৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ২০২০১৬
 
 ২০/১১/২০১৬  Posted by
কবি মামুন মুস্তাফা

কবি মামুন মুস্তাফা

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কবিতায় চিত্রকল্প
– মামুন মুস্তাফা
    
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে পাশ্চাত্যের কবি ও তাত্ত্বিকগণ কবিতায় চিত্রকল্পের ক্ষেত্রে এক আন্দোলন সৃষ্টি করলেন। এই চিত্রকল্পবাদী আন্দোলনে মূল ভূমিকা রাখলেন এজরা পাউন্ড ও এমি লাওয়েল। এঁদের সঙ্গে আরো যাঁরা যুক্ত হলেন, তাঁরা হলেন রিচার্ড এলডিংটন, এফএস ফ্লিন্ট, ডিএইচ লরেন্স, জন গোল্ড ফ্লেচার, হিলডা ডুলিটল প্রমুখ। আর বাংলা কবিতার প্রেক্ষাপটে চিন্তা ও চেতনায় আধুনিকতার প্রবর্তনকারী তিরিশের কবিগন তাঁদের নতুন কবিতার জন্য চিত্রকল্পকেই প্রধান উপাদান হিশেবে গ্রহণ করলেন।

বলা যায় কবির ভাবনা কবিতায় বর্ণিত চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যখন দৃশ্যাতিরেক সৌন্দর্য দান করে এবং পাঠককে দৃশ্যের বাইরেও অন্য কিছু ভাবতে সাহায্য করে, চেতনাকে সম্প্রসারিত করে তাকেই আমরা চিত্রকল্প বলে অভিহিত করতে পারি। মূলত প্রকৃত চিত্রকল্পই পাঠককে দৃশ্যের বাইরে নিয়ে ভাবিয়ে তুলতে সাহায্য করে। সেক্ষেত্রে প্রতিতুলনাজাত অলঙ্কার ব্যবহার তথা উপমা-উৎপ্রেক্ষা-রূপক-প্রতীক-সমাসোক্তি যুক্ত না হলে কোন চিত্রই চিত্রকল্প হয়ে উঠতে পারে না। আর প্রতীকবাহী চিত্রকল্প অন্যান্য চিত্রকল্পের চেয়ে বেশি হৃদয়গ্রাহী ও সৌন্দর্য-সঞ্চারী।

একটি উৎকৃষ্ট চিত্রকল্প তখনই নির্মাণ করা সম্ভব যখন কবিতায় খুব কম শব্দে চিত্রকল্পটি ফুটিয়ে তোলা যাবে। কেননা তৎক্ষনাৎ কবিতায় বর্ণিত দৃশ্যটি পাঠকের মনের ফ্রেমে বন্দী হয়ে যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে বিবৃতিধর্মী কিছু বাক্যও চিত্রকল্পের অবয়ব তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
    
অন্যদিকে সজীবতা-প্রচ-তা-স্মৃতিজাগানিয়া শক্তি- এই তিনটি বিষয় যখন একে অপরের সঙ্গে বিভিন্ন হয়েও অর্থের দ্যোতনায় দারুণ সঙ্গতি সৃষ্টি করে তখন চিত্রকল্প অন্তর্নিহিত কল্পনার পরম্পরায় সার্থকভাবে পাঠকের সামনে উদ্ভাসিত হয়। সজীবতা চিত্রকল্পের এমন এক গুণ যা আমাদের ইন্দ্রিয়ের কাছে একেবারে নতুন অথচ আমাদের অনুভূতিতে ব্যাপকভাবে সাড়া দেয়; এর রয়েছে সুপ্ত শক্তি ও সীমাহীন সম্ভাবনার আভাস, যা শব্দ ও বস্তুর মধ্যে সদ্যসৃষ্টির আস্বাদ জাগায়। প্রচণ্ডতা-গুণের রয়েছে আরো ঘনবদ্ধ প্রগাঢ় বৈশিষ্ট্য। এটি কবিতায় বর্ণিত বিষয়-বিষয়ীকে দেয় বিপুল ব্যাপ্তি এবং এর তাৎপর্য ও অনিবার্যতাকে পাঠকের হৃদয়বৃত্তে অনুভবের ক্ষেত্রে সাহায্য করে। আর স্মৃতিজাগানিয়া পরিচয়ের তৃতীয় গুণটির অন্তর্গত ভিত হল কবিত্বশক্তির আবেগবাহী অনুরাগ, যার মাধ্যমে কবি অর্জিত অভিজ্ঞতার সঙ্গে উপমানচিত্রের সংযোগসূত্র গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন। চিত্রকল্প এই ভাবে কবিমনের সজীব উপমা-প্রতীক-রূপকল্পের আবহ সৃষ্টি করে। শুধু কবিমনের সজীব অনুভূতির মূর্তায়নই নয় বরং তীক্ষ্ণ, প্রবল, প্রচ- এক অভিজ্ঞতার সম্মিলনে এর ব্যঞ্জনা আরো বিস্তৃত হয়। চিত্রকল্পের এই এক পরম শক্তি- মিত পরিসরে অমিত দ্যোতনার সম্মোহনী বিচরণ।

