৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ০৯২০১৬
 
 ০৯/১১/২০১৬  Posted by
চন্দন চৌধুরী

চন্দন চৌধুরী

কবি পরিচিতি

চন্দন চৌধুরী। জন্মঃ ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭। জন্মস্থানঃ ঘাগটিয়া, দুলালপুর, হোমনা, কুমিল্লা। শিক্ষাঃ স্নাতকোত্তর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। পেশাঃ সাংবাদিকতা। মুঠোফোন: ০১৭১১২০৬০৩৮, ০১৬৮২২৭০৭২১, ইমেইল: chandan.kk75@gmail.com

প্রকাশিত বইসমূহঃ

কবিতাঃ যাবে হে মাঝি, দিকশূন্যপুর ; লাল কাঁকড়ার নদী ; কাকের ভাস্কর্য ; হাসির দেবতা ; মা-পাখি ম্যানিয়া ; অক্সিজেনের গান ; কন্যা কালীদহ ; পাণ্ডবজন্ম ; ঢাকা সিরিজ।

ছোটগল্পঃ আয়নাপাথর।

উপন্যাসিকাঃ নীলতোয়া জোনাকি।

শিশুতোষ গল্পঃ গোল্ডফিশ ও একটি প্রজাপতি ; শহরজুড়ে বাঘ-ভালুকের মিছিল ; হ্যালো ফড়িংমিয়া ; দুষ্টুরা দশ মিনিট আগে ; ভূতের বাচ্চাটা ক্লাসে এলে কাঁদে ; সাত রঙের ভাই বোন।

শিশুতোষ ছড়াঃ লাল ফড়িঙের বৌ।

অনুবাদঃ যাযাবর (মূল- কাহ্লিল জিবরান) ; গহীনে গোপনে (মূল- কাহ্লিল জিবরান, যৌথ) ; আরব বিশ্বের কবিতা ; নতুন ডানার উড়াল (পৃথিবীর তরুণ কবিদের কবিতা)।

সম্পাদনাঃ শূন্য দশকের গল্প ; মুক্তিযুদ্ধের কবিতা ; মুক্তিযুদ্ধের ছড়া ; একুশের ছড়া ; একুশের কবিতা।

