৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ১৫২০১৭
 
 ১৫/০১/২০১৭  Posted by

পাবলো শাহি
আদাবর তিনের বেণীবাঁধা বাড়ি : চতুর্থ রুমাল

 

বশীকরণ

দুই ফোঁটা রক্ত আর বাঘিনীর দুধ- এই নিয়ে বশীকরণ মন্ত্র শিখেছো তুমি পদ্মপাতা। এ এক দ-িতের পৃথিবী, ক্রমে ক্রমে গাঢ়তর লাল…। একদিন আমাদের শঙ্খচূড় ও সৃজনীর পাশে- দুই ফোঁটা রক্ত নিয়ে, বাঘিনীর দুধ নিয়ে ক্রমে ক্রমে বশীকরণ মন্ত্র শিখেছ তুমি পদ্মপাতা। আমি পা ভাঙা মধ্যরাত, হ্রীত্যাগ পর্ব শেষে বসে থাকা সন্ধ্যাতারা- তোমার অষ্টধাতুর আংটি পড়ে গেলে, তোমার সহপাঠিনীর নলকূপ ভেঙে গেলে; চুপ করে দেখি স্তব্ধবালকের ভাঙা সাইকেল। দুই ফোঁটা রক্ত আর বাঘিনীর দুধ- এই নিয়ে বশীকরণ মন্ত্র শিখেছো তুমি পদ্মপাতা। এ এক দ-িতের পৃথিবী, ক্রমে ক্রমে অলিখিত যৌন রক্তপাত…। ক্রমে ক্রমে শঙ্খচূড় ও সৃজনীর  পাশে তোমার সাজঘর। বালিকা তোমার বাদামগাছ থেকে রতিক্লান্ত কাঠপিঁপড়েরা আজ নেমে আসে…। একদিন  আমাদের শঙ্খচূড় ও সৃজনীর পাশে…। এইসব খুলে যাওয়া ছায়ার দরোজা- এই পথে বশীকরণ মন্ত্র শিখেছো তুমি পদ্মপাতা।

অবধূতী

আজ তুমি অগ্নি ও জলের ভিতরে বসে আছো আশ্চর্য অবধূতী। তোমার মাঝখানে শঙ্খচক্র, তোমার মাঝখানে ঈড়া ও পিঙ্গলা…। আজ তুমি পূর্ণ ও ছিন্নের ভেতরে বসে আছো অবধূতী। কোনো একটা মৃদুছায়া, মৃদুবর্ণ তোমার চারিপাশে ঘুরে ঘুরে একা…। কোনো এক ইতিহাস থেকে তোমার বন্ধুরা আসে ঈশ্বরী পাটনীর কাছে- কুয়ো ও বৃষ্টির মধ্যে পড়ে থাকা কালো গল্প শুনতে। তুমি বলো চাপা আর্তস্বরে, এই পৃথিবীর অলাতচক্র থেকে, বৃষ্টি থেকে, বাক্যহীন জিব থেকে…। অগ্নি ও জলের ভিতরে বসে আছো আশ্চর্য অবধূতী। কোনো একটা দিন মৃদু চাঁদ উঠবে, কোনো একটা দিন নদীতে ঝড় উঠবে…। কোনো একদিন পাগল গারদে…। মৃদুছায়া, মৃদুবর্ণ তোমার চারিপাশে ঘুরে ঘুরে একা…। বাংলার নাভিপথের মতো তোমার নোতুন অক্ষর শরীরে, গৃহচাঁদের পেছনে ঘুরে ঘুরে একা…। অথচ আজ তুমি অগ্নি ও জলের আশ্চর্য অবধূতী…। বসে আছো পূর্ণ ও ছিন্নের ভিতর…

অপেরা

মহাপৃথিবীর তুমি ধূলিচন্দন। চারিদিকে নটিনীতরঙ্গ, চারিদিকে ঘিলুস্নান মাতৃগর্ভের বোতামঘর। তুমি ঢুকে পড়ো তার ভেতরে, ভ’কেন্দ্রবিহীন জাহাজের ভেতরে। অমূলসম্ভব লাল জবার ভেতরে, চাঁদচম্পায়। মহাপৃথিবীর এই অপেরায় বাতাস ছেড়েছে ভাষা, চারিদিকে ওংকার, চারিদিকে কবিতার হিংসা ও হিঁয়ালী। মৃদু মৃদু বাঁশপাতা, মৃদু মৃদু রতিক্লান্ত ফুসফুস…। তুমি ঢুকে পড়ো মেঘডম্বরু নিয়ে- দুটি আঙুল ও একটি কুড়িয়ে পাওয়া চোখে। পৃথিবীর এই অপেরায় সারারাত রাখিয়াছ গান ও গ্রীবা, রম্যপিঁপড়ের  সৃজনীও সিঁদুর- আবিরাম দীর্গকোন চিঠি…। লাল জবার ভেতর চাঁদচম্পার দেশ। মহাপৃথিবীর তুমি ধূলিচন্দন, তুমি লাল জবা- জলের ভেতরে অবিরাম চাঁদচম্পার দেশ…

