৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ২১২০১৬
 
 ২১/১২/২০১৬  Posted by
গৌরাঙ্গ মোহান্ত

গৌরাঙ্গ মোহান্ত

গৌরাঙ্গ মোহান্তের ৩০টি কবিতা


আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর

আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর জিইয়ে রাখে আগুন ও অঙ্গার। টুকরো ম্যাকেট হতে উবে যায় যৌবনঘাম। প্রমগ্ন স্থাপত্য থেকে খসে পড়ে বিষণ্ণ ব্যালাসট্রেড। আমি অগ্নিমান অন্তর্গৃহে ব্যর্থ মেঘের দ্রবণ ঢালি। মোহনাবিহীন দ্রবণ-অগ্নি বিভাজিত সঞ্চারপথে যেন প্রস্তরময়, গ্যাসীয় গ্রহ। তবে অলাতচক্র দূরস্থ কোয়েজার আর উপস্থ ধূলিপুঞ্জে ফোটায় সমরূপী টংকারধ্বনি। ছায়াশরীর বিমূঢ় চেতনাকে কখনো করে না বিনির্মুক্ত।


অধিগ্রহণকাল

নির্বাক ঝরনাজলে কেঁপে ওঠে আহত স্থলপদ্ম। আমি তার সুনীল শেকড়ের দিকে চেয়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ি। শহরের নিষ্প্রদীপ ধূসরতায় ধান জন্মে না বলে উজ্জ্বল অরণ্যের গন্ধে ডুবে থাকি। বিশুদ্ধ বাতাসে ভাসে হর্নবিলের দুর্বোধ্য ভাষা। সন্ধ্যার স্থিরতায় মিশে থাকে অধিগ্রহণকাল; আমি প্রাগৈতিহাসিক গুহা-দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখি সময়ের সুরঞ্জিত ঝালর। প্রথম জেগে ওঠে পাহাড় – রাতের পাখির চোখে মূর্ত হয় ভূকম্প-বিভীষিকা। কোমল স্থলপদ্ম অস্তায়মান সূর্যের ফিকে আলোয় নিমগ্ন হতে চায়। প্রস্রবণ রেখার রহস্যগতি উন্মোচিত না হলে অন্তঃপুরে সঞ্চিত হয় শ্রাবণমেঘের ধূপছায়া ফটোগ্রাফ!


বৃক্ষবিভাস ও প্রলয়স্বপ্ন

নিদ্রায় বিকৃত হয় বৃক্ষের কা–পত্র-বল্কল। বন্যার অস্থির জলে সাময়িক নিমজ্জনে বিক্ষত হয় বৃক্ষবিভাস। বৃক্ষ জেগে ওঠে – ঘাসে ঢাকা থাকে তার কর্দমাক্ত তলদেশ। দুর্বহ গন্ধ নিয়ে কর্দম নরম থাকে না অনন্তকাল। অগ্নিময় নক্ষত্র বিপন্ন বৃক্ষের বাগভঙ্গি বোঝে। কাদা-গন্ধ বৃক্ষের বোধিময় সত্তায় পাংশু মেঘের পাহাড় গড়ে তোলে। অধিকৃত সূর্য পাহাড় গলাতে পারে না। চন্দনঅরণ্য ঘোচাতে পারে না মেঘের পূতিগন্ধ। পরিযায়ী পাখির সংগীতময় প্রার্থনা বাতাসে নির্মাণ করে স্নিগ্ধতার সাঁকো; বৃক্ষের সাথে তার যোগসূত্র ছিন্ন হয় বারংবার। নিঃসঙ্গ বৃক্ষের শেকড়ে নেই পুনর্ভবী শিহরণ। বৃক্ষের রক্তে নিদ্রার বিষ; বিষে প্রলয়স্বপ্ন – বৃক্ষের শয়ন বেদনাবহ; মৃত্তিকাস্পর্শী কাণ্ড-পল্লব শানাই বাজাতে পারেনা। তাপিত ধুলো নিঃশেষ করে শেকড়-সুরক্ষিত জলকর। আকাশ বৈরী হয়ে ওঠে; রোদ কিংবা বৃষ্টি আনে না বয়ে সন্ত লিখিত সুসমাচার। বৃক্ষের ক্রন্দনবাহী মাধ্যম দূষণগ্রস্ত বলে বিষ্ণ্ণ স্বরগ্রাম আঁকতে পারে না শূন্যতার অবিনাশী অন্ধকার।


