের শবেবরাতে হারিয়ে গেল আমার গোল টুপি,
পাঞ্জাবিতে লাগল মাংসের ঝোল। তবু ওই পাঞ্জাবি পরে
পরদিন কিনলাম বউবাজারের পাঙ্গাস। নিজের কণ্ঠস্বরকে
মনে হলো অন্যের কণ্ঠস্বর।

আগামী শবেবরাতে চাঁদে যাব খুঁজতে উড়ে যাওয়া তারাবাতি।


গাছ কাকা

সামনে এগোলে চিংড়ির পুকুর। তারপর পাকা রাস্তা।
রাস্তার কিনারে আম-জাম-শাল আর সারি সারি
নারকেল গাছ।

এই গাছ সব লাগিয়েছিলেন আমাদের বুড়া দাদা।
তিনি গাছেদের সঙ্গে কথা বলেন, গাছেরা নাকি তার
ছেলে-মেয়ে। গাছেরা নীরবে তাকে বাবা বলে ডাকে।

আমিও সুযোগ পেলে তাই এ গাছগুলোকে কাকা বলে ডাকি।


রেফ

আদিম শিকারি কালো ভালুকের পিঠে বসিয়ে যায় রেফের মতন
তীক্ষ্ণ ফলা।

বকের পালক খুঁজতে গিয়ে থামি পাহাড়ী চাঁপাগাছের সামনে।

চাঁপাগাছ যেন দুপুরের ভুঁড়িঅলা মাতাল। মৌমাছির গুঞ্জনে শোনায়
শের-শায়রি; দূর-দুপুর থেকে ভেসে আসে ব্রেকফেল সাইকেলের ক্রিং।

‘ইউরেকা’ বলে চিৎকার করে লাল কিশোরী-
নামতাক্লাস থেকে পালানো ফিনিক্স চাঁপা গাছকে ভাবে মির্জা গালিব।

চাঁপা গাছ আর ভালুকের পিঠে রেফ দেখতে আসে ১০০ নোবেল জয়ী।


জন্মদিনের কেক

যে দরজায় নক করলো সে হচ্ছে আমি
যে দরজা খুললো সেও হচ্ছে আমি
যিনি কিছুই করলেন না তিনি হচ্ছেন
আমাদের লাশ
কবরে নেমে চকলেটের গন্ধ ছড়ান।


বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী

বসে আছি তিন সূর্যঅলা গ্রহের খয়েরি গাছের তলায়। তিন সূর্যের আগুনে
হাসে কাঠ, পোড়ে ফুল।

নভোমণ্ডলের দারোয়ান ছোঁয় সাঁতার না জানা সামুদ্রিক মাছ, উড়তে না পারা
নিঃসঙ্গ সারস আর মায়াবী ময়ুর।

নক্ষত্র-রাস্তায় নক্ষত্র-ট্রাফিক দাঁড়ায় উড়ন্ত সসারের ছাদে। শোঁ-শোঁ শব্দে কাঁপে
নীল নভোযান।

হারানো বোতামের খোঁজে এক সূর্য ওঠে দুই সূর্য অস্ত যায়। এখানে কোনো রাত
নেই, সারাক্ষণ অতি অতি দিন।

বছরে একবার তিন সূর্য এক সাথে অস্ত যায়, আর সেদিনই চারখানা চাঁদ ওঠে।

চারটি চাঁদের জ্যোৎস্নায় সারা গ্রহে ঝড় ওঠে, উড়ে যায় নভোচারির পা,
উড়ে যায় মহাকাশচারীর শান্ত মাথা।

এ আজব গ্রহে ১ জনেরই বাস, তার কোনো জন্মদাতা নেই, জন্মদাত্রী নেই।
তিনি কবিতা লেখেন।


নিরক্ষর

তিনি নিরক্ষর, মাঝেমধ্যে তাকে বাংলা পত্রিকা পড়ে শোনাই।
তার কাছে চিঠি এলে তাও পড়ি আমি, কখনও আবার উত্তর লিখে দিই।
তাকে প্রায়ই অক্ষর-জ্ঞান দিতে চাই কিন্তু তিনি শিখতে নারাজ।
তার কাছে বাংলা অক্ষরগুলোকে দুর্বোধ্য ছবি মনে হয়। তিনি বলেন,
নবীজি নিরক্ষর ছিলেন। ফকির লালন জানতেন না পড়তে।

তার কথায় আমি হাসি। এরমধ্যে এক জাপানি কবির সাথে পরিচয় হয়।
কবি আমার জন্য জাপানি পত্রিকা পাঠান, পত্রিকা ভরা কেবল জাপানি বর্ণমালা।
পত্রিকাটি মেলে ধরে তাকিয়ে থাকি- আমার কাছে জাপানি অক্ষরগুলোকে ছবি
মনে হয়।

তিনি আমার পাশে এসে দাঁড়ান। পত্রিকাটির দিকে তাকিয়ে বলেন ‘সুন্দর’।
আমিও বলি ‘সুন্দর’। অনুভব করি, এবার আমার আর তার মধ্যে কোনো
পার্থক্য নেই। জাপানি বর্ণমালার সামনে আমরা দু’জনই নিরক্ষর।

শিশুরা জন্মায় ওহে নিরক্ষর হয়ে, মানুষ মূলত ফুল-পাখি-গাছের মত নিরক্ষর!!


