৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ১০২০১৬
 
 ১০/১২/২০১৬  Posted by

দুপুর
– জাহিদ সোহাগ

১.
দুপুরটা যেনবা রৌদ্রের অফুরাণ ঢেউ। আর তুমি রিক্সার হুড ফেলে পুড়ে পুড়ে কয়লাবতী? এখানে দাঁড়াবার সামান্য ছায়াও নেই, পার্কে পুড়ছে পাতার মজ্জা। বলি, দ্যাখো দ্যাখো বুকের ভেতর ঘাড়ভাঙা ঘোড়াটা ফের দাঁড়িয়েছে- না না ঠিক ঘোড়া নয়, কেশর, নাকি আমাদের হারানো শীতের জামা! তবু ধরে নেই সে রৌদ্রের শিশুগাল। যে কিনা তোমার চাবির গোছার মতো কোমরে ঘণ্টি বেধেছে শিশ্নকে সচকিত করে।
হঠাৎ একটা ধুলোর ঝাপটা, যে কিনা তোমার শাড়ীকে মাতালের মতো পেতে চেয়ে চেয়ে ছড়িয়ে পড়লো আকাশে, নীলে। তুমি ছোঁ মেরে টেনে ধরলে যেভাবে মা দুষ্টু গাভীটার রশি টেনে ধরতেন। আর তখনই ন্যাংটো পাগলীটার চোখে চোখ পড়ে গেল।

২.
আমার হৃদয়ও সিফিলিসের মতো অস্বস্তি। পুঁজ আর বেত-কাটার আঁচড় যেনবা বাড়ছে। আমি জানি নিশ্চিত কিছু পেয়ে গেলে মন পড়ে থাকে দূর পাহাড় ও ময়ূরে- যেখানে চিরদিনের বৃষ্টিতে ত্বকে জমেনি শ্যাওলা। আর তাই মুহূর্তের জন্য খুন হওয়া যায়, কিন্তু সারাটা দুপুর নয়।
আমার মত পুরুষ আর চায় না জেব্রার দ্রুতি বরং কাশ দুলে ওঠা নদীর ছায়ায় চুমুকে শান্তি খোঁজে অযথা রাত্রি কাটানোর। যেখানে একটি গ্রাম্য বেশ্যা এসে ডুবেছিল অপাংতেয় শিশুর কলরবে, তার বাড়ির নীম ফুলের মদ ও ধনেশের স্বর শুনে আমিও ছিলাম কিছুটা বিভক্ত- প্রেম ও নীলাভে।
আজ দুটোই আমাকে ডাকছে একই অঙ্গে আর আমি পায়ের দিকে চেয়ে দেখি শ্মশান ফেরা মানুষের নীরবতা।

৩.
এই মুত্রঝরনা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে খুঁজছি নতুন রিক্সা। বাহারী নক্সাদার। যে কিনা আবার টুংটাং ঘণ্টায় ভাঙতে পারে রৌদ্রের হলুদ জঞ্জাল। আর রিক্সাওয়ালার নাম দিয়ে ফেলি সিরাজ-উদ-দৌলা।
তুমি ভ্রু কুচকে বললে, ‘না থাক ওর নাম… ওর নাম দিলাম পার্থসারথি।’
আমি তখন বাম রাজনীতি ছেড়ে ভদকার জন্য বরফ খুঁজছি। আর তুমি ব্যাগ ভরে এনেছো পাথর, যেন কাকের মাথায় ঢিল ছুঁড়লেই থৈ থৈ করে উঠবে কুয়োর জল।
কখন যে রিক্সাটা তোমার নীল ব্লাউজের গ্রীবায় পেইন্টিংয়ের রঙ ঢালছে। আমি বলি, ওর বউটা তেলচিটে, আমার বাসায় ঝির কাজ করে।