বাংলা কবিতায় চেতনা-প্রসারী চিত্রকল্প তৈরি হয়েছে তিরিশি আন্দোলনের মাধ্যমে। বাংলাদেশের কবিতারও পথপরিক্রমার অগ্রযাত্রার বর্তমান পর্যায়েও চিত্রকল্প সবারই আরাধ্য। ইঙ্গ-মার্কিন চিত্রকল্পবাদী কবি ও তাত্ত্বিকদের একটি উদ্দেশ্য ছিল কবিতা থেকে সব ধরনের বিবৃতিধর্মী পঙ্্ক্তিকে বিদায় জানিয়ে কেবল চিত্র ও চিত্রকল্প দিয়েই কবিতা নির্মাণের। এ ধরনের কবিতাকে বলা হয় ‘চিত্রকল্পবাদী’ কবিতা। এর নিরিখে আমাদের বাংলা কবিতায় যা আছে তার অধিকাংশই ‘চিত্রকল্পবাহী’ কবিতা, প্রকৃত ‘চিত্রকল্পবাদী’ কবিতা বিরল। চিত্রকল্পবাদী কবিতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল কবিতাটি পাঠ করার পর খ- চিত্রগুলো মিলেমিশে একটিমাত্র সুবিশাল চিত্রকল্প পাঠকচৈতন্যে ধরা দেয়। প্রকৃত চিত্রকল্পবাদী কবিতা বাংলা সাহিত্যে বিরল বলেই বাংলাদেশের প্রতিভাবান তরুণ ও নবীন কবিদের সামনে পড়ে আছে চিত্রকল্প নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার এক বিরাট সুযোগ।  

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কবিতায় নব্বই ও তাঁর পরবর্তী সমসাময়িক কবিরা বর্তমান সভ্যতা, নগরসংস্কৃতি, অগ্রজের প্রতিষ্ঠিত শিল্পলোক, ভাষাভঙ্গি, চিত্রকল্পের প্রকৃতি, উপমান-উৎস সমস্ত কিছুকেই অস্বীকারের প্রণোদনায় উৎসাহিত। তথাপি এই সময়পর্বের অনেক কবিই প্রত্ন-ইতিহাস, লোকঐতিহ্য, মরমিয়া শিল্প-ঐতিহ্যে অবগাহনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কবিতায় চিত্রকল্পের যে ব্যবহার দেখিয়েছেন তার একটি সারনির্যাস তুলে নেয়া যাক।
    
চিত্রকল্পকে কেউ কেউ বলেছেন বাকপ্রতিমা। মূলত চিত্র হচ্ছে সেই ভাষার রঙে ছবি আঁকা যার সঙ্গে কবির ভাবনা-কল্পনার সম্মিলন ঘটলে নির্মিত হয় চিত্রকল্প। চিত্রকল্পের নির্মাণ দক্ষতায় একজন কবির অন্তর্দৃষ্টি প্রতিভাত হয়। কবিতায় আমরা অনেক ধরনের চিত্রকল্পের দেখা পাই। সাধারণ চিত্রকল্প, বিমূর্ত চিত্রকল্প,অব্যবহিত চিত্রকল্প, বিস্তৃত চিত্রকল্প, মিলিত চিত্রকল্প, জটিল চিত্রকল্প প্রভৃতি। আর আধুনিক কবিতায় এর ব্যবহার বিচিত্র পথে ও পন্থায় ঘটেছে।