বৃষ্টি

সে আসলে ঘুমাতে চেয়েছিল, চায়ের বাক্সে অথবা মশলা ঘরের হাঁড়িতে, ছ লাইনের বৃষ্টির ভেতর…। সে আসলে ঘুমাতে চেয়েছিল। আমি তার মেঘাচ্ছন্ন বিশ্বকে হাতে তুলে নেই, দেখি নয়শত জমে থাকা গায়ত্রী- নাভিচক্র বেড়ে ওঠা বোটাশূন্য মুকুলিকা…। সে আসলে ঘুমাতে চেয়েছিল… ধ্বসে পড়া খিলানের শব্দে, সে আসলে ঘুমাতে চেয়েছিল। হায় দেবদারু, হায় পাইনগাছের সাতরঙা টিম। তোমার বোতাম ঘরে আজ শঙ্খসরণি, তোমার বোতাম ঘরের কামকল্কির ভেতর সে ঘুমাতে চেয়েছিল- সে আসলে ঘুমাতে চেয়েছিল মশলা ঘরে, হাঁড়িতে ছ লাইনের বৃষ্টির ভেতর…। তার সন্ধ্যার ফাঁকা বাড়ি, ফ্যান আর বেসিনে ভেজানো শাদা ভাঁতের মতো চাঁদর; জীবনের দরোজা পার হবার হাতভর্তি চূর্ণ চূর্ণ মশকরা, নৈশ্যবিদ্রুপ। সে আসলে ঘুমাতে চয়েছিল…। তারা তিন বোন উচুঁ নীচু বিস্ময় বিস্ময়… তারা তিন বোন রক্তমাখা ঘাসফুল হাতে… তারা তিন বোন জলে স্থলে পড়ে আছে অকাল ফাল্গুনী…। সে আসলে ঘুমাএত চেয়েছিল। সে আসলে শতাব্দীর পোশাক পরা লোকটির কাছে,  সাধু বৃষ্টিভেজা যৌনজীবনে ঘুমাতে চেয়েছিল।

অসুখ

তোমার মনের অসুখটাই আজ চাইছিলাম। মুক ও বধির হয়ে দূর থেকে মুগ্ধ হয়ে দেখি- তুমি হিজলতমাল; তুমি ভৈরবীচক্র, দু’একটা মনখারাপ। তুমি বৃষ্টি এলেই ছাপা কবিতার মতো রাশি রাশি চৌষট্টি পাপড়ি।  তোমার মনের অসুখটাই নিঃসঙ্গ ব-দ্বীপ। ময়ূরাক্ষী, ময়ূরাক্ষী বলে তুমি চিৎকার করো। তোমার মনের অসুখটাই শ্যামশূন্য বাড়ি। তুমি মেঘাছন্ন গোধূলিতে রক্তমাখা নাভিচক্র। আমি এইসব, তাহাদের বানান লিখে রাখি; সর্বনাশের বারান্দায় টাঙিয়ে রাখি রজনীগন্ধার ডাঁটা। কোনো কোনো বিকেলকে ফালি ফালি করে কাটি। তোমার মনের অসুখটাই আজ চাইছিলাম; দশখ- রাত শেষ হলে- আমি কুয়োয় বর্শি ফেলে রাখি- যদি তোমার মনের অসুখ ছিপে বিঁধে। যদিও তুমি, মুক ও বধির হয়ে থাকো। যদিও তুমি মরুসন্ন্যাসীর মতো ময়ূররাক্ষী ময়ূরাক্ষী বলে চিৎকার করো। আর জ্ঞানীরা যে জুঁইফুলের নগ্নছবি দেখে তুমি তাকে সন্ধান করো মনের অসুখের মধ্যে; রক্তমাখা শামুকের মধ্যে…