পুরান ঢাকা

পুরান ঢাকার দালানগুলো যেন শতবর্ষী নানা, শরীর ভরা ইতিহাস।

নানা আমার হাঁটতেন বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথের মতো কুঁজো হয়ে
মধ্যরাতে লেবুফুলের করতালিতে পড়তেন সুর করে কোরআন।

আকাশে উড়ত লাল-নীল বাক্স-ঘুড়ি, নানার হাতে শোভা বাড়াত
বাকরখানি;
নানাবাড়ি বহুদিন হলো হয়ে গেছে মামা বাড়ি।
মামাবাড়ি হয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে মামাতো ভাইয়ের…

পুরান ঢাকার অলিতে-গলিতে, বাড়ির ছাদে হাসনাহেনার ঘ্রাণে
আজ সন্ধ্যায় উঠেছে মস্ত টিনের চাঁদ।
পঙ্গু ভিখিরির গানে ওই চাঁদ যেন বাজছে ঠন্ ঠন্।

মনে হয়, নানার মত ওই দালানগুলোও লুটিয়ে পড়বে হঠাৎ।


বিজ্ঞাপন

তোমাদের শহরে এসেছি মৃগী রোগ বিষয়ে বক্তৃতা দিতে।

শোনো, সক্রেটিস- এরিস্টোটল মৃগীরোগী ছিলেন
তুমি মৃগীরোগী নও, তুমি দার্শনিক হতে পারবে না।

লিওনার্দ দ্য ভিঞ্চি মৃগীরোগী ছিলেন
তুমি মৃগীরোগী নও, মোনালিসার হাসি তোমার জন্য নয়।

মিকেলাঞ্জেলো মৃগীরোগী ছিলেন
তুমি মৃগীরোগী নও, তুমি পাথরে প্রাণ দিতে পারবে না।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মৃগীরোগী ছিলেন
তুমি মৃগীরোগী নও, তোমার ঘোড়া কথাসাহিত্যের মাঠে দৌড়াবে না।

মৃগীরোগ খুব ভালো!!!


মঙ্গলকাব্য

দুরবিন পেতেছি সন্ধ্যা শেষের ছাদে।

সকল নক্ষত্রের নামকরণ করা হয়নি এটা বুঝে
বহু নক্ষত্রের নামকরণ করি নিজে।

আমার বাড়িতে
নক্ষত্র দেখতে আসে কালকেতু আর ফুল্লরা।

কাঠকুড়–নির বনে
আগুন লাগিয়ে আসা বনিক হাততালি দেয়।

আমাকে ডাকে
মহাকালের ঠোঁটকাটা নদী  আর ছোট্ট টঙ ঘর।

নক্ষত্র চেনার বই আমার হারিয়ে গেছে খেজুরতলার হাটে!

১০
আমি মতিলাল হতে চাই

শুনেছো মতিলাল, ভালো লোকগুলোকে আজকাল সবাই ‘গাধা’ বলে ডাকে।
তুমি ভালো আদমি, তোমার পাশে দাঁড়িয়ে গতকাল আকাশ দেখেছি- মানে
গাধার পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছি আকাশ ভরা তারা! তোমার পুরনো চটিজোড়া
দেখে তখন হাসছিল নিম্ন আকাশের কিছু শাদা মেঘ। আমি ওই মুহূর্তে ভাবছিলাম
কিছু চালাকজীবনের প্রতিপত্তির কথা।

মনে কি পড়ে মতিলাল, তোমাকে ঠকিয়ে যে লোক নিয়েছিল জমির দখল তাকে
দিয়েছিলে একদিন অভিশাপ; লোকটা আত্মহত্যা করতে গিয়ে গতমাসে বেঁচে গেছে,
তার পান করা ইঁদুরের বিষে ছিল ভেজাল। মতিলাল, তুমি কি বুঝে গেছ চতুর
লোকগুলিকে কোনো শাপই সাপ হয়ে মারে না ছোবল!

মতিলাল আমি জানি, ঠকতে ঠকতে শেষপর্যন্ত তুমিই জয়ি সুখী মানুষ।
মতিলাল, আমি তোমার মত হতে চাই…

১১
নক্ষত্রের দূতাবাস

সাজানো তাসের সব শয়তানি ছিঁড়ে একাকী বেরোয়
মহান ইস্কাপনের টেক্কা। দোজখের গোপন ফাঁটল
দিয়ে ঢুকে পড়ে স্বর্গের বাতাস! সমুদ্রের স্রোত গুণে
জন্ম নেয় প্রাচীন গণিত। মৃতদের ড্রয়িং খাতায়
বৃত্ত আঁকতে আঁকতে যাই ঝলমলে নতুন সি-বিচে।
পশ্চিমের দেশে ঘুরে বেড়ানো কুয়াশা ঢেকে ফেলে চুপে
আদিম সূর্যোদয়ের গল্প! হরিণীর মত অধ্যাপিকা
পাখির কূজন বন্ধ করে চালায় ভাষাতত্তে¡র ক্লাস।
পাহাড়ি পাঠশালায় নামে শিমুল ফুলের  নিরবতা
গভীর বনের ঝরনার সুরে ক্যামেরার আলো পড়ে।
ভাঙা চাঁদ হাতে নিয়ে নীল দার্শনিক হাসে। শীত পাখি
গাছের পাতায় লেখে, ‘খ্যাতি চমক সৃষ্টিতে পায় বৃদ্ধি।’
দূতাবাসে-দূতাবাসে কড়া নাড়ে তেজি লাল ঘোড়া,
বিদেশী বাঘের ভিসা নিয়ে ওড়ে আকাশে হেলিকপ্টার।

১২
প্রশ্নগাছ

…  ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যে নক্ষত্র তোমাদের দেশে আলো দেয়
তার নাম ‘সূর্য’ রেখেছিল কে? রোদের নাম ‘রোদ’ রাখা হলো কেন
ভেবেছ কখনো? নিশ্চয় রয়েছে লুকিয়ে এসবের উত্তরে তোমাদের জন্য
ভাবনার বহু বহু উড়ন্ত বীজ।

একবার ভেবে দেখো তো, সূর্যের নাম যদি হতো ‘কুকুর’
তাহলে ‘কুকুর’ শব্দটা শুনলেই কি তোমাদের সামনে ভেসে উঠতো না
ঘেউ ঘেউ করা প্রাণীর বদলে ‘অগ্নি-গোলক’।

…নিশ্চয় ‘মৃত্যু’ শব্দটা শুনলে তোমাদের মধ্যে জেগে ওঠে বিষাদ ।
কিন্তু ১টা চমৎকার লাল-নীল গাড়ির নাম যদি দেয়া হয় ‘মৃত্যু’
কিংবা ‘শিশুপার্ক’কে বলা হয় ‘মৃত্যুপার্ক’ এবং রাখা হয় ওখানে
আনন্দময় হাসি-গান তবে কি ‘মৃত্যু’ শব্দটাই হয়ে উঠবে না আনন্দময়!

একবার ভাবো, ভেবে দেখো- কোথা থেকে উৎপত্তি ভাষার
আকার-নিরাকার। তাকাও প্রকৃতির দিকে-
জানে না মাছ, মানুষ তাদের ‘মাছ’ বলে
জানে না পাখি, মানুষ তাদের ‘পাখি’ বলে
জানে না গাছ, মানুষ তাদের ‘গাছ’ বলে
জানে না সমুদ্র, মানুষ তাদের ‘সমুদ্র’ বলে

কেবল তোমরা জানো, মানুষ তোমাদের ‘মানব’ বলে!
আহা, মানুষ যেখানে যায় সেখানেই দৃষ্টি শব্দ হয়ে মানে ওড়ায়।

১৩
কামসূত্র

ঘন বন-মাঝে            বাউলের সাজে
হয়ে উঠি একাকী প্রবাসী,
মাতৃভাষা ভুলে        এলোমেলো চুলে
মহাকাশে পদ্মাসনে আসি।
হাওয়া লাগে জলে        মাছ কথা বলে
অন্ধকারে হাসে বর-কনে,
ধৈর্য্য অস্ত যায়        সূর্যটা লুকায়
দারুচিনি-দ্বিপে ঝাউবনে।
মেঘের বর্ষণে            দেহের ঘর্ষণে
কামসূত্রে কাঁপে তাজা মাটি,
তারা ঝরে টুপ        নর-নারী চুপ
ভোরে মেলে দাঁত এক পাটি।

১৪
আহত হেডকোয়ার্টার

যদিও ছেলেটি পকেটমার
তবু সে আমার ভাই
এশিয়ার আলো-ছায়ার সন্তান

পৃথিবীর জনবহুলদের আগাছা

অন্ধকার বোতলের মধ্যে সবুজ ফড়িঙ ঢুকিয়ে
নিজেকে বলে অভিবাদন মৃত্যুময় সকাল।

১৫
মতিঝিলের বাতাস : ১

একবার মতিঝিলের ফুটপাতে জ্যোতিষীকে হাত দেখিয়ে
দশ টাক লস দিয়েছিলাম; এবারের শীতে ওই দশ টাকার
নোটটাকে দেখতে ইচ্ছে করছে খুব।

কোথায় ওই নোট, কার হাতে
কার হাতে…

টাকার কি শীত নাই?
টাকা কী শীতে কাঁপে না?
গেল বর্ষায় আমার ভেজা টাকা শুকাতে দিয়েছিলাম
গরম তাওয়ায়। টাকা হয়ে উঠেছিল কড়কড়ে উত্তপ্ত।

ওহ মতিঝিল,
তোমার ব্যংকগুলোতে কত কত টাকার উত্তাপ
আমার মাটির ব্যংকে কোনো টাকা নাই।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E