চিত্রকল্পের সবথেকে সাযুজ্য সম্মিলন ঘটান নব্বইয়ের প্রতিভাবান কবিসকল। চিত্রকল্প ব্যবহারে এ-সময়ের কবিগণ হয়ে ওঠেন শুদ্ধবাদী কবি। এঁদের কারো কারো কবিতায় চিত্রগুলো আর চিত্র থাকেনি, এক ধরনের চিত্রমায়ায় রূপ নিয়েছে। এঁদেরই উত্তরসূরি শূন্য দশকের কবি অতনু তিয়াসের কবিতায় এই চিত্রমায়া তৈরির প্রক্রিয়াটি অভিনব সংযোজন বলে অন্তত আমার কাছে মনে হয়েছে:
    
একবার তোমার ভেতর যদি অনঙ্গ বউ বলে বেজে উঠতাম একতারা স্বভাবে
বুকের পাথর গলে গলে
একজোড়া নদী হয়ে নেমে যেতো সমতল গ্রাম ছুঁয়ে ছুঁয়ে    (আমাকে ইচ্ছে করো/অতনু তিয়াস)

আধুনিক কবিতায় চিত্রকল্পের ব্যবহারে স্যুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। খুব সামান্য মাত্রায় হলেও নব্বইয়ের কবিদের মধ্যে এই পরাবাস্তববাদ কবিতার চিত্রকল্পকে দিয়েছে ভিন্নতর মাত্রা। আবার পরাবাস্তব চিত্রকল্প সাধারণত প্রতীকাশ্রয়ী হয় এবং চিন্তার গভীরে পাঠকের অনুভূতিকে টেনে নিয়ে যায়। পাঠক এর ফলে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার বাইরে গিয়ে অন্য এক জগতের সন্ধান পান। যদিও সাম্প্রতিক কবিতায় এই ‘স্যুররিয়ালিজম’-এর যথেষ্ট সার্থক প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না:

ক.     সেদেশে তীব্র বেগ। ঝাঁজালো নির্গত গ্যাস, হয়তো-বা
আরও কঠিন ফুটন্ত জলাশয়ে বহুকাল শুয়ে ছিল তারা
রূপালি আগুন গায়ে জ্বেলে দেখি লাল চাঁদে যারা
বসেছিল আমাকে কেন্দ্র করে অনন্তকাল কৃতী বিধবা।        (কৃতী/শিবলী মোকতাদির)

খ. সন্ধ্যার কিছু পরে, সেই ফুলচোর, শেষবার আমায় বলেছিল, ঘন ঘন জবাচিন্তা মতিভ্রমের পূর্বাবস্থা, এর চেয়ে কাটা-গাছের গুঁড়ির মতো শুয়ে থেকে তুমি পাঠ করো মেঘেদের নশ্বর পঙ্ক্তিগুলো। বোঝো, বজ্রের মন। দু-পাতা বিদেশী সাহিত্য পড়ে বেবুনের মতো কিছু প্রাজ্ঞ হও।             (জেব্রামাস্টার/মজনু শাহ)
    
    গ. চোখ মেলে দেখি
দাদিমা ধান খাওয়াচ্ছেন
ক্যালেন্ডারে আঁকা মুরগিগুলোকে
আর আমাদের নাস্তার প্লেটে    
      ডিমের কুসুম সেজেছেন শেষ বিকেলের সূর্য     (বৃষ্টি অথবা টাইমমেশিনের আওয়াজ/ফেরদৌস মাহমুদ)

কিন্তু নৈসর্গিক দৃশ্যের সঙ্গে অতীত স্মৃতির রোমন্থন মিলে জন্ম নেয় যে নতুন কোলাজ, রক্তমাখা স্মৃতি- তাকে বিশালায়তন করেছেন এ-সময়পর্বের কবিরা। তাঁদের কবিতায় সেই বিস্তৃত চিত্রকল্পের নমুনা খুঁজে পাওয়া যাবে:

ক. এরকমই তো কথা ছিলো! আগলে রাখবো ফসলের মাঠ। চাষের কৌশল।
মৌসুমি হাওয়া এলে যাবতীয় বিছরা জুড়ে বসে পড়বে সবুজের হাট। বছরের
প্রথম বৃষ্টিতে যখন উর্বর হবে জমিনের বুক, ভোর না হতে তার কাছে পৌঁছে
যাবো রোজ।…                (সাং নালিহুরী : ২/মুজিব ইরম)