তীরধস তাড়িত জল, নির্মলতা

তীরধস তাড়িত জল পরিশ্রুত নয় জেনেও জলকে বলো নির্মল হও। নির্মলতার সর্বাদৃত মানদ- নেই। বিশুদ্ধতা মেনে নেয় সূক্ষ্ম শিলাচূর্ণের প্রেম। শুকনো পাতার তুমুল উড্ডয়ন তোমাকে চিন্তাগ্রস্ত করে। যা সহজে ওড়ে না তারও ঘটে যেতে পারে পক্ষোদ্গম। গণিত চূড়ান্ত বিষয় নয়। চূড়ান্ত বিষয়ের অভিজ্ঞা কোন কালসারণী যোগে অধিগম্য নয়। নদীখাতের ক্রমিক বিবর্তনের সূত্র ধরে উদ্ভাসিত হয় চূড়ান্ত বিষয়ের প্রকরণজ্ঞান। ভবিষ্যৎ কমলারং ভোরের মতো স্পষ্ট নয়। শ্যামলা চাদরে ঢাকা থাকতে পারে কার্পাস কিংবা পড়েনের পরিত্যক্ত সুতো। বায়ুচঞ্চল মসলিনে ঢেকে রাখো বাসমতী সৌরভ; বাতাসের নেই কোন কলঙ্ককালিমা।


মৃত্যুগানের শূন্যতা হতে

পত্রালিক্রন্দন মৃত্যুগানের শূন্যতা হতে ঝরে পড়ে তামাটে পাথরের উত্থানশূন্য বক্ষঃস্থলে। পাথরের ম্লান হাসি জন্মগন্ধ ছুঁয়ে আসে। অস্পষ্ট মাতৃমুখ স্বপ্নের জ্বালামুখ বেয়ে গড়ে তোলে গভীরসমুদ্র তলদেশ। বালিয়াড়ি অন্তরালে রাখে অথই সংলাপের সোনালি কংকাল। জ্যোতির্বলয়তাপে পাথর দৃষ্টি খোলে। বিপন্ন আলোয় জেগে ওঠে কালপেঁচা অন্ধকার। লালাক্লিন্ন রুমাল ঢেকে রাখে জ্যোৎস্নাময় বাতাসের ঝাঁজর। জন্মপূর্ব অস্তিত্বের আহ্বানে কেঁপে ওঠে পাথর ঃ হে অগ্নিনির্ভর পত্রালি, আদি ভস্মমেঘে ভাসাও অনন্তকাল।


খোয়ইজলে ভেসে যাওয়া

দরজা খুলে  দাঁড়াতেই বাতাসে একটানা বাজতে থাকে পার্থিব ঝুমঝুমি। আমি পার্থিব শব্দের সৈকতে হেঁটে হেঁটে পর্বতে প্রতিধ্বনিত অর্ফিয়াসের গান শুনি। অথচ ঝুমঝুমির শব্দ দুঃসহ কেনো? যারা ঝুমঝুমি বাজায় তারা কি বৃন্দবাদনের দেয় নি মহড়া? দরজা বন্ধ করে সিডরতাড়িত হরিণের মতো পড়ে থাকি, নিশ্চুপ, আপাত চেতানহীন। দেয়ালঘড়িতে প্রতিশব্দিত হৃৎপিণ্ড অস্পৃশ্য তারাবাতির মতো জ¦লে ওঠে। সিলিংকেন্দ্রে চুনকামের আলোছায়া নির্মাণ করে রবীন্দ্রস্কেচ। আমি কাজুও আজুমার মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকি, নির্নিমেষ। রবীন্দ্রনাথের বেদনার গানে আমার ঘর ও পৃথিবী খোয়াইজলে পদ্ম-পাঁপড়ির মতো ভেসে যেতে থাকে।


ঢিবি

মার পাশে বিক্ষত শিউলি দাঁড়িয়ে থাকতো এক বিষণ্ণ প্রহরী; কলাপাতা সূর্যকরোজ্জ্বল দিনে নাড়- বানাতে বানাতে জাগিয়ে তুলতো মার শিউলি শ্বাসের প্রতিধ্বনি। জামছায়ায় নৃত্যপর ছিলো পুবের পদ্মপুকুর। জল শুকিয়ে গেলে পুকুরের করুণাময় মাটি দিয়ে সেরে তোলা হতো বর্ষাগ্রস্ত উঠোনের নালিঘা। আমি বোনকে নিয়ে গড়ে তুলতাম মার জন্য অতুঙ্গ, মৃন্ময় ঢিবি। এভাবে মা, মাটি, ফুল ও বৃক্ষ আমাদের চেতনার সুগুপ্ত দ্বীপে রচনা করে শুভ্র সৌধ। ঢিবিময় বাড়ি ছেড়ে আমাদের পেরিয়ে যেতে হয় অগ্নিমান সীমানা; শরণার্থী দৃষ্টি বারংবার সিক্ত হয় মার শিউলি সৌরভে। শিউলি ও কলাগাছের কুলোচ্ছেদের চেয়ে মৃন্ময় ঢিবির অবলোপন আশঙ্কায় আমি থাকতাম উ্দ্ভ্রান্ত বিধ্বস্ত স্বদেশে ফিরে দেখি প্রাণময় পুষ্প-পত্র-ঢিবি যুদ্ধস্রোতে গেছে ভেসে। পুরনো কাঁথার সেলাই কেটে মার শ্যামল শাড়ির কমনীয় টুকরো সযত্নে রেখেছিলাম তক্তপোষের উষ্ণ কন্দরে। লুটেরার নাপাক থাবায় আমাদের আসবাবপত্র চিরতরে হয়েছে দৃশ্যাতীত; এক খ- ন্যাকড়াও পড়ে থাকে নি বাস্তুভিটায়। দেশের জন্য দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের রক্তবীজাঙ্কুুর ধারণ করি নিরাতঙ্ক জিহ্বায়। ছাত্রাবস্থায় ফুলপ্যান্টের ব্যয় মেটাতে মার নামাঙ্কিত সুবর্ণ-লকেট সেকরার হাতে তুলে দিয়ে নির্জনতাকে করেছি লোনাক্ত। মার স্পর্শদীপ্ত শেষ চিহ্ন হারিয়ে এখন উঠোনের দিকে চেয়ে থাকি; মা যেখানে শিউলি ফুলে ডুবে থাকতেন সেই পবিত্র বেদির কাছে আমিও ডুবে থাকি অদৃশ্য জলের উষ্ণ ধারায়। এ মাটিতে শুয়ে যেনো আমিও একদিন কলাপাতার সবুজ স্নেহে শীতল হয়ে উঠি।