৪.
ব্লাউজের ভেতরই এর সুরভি পাওয়া যায়। নইলে স্তন দুটোয় গলা চকোলেট কেনো! পপি ক্ষেতে দীর্ঘকাল ব্লেড আর রৌদ্রের ডানায় ঘুমন্ত থেকে সবে ভাবছি আমাকে বুঝি ডেকেছিল স্বৈরিণির জঙ্ঘা।
কিন্তু আমার তো রক্তে অ্যালকোহল, মানে বিষণ্ণতার ঋতুতে ফলছে নিস্ফল বিদ্যুৎ- যেন ভীত হয়ে উঠছি বদ্বীপে গুল্মলতায়।
কিন্তু এমন তো ছিল না, নারী মানে যে মাংসের ফোয়ারা সে কথা ভাবি না আজো- তাহলে একটা মাছরাঙা হাটুঅব্দি জলে দেখে শুধুই মাছের কঙকাল!
এখন প্রতারণার মতো নারী আর পুরুষের রাত্রির বরফ জল। যাতে হয়তা উপচে উঠবে শ্যাম্পেনের মেদ। যাকে আমি সমুদ্র ভেবে মরে থাকবো চিলের নীলঘন আকাশে। আমার মতো পুরুষের তো দুঃখ করারও কিছু নেই।   

        
৫.
আমার হাতেও দিতে বুনোফুল ভরা মধু; তাহলে হাওয়ার এই নীল ঘোড়া ব্যাটারি চালিত ইচ্ছের মতো আমাকেও ছেড়ে যেত না।
এখন পাঁচিল ঘিরে আসছে কুমাড় পাড়ার ধোঁয়া- যেন আমিও কাঁচা মাটির পাত্র! আর সন্ধ্যায় উলুধ্বনি শেষে কুপির আলোয় দেখি সেই ঘোড়ায় আঙুল বুলাচ্ছে মাসিমণিরা।
কোনো লুকোচুরি নেই আবার, একফোঁটা কুপির সামনে এলে তারা আমার হাতে তুলে দেয় পোড়া-কাকড়া, যার ঘ্রাণে উন্মাতাল আমাকে পেয়ে মেখে দেয় জলমাটির প্রলেপ। যেনবা মেলায় ভুলে যাবো নাগরদোলা আর রঙিন জলের স্বাদ।  

                   
৬.
হায় আমারও লোভ ছিল বাতাবী লেবু আর শালিকের মরে থাকা দিনের- কেন যে আমার মত পুরুষও উদযাপন করে বিদ্যুতের জঙ্ঘা আর নীম ফুলের মদ; যেহেতু আমি রৌদ্রের ভেতর এক ঋতু অপেক্ষায় ছিলাম স্বেদসুন্দরের লোভে, তাই আজকে আমাকে বলো, আমার হৃদয়ও কি টেরোকোটার নাচ, যাকে স্থির দেখি পুরাণের ক্যামাফ্লেজে!

না শুধুই নারী নয়- বাঘিনীও আজ খুলে ফেলে ডোরাকাটা, নোখের হলুদ। যেনবা এবার বর্ষায় মনখারাপের দিনে প্রতারণা ভুলে যাব আর বলবো দ্যাখো আমার শরীরও এক অস্পূর্ণ নারী।
যাকে বিলিয়ে এসেছি হীনমন্য পুরুষ আর বৃহন্নলার দিকে চেয়ে চেয়ে। হায় আজ তারাও আমাকে দেখে ছুঁড়ে দেয় আধুলি দেয়ার ভঙ্গি।  

৭.
নিজের ইচ্ছার যৌনতা ফুঁড়ে উঠেছে রৌদ্র, মানে, উফ্ বর্ষাকাল শেষ; এখন কুচকির দাঁদের মতো চুলকাচ্ছে হৃদয়। আর একটা ময়ূরকণ্ঠী মিথেন গ্যাসের মতো হঠাৎ জ্বলে ওঠে, যা কিনা রাতের অপেক্ষায় প্রেতের জিভ চাটে; কিন্তু আমি এই দুপুরে দয়াহীন যৌনতায় আবার; কিন্তু কলকব্জার পাখি পেশীতে টান লেগে কাৎ হয়ে শুয়ে থাকে।    
রৌদ্র রৌদ্র রৌদ্র প্রার্থনার মতো উপশম। বৃথা যায়। বৃথা যায়। ফুরন্ত এক ইচ্ছা বয়ে যায় পুরুষের মতো।  