জীবনীমূলকঃ বীরশ্রেষ্ঠ (ছোটদের) ; মাদার তেরেসা (ছোটদের) ; বিশ্বজয়ী বাংলাদেশি।

চন্দন চৌধুরী’র কবিতাভাবনা

গণিতের চমৎকার ফাঁকিবাজি খেলা

আমি একটি বীজের ভেতর ঢুকে যাচ্ছি। হয়তো কোনো অঘ্রাণে এই বীজ আমাতে প্রবেশ করেছিল। হয়তো এই বীজ আমি কিংবা আমার। অথবা বলা যায় এই বীজ থেকেই আমার জন্ম। এমনও বলা যায় বীজ ও আমার একটা সম্পর্ক আছে। এ সম্পর্ক অস্তিত্বের, এ সম্পর্ক অস্তিত্বের অলঙ্কারের।
তাহলে কবিতা অস্তিত্ব নয়, কবিতা অস্তিত্বের অলঙ্কার। কবিতা প্রাণ নয়, প্রাণের শিখা। কিংবা যে জন্য প্রাণ ক্রমাগত বেঁচে থাকছে হয়তো সেই ক্রমাগত-এর ‘গত’ নয়, ‘ক্রম’র জন্য যা প্রয়োজন তা কবিতা। হয়তো কবিতাই ‘নতুন’। হয়তো ‘আজ’ থেকে ‘আগামী’- ক্ষাণিক এগুনোর জন্য যা -তা-ই কবিতা। ধরা যাক কবিতা সেই গণিতের ক্রমবর্ধমান খেলা। ধরা যাক গণিতের সেই ফাঁকি।
প্রথমত, আমরা সংখ্যাগুলো গুনে যাই- ১ ২ ৩ ৪ ৫…
এবার পেছনে ফিরি- … ৫ ৪ ৩ ২ ১
এবার একটি সংখ্যা ফেলে আরেকটিতে যাই- ১, ১.১, ১.২, ১.৩. …
এবার ১ থেকে পেছনের দিকে যাই- ….  ০.৮  ০.৯  ১
এই ৯ এবং ১ এর মধ্যে অনন্ত সংখ্যা।
আমরা ধরে নিই কবিতা গণিতের এই চমৎকার ফাঁকিবাজি খেলা। আবার যুক্তিহীনও নয়। ধরে নিই একটি সংখ্যা থেকে আরেকটি সংখ্যায় যে দূরত্ব, এই দূরত্ব পার হওয়াই কবিতা। অর্থাৎ অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তন। কবিতা একটি ‘নতুন’-এর দিকে যাত্রা। অথবা মানুষের প্রজন্ম একটি পরিবর্তন। আমি যেহেতু পরিবর্তনের অংশ তাই আমিও কবিতা কিংবা আমি কবিতার ভেতর ঢুকে যাচ্ছি। কিংবা কবিতার আমি।
এবার যদি আমরা গণিতের ভেতর যাই, একটি সংখ্যার ভেতর যাই তবে দেখবো যে এর গভীরতাও অশেষ। আমি কবিতাকে সেই গভীরের দিকে যেতে দেখি। যত ইচ্ছে এর অভ্যন্তর খুঁড়ে যাও। যতো ইচ্ছে এর অশেষ ময়দানে হাঁটতে হাঁটতে দৌড়োতে দৌড়োতে উপলব্ধি করতে থাকো। কারণ-‘যতই সুদূরগামী, বহুদূর বাকি থাকে পথ।’
এ পথ অনিঃশেষের, অতলান্তের। অথবা কবিতা সেই কলাবতী, যার ঐশ্বর্য যার সৌন্দর্যও অনিঃশেষ। যদি আমরা সৌন্দর্যের গভীরে ঢুকি-
দুইটি লাল পিঁপড়া এই পথে হেঁটে গেছে। অথবা- দুইটি সমান্তরাল আঁকাবাঁকা পথ বাতাসে রচিত হয়েছে। অথবা- পিঁপড়ের পায়ের অসংখ্য শব্দ বিছিয়ে পড়েছে। অথবা- দুইটি পিঁপড়ে নয়, দুইটি অদেখাই এই পথে দৃশ্যমান ছিল। অথবা- পিঁপড়েরা হেঁটে যায়নি, হেঁটে গেছে সময়। অথবা- মাটিতে পায়ের ছাপ রচনার জন্যই পিঁপড়েরা হেঁটে গেছে। অথবা- পিঁপড়ে নয়, বরং হেঁটে গেছে পিঁপড়ের প্রতিবিম্ব। অথবা…।
এভাবে আমরা অসংখ্য গল্পের মুখোমুখি হই। প্রাণবস্তুর সর্বত্রই সৌন্দর্য। সৌন্দর্যের বিচিত্রতা অশেষ। এই বিচিত্রতা একেকজন একেক রকমভাবে আবিষ্কার করে। আবিষ্কার যে বেশি করতে পারে সেই সবচে বেশি পথ-হাঁটা পথিক। কবিতা তাই এক ভবঘুরে। সে শুধু কবির মনে হাঁটতে থাকে। এই হাঁটা অবিরাম। প্রকৃত কবিতা ভবঘুরের বিশেষ সৌন্দর্য, বিশেষ উপলব্ধি, উপলব্ধির স্বভাব। ধরা যাক, আমরা একটি পাতা দেখছি। আমরা সবাই একসাথেই দেখছি- কেউ ভাবছে পাতার বর্ণ নিয়ে, আপাতভাবনা যাকে বলে। আকার নিয়েও কেউ ভাববে। কোন গাছের, তাও কেউ ভাববে। ধরো, তুমি একটু অন্যভাবে ভাবতে চাইছো-
এই পাতার মা কে? / এই পাতা কি তার মায়ের বীজে ছিল? / এই পাতার বিবর্ণপর্যায় কেমন হবে! / কুঁড়িতে তার কতটুকু স্বপ্নের উল্লাস ছিল? / পাতারও কি অহংকার আছে?…
পাতা কবিতা নয়, কিন্তু পাতাকে ঘিরে জন্ম সহস্র সৌন্দর্যের খেলা। কবিতা সেই ‘কলাবতী’ কিংবা ‘পাতার শরীরে যে-ধরে’। আরেকটি ব্যাপার হলো- কবিতা প্রাণবস্তুর এই অন্তহীন ভাবনা। গণিতের সেই সূত্রের মতো। যতো ইচ্ছে হাঁটো, এই পথের শেষ নেই। কিন্তু তুমি যখন একটা নতুন অংকে পা ফেলবে তখন তৈরি হলো একটি নতুন পথ। ভাবো, সেই ‘অংক’ কিংবা ‘সংখ্যা’র ভেতর অসংখ্য ‘অংক’ কিংবা ‘সংখ্যা’। তেমনি একটি ভাবনা কিংবা অংক- যাই বলি, অসংখ্য ভাবনার ভেতর শূন্য মাত্র; সবই অশেষের শূন্যতা, সৌন্দর্যও অশেষ।