খ. স্টেশনমাস্টারের বউ এবং অবনীদের বাড়ির কাছে
    আমার গোপন প্রণয় বলি।
চাষাড়া মোড় থেকে অনির্দিষ্ট টানবাজারের গলি,
অগ্রণীব্যাংক শাখার মুখোমুখি মর্গের প্রেরণা
চেকবইয়ে সই করা কয়েকটা দিন
কয়েক মুহূর্তের ছলনা     (চাষাড়া ব্যাংকের নীল অফিসার/আলফ্রেড খোকন)    
গ. থুতুর ফেনা জুতোর ধূলি নখের আঁচড় গায়ে মেখে
যখন ফিরে আসি ঘরে
রাতের গায়ে একবিন্দু মোম জ্বালিয়ে
আলোর ওপাশে বসে থাকে বউ।

আলোর মতো নরম করে সে হাসে
নরম দুহাতে ভাঁজ করে দেয়
সারা দিনের এলোমেলো জীবন।     (সংসার/মামুন খান)

তবে বাংলাদেশের কবিতায় বর্তমান সময়ের তথা নব্বই ও তার পরবর্তী সময়ের সাম্প্রতিক কবিরা বিস্তৃত চিত্রকল্পের ব্যবহার করেছেন সব থেকে বেশি। হয়তোবা তাঁদের কাছে এটিকেই মনে হয়েছে অনেকটাই সহজাত। তবে এই বিস্তৃত চিত্রকল্প কেবল নিসর্গের ভিতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং ব্যক্তিমানুষের যাপিত জীবনের নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে এর মধ্য দিয়ে:    

ক.   প্রশস্ত শীত ঋতুর পর বাড়ি ফিরছি আমি। একটি খসে পড়া ধাতব
এ্যান্টেনা জড়িয়ে আছে আমার আবাল্য সরল মুখ। আমার থেঁতলানো
চোয়াল, এলোমেলো চুলে হাত রাখছেন মা। কপালে চুলের টিকলি,
মাজার সুতো, ফুটো আধুলি- কে কবে পরিয়েছিল একটু একটু মনে
পড়তে, আমার পঁচিশটি আঙুল দিয়ে তৈরি এই পতিত এ্যান্টেনার পাশে
বিভিন্ন বর্ণচোরা ফুল, নীল মোমবাতি- এসব দিয়ে মাকে কেউ বরণ
করে নিল।                (এ্যান্টেনা/ওবায়েদ আকাশ)

খ. মাটির অন্তরে ওটা কিসের রং? জীবন মূলের গন্ধ পেয়েছ বুঝি? আচ্ছা, পৃথিবীর ডাকনাম জানলে কীভাবে? জানি, পৃথিবীর গলায় দড়ি পড়লে জমে ওঠে মানব অন্তরের খেলা। যেমন ধরো, সাপের সাথে মানচিত্র দৌড়ায়, খ্যাপার মুখে বাজে বায়ুহীন বাঁশি।                    (প্রাণ এক দুঃখের রন্ধনশালা/জুয়েল মোস্তাফিজ)  
 
গ. সন্ধ্যা একটা জংশন, এই ইস্টিশানে কেবল দিন ও রাতের ক্রসিং-
    দক্ষিণ পাড়ার নিষিদ্ধপল্লি থেকে হাওয়া এসে মেশে এ পাড়ার ধূপের
    ধোঁয়ায়, আমি হাটফেরত কেউ, ক্রমেই বাড়াতে থাকি পায়ের চাঞ্চল্য-
    
    আমি টের পাই- এরই মধ্যে বাতাসের গায়ে লেগে গেছে ধূপের আঁচড়      (সূর্যক্রসিং/চাণক্য বাড়ৈ)