পৌষপতঙ্গ

কেবল পৌষপতঙ্গের পর তোমার দুটি আঙুল আর তোমার জন্য কথা আনতে গিয়ে আমি কুড়িয়ে পেয়েছি ছয়টি জামাগাছ। কেবল মহুয়ামৃণালের কথা মনে করে একবার এসো- উদাস বকুলবৃক্ষ থেকে পেড়ে দেবো একজোড়া টিয়ে। কেবল পৌষপতঙ্গের পর বারোটি প্রবল কেতু ছোট ছোট পিঁপড়ে ছেলেদের মতো তোমার শান্ত জল স্পর্শ করে। আজ তুমি ফেলে রেখে গেছো দুটো পরিত্যক্ত কুয়ো; আজ তুমি ফেলে রেখে গেছো বোবাবালিকাদের  লেখা নির্জন প্রবন্ধ…। তবু তোমার কথা আনতে গিয়ে আমি কুড়িয়ে পাই ছয়টি জামাগাছ। কেবল পৌষপতঙ্গের পর- তুমি একনৌকা পাগলামী যোনিগর্ভে ঢেকে রাখো। কেবল মহুয়ামৃগালের কথা মনে করে- হাতভর্তি পুরুষপাপ আনতে গিয়ে আমি বুঝি; তোমার জন্য খুনি হওয়া কত সহজ…

দৈবদ্যুতি

এই অতীন্দ্রিয় দৈবদ্যুতি, এই টোটেম পালক, এই তুমি নীড় ও নদীতীর; চিরকাল গুটি পোকার মতো। আমাদের এই দেহখানি, আমাদের এই ভাষাজাগরী কামকাল্কিকূট, আমাদের চারিদিকে এই বিষণ্ণ নীল হেরিকেন এ কোন রক্তমাখা অবধূতী। রাত্রির আধিক্য নিয়ে আমরা কোথায় ঢুকবো, কোন মহাভাষাবিশ্বে ধুতুরার ঝগড়া ও প্রলাপের ভেতর সারাদিনমান অন্ধ ঈশ্বরের মতো পড়ে থাকবো…। এই অতীন্দ্রিয় দৈবদ্যুতি, এই টোটেমপালক, এই তুমি- নীড় ও নদীতীর; চিরকাল গুটি পোকার মতো খুলিগ্রহে পড়ে থাকো…। এই কতা মূর্ছাতুর ধানক্ষেতে বসে; এই কথা, মূর্ছাতুর শসাক্ষেতে বসে- একদা শুনিয়েছিলেন আমাদের গৃহশিক্ষক মীননাথ…। এই কথা, শাল বোদলেরকে কাঁটাগাছ খেতে খেতে শুনিয়েছিলেন তার যৌনশিক্ষিকা। তারপরও চিরকাল এই অতীন্দ্রিয় দৈবদ্যুতি, এই টোটেমপালক, এই নীড় ও নদীতীর… চিরদিন বিস্ময় হাতে নিয়ে কেন খোঁজে, মৃত ডুমুরের বাক্স।

ছিপনৌকা

আজ তুমি একাকিনী সন্ধ্যাতারা, একাকিনী শ্বেতপদ্ম- কি অভিরূপ নিয়ে স্মৃতিপোড়া রাতের ভেতর পড়ে আছো। হাতভর্তি চন্দ্রভস্ম হেঁটে যায় তোমার দিকে; হাতভর্তি কাঁঠালিচাঁপা বসে থাকে গর্ভদ্বীপে। সন্ধ্যাতারা, তুমি ছিপনৌকায় একাকিনী বসে থাকা সন্ধ্যাতারা- তুমি একাকিনী পড়ে থাকা অধিকবিতার পালক খুঁজতে বের হওয়া সন্ধ্যাতারা; ছয়টি বালিকার স্তনে জবাফুল ফুটে থাকা সন্ধ্যাতারা। তোমর সঙ্গে থাকে, শুধু এক অপ্রাকৃত সরীসৃপ- সমুদ্রবক্তৃতা দেবে বলে; তোমার সঙ্গে থাকে, এক চতুর্থ রোমাল- ষড়যন্ত্রে অংশ নেবে বলে। তোমার কাছে- একাকিনী সন্ধ্যাতারা, শুধু তোমার কাছে…। শুধু তোমার কাছে পোড়াগন্ধের ভেতর হেঁটে আসে। আজ তুমি একাকিনী সন্ধ্যাতারা, একাকিনী শ্বেতপদ্ম- কি অভিরূপ নিয়ে রাতের ভেতর পড়ে থাকো। তোমার ভেতরে অভ্রময় কি সেই পরাবিদ্যা, কি সেই অগ্নিপ্রতঙ্গ। তোমার ভেতরে উপবিষ্ট কি সেই নীহারিকাপুঞ্জ, কি সেই সঙ্গমশৃঙ্গার…। আজ তুমি একাকিনী সন্ধ্যাতারা; তোমাকে ছাড়া এই চারুবাক, এই জীবক্রিয়া কি অভিরূপ নিয়ে একা একা পোড়া চাঁদগন্ধের ভেতর পড়ে থাকে।