চন্দন চৌধুরী’র কবিতা


শুধুমাত্র সাধারণ

শুধু সাধারণ হবার জন্য সময়কে তাড়িয়ে দিলাম নিজের ভেতর থেকে, এভাবেই তৈরি হলো গতির নিয়ম; ভেতরের অপার সৌন্দর্যকে দিলাম ছুড়ে ওই শূন্যতার দিকে, দৃশ্যে দৃশ্যে রচিত হলো জগত;
আহা, শুধু সাধারণ হবার জন্য অভ্যন্তরের সমস্ত সুধা ছড়িয়ে দিলাম বাতাসে, গন্ধে গন্ধে ভরে উঠলো পৃথিবীর কূল; আর আমার ধ্বনিপুঞ্জ ভেঙে চুরমার করতেই সশব্দে ফেটে পড়লো দুনিয়াটা;
হুম, শুধুমাত্র সাধারণ হবার লোভে আত্মাকে বের করে ছুড়ে দিতেই জন্ম হলো অবারিত প্রাণ; এবং লাবণ্যকে ঝেড়ে ফেলতেই রঙে রঙে অপূর্ব হলো চারপাশ;
হয়তো আমার সাধারণ হবার জন্যই নিজের ভেতরটা উড়ে গেল বাইরে, এবং পৃথিবীতে তৈরি হলো যাবতীয় সম্পর্ক; আর এই সাধারণ হবার আশায়ই আমি মাথা গুজলাম ঘাসের ভেতর, আমার ওপরেই পড়ুক জগতের সব পায়ের বেদনা।


জীবনসূত্র

একটা চুমুর বয়স থেকে মোটেও বেশি নয় আমার বয়স
তোমরা যারা আমার বয়স হিসেব করে ভাবছো

জীবনটা স্রেফ ১০০ মিটার দৌড়

এবং একটা প্রজাপতির উড়াল
তাদের বলে রাখি শোনো-
জীবন সন্তানের মতো, তাকে জন্ম দিতে হয় বারবার

একটি জীবনে যার ষাট লক্ষ বসুন্ধরা থাকে
তাকে শুনতে হয় না জমিদারবাড়ির পাখিদের ঠাট্টা
সে এমনিতেই পেয়ে যায় আশ্চর্য এক গল্পের দোয়াত
যার ফোঁটায় ফোঁটায় জন্ম নেয় এক-একটি চুমু