কবির সৃষ্টি-জগতের একটি বিশেষ গোপন কুঠুরিতে নিহিত থাকে চিত্রকল্প রচনার প্রণোদনা। কবির অবচেতনে যেমন সঞ্চিত থাকে তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতা, তেমনি যুগ-যুগান্তরের মানব-অভিজ্ঞতার নির্যাসও সেখানে বিরাজমান থাকে। চিত্রকল্প নির্মাণের প্রক্রিয়ায় কবির মনের অবচেতন ও অচেতন অংশে সুপ্ত বোধ, ভাবনাই সর্বোচ্চ প্রভাব তৈরি করে। ফলে কবিতায় চিত্রকল্পকে চিত্রের সীমিত অর্থে বিবেচনার সুযোগ নেই। কখনো কল্পনার বাস্তব, কখনো বাস্তবের প্রকৃতিকে ভাষার কাঠামোতে তুলে ধরে নতুন উপলব্ধি প্রকাশ করা যায় চিত্রকল্পের মাধ্যমে। আর এর সার্থক প্রয়োগ দেখা যায় নব্বইয়ের কবি চঞ্চল আশরাফের কবিতায়:

কাকে দায়ী করি? মধ্যাহ্নের মুছে-যাওয়া মেঘে
এই প্রশ্ন রেখে আমি তাকাই ছাদের দিকে- ভাবি:
খুব ভালো পাখিজন্ম; তখনই একটা চড়–ই এসে
আমার শরীর ঘেঁষে ওড়ে, শূন্যে দেখা যায় সেই
রেখাগুলো, তাতে ভর দিয়ে আমি চড়–ইশরীরে
ঢুকে যাই।                    (সুইসাইড-নোট : ২/চঞ্চল আশরাফ)

কবি হচ্ছেন প্রেরক আর পাঠক হলেন প্রাপক। আর এ-দুয়ের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে কবিতা। ফলে কবিতার মধ্য দিয়ে যে যোগাযোগ স্থাপিত হয় তা এক ধরনের মানবিক যোগাযোগ। আর এই যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় কবির বার্তাকে পাঠক গ্রহণ করেন ইন্দ্রিয় সংবেদনের মাধ্যমে। সুতরাং কবির অপূর্ণ চিত্রকল্প পূর্ণ হয়ে ওঠে পাঠকের কল্পনায়। আর চিত্রকল্প পাঠকের বোধ ও কল্পনাকে উসকে দেয়, নতুন উপলব্ধির জন্ম দেয়:

ক. চলো, অশ্রু ও প্রতিভার কথা বলি।
যারা প্রতারণা ও প্রেমে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করেছে
তাদের কথা এই উন্মত্ত রাতের টেবিলে পড়ে থাক।

বনশ্রী অধিক দূরত্বের হলেও    
প্রেম ও প্রতারণা দিয়ে একান্তে চেয়েছি।

এই হচ্ছে অশ্রু ও প্রতিভার উদ্গম- ধীর ও মৃত্যুময়। (হীরকখণ্ড/আহমেদ স্বপন মাহমুদ)

খ. সকালে ঘুম থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াই,
প্রতিদিন।  
ভালো লাগে, বাঁচতে ইচ্ছে করে।

রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত
নিজের প্রতিবিম্বই উজ্জীবিত রাখে আমাকে।

কাচের, জলের এ আজব জগৎ বানিয়েছে ইঞ্জিনিয়ার।
যেদিকে তাকাই সেদিকে আমি।
    
যখন আশপাশে আয়না নেই, জল নেই-
তখন আমি আমার ছায়ার দিকে তাকিয়ে থাকি,
মাটির আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকি।         (মাটির আয়না/মাহবুব কবির)

অনেক সময় চিত্রকল্প হয়ে ওঠে খ- খ- ছবির সমাহার। অনেকগুলো অনুষঙ্গের সম্মিলনে একটি পূর্ণ চিত্রের কাঠামো সৃষ্টি হতে পারে। আর এ ধরনের চিত্রকল্প নির্মাণে এই সময়পর্বের কবিরাও কম যাননি। প্রচলিত অর্থে রোমান্টিক নয়, কিন্তু অন্তর্মুখীন ও অনুভূতিপ্রধান হবার ফলে বাস্তব প্রতীকের অনুষঙ্গে এ জাতীয় চিত্রকল্প নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে:

ক. এপাশে ঘুমিয়ে আছি    ওপাশে ঘুমিয়ে তুমি
       মাঝখানে ঘুমিয়ে আছে ¤্রয়িমান কবর
                 স্যাঁতস্যাঁতে হাড়
                    জৈবসার
                     অথবা
    এপাশে জেগে আছি    ওপাশে জেগে তুমি
       মাঝখানে জেগে আছে শ্মশান
                  অর্ধদগ্ধ হাড়
                  শরীরবল্কল