আগুনের পলাশ মুদ্রা ও স্বদেশ

নৃশংস বুলেটের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে আমরা সন্তর্পণে গ্রামের অন্ধকার পথে বেরিয়ে পড়ি। গরুর গাড়ির ছই ঢেকে রাখে গ্রামের স্বপ্নোজ্জ্বল শেষ প্রদীপের শিহরণ। আমার ভয়ার্ত চোখের গভীরে ভেসে ওঠে মৃত্তিঙ্গা গ্রামের গৃহদাহ-বিভীষিকা: টিন-কাঠ-বাঁশ-খড়ের বাড়িগুলো শুধু নয়, আম-কাঁঠাল-নিম-নিসিন্দার মতো স্থানু বন্ধুরাও অগ্নি-কুণ্ডলে বন্দি ─ বাস্তুভিটার ভস্ম ফুঁড়ে জেগে ওঠা টেরাকোটাবর্ণ মৃৎচুলা দেখে চিনে নেয়া যায় রান্নাঘরের অবস্থান। আগুনের পলাশ মুদ্রায় কিছু সুউচ্চ সুপারি বিক্ষত, বিবর্ণ। পশ্চিমাকাশে রক্তজবা বিকিরণে উৎকণ্ঠিত সত্তা কাঁকরগাড়ি বিলের সান্ধ্য নির্জনতায় বিমূঢ়, স্তব্ধ।

নদী পেরিয়ে আমাদের যেতে হবে শুশ্রুষাময় সীমান্তে নৌকোর নিশ্চিন্ত অন্ধকারে ঢেকে উদ্বাস্তুসেবক আমাদের নিয়ে যায় অবারিত ঘাটে। চলৎশক্তিহীন, ন্যুব্জ সহযাত্রীর বিপন্নতা বুকে বিঁধিয়ে দেয় সুতীব্র তীর। শরণার্থীশিবিরে আশ্রিত না হওয়া অব্দি অগণিত মানুষ সীমান্তের উন্মুক্ত হেঁসেলে চাল ফুটিয়ে খায়, গো-মোষ সাথে নিয়ে অসংবৃত রাত কাটায়।

রাজবাড়ি ক্যাম্পে তাঁবুবাসী হয়ে বাবা আর্ত জনতার পাশে দাঁড়ান আর আমরা গ্রাম্য বাড়ির স্যাঁতসেঁতে উঠোনে নির্মিত একচালায় সংকুচিত হয়ে থাকি। ধানখেত, পাটখেতের আল ধরে আমি বিলের জলে খলসে মাছের উজ্জ্বল ডুবসাঁতার দেখি, খয়ের বনে হরিয়ালের প্রসন্ন উড়ালে বিমোহিত হই আর ভাবি, জীবন হয়তো থেকে যাবে আলোশূন্য অন্ধকারে। বাবা, জীবন বাজি রেখে যুদ্ধের ভেতর যখন স্বভূমির গন্ধ আর জরুরি খবর নেবার জন্য নিরুদ্দেশ হতেন তখন আমাদের কাটতো বিমর্ষকাল।

আমরা রেশনের চাল-ডাল-তেল-লাকড়ি নেবার জন্য পাকা রাস্তার পাশে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম আর ট্রাক-ভর্তি মিত্রসেনা ও মুক্তিফৌজের দৃপ্ত মুখাবয়ব লক্ষ্য করে বিশ্বাস করতাম অচিরেই অন্ধকার যাবে কেটে।