চুমুর যুদ্ধে হেরে যাওয়া জীবন নিয়ে
যারা এখনো দেখে যাচ্ছ মুদ্রার অহেতু নাচ
শোনো- আমার দাদীমা এক রাক্ষুসীর গল্প বলতেন

একটিও দাঁত নেই, অন্ধও সে

অথচ তার চোখের জল থেকেই নাকি জন্ম নিয়েছিল

পৃথিবীর প্রথম নদী

সেই নদীতে ডুব দিয়ে দেখ, তুমি শুধু অজস্র জীবনের গল্প


চিরপুষ্প

চিরপুষ্প ফুটবে এবার, ভদ্রকালীর জিহ্বা থেকে ঝরে পড়া রক্ত শুষে নেবে বৃক্ষের মূল; এবার জগতের সমস্ত পাতা ধারণ করবে রক্তবর্ণ মেঘ।
আর তুমি ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাতে ভুলে গিয়ে থামিয়ে দেবে সময়কে; শূন্যতায় নিয়ে আসবে অবিনশ্বরতা।
এবার পৃথিবীতে বইবে অমৃতের গাঙ; এবং একজন রাত্রিহন্তারক চিৎকার করে খেয়ে ফেলবে যাবতীয় তন্দ্রামঞ্জুরী।
এবার মুছবে প্রলয়, কোথাও শোনা যাবে না রুদ্রের হাক। তবু নিরবতার প্রাচীর ছিন্ন করবে হৃদয়পাখিরা।
ফসলের মাঠে জন্মাবে নতুন নতুন ইচ্ছে আর শসার মাচার মতো ঝুলে থাকবে অনন্ত আনন্দ।
এবার তুমি মৃত্যুকে হত্যা করবে, এবং জন্ম দেবে আমায়।


খুনি

খুন করার পর থেকেই নিজেকে বেশ পুণ্যবান মনে হচ্ছে

খুনেও এত আনন্দ!
তা-ও দিনদুপুরে আস্ত একটা খুন

প্রকাশ্যে ফুলরঙের উজ্জ্বলতায়!

কাল পত্রিকায় ছাপা হবে
একজন আদর্শ খুনির ছবি ও খুনের ঘটনা
সাংবাদিকরা অবশ্য রসটস দিয়ে ভালোই লিখবেন
পোজ দিয়ে দু’একটা ছবি তোলা থাকলে ভালো হতো

কিন্তু শালা থানাটাকেই মনে হচ্ছে ধর্মশালা
পুলিশ আমাকে দেখেই বলল- এখানে খুনির জায়গা নেই

দয়া করে সংসদে যান


জন্ম

শব্দ আমার কাছে শৈশবের লাটিম, হাতের তালুতে রেখে অবাক বোলাতে পারি।

দেখো ঐ যে হিজলবন, যার গোপন করোটি খুলে যারা উপভোগ করেছিল বালিকার সমগ্র বেদনা; গ্রামাঞ্চলে একদিন এইসব জিরাফের মুখে কাফি পরিয়ে দিতেও আমি ব্যবহার করেছি লাটিমের রশি।

এরকম প্রতিটি ভাবনা এক-একটি আলোর চিরুনি।

নিরীহ উরুর কাছে প্রতিভা প্রার্থনা ক’রে যারা নেয় গলিত করুণা, তাদের কাছে শব্দ কপট পিপাসা। আর আমি জানি নারীর শান্ত বুকে প্রার্থিত শব্দ নাড়াচাড়া করলে জেগে ওঠে পৃথিবীর প্রাণপুঞ্জ; শ্যাম্পেনের ফেনার মতোই অলৌকিক চুম্বনচিত্র।

শোনো, প্রতিটি বাক্যই বাসন্তির গায়ে প্রথম স্পর্শ।

হরিণীর সমস্ত পেয়েও আমি সম্ভোগ শিখিনি; অথচ তার গর্ভেই জন্ম নিয়েছে আমার সমস্ত কবিতা।


নতুন

দুটো বাড়িই পুরনো। তবু তোমাদের বাড়ি চিনত না আমাদের বাড়িটা। তোমাদের গাবগাছের সঙ্গে কথা হতো না আমাদের জারুলগাছের। আমাদের বাদুড়েরা জাম খেতে যেত না তোমাদের বাড়ি।

আমাদের বাড়িতে যেদিন লাটিম খেলার দিন, তোমাদের বাড়িতে হয়তো বৃষ্টি হিম হিম।
দুটো বাড়িতেই হয়তো শালিক থাকে, দুটো বাড়িতেই হয়তো চিল।
বাড়ি দুটো পুরনোই, ফুল পুরনো, হয়তোবা ফলও। হয়তো পুরনো আষাঢ়ে করা মেঘেরাও, আরও পুরনো হয়তো সুখদুঃখগুলো।

তবু একদিন তোমাদের বাড়ির ছায়া আমাদের বাড়িতে এসে পড়ে, আমাদের বাড়ির ছায়া তোমাদের বাড়িতে। হয়তো একেই নতুন বলে।


কারণ

আমিই সেই রাক্ষস, যে নিজেকে খেয়ে খেয়ে বেঁচে থাকি, নিজের কবরে বসে করি গোরখোদকের গান আর হেসে ওঠি পৃথিবীর মানুষের মতো, কখনো কাঁদি ইচ্ছে করেই।
আমিই সেই ভয়াল, নিজের মধ্যেই বাস করে যার মৃত্যু, যার নিজের বিষের দংশনে নিজেই জর্জরিত হয় আর মৃত পালকের মতো উড়ে যায় অচীন এক অদৃশ্যের দিকে।
তবু আমাকেই আমি আমার সহস্র হাতে জাপটে ধরে রাখি, সময় যেভাবে নিজেই বেঁধে রাখে সময়কে।


আমার পুত্ররা

আমার পুত্রদের কথা আমি বলিনি, তারা উঠবে পৃথিবীর দুই দিক হতে। পূর্ব দিকে যখন তাকাবে দেখবে প্রখর সূর্য, পশ্চিমে যখন তাকাবে দেখবে মায়াময় চাঁদ। আমার পুত্রদের তেজেই উজ্জ্বল পৃথিবী।
আমি আমার পুত্রদের কথা বলিনি, কারণ তাদের মা এখন হলুদ শর্ষেক্ষেতে ফুল তুলতে ব্যস্ত এবং আমাকে বলছে, এই যে দেখছো পৃথিবীর যাবতীয় ফুল, আমাদের ছেলেদের হৃদয় হবে।
আর আমি সমুদ্রের সব নীল গায়ে মেখে বলেছি, এ দেহে যতটা সমুদ্র ধরে সব দেব তোমায়।
আমাদের পুত্রদের কথা আমি বলিনি, তাদের সঙ্গেই সমস্ত জন্মের সম্পর্ক; তারা উঠবে পৃথিবীর দুই দিক হতে।


অক্সিজেনের গান

কত বছর আগে চুমু খেয়েছ, আজও রক্ত ঝরছে ঠোঁটে।
স্মৃতিসংস্করণে বদলে যাচ্ছে দিগন্তের রঙ। তুমি কার কাছে শিখেছ নিত্য-অনিত্যের খেলা, কোথা থেকে পেয়েছ সময় শাসনের এমন আশ্চর্য শক্তি!

ভালোবাসতে শিখিনি আজও, অথচ ভালোবাসার অপরাধে আমিই কিনা লিটমাস মেঘ! অদৃশ্যের ভেতর দৃশ্যচরাচরে অবিরত বদলে দিচ্ছ আমায়। কেবলই হয়ে যাচ্ছি রক্তরাগের নেশা।

তোমার সঙ্গে দেখাই হলো না আহা, অথচ তোমার চুমুর দাগ বহন করতে করতে আজ এই ঠোঁট এতো সাবালক।

১০
নদীর ভাস্কর্য

অভিশাপ দিয়েছ তাই হয়ে গেছি শামুকরঙা নদীর ভাস্কর্য; ভেতরে বাউলের মতো একতারা বাজাচ্ছে এক কালো বাউশ মাছ, সুরে কি গভীর টান!
গাঙের কান্দায় বসে মাথাপাগলা গাঙশালিক এইসব শোনে আর শোকায় লেজের পানি; শেখে জেলেদের জালবোনা।
তখন নাইল্যাকাটা শেষে ভূডি দেয় যে কৃষকের দল- চলে যেতে দেখে ইঞ্জিনচালিত নাও।
আর তুমি সান্ধ্যস্বৈরিণী, মেঘেদের কাছ থেকে কিনে খেতে শেখাও রঙিন যৈবন।
ততদিনে পাট পঁচে গেলে উন্মাদ গন্ধেরা অবিরত চিলচক্করে দু’ঠোঁটে তুলে নেয় তেলাকুচা ফল।
এই স্রেফ মাছেদের ঠোঁট লালের কারণ।
কালো বাউশ মাছও জানে এইসব পোষা পাপ আর অঙ্গার কথা। তাই কৃষ্ণাঙ্গ ঠোঁটের দায়ে গানেই চিৎকার করে, অসহ্য অরূপ সুরে ভেঙে দিতে চায় ভাস্কর্য আমার।

১১
সংবিধান

পাখিদের সংবিধান নেই, তবু নীতি কড়াকড়ি
দেখতে এক হলেও
বাবুইয়ের সঙ্গে চড়াইয়ের সঙ্গম নিষিদ্ধ

ভালোবাসাও পাপ

এক খোয়াড়ে থেকেও হাঁস-মুরগির মধ্যে

কোনোদিন মিলন হয় না

চিল ও বাজের সম্পর্ক মোটেও মধুর নয়
এমনকি কাকের বাসায় বাচ্চা ফোটালেও
কোকিল কাকদের অচ্ছুৎই ভাবে

এত কিছুর পরও পাখিসমাজে হয় না মহাযুদ্ধ
মারণাস্ত্রের ইতিহাসও তাদের নেই

সংবিধান আছে বলেই হয়তো আমাদের সংসদে

কোনো পাখি নেই

১২
ডাকাত

নারে দোস্ত, ডাকাতদলের সাথে আমি নেই
মেয়েদের চোখ টিপুনীতেই কাত হয়ে যাই
তোরা বরং আমাকে ব্যাংকে রেখে

চেক নিয়ে যা;

অন্তত কাগজ হয়েই বেঁচে থাকি কিছুদিন

রিকোয়েস্ট করিস না প্লিজ
জানিস তো, গত বছর গরমে পকেটে ছুরি নিয়েই

শীতের পোশাক পরে হেঁটেছি

ডাকাতি! ফুলের দোহাই দোস্ত
বেঁচে থাকলে দেখা হবে সাত-সমুদ্দুর দূরে

পারিস তো পিস্তলটা রেখে যা,
পাশের বাড়ির মেয়েটার আবার

হাতে নিয়ে পিস্তল দেখার শখ!

১৩
পলাতক

আমি তো কেবল ঘাসফুল হয়ে ফুটে আছি

ফড়িং দেখার লোভে

গতবার, আমার চিপসের প্যাকেটে ফড়িং বসেছিল
সমুদ্ররঙের ডানা,
আমি তাকে থাকতে বলেছিলাম সূর্যাস্ত পর্যন্ত

তারপর থেকে ঘাসফুল হয়ে ফুটে আছি

এ-বনে কোনো ফড়িং নেই জেনেও

দ্বিতীয়ত: মাধবীর বড় বোন
আমাকে ফড়িং দেখানোর আশ্বাস দিয়ে
ধানক্ষেতের পাশে নিয়ে জড়িয়ে ধরেছিল
হঠাৎ দেখলাম আমারই ডানা গজিয়েছে
আমিই ফড়িং হয়ে উড়ে যাচ্ছি

ধানফুলের মাঠে

১৪
হারানো বিজ্ঞপ্তি

একটা হত্যার জন্য ঘুষ খেলো দশজন পুলিশ
একজন সেই টাকা থেকে কিনলো

 বাচ্চাদের জন্য চকোলেট

একজন কিনলো মায়ের জায়নামাজের কাপড়
একজন মোবাইলে ফ্লেক্সি করে কথা বলল প্রেমিকার সঙ্গে
একজন কিনলো নিজের বিয়ের কাপড়
স্ত্রীর নামে ব্যাংকে রাখলো একজন
একজন টাকাটা খরচ করলো ইফতার পার্টিতে
একজন জমা দিল মসজিদের ফান্ডে
একজন বন্ধুদের নিয়ে পান করলো সারা রাত
একজন পালন করলো পিতার শ্রাদ্ধ
আর একজন পকেটে টাকাটা নিয়ে হাঁটা দিল সোজা

১৫
হাসির গন্ধ

কোনো কোনো চুম্বন প্রেমিককে ভিখিরি করে দেয়
যারা চুমু খেতে শিখিনি, স্পর্শ করতে শিখিনি প্রজাপতির পাখা,
তারা শুধু জেনেছি চুমুতে দেবতা থাকেন
পথ দেখিয়ে নিয়ে যান ঈশ্বরের বাড়ি
অথচ আমার বন্ধু- যে কিনা একটি চুমুর দায়ে ভিখিরি হয়ে গেল
তাকে দেখে, তার কান্নার নদীতে হেঁটেও আমরা মাতাল হই
পানশালার গ্লাসে ভাসতে দেখি হৃদয়ের অগ্নিরঙা ছবি
তখন কোত্থেকে যেন আমাদের জড়িয়ে ধরে ঝাঁঝাঁর ঘুঙুর
কী কারণে ক্রমাগত আহা, অবাক সৌরভে ডুবে যাই
প্রেমিকার হাসির গন্ধে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাই

১৬
কবিতা

এই যে আমি ঘুমোতে পারছি না, জেগেও থাকতে পারছি না এবং এই যে আমাকে কিছু একটা টানছে- এর নাম!
এটা একটা স্বরচিত মর্গ- এখানে আমি নিজেই নিজের জীবন্ত দেহ কেটে গামলাভর্তি টুকরোগুলোকে দিয়ে দিই গরুদের কাছে।

মানুষের মাংসই গরুর সবচে’ প্রিয় খাদ্য।

এই যে আমাকে ডাকছে, মাঝরাতে আমার শরীরে ব’সে আছে বিবস্ত্র সুন্দর; জব্ধ হতে হতে বলি, এসবের কোনো মানে নেই, আগেও আমি হাঙরের ঠোঁটে চুমু খেয়ে কেড়েছি অসংখ্য সুখ, ঘুমের উরুকেও কামনাসিক্ত করেছি বহুবার!
এরপর কী হয়ে তোমরা সবাই তো জানো- বোকা ছুরিটা এক পোঁচে কেটে ফেলেছে আমার কণ্ঠনালী; সম্ভবত তোমরা যার নাম দিয়েছ কবিতা।

১৭
ভোট

পাখিরা দিয়েছে ভোট, ফুলেরাও দিয়েছে
ঐ যে নদী তারও তো ভোট ছিল; পায়ে পায়ে এসেছিল হেঁটে

ভোট তো হয়েছে ঠিকই, জিতেছেও কেউ
গোপন ব্যালটে ঠিকই কেউ কেউ পেয়েছিল শিশুদের ভোট

এবারের নির্বাচনে ভোট দেয়নি শুধু একজন
সে আমাদের সুতোকাটা পরবাসী ঘুড়ি-ঘুড়ি আমার কাকার নাম

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E