      পোস্টমর্টেম রিপোর্টের জন্য
   মহাকালের দরজায় অপেক্ষারত, অনন্তকাল… (একরাত্রি ঘুম/তুষার প্রসূন)
 
খ. একদিন আমার তো সব ছিল-
পিঁড়ি ছিল, ছিল মাটি, সবুজের হাতছানি,
বউচি খেলার মাঠ    
গোল্লাছুট
        কানামাছি
            অলস সাঁতার
রীনাদের ক্ষেত থেকে কাঁচা শশা চুরির সাহস।      (এই সব স্মৃতির সৌরভ/তপন বাগচী)
চারিদিকে আকীর্ণ গুঞ্জন, বাঁক বদলের সন্ধিক্ষণের, ক্লিশে বাৎসল্য ঝাড়া আধুনিক কবিতার বলিষ্ঠ কান্তিমান চাবি-মাস্টার এই সময়ের তথা নব্বই ও তার পরবর্তী সময়ের কবিরা তাঁদের কবিতার বিষয়-বৈভবে যে চিত্রকল্পের অনুধ্যান ঘটান, সেখানে বিমূর্ত চিত্রকল্প একটি প্রধান জায়গা করে নিয়েছে এবং এই সময়পর্বের অনেকের কবিতায় তার সার্থক প্রয়াস লক্ষণীয়:

ক. ভিজতে ভিজতে যায়, জগতের ম্লান এক পাখি
 মর্মে মর্মে ধুলোর জীবন, মনে মনে মরুভূর
 উষ্ট্রিণীর ডিম পেলেপুষে পথের কাদায় মিলে
 এমন বাদল দিনে হেঁটে যায় দূর কোনো দেশে

 পাতার ঝড়ের দিনে মাথার উপর থেকে ভেঙে
 উড়ে যায় বহুদূর জীবনের পালকের ছাতা…        (ঝড়/মোস্তাক আহমাদ দীন)

খ. রতিবিহার শেষে জ্যোতি নিভে যায়
অহেতু কোলাহল- তুমি এসে ফিরে গেছ ক্রন্দনরাত
দ্বৈতহৃদয়; রক্তাক্ত ছায়ায় খুঁজে পেয়েছিলাম তোমার প্রণয়

নিদ্রিত চোখকে নিহত ভেবে বাতাস নিয়েছিলে বুকে
চোখের দৃষ্টি জংধরা ছিল সম্মুখে,             (মুনিয়া, দূর-কোন গাঁ/শামীম রেজা)
    
গ. এখন লাঙল ছোঁবো
    পূর্বজন্ম থেকে শূন্যজন্ম আমি আদিম কৃষক
    কর্ষিত মৃত্তিকা ক্ষুধা কিংবা তৃষ্ণার আধার
    অঙ্কুরোদগমের উৎকৃষ্ট পাত্র
    হয়ত প্রণয়ের উষ্ণ বিছানা                (চাষ/গালিব রহমান)

বাংলা কবিতায় চিত্রকল্প আরো সমৃদ্ধ হয়েছে দৈশিক ও বৈশ্বিক প্রাকৃতিক বন্দনা ও মিথের আশ্রয়ে। দেশীয় লোকজচেতনা, বিশ্বঐতিহ্য ও পৌরাণিক কাহিনীর বর্ণনায় কখনো কখনো ঘা দিয়ে পাঠকের চেতনা জাগাতেও কবি চিত্রকল্প সৃষ্টি করে থাকেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এই মিথের আশ্রয়ে যে চিত্রকল্প, তা বর্তমান সময়ের কবিদের কবিতায় খুব একটা দেখা যায় না। চিত্রকল্প ব্যবহারে নব্বই ও তার সমসাময়িক কবিরা ডিটেইলে কাজ করলেও মিথের ব্যবহারে চিত্রকল্প নির্মাণে তাঁদের দীনতা পরিলক্ষিত হয়েছে। মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন এ ধরনের চিত্রকল্প নির্মাণের চেষ্টা করেছেন মাত্র:

ক.     স্মৃতির কূজনে কাঁপি লখিন্দর অতীতের ধ্বনি। পুরাণ কাহিনী আহা- প্রীতিঘন মধুদিনগুলি। দৃশ্যের সাক্ষাৎ যত ফণা তোলে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে; বিহ্বল ক্ষত থেকে পুনর্বার রক্ত ঝরে পড়ে। কি কঠিন বোঝা??? মস্তিষ্ক মেতে ওঠে দানব দঙ্গলে। নিজেকে ব্যাখ্যা করতে পারি না!!! বেহুলা-লখিন্দর ছাড়া এ জীবন পচা নেকড়া; বৃষ্টি ভেজা কঠিন দৃষ্টিপথ আমাকে ভাগ্যহত করে।                      (অভিনব এক কাব্যকুসুম/পাবলো শাহি)

খ.     যীশু নই, কুমারী মাতার গর্ভে তাই বিব্রত ছিলাম        
    
        আমাকে বলেনি কেউ ঈশ্বরের পুত্র
        করতলে নেমে এলে অন্ধরাত, হৃদয়ের ডগায় টের পাই বাসুকির ছোবল
        কালঘুমে নিদ্রিত বেহুলারা, পৃথিবীর কুমারী মাতারা,
        বলে যাই, যীশু নই, তবু তোমাদের গর্ভেই ফের জন্ম নেবো।         (যীশুর পুনর্জন্ম/মিহির মুসাকী)

গ.     রাঢ়-ঘেঁষা যে-সকল বালবন্ধুজন
    প্রত্যেকে নিজের সঙ্গে নারীকে চিনেছে
    সবুজ দেহের নামে বৌদ্ধিক শ্রমণ
    গৌতমের তমিস্রাকে দু’হাতে কিনেছে।                 (বায়তুল্লাহ কাদেরী)

চিত্রকল্প হচ্ছে কবিতার মর্মসূত্র। চিত্রকল্প চিত্রাতীত বাস্তবতা ও নান্দনিকতাকে ধারণ করে। কবি তাঁর বোধ ও অনুভবকে যখন দৃশ্যময় শব্দপুঞ্জের সাহায্যে কবিতায় প্রতিস্থাপন করেন, তখন শব্দ দিয়ে তৈরি চিত্রের মধ্যে গভীর প্রাণময়তা সূচিত হয়। কবির হৃদয়াবেগ- তাঁর কল্পনা, স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন তখন ঐ চিত্রের মধ্যে মূর্ত হয়ে ওঠে। আর কবিরা একে তাঁদের কবিতায় ব্যবহার করেছেন বক্তব্যকে সংহত, যথাযথ ও সুনির্দিষ্ট করার লক্ষ্যে।

ফলে কবিতার একটি অন্যতম সৃষ্টিশীল উপাদান হচ্ছে চিত্রকল্প। চিত্রকল্পের মধ্যে বস্তুরূপই নয় কেবল, বস্তুর ভিন্নতর রূপেরও প্রকাশ ঘটে। এককথায় কবিতাকে হৃদয়স্পর্শী করে তোলে এই চিত্রকল্প। যা কবিতার বিভিন্ন কোণে প্রতিস্থাপিত হয়ে কবি ও কবিতার মর্মমূলকে প্রজ্জ্বলিত করে। সুতরাং চিত্রকল্প পৃথক কোন অলংকার নয়, সকল অলংকারের শৈল্পিক নির্যাস মাত্র।

মূলত বাংলাদেশের কবিতায় ত্রিশের কবিতার প্রভাব থাকলেও বোধ করি তা থেকে ভিন্ন ও উৎকৃষ্টতর পথে এগিয়ে গেছে সাম্প্রতিক সময়ের কবিতা নতুন ভাষাভঙ্গি ও চিত্রকল্প নির্মাণের ভিতর দিয়ে। তবে এ ধারার বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হল পঞ্চাশের দশকে এর নির্মাণ এবং নব্বইয়ের দশকে তার নানামুখি উত্থান। সেই বিভিন্নতার পথে নব্বই ও তার পরবর্তী প্রজন্মের কবিতা নানামুখি চিত্রকল্প নির্মাণ-বিনির্মাণ ও পরীক্ষণের ভিতর দিয়ে জানান দিয়েছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কবিতার স্বাতন্ত্রিকতা। যদিও এই অনিবার্যতা সীমাবদ্ধ, বিতর্কিত। তবুও এ-সময়পর্বের কবিরা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কবিতায় কবিতার বিকেন্দ্রিকরণ ও ব্যাপক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে গবেষণালব্ধ কাজ করে চলেছেন অবিরাম।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E