আমরা ফিরে আসবো বলে আমাদের পুকুর ভরে ওঠে শিং আর মাগুরে; উঠোন ছেয়ে যায় শিমের সবুজ মমতায়। আমরা যেদিন ফিরে আসি ‘পাকড়া’ বাবার পায়ে পড়ে অনেক্ষণ হাউহাউ করে কেঁদেছিল। আমাদের পোষা কুকুর ‘পাকড়া’ বাস্তুভিটায় আগাছার অনভিপ্রেত রাজত্ব দেখেও হয়তো হতাশ হয় নি। স্বদেশে পোষা কুকুরের হৃদয়ের মহত্ত্ব দিয়ে আমাদের আর কেউ স্বাগত জানায়নি।


আত্মবিভক্তি

উজ্জ্বল হরিণীর পেছনে ছুটতে ছুটতে নিজেকে বিভক্ত করে ফেলি। আমার বিচ্ছিন্ন সত্তার স্নায়ুতে জমে জীবনান্তক বিষ। আমি বয়োবৃদ্ধ এন্তাজ ওঝার গ্রাম্য শুশ্রুষাগারে ছুটে যাই। আমার জর্জরিত শরীর থেকে এক মুঠো ঢেঁকিপাতায় তিনি তুলে আনেন স্নায়ুবিষ। গাঢ় সবুজ ঢেঁকিপাতা ছাইবর্ণ হয়ে ওঠে। গভীর রাতে কখনো কখনো আমি অদ্বিতীয় হয়ে উঠি। আমার অন্তরিন্দ্রিয় থেকে তখন ঝরতে থাকে সৌর কিরণ; বস্তুরাশির খোলস ভেদ করে তা স্বরূপের সারল্য ঝলকিত করে তোলে। বিবর্ণ ঢেঁকিপাতা আর প্রতারণার দহন মুহূর্তে সমার্থক পদে উন্নীত হয়।

১০
অসম মেঘসীমার ওপর

অসম মেঘসীমার ওপর দিয়ে ছুটে চলি এবং সমস্ত চেতনায় ধারণ করি শংকা ও শিহরণ। আঁকাবাঁকা রেখার অনেক নিচে পড়ে থাকে নদীর নিথর শরীর। নদীর প্রার্থনা ভেসে আসে গাঢ় নীল শূন্যতার অসীমতায়। এখানে দিগন্ত জুড়ে মেঘের ভাসমানতা। আলোকিত শুভ্র মেঘের ফাঁকে ফাঁকে জেগে ওঠে ক্রন্দিত মুখ। সূর্য উজ্জ্বল করে রাখে ভূ-পৃষ্ঠের সজীব মানচিত্র। নামহীন নদী, অরণ্য কিংবা ভূ-অঞ্চলের চপলতা ক্ষীয়মাণ মনে হয়। ভূ-খণ্ডের কোথায় ধান, কোথায় গম উৎপাদিত হয় তা দৃশ্যমান নয়। ধাবমান গৃহে ভাত আর জলের সুলভতা আমাকে বিহ্বল করে। আমি আলোর উৎস মহাশূন্যের দিকে তাকাই; অত:পর ভাতের উৎস ভূ-মণ্ডলের দিকে দৃষ্টিপাত করি। অদৃশ্য কৃষকের ক্রন্দন আর্দ্রতর করে শূন্যতার নীলিম বক্ষ। মহাশূন্যে স্পষ্ট হয়ে পড়ে জীবন ও শূন্যতার সম্পর্ক। শূন্যতাও ফিরে যেতে চায় জীবনের কাছে। শূন্যতা জীবন ছাড়া পূর্ণ হয় না। মেঘ গড়িয়ে পড়ে বৃক্ষপত্রে, অসীম নীলতা মিশে যায় সাগরের জলে। শূন্যতাকে অর্থময় করা হলে শস্যদানা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

১১
স্রোতফেনাময়তা

ঝলসিত সিয়েনার রঙে ছোপানো জাগ্রত জীবন বিষণ্ণতার শস্যভূমি। নিশ্চুপ থাকি, অনন্ত স্রোতোফেনা উজানপথে ফিরে মহাকালের অদৃশ্য গৃৃহে আশ্রয় খোঁজে। আমি সমস্ত জানালা খুলে ম্লান আকাশের দিকে  চেয়ে থাকি। ধূসর পাখির গান অরণ্যের সবুজ আভায় মেশাতে থাকে বেপথু জলের প্রস্রবণ। আমার আকুল কণ্ঠে উচ্চারিত হয় গান থামাবার গূঢ় শব্দাবলি; মুহূর্তে পাখি অদৃশ্য হয়ে যায়। দিগন্ত জুড়ে বিস্তৃত যে অরণ্য মগ্নতার তরঙ্গ বইয়ে দেয়  তা-ও নিমেষে হয়ে পড়ে দৃশ্যাতীত। সজোরে কে যেনো বন্ধ করে রাখে আমার সকল জানালা। আমি আপন অন্ধকারে বসে সমুজ্জ্বল স্ফটিকের উষ্ণতা নিতে থাকি।