৮.
এই লণ্ঠনের কাছে জেনেছি নিশ্চুপ জেগে থাকা শস্য মাড়াইয়ের দিনে। ধানের গন্ধে রৌদ্র আর ছাতিম গাছে কুহুকুহু ডাকাডাকি, আর ঘুমিয়ে পড়েছি কলাপাতা দোলানো ছায়ায়- সে নাকি একদা গ্রাম, নিচে ভাঁটফুল আর সজনে ডাটায় ছাওয়া আকাশ!
এমনই ভেবে ভেবে মনে হয় ঠিক অন্ধ হয়ে গেলে বুঝি আমারও স্মৃতি কিছু থাকে না।
আমি ঠিক জানি না মানুষের মতো আমারও কেন হবে ব্যবহৃত জীবন!
ধরো যদি এমন হয়- শরীরে কাশফুল জড়িয়ে নদীর স্রোতে দুলে দুলে যাই, আর তুমি বৃষ্টির ক্যামাফ্লেজে দেবে বর্জ্রের হৃদয়- তাহলে ওপাড়ে সবজি ক্ষেতে আমিও হতে পারি কৃষাণীর নজর-হাড়ী।
হায় অথচ আমি কিনা রিক্সার প্যাডেলের মতো শহরে শহরে বিরামহীন বাঁচি।  
 

৯.
সেই কালো বেড়ালটার জন্য দুঃখ পেতে ইচ্ছে করে, ওর কথা ভেবেই ছুঁয়ে দেখি তোমার তিল। যে কিনা ঝড়ের রাতে প্রসব বেদনার মতো উৎকণ্ঠা নিয়ে চেয়েছিল আমার সহৃদয়। হে বিবাহিতা তোমার স্তনও আজ দুগ্ধে পরিপূর্ণ- কিন্তু শিশুহীন এ সন্ধ্যায়, বিদ্যুতের মর্মর গানে আমি কোনো অর্থ বুঝি না।
স্মৃতিতে কেবলি গুণটানা নৌকা স্রোতের বিপরীতে শেষ সুর্যের ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভেসে যায়। আর আমি
তোমার তিল ছুঁয়ে বলি, কালো বেড়ালের লোমে আমারো কেটেছে শীতকাল। আজ বসন্তে পালাই পালাই করছে আমার হলুদ শার্ট- যে কিনা টিয়ের ঠোঁটের মতো ধারালো জীবন দিয়েছিল একদা।  

১০.
এখনো কেনো যে প্রেমের জন্য হা-হুতাশ, যেখানে হৃদয়ও শৈথিল্যে নুয়ে হাঁটে। মনে হয় কাছে গেলে চোখে তার শরীর মেখে নেবো- যেভাবে টমেটো ক্ষেতে রগড়ে নেই লেবুপাতার আঘ্রাণ। কিন্তু এমন হয়নি কখনো, প্রেম যেন শুধুই প্রসব করে শজারুদঙ্গল। যারা আমার সিল্কের দিবাস্বপ্ন এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়।
এসব জেনেও প্রেমের জন্য কেনো হা-হুতাশ, রমণীর উড়াল ভ্রুর নিচে দ্বার টেনে যাওয়া!

১১.
উহ্ হাড় ফুঁটো হয়ে ঢুকছে ঘোড়া, বাঘের কম্বলও যেন বিলাপ আজ। শ্বেতপাথরের মতো যে স্তনের ঢল তাকে বলছি চোখের নিচে যে কালো জমেছে বরং তাকেই সারাও।
ভেবেছিলাম আমিও বুঝি ব্যাঙের রক্ত ছেনে ছেনে ডুব দিতে পারি কিন্তু দ্যাখো তোমার দেয়ালে রেডিয়ামের নক্ষত্রের মত ফুঁটে আছি অজস্র চোখে।
আর সূর্যমুখী ক্ষেতে অন্তর্বাস খুলে বেছে নেবে চামরার উকুন- কোথাও দূর্বা ঘসে ঘসে নিতে পারি নিদান। কিন্তু সবটুকু কুয়াশা টেনেছি নস্যি ভেবে তাই টুপটুপ করে প্যারাসিটামল নামছে ডুমুর-জলে।
তুমি গায়ের লেপ টেনে বলো, গ্রীষ্মেও দেখেছি হাসফাস আর জিভ এ-গলি ও-গলি করেছে বরফেরে লোভে- আমি তাই ভাবি, অসহ্য আমি শুধু ঋতুতেই নয়, মাঝে মাঝে হাতেও গজাতে থাকে অতিরিক্ত আঙুল।

            
১২.
জলমগ্ন হলে ধীরে ধীরে খুলে যায় দেহের বাকল- এই ভেবে সারাদিন গাছের সঙ্গে থেকে চেরাইকলের শব্দ আর বাজারির হল্লায় আমি জেগে উঠেছি শুশুকের মত হুঁষ করে।
এবার আমাকে তুলে নাও তোমার অঙ্কশয্যায়; টুকরো টুকরো করো আমাকে, যেন এবার বর্ষায় আমিও হতে পারি সাময়িক নৌকা;
তবে চৈত্রের পুকুর থেকে আমাকে ফের তুলে নিও না আকণ্ঠ আলকাতরা পান করাতে।
আমি বেঁচে থেকে থেকে ক্লান্ত, নশ্বরতাই যেন আমার শরীরে দেয় শেষ ফুঁ…

১৩.
হঠাৎই আবার ভালোবাসা- ওফ্ ভেবেছিলাম এবার হাত বাড়াবো না,স্রেফ কথা বলে কাটাবো- যেমনটা প্রতিবারেই হয়, কিন্তুরেডিওর এন্টিনার মতো কে যেন আমার আঙুল টেনে লম্বা করে দেয়আর তা ইথার থেকে টেনে নেয় অসহ্য জামা। কিন্তুসে জামায় আর নেই নক্ষত্রের বোতাম।
ওষুধ খেয়ে এখন যেমন ঘুমাই,আলসারের ব্যথা চেপে রাখি আবার ভালোবাসতেও জেগে উঠি- সে মানুষের  যেখানেই ছোঁও- পাথর;
আজ পত্রিকার দু’একটা পৃষ্ঠাচিবুতে চিবুতে মনে হলো তোমাকে জানাই ফুটপাথে বসেছেকচি ডাবের জল আর তালশাঁশ- একা একা এসবে আমার অরুচী, সঙ্গিহীন মদ্যপানের মতো।
কিন্তু তোমার অফিস ছুটি হতে হতেসন্ধ্যাটা মরে যায়, রিক্সাওয়ালারা খোঁজে দূরের যাত্রী;
তাহলেআবার পাঁচ/ছয় মাস- তারপর যা হয় হোক- হোক শুয়রের চামরার মত সন্ধ্যা বাযা ইচ্ছে তাই- এই ভেবে ভালোবাসি না- নইলে হঠাৎই এসেছিল সে শুতেও চেয়েছিল নিরিবিলি রঙিন বিছানায়।

১৪.
বহুদিন ফিরে গেছি

জানি দরোজা খুললেই ভেতরে কাঁচ
চড়ুই পাখির মতো কিচিরমিচির-
একদিন যা ছিল কলম, কাঠের ঘোড়া,
ব্রাশ, টিস্যু পেপার।
সেল্ফের বইগুলো কাঁচের বয়াম, চূর্ণ হতে নামছে
লাজুক ঝর্ণা।

ফ্রিজ থেকে সবুজ আপেল ডিম আর বর্ষার মাছ
লাফিয়ে নামলো, যেন খুকির ঠোঁট ফোলানো অশ্রু

আর তোমার শাড়ী? ভাঁজ করে রাখা পিংক, ম্যাজেন্ডা,
সোনালী আর হলুদছাপা আর জামদানী
রাজশাহী সিল্ক- এসব ঘুমন্ত কাঁচ?

আর জন্মবিরতীকরণ পিলও মিষ্টি-কাঁচ
টেস্টটিউবের মতো তিনটে কনডম
বিছানায় গজিয়ে উঠেছে তারকাটা-কাঁচ

কাছে ডাকলে ভেঙে পড়লো কণ্ঠ, ঝনাৎ
করে মাথা, চুপচাপ হাত দুটো আর পা
যেন আগুনে গলছে- আর আমিও পোশাকের ভেতর
কাঁচপুরুষ; এক ধাক্কায় ঝাঁপ দিচ্ছি ফ্লোরে

এরপর মানুষের যোনী
ও শিশ্ন

***

জাহিদ সোহাগ

জাহিদ সোহাগ

কবি পরিচিতিঃ
জাহিদ সোহাগ। জন্ম: ১০ মার্চ ১৯৮৩, মাদারীপুর জেলা সদরের কুলপদ্বী গ্রামে। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: আর্তনাদও এক বায়বীয় ঘোড়া, অসুখের শিরোনাম, ব্যক্তিগত পরিখা। সম্পাদনা: তিন বাঙলার শূন্যের কবিতা।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!

  One Response to “জাহিদ সোহাগ -এর “দুপুর””

  1. কবিতা কি না বুঝতে পারছি না। তবে একটুও ভাল লাগল না।

E