ছয়জন্ম

তোমার সঙ্গে ভুট্টাক্ষেতে একটি রাত, তোমার সঙ্গে কামিনী গুহায় একটি রাত- মনশূন্য একটি রাত আর্তনাদ করে; তবু তোমার সঙ্গে অর্ধেক ঝরাপাতা নিয়ে পাগলের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরচি। ছয়জন্ম আগে থেকে আমি তোমার মোটা বইয়ের দুই মলাটের মধ্যে ডুবে আছি। তোমার মাতৃচক্রে, জীবচক্রে… ছয়জন্ম আগেই তোমার মাথার ভেতর সমাধিস্থ হয়ে আছি। তোমার সঙ্গে ভুট্টাক্ষেতে একটি রাত, তোমার সঙ্গে কামিনী গুহায় একটি রাত- মনশূন্য একটি রাত আর্তনাদ করে। তবু তোমার সঙ্গে একটি মহাপৃথিবীর নুনজল নিয়ে পাগলের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি। জীবন আমাকে আলো দেবে বলেছিল, তুমি আমাকে আলো দেবে বলেছিলে… আজ রাতে তুমি কি দেবে আমায়? বাকবিভূতি ঘিরে ধরেছে আমাকে, নৈশবিদ্রুপ ঘিরে ধরেছে আমাকে… সবুজ সাপ অন্যদের সঙ্গে, তোমার সঙ্গে ঘিরে ধরেছে আমাকে…। তোমার সঙ্গে ভুট্টাক্ষেতে, একজনের প্রশ্নদৃষ্টি আর অন্যজনের সুনির্ধারিত চাবুক; খুলতে বড় দেবি হয়ে গেলো আজ…

……………………………………

কবি পরিচিতি :

পাবলো শাহি

পাবলো শাহি

ড.পাবলো শাহি। আশির দশকের কবি, গবেষক ও গদ্যকার। জন্ম: ০২রা ভাদ্র ১৩৭২, যশোর।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: যাও পক্ষী কহ তারে (ভূর্জপত্র ১৩৮৭); সেই ঘুম ঘুম ভিখারী আপেল গুলি (ভূর্জপত্র ১৩৮৮); দূত সুড়ঙ্গের বীজ (অনন্যা ১৪০০); ইহা এক অভিনব কাব্যভজনা (প্রতিশিল্প ১৪০৬); ক্ষম ওঁ নিঃশ্বাসযান (ভূর্জপত্র ১৪০৭); মেঘবালিকারমুদ্রা (ভূর্জপত্র ১৪০৭); বেহেশতি আদি বড় ও সহি হুরিনামা যাহা কেবল নরগণ পাঠ করিবেন (ভূর্জপত্র ১৪০৭); শব্দ বিশারদগণ কহেন উহা পেণ্ডুলাম শরীরের গোলাকার মহাপ্রাণধ্বনি (ভূর্জপত্র ১৪০৭);  কহে কবি নবীন বাল্মীকি (ভূর্জপত্র ১৪০৮); বর্ষা এবং আমাদের প্রাইভেসি (ভূর্জপত্র ১৪১০); ছলাপদ লেখে কবি শাহিপাদানাম (ভূর্জপত্র ১৪১৪); কসাইয়ের স্কুল (অ্যাডর্ণ ১৪১৬); পরাবাস্তব জামার বোতাম (ধ্রুবপদ ১৪১৮); সপ্তসিন্ধু চারদিগন্ত কাব্য সংগ্রহ (ধ্রুবপদ ১৪১৯); বঙ্গকবতিাবিদ্যা নির্বাচিত কবতিা (ছোঁয়া, কলকাতা, ১৪২৩)।

প্রবন্ধগ্রন্থ: আমাদের কোড আমাদের ইশারা এবং ভাষার বিনির্মাণ (ভূর্জপত্র ১৪১২); আজীজুল হকের কবিতা: ভাব ভাষা ও তাৎপর্য (ভূর্জপত্র ১৪১২); সাহিত্য পাঠ ও ভাবনা: বিবেচনা-পূনর্বিবেচনা (ধ্রুবপদ ১৪১৯)।

সম্পাদনাগ্রন্থ: আজীজুল হকের কবিতা সংগ্রহ (ধ্রুবপদ ১৪২৩)।

যোগাযোগ: পাবলো শাহি, ডি-৮২, উপশহর, যশোর ডাকসূচক- ৭৪০১, মোবাইল:+88 -০১৭১১২৮৩৮১৩/ ০১৬১১২৮৩৮১৩
ইমেইল: pablo.shahi1965@gmail.com

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E