৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুলা ০৯২০১৭
 
 ০৯/০৭/২০১৭  Posted by

মামুন মুস্তাফা-এর দীর্ঘ কবিতা “চিতাভস্ম”

 

শ্মশানঘাটের পাশে আমার বসত
কাল তোমার আসার কথা ছিল
মড়া পোড়াতে।
লবনাক্ত চাঁদের স্বাদ শরীরে মেখে
আমি বসেছিলাম নিঃস্ব উঠোনে,
গরমে তেতে ওঠা মাটির তলা থেকে
উঠা আসা গুটিকয় মসৃণ সরীসৃপ
এঁকেবেঁকে চলে যায় আমার ঘরের দেয়াল ঘেঁষে,
দূরে কোথাও শোনা যায়
হরিবোল হরিবোল
তবু চিতায় কোনো লাশ নেই
অথচ কথা ছিল কাল মড়া পোড়াতে
আসবে তুমি।
তবে কি কাল মৃত্যু ঘটেনি
কোনো সফল মানুষের? ওই একটি
দিন কি শুধু গেছে পৃথিবীর মৃত্যুহীন?
ব্যর্থ মানুষের জন্য সাজে না চিতা
কে করবে মুখাগ্নি তার?
জীবন ও জীবিকার সন্ধানে পরবাসী
সন্তান তার সনতারিখ ঠিক রেখে
পৌঁছুতে পারে না ছাই হবার আগে!

সেই চিতাভস্মের পাশে আমার বসত
তোমার আসার কথা ছিল কাল
মড়া পোড়াতে।

মাঝে মাঝে দক্ষিণে হাওয়া উস্কোখুস্কো
করে আমার মন
কোথা থেকে ভেসে আসে খণ্ড খণ্ড কালো মেঘ
আমার সাথে ছেলেভুলানো খেলা করে নীরক্ত চাঁদ
ঘুমন্ত সময় জানিয়ে দ্যায় কেঁদে ওঠা কুকুর

তবু তোমার কথা ছিল কাল আসার
মড়া পোড়াতে।

ছোট ছোট জলদোলা লাগে শ্মশানঘাটে
ছড়ানো ছিটানো প্রত্নছাই ভেসে যায় নদীজলে
তখন অনিঃশেষ নাভিমূল কথা কয়ে ওঠে:
“তুই কার জন্যে অপেক্ষা করিস?
এই দ্যাখ, তাকা আমার দিকে,
এ সংসারে অপেক্ষা বড় করুণ পাপ
বেঁচে যাবো বলে আকণ্ঠ বিষ পান করেছি
তবু মরা হল না আমার!
আজো আমি অপেক্ষা করি করুণ পাপে
আজ নয়ত কাল–নতুবা আরো পরে পরশূ
মৃত্যুহিম এসে ঢেকে দেবে আমাকে,
তবু শেষ হয়না এই অপেক্ষা!
তুই পালা, সংসার থেকে পালা,
জীবন থেকে,
হয়ত বেঁচে যেতে পারিস দূরাগত পথে।”
তবু আমি অনাহারী শিশু যেন
মায়ের স্তন পান করার মত অপেক্ষা করি
কাল আসার কথা ছিল তোমার
মড়া পোড়াতে।

এখনও ভোর হতে কিছু বাকি
দমকা চৈতী হাওয়া উড়িয়ে নেয়
অবশিষ্ট চিতাভস্ম
সুনিপুন গৃহিনীর ঝাঁট দেবার মত
এখন পরিচ্ছন্ন শ্মশানঘাট,
হয়ত আজ মৃত্যু এসে দাঁড়াবে
সফল মানুষের দরজায়।
তুমিও এসে যাবে সন্ত পায়ে
মড়া পোড়াতে।

পা মেলে দিয়ে শূন্য উঠোনে
অবোধ শিশুর মত হামাগুড়ি দেয়া
শেষ হবে আমার চৈত্রদহনে।

দূরে কোথাও শোনা যায়
হরিবোল হরিবোল
শাঁখ-ঢাক বাজার শব্দ
চিতা সাজাবে প্রথম বিবাহের মত
ঘৃত ছড়ায় গন্ধ জামাই আগমনে
চন্দনের সুবাস ম’ ম’ করে বিস্তীর্ণ
শ্মশান জুড়ে

তুমি আসছো ঠিকই সন্ত পায়ে আজ
মড়া পোড়াতে।

কোথাও গাছ পতনের শব্দ
বাসা ছেড়ে পালিয়ে গেল
ঘরমুখো পাখি।
শাদা শাঁখা টুকরো টুকরো হয়ে
ভেঙে গেছে মাটির উঠোনে
সিঁদুরের লাল মুছে যায়
হরিবোল হরিবোল ধ্বনিতে।
ঘরের বাঁধন ছিঁড়ে কঁকিয়ে ওঠে মেয়েমানুষ।

যে সন্ত পুড়িয়েছে এতদিন মড়া
তার শব কাঁধে নিয়ে এলো নতুন
সন্তের দল
আমি উঠে দাঁড়াই অপেক্ষা শেষ করে
নিঃসঙ্গ উঠোনে।
আট বছরের শিশু মুখাগ্নি করে সন্ত পিতার
বিরহী পথিক চেয়ে দেখে
ভেজা আমকাঠে জ্বলে না চিতা
ভেজাল কেরোসিনে মড়া পুড়তে চায় না
গভীর অভিমানে
নাকে কাপড় গোঁজে সব গরু মরার গন্ধে।

চিতাকাঠ শুধু দগ্ধ করে আমাকে
তোমারও ভস্ম প্রত্নছাই হবে একদিন
অনিঃশেষ নাভিমূল ধিক্কার জানাবে
আগামীকে
সংসারবিষে এই গোসাপ আমি
এখন পালাবো কোথায়?
মৃত্যুতে বেঁচে যাব সে উপায় নেই
কোনোমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলি
আমি এক গন্ধগোকুল

কথা ছিল আমারও মড়া পোড়াবে তুমি
চৈত্রসংক্রান্তির কালে
কথা ছিল কাল তোমার আসার
মড়া পোড়াতে।

 


কবি পরিচিতি

মামুন মুস্তাফা

মামুন মুস্তাফা

মামুন মুস্তাফা। জন্মঃ ৩ জুলাই, ১৯৭১। জন্মস্থান: বাগেরহাট। যোগাযোগঃ বিসিসিপি, বাড়ি: ৮, সড়ক: ৩, ব্লক: এ, সেকশন: ১১, মিরপুর, ঢাকা ১২১৬। পেশাঃ একটি গবেষণামূলক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

প্রকাশিত গ্রন্থঃ কাব্যগ্রন্থঃ

সাবিত্রীর জানালা খোলা (১৯৯৮); কুহকের প্রত্নলিপি (২০০১; দ্বিতীয় মুদ্রণ ২০০৯); আদর্শলিপি : পুনর্লিখন (২০০৭); এ আলোআঁধার আমার (২০০৮, কলকাতা সংস্করণ ২০১৪); এ বদ্বীপের কবিতাকৃতি (২০০৯); পিপাসার জলসত্র (২০১০); শিখাসীমন্তিনী (২০১২); একাত্তরের এলিজি (২০১৩); শনিবার ও হাওয়াঘুড়ি (২০১৫)।

প্রবন্ধগ্রন্থঃ মননের লেখমালা (২০১২); অন্য আলোর রেখা (২০১৬)।

সম্পাদনা: লেখমালা একটি ত্রৈমাসিক সাহিত্যকাগজ ২০১৫ থেকে প্রকাশিত হচ্ছে।

ইমেল: mmustafa72@gmail.com

মোবাইল: ০১৭২৬৭০২৮৪৬

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E