১২
জলকথা

কিছু জল কখনো শুকোয় না।  কিছু কথা কখনো হয় না অস্পষ্ট। একটি বা দুটি মৃত্যুর সাথে হয়তো সেগুলোর অবসান ঘটে। জল, কথা কিংবা দৃশ্য জীবনকে দুর্বহ করে তোলে। জলসূত্র শাশ্বত বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের পরিপন্থী হলে তা নিয়ে আলোচনা করা যায় না। যে কথা আমি শুনি, আত্মজন শোনে না, তা নিয়ে নিশ্চুপ থাকতে হয়। যে দৃশ্য আমি দেখি, কেউ চাক্ষুষ করে না, তা নিয়ে মুখর হওয়া যায় না। ব্যক্তিগত জলে যখন জলোচ্ছ্বাস ঘটে তখন ত্রাণ অকার্যকর হয়ে পড়ে। অবিনাশী কথা যখন বজ্রের শক্তি ধারণ করে তখন পৃথিবীতে কোনো নি:শব্দ গুহার অস্তিত্ব থাকে না। দৃশ্যপট যখন উত্তাল তরঙ্গে ভেসে যেতে থাকে তখন রাতের প্রভাব থেকে নিদ্রা মুক্ত হয়ে ওঠে। গহন জীবন ক্রমাগত বাহিত হয় অনির্দেশ্য ভবিষ্যতের দিকে।

১৩
শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ

শূন্যতা কেবিন ক্রুর কৃত্রিম উজ্জ্বলতায় কেঁপে ওঠে। আমার কম্পিত দৃষ্টি বিরামপুরের স্ফীত পথে প্রসারিত হলে তুমি মুহূর্তেই চীনের বসন্ত ফুলের উচ্ছলতা নিয়ে আবির্ভূত হও। আমরা বাতাসে অঙ্গীকার, প্রতারণা ও ভবিতব্যমূলক সাংকেতিক পালক ছড়াতে থাকি। প্রার্থনা আমাদের সংবেদনা থেকে আলো ঝরাতে থাকে। পরিপার্শ্ব দুর্লভ পালকের বিচলনে প্রতপ্ত হয়ে ওঠে এবং নদীর উন্মন ধ্বনি অদৃশ্য ময়ূর পাখার ভেতর ঢুকে যেতে থাকে। প্রতারণাদগ্ধ মেঘের হাহাকার আমাদের অগভীর চুলে দুর্বহ কোরাসের প্রতিধ্বনি তোলে। ইথারাশ্রিত অঙ্গীকার বার্ডস নেস্ট সন্নিহিত বৃক্ষখুঁটির অসম্ভব সামর্থ দিয়ে আমাদের দাঁড় করিয়ে রাখে। আমরা মহাপ্রাচীরের ওপর দিয়ে ভবিতব্যের অস্পষ্ট বাতিঘরের দিকে তাকিয়ে থাকি। দ্রুতগতি ঘোড়ার জিনে চেপে আমরা ছ হাজার মাইল পরিভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি। খর্বাকৃতি প্রহরীর অগ্নিময় কুঠার আর বল্লমে আমাদের ঘ্রাণময় সত্তা ঝলসে উঠতে থাকে। আমরা পাহাড়ের বসন্তের ভেতর, উপত্যকার শীতল হাওয়ার ভেতর হারিয়ে যেতে যেতে রোদের শুশ্রুষা গ্রহণ করি। অনন্তর দুর্বোধ্য সুরঙ্গপথে এগিয়ে আমরা শিশুদের হাতে আলোকময় ভূগোল তুলে দেই আর অনন্ত অন্ধকারে অন্তর্লীন বাতাস বিসর্জনে প্রস্তুতি নিতে থাকি।

১৪
মেঘের প্রাচীর ও নৈ:শব্দ্যের বাদামি ফুল

বাতাস থেমে যাবার পর নেমে আসে অনন্ত জলধারা। সীমান্তে জলের বেদনা গড়ে তোলে বজ্রহীন মেঘের প্রাচীর। নৈ:শব্দ্যের বাদামি ফুলে ভরে থাকে প্রাচীরের আলোছায়া। ফুলের সংকেতগভীর গন্ধে মত্ত বাউল পেরিয়ে যেতে চায় জলময় দেয়াল। জলের চুম্বকে যোজিত হয় চাঁদবরন খঞ্জরি। মুহূর্তে বিষণ্ণ প্রাচীর ব্রাত্য গমকের সোনালু ঝর্নায় বিভাসিত হয়ে ওঠে। প্রাচীরের ওপারে পরিযায়ী ওমে আচ্ছন্ন থাকে কি সহৃদয় আকাশ? সেখানে সোনালি ঘুড়ির গানে চঞ্চল হয়ে ওঠে বিকেলের মেঘ? বাতাস থেমে যাবার পর নেমে আসে শুধু অনন্ত জলধারা।

