৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ০৬২০১৬
 
 ০৬/১১/২০১৬  Posted by
কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

গৌরাঙ্গ মোহান্তের ‘জলময়ূরের শত পালক’ : অন্তর্লীন বোধের স্মারক

– ফেরদৌসী রহমান বিউটি

‘সময় ও পৃথিবী অভিজ্ঞতার আধার। কবিও সঞ্চয়ী। কিন্তু তার আনীত অভিজ্ঞতা কতখানি সার্বিক, কতখানি তার নিজের এবং নিজের অভিজ্ঞতাকে কতদূর অপরের করে তুলতে পারা যায়-সকলকে না হোক, অনেককেই পরিদীক্ষিত করতে পারা যায় নিজের মুল্যজ্ঞানের চেতনায়-এ দায়িত্ব কবির।’
                                            (মাত্রা চেতনা: জীবনানন্দ দাশ)

ড. গৌরাঙ্গ মোহান্তের লেখনিতে প্রজ্ঞা বিষয়বস্তু এমন এক জগতে নিয়ে যায় সেখানে সত্য শুধু সত্য হয়ে ধরা দেয়। বাস্তবতার নিরিখে তিনি দেশ, সমাজ, শিল্প ও সংস্কৃতি সর্বোপরি বর্তমান সময়ের মূল্যবোধকে অতি যত্নে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।

তেমনি সম্প্রতি প্রকাশিত গৌরাঙ্গ মোহান্তের ‘জলময়ূরের শত পালক’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো পড়ে মনে হল জীবননান্দ দাশের কবিতা বিষয়ক উপর্যুক্ত বক্তব্যের সাথে হালের কবিদের সম্পর্ক কতটা শিথিল। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক কেননা, কালস্রোতে অনেক কিছুই ভেসে যায়। তবুও সাহিত্যের এই বনেদী ও প্রাচীন মাধ্যমটি সম্পর্কে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের অনেক নবীন-প্রবীণ কাব্যকলাবিদ জীবননান্দের বক্তব্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেসব মতামত ব্যক্ত করেছেন তার যথার্থ অনস্বীকার্য। কবি ও পাঠকের মধ্যে ন্যূনতম মেলবন্ধন না ঘটলে কবিতা কালসম্পৃক্ততা হারায়, আর সমকালকে ধারণ করার অক্ষমতা যে শিল্পসৃষ্টির অকালমৃত্যু ঘটায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেকেলে বাল্মীকি-হোমার-কালিদাস-শেক্সপীয়ার গ্যেটে আর এ কালের শেলি-কীটস-বায়রন-রবীন্দ্রনাথ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সমকালের উপযোগিতা আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন বলেই এঁরা কালজয়ী ও আধুনিক।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে শিল্প সাহিত্য সর্বত্র ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়। বিশেষ করে সাহিত্যের বিষয়, শৈলী ও নির্মিত প্রকরণে প্রযুক্ত হতে থাকে নানা মতবাদ আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এদেশে তিরিশের দশকে এর প্রতিফলন ঘটে বৃদ্ধদের বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, জীবননান্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, ও বিষ্ণুদের কবিতায়। এ ধারার অনুসারী কবিদের মধ্যে যাঁরা কবিতার শৈলী ও আঙ্গিক বিনির্মাণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধন করেন তাঁদের মধ্যে সমর সেন অগ্রগণ্য। মতাদর্শে বিশুদ্ধ কলাকৈবল্যবাদ আর উপস্থাপনায় নিরেট গদ্যশৈলীর ব্যবহার সমর সেনের বিশেষত্ব যা পরবর্তী কবিদের সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে।

উল্লেখিত ঘরানার উত্তরসূরী গৌরাঙ্গ মোহান্ত অন্তর্লীন অনুভবের ভাষ্যকার। শুধুমাত্র কবিতার কাছে দায়বদ্ধ কবি পরাণের গহীন ভিতরের বোধ আর বোধির অনুষঙ্গ নির্মাণ করেছেন শতাধিক শিরোনামে। দুজ্ঞেয় উপমা-উৎপ্রেক্ষা-কূটাভাস সমন্বিত, দুর্বোধ্য শব্দকন্ঠিত বাক্যে ব্যক্তিগত ক্ষোভ-হতাশা বিধৃত হয়েছে তাঁর জলময়ূরের বহুবর্ণিল শত পালকের আধাঁরে। যেমন-
“আমি অগ্নিমান অন্তর্গৃহে ব্যর্থ মেঘের দ্রবণ ঢালি/শহরের নিষ্প্রদীপ ধূসরতায় ধান জন্মে না বলে উজ্জ্বল অরণ্যের গন্ধে ডুবে থাকি/শুকনো পাতার তুমুল উড্ডয়ন আমাকে চিন্তাগ্রস্থ করে/নিদ্রার আগে মৃত্যুর বিচ্ছেদী চেতনা নিয়ে জেগে থাকি/অনিরুদ্ধ জলস্ফীতি আমার রুদ্ধবাক চেতনাতট ছুঁয়ে যায় এবং অব্যাখ্যাত শুককীটপ্রার্থনা মঞ্জুর করে/আমি গহন বোধিগৃহে কাটাবো কিছু কাল/আমি নিশ্চল গ্রহের নির্বিগ্ন-কক্ষপথে দাঁড়িয়ে সমুদ্রবর্ণ ভ্রমরের আমি অদ্বিতীয় হয়ে উঠি/স্বপ্নময় রাতে অনন্ত নিদ্রার ভাস্কর্য দেখি/ আমার বোধাশ্রয়ী শেকড় সমভূমির পলিস্বাদে আচ্ছন্ন হয়/আমি আপন অন্ধকারে বসে সমুজ্জল স্ফটিকের উষ্ণতা নিতে থাকি/…অনন্তর দুর্বোধ্য সুরঙ্গপথে এগিয়ে আমরা শিশুদের হাতে আলোকময় ভূগোল তুলে দেই আর অনন্ত অন্ধকারে অন্তর্লীন বাতাস বিসর্জনে প্রস্তুতি নিতে থাকি। ”

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের জলময়ূরের সতেরটি বিচ্ছিন্ন পালক তাঁরই অনুসরণে এভাবে সাজালে যে কবিতার অবয়ব মূর্ত হয়ে ওঠে, তাকে কোনক্রমেই কবিতা না বলে পারা যায় না। অথচ কবি শতাধিক শিরোনামে তাঁর বক্তব্যকে উপস্থাপন করেছেন। বিষয়টি বাহুল্য মনে হলেও পরাবাস্তববাদ, প্রতীকিবাদ ইত্যাদি মতবাদের প্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে এটি মোটেই অসঙ্গত মনে হবে না। কেননা, উপর্যুক্ত মতাদর্শের ছাঁচে ফেলে একটি অনুভবকে শতধা-বিভক্ত করা সম্ভব। গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতাই তার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।

নিরেট গদ্যশৈলী ছাড়াও এক কুড়ি কবিতায় ভিন্ন আঙ্গিকে কবি তার অনূভূতি ব্যক্ত করেছেন যাতে বিষয়বৈচিত্র ও সাবলীল প্রকাশভঙ্গি লক্ষণীয়। যেমন- *নিবিড় ঘাসের ফাঁকে নাগপত্নী রেখে যায় প্রতপ্ত নির্মোক (ব্লেড ও নির্মোক)* আমাকে রেখে যায় প্রথা-পঙ্গু মরুদ্বীপে। আমাকে বাঁচিয়ে রাখে পবিত্র পাথর-পিপাসা (পাথর-পিপাসা)* মধ্যরাতে সেলফোন তুলে আনে সাগর মল্লার। অবচেতনার গহন হ্রদে কাঁপে শ্বেত কহ্লার (জলময়ূরের পালক)

‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’-এই গুরু বাক্যের গুরুত্ব অস্বীকার না করেও বলা যায়, কোনও কথাই সহজে বলা যায় না। আর সে কথা যদি কাব্যকথা হয় তাহলে তো তা বলার মতো বলতে পারা সহজসাধ্য নয়। বিলেতী কবি কোলরিজের সহজ ফর্মুলা Best words in the best order রপ্ত করতে বোদ্ধা কবিকেও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। এসব বিষয় বিবেচনা করলে কবিদের যে কোন আন্তরিক প্রয়াসকে অবহেলা করা সঙ্গত নয়।

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত পরিশ্রমী-প্রজ্ঞায় প্রদীপ্ত. যে ভাঙতে পারে গড়ার সামর্থ আছে তাঁরই। কবিতার মূর্তি ভাঙা-গড়ার খেলায় তিনি আরও দক্ষতা অর্জনের ক্ষমতা রাখেন ‘জলময়ূরের শত পালক’ তার সাক্ষ্য বহন করে।

******************
জলময়ূরের শত পালক:
গৌরাঙ্গ মোহান্ত
প্রথম প্রকাশ: ১ ফেব্রæয়ারী, ২০১৬
প্রচ্ছদ: মোমিন উদ্দীন খালেদ
প্রকাশক: শ.ম. গোলাম মাহবুব
সাহিত্য বিলাস
৩৮/৪, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০
মুল্য: ২৪০ টাকা।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E