১৫
নৈ:শব্দ্যে সবুজ ঘুঘু

অনাগত দৃশ্যের ভেতর সবুজ ঘুঘু নৈ:শব্দ্যের দিব্যরথে ঘাসের ছায়ানিবিড় খোপরে ফিরে আসে। পালক থেকে তার ঝরে পড়ে ঘুমন্ত শব্দবীজ। মগ্ন ঘুঘু নিদ্রাকালের প্রসার পরিমাপ করে এবং চোখে মাখে শব্দের খোয়াবশিশির। দূর অরণ্যের মাদল হাওয়া ভেসে এলে শব্দের খোলস ভাঙতে থাকে; অলৌকিক শিসে উদ্দাম হয়ে ওঠে মুথোদের উদ্বাহু শরীর। উৎসবরেখা ধরে অরণ্যে ফিরে যায় সমুজ্জ্বল, সবুজ ঘুঘু।

১৬
আকাশ ও বেদনার হরফ

বেরিয়ে আসার জন্য প্রযত্ন প্রয়োজন। ইচ্ছে হলেই আকাশ দেখা যায় না। পেরোবার পথ থাকে না মসৃণ। কাঁটাগাছে পূর্ণ থাকে পথের দু ধার। পথের বন্ধুরতা ও কাঁটাগাছের অস্তিত্বের মধ্যে রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। অজ্ঞাত পরিকল্পনার প্রভাময় সঙ্কেতে প্রণীত হয় যাত্রা-সম্ভাব্যতার সূত্র। পা বাড়ালেই রক্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে কাঁটার জ্যোৎস্নাময় বিষ। আকাশ না দেখলে ক্ষতি নেই। আকাশ সকলের জন্য দর্শনীয় নয়। বৃত্তকে টুকরো করে, পাথুরে দেয়ালকে ভেঙে ফেলে আকাশ দেখার মধ্যে উত্তেজনা ও আনন্দ রয়েছে। আনন্দ যখন উপভোগ্য হয়ে ওঠে তখন বিভোরতা গভীরতর হয়। কণ্ঠের বদলে দৃষ্টি রূপান্তরিত হয় ভাষা ও বেদনার গোপীযন্ত্রে। অব্যক্ত ভাষা ও বেদনার বিভাসিত হরফ আকাশ থেকে নেমে আসে। আকাশকে কেউ কেউ উপেক্ষা করতে পারে না। জ্যোতির্বিদ্যাময় আকাশের জ্ঞান সাধারণ নয়, ব্যক্তিগত। আকাশ উন্মোচন করে দর্শকের প্রয়াস ও প্রাপ্তির দূরতা এবং জীবনের অপ্রচারিত সত্য।

১৭
হুইসেল-কর্কের অনির্দেশ্য ঘূর্ণন

বর্গক্ষেত্রের ঊর্ধ্ব-অধোভাগ, ডান-বাম পার্শ্বস্থল এবং চার কর্ণের ক্রমবর্ধমান জ্যামিতিক প্রতিবেশে হুইসেল-কর্কের অনির্দেশ্য ঘূর্ণনের ভেতর জেগে থাকি। বিস্ময়কর বাতাস থেমে গেলে অথবা কর্ক বিনষ্ট হলে হুইসেল অকার্যকর হয়ে পড়ে। কর্কের ঘূর্ণনের সাথে যে সুর উত্থিত হয় তার ধ্রুপদায়ন দু:সাধ্য জেনেও আমি সময়ের সোনালি দানা ছিটিয়ে দিই। কিন্তু কর্কের বস্তুশক্তি কিংবা হুইসেলের যৌগ মিশ্রণ এবং বায়ুপ্রবাহগত ক্রটির জন্য আমার প্রয়াস সার্থক হয় না।

১৮
বৃক্ষ ও সাগরস্বপ্ন

মহত্তম বৃক্ষের ছায়ায় কাটে আমার নির্জনতম কাল। কমলা বল্কলের প্রান্ত থেকে যখন ঝরে বেগুনি রশ্মি তখন উদ্ভাসিত ধুলোয় দাঁড়িয়ে আমি কাঁপতে থাকি। অদূর পথ, আলচিহ্নিত খেত, হোগলাকীর্ণ জলাশয় বার্তাবহ হয়ে ওঠে। বৃক্ষপত্রের প্রতারণাশূন্য শিহরণ পানডুবির বক্ষে জাগায় ব্রহ্মপুত্রের স্বচ্ছতম ঢেউ। জলের ভেতর ভিন্ন জলধারায় যে বৃক্ষছায়া মিশে থাকে নিরন্তর শোনে সে সাগরের অজর ধ্বনি। আমি বৃক্ষের নিচে মুদ্রিত চোখের গভীরে ধারণ করি শুদ্ধতম সাগরস্বপ্ন।

১৯
আনডিনের আঙুল

মৃত্যুকে যে অস্তিত্ব ডিঙিয়ে যায় তার নীলাভ তরঙ্গে ডুবে থাকি। তরঙ্গে ভেসে আসে যাত্রাকালের সংকটভাবনা, অনিদ্র প্রহর, রবীন্দ্র প্রশ্রয় ও আকুল ধ্বনির অনন্ততা। আমি এদের আঁকড়ে ধরি, অজলচর বলে থেকে থেকে নাসারন্ধ্রে টেনে নিই ধুলো ─ সিসার ঢাকাই চূর্ণ। আমার অদৃশ্য কম্পনের ভেতর ফুটতে থাকে নিশিপদ্ম ─ তার অশান্ত কেন্দ্রে জমে ভাঙনফেনার ঘোলাটে নির্যাস। তরঙ্গের চন্দ্রকোষে জেগে ওঠে আনডিনের উজ্জ্বল আঙুল ─   তার পদ্মকোষ মুদ্রা নিশ্চিত করে জলকুসুমের পুনর্বাসন।

২০
অন্ধকার ও স্বপ্নহীন বাতাসের ফ্লেয়ার্ড বেল

অন্ধকারে দূরবর্তী বাতি আর আধা-কালো আকাশের নক্ষত্র ছাড়া দ্রষ্টব্য কিছু নেই। নিরালোক গ্রামের পথে যখন হাঁটি বৃক্ষ-লতা-ডোবার গন্ধে ভেসে আসে অতীত; দৃশ্যমান ক্রেভ্যাসের মুখে রূপালি মই জুড়ে অতীত নিয়ে যায় হিম ভবিষ্যতে। দহনঅভিজ্ঞতা থেকে ধারণা জন্মেছিল, জীবন রক্তাক্ত বা রক্তপাতহীন আঘাতের সহজ শিকার। গন্দমঋতুর রূপমাধুর্য দেখে বুঝেছি জীবন একমাত্র বেদনার শস্যক্ষেত্র নয়। অভূতপূর্ব প্রাপ্তি মুছে দিতে পারে শুকনো ক্ষতের পাংশু মোহর। সিদ্ধিকুম্ভ ক্ষয়িত প্রত্নশানের সন্তাপে হতে পারে শিহরিত; তবে অন্তর্গূঢ় অস্তিত্ব থেকে নি:সারিত হয় নিষ্ফলতার বোধ। অন্ধকারে মাটির হিমপ্রবণতা বৃদ্ধি পায় এবং চূর্ণিত শিলার ভেতর সংকেতময় হয়ে ওঠে স্বপ্নহীন বাতাসের ফ্লেয়ার্ড বেল।

২১
পানকৌড়িবোধ

পানকৌড়িবোধ নিয়ে নিমজ্জিত থাকি; একটি মাছের উজ্জ্বলতার পাশে দেখি জলজ রাজ্যপাট। দেখার জন্য নিমজ্জনকে অত্যাবশ্যক ভাবি। মৎস্যমগ্নতা প্রতিনিয়ত ঘটায় শ্বাসপ্রকৃতির রূপান্তর। উজ্জ্বল মাছের ব্যক্তিগত আয়নায় প্রতিফলিত হয় পানকৌড়ি চিহ্নিত পথ। পানকৌড়ির সাথে মাছের অতিপ্রাকৃতিক যোগ প্রস্তুত করে গভীর রং। এ রং মৃত্যুপূর্ব প্রসারতার জন্য জরুরি। আমার কৃষ্ণতা পানকৌড়ির ঐশ্বর্যে রঞ্জিত। আমার প্রার্থনার ভেতর মাছের অলৌকিক পুচ্ছের অবিকল্প বিকিরণ।

২২
সংখ্যাপদ্ম

আমার অর্জিত সংখ্যার ভেতর মেঘযাত্রা। নীল জুড়ে বিস্তৃত সংখ্যাগুলোর কাছে নিরাকার বাতাসের আনাগোনা। বর্ণময় মেঘ পথরেখায় রেখে যায় সজল সাক্ষ্য।  মেঘ আছে বলেই অন্তর্গত ড্যাসবোর্ডে তুমি দেখে নিতে পারো সচিত্র যাত্রাজ্যামিতি। সংখ্যাচরিত্র মনস্তাত্বিক, কোথাও এদের সম্পূর্ণ প্রতিফলন নেই; না শিশিরে, না অপরাজিতায়। বুদ্ধধ্যানের ভেতর ফোটে সংখ্যাপদ্ম। প্রতিটি পদ্মের বর্ণ ও বিকাশকালের বৈভিন্ন্য শ্রম, প্রতীক্ষা ও বেদনাকে জাগ্রত করে। আনন্দ অপ্রকাশ্য বেদনায় রূপান্তরিত হয় বলে সংখ্যাবর্ণ বিচিত্র – এ রহস্য তোমার অজানা নয়। বস্তুত প্রতিটি সংখ্যা যৌথ ফল; একমাত্র সহযোগী তোমার ধ্যানদীপ্তি। এ কথা জেনে গেছি, আমাদের মৃত্যুর সাথে সংখ্যাতত্ত্বের অবসান নিশ্চিত, প্রজন্মান্তরে তা প্রচারিত হবার কোনো সুযোগ নেই।

২৩
মাছের সৌন্দর্যছায়া

ইভাসকুলার লেক থেকে মাছ উঠে আসবে বলে আমি হিমার্ত প্রভাত থেকে বসে থাকি ধবল বার্চের নিচে। কাদার গহন আশ্রয় থেকে শরীর ভাসাতে সময় লাগবে জেনে আমি বনের দীর্ঘতার দিকে দৃষ্টি ফেরাই – বসন্তের অবসন্নতার ভেতর কুয়াশা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সূর্য লজ্জিত; কুহকী আঁধারে ডুবে আছে বন। আমাকে ভিজিয়ে যায় অতি শীতল সাহসী বৃষ্টি। উঁচু বৃক্ষরাজির দুর্বল শাখা শীতফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। অবিস্তীর্ণ পার্ক ও পাহাড় পথে যুবক-যুবতীরা নেমে পড়ে –  লেকের গভীরে ঘন্টা বেজে ওঠে। মাছেরা জলবক্ষে সাঁতার দিয়ে যায়। আমি অজস্র মাছের ভেতর অনন্ত সৌন্দর্যের ছায়া দেখি; রক্তের উজ্জ্বলতার জন্য ছায়াকে জরুরি বলে চিনি।

২৪
কার্ল প্লেস পার্ক

আমার শূন্য অন্ধাকারে তুমি ফিরে আসো, অর্থাৎ তোমাকে টেনে আনি। প্রলম্বিত অন্ধকারে মেঘকণা আয়না হয়ে ওঠে। আমার জন্যে নেমে আসা নক্ষত্রআলো তোমাকে প্রতিফলিত করে – আশ্চর্য  গতিময় প্রতিফলন খুলে দেয় সমস্ত দরজা। আমি সিঁড়ি বেয়ে নেমে পড়ি কার্ল প্লেস পার্কে। সবুজ লতায় বাঙ্ময় হয়ে ওঠে নক্ষত্রফুল; কর্তিত ঘাসের শরীর শোনায় নবজন্ম উপাখ্যান। অলৌকিক গন্ধে কেঁপে উঠে পার্ক, বাতাস, বসবার কাঠবেঞ্চ। আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রার্থিত ফলের দীপ্তি। আমার সমস্ত কোষে তখন গন্ধদীপ্তির অদৃশ্য আলোড়ন।

২৫
অন্ধকার ও ট্রোগনের গান

আবির্ভাবের চেয়ে প্রস্থান নিশ্চিত – এ ঘোষণা পানকৌড়ির অন্ধকার পাখায় প্রতিধ্বনিত হয় বারংবার। চঞ্চল বাতাসের রংধনুগতি কে চিরকাল দেখে থাকে? কৃষ্ণচূড়ার হলুদ পাতার বিষণ্ণ বৃষ্টি যখন অতিথিভবনের প্রাঙ্গনে নেমে আসে, ট্রোগন গেয়ে ওঠে মেঘরং শূন্যতার গান। স্মৃতির সূক্ষ্ম আধার একদিন বাতাসে থাকবে ভেসে। কোনো নিভৃত গৃহে নয়, গৃহহীন অনন্ত শূন্যতার মাঝে শোনা যাবে ক্রন্দন ধ্বনি, দৃশ্যমান হবে অশ্রুজল! পৃথিবী কি বৈপরীত্যের আধার? জীবন-সূর্য ও মৃত্যু-তুষার নির্বিরোধ কি? আনন্দ আছে বলে কি অশ্রুপাত? নির্লিপ্ত যিনি তাকে কেনো কাঁদতে হয়? মৃত্যুপ্রবণ মানুষের সংরাগী হওয়া সাজে না; আত্মায় জাগিয়ে রাখতে হয় বিনাশ ও আর্তনাদের আইলাস্ফীতি। জীবিতের জন্য জীবন এবং মৃত্যু – দু-ই মনোভারের কারণ। আমার জানালার পাশে সবুজ কাঁঠালপাতা একদিন ভুলে যাবে নৃত্যের সরল মুদ্রা; দুপুরে ঘুঘুর মায়াময় সরবতা মিশে যাবে দেয়ালের শেওলা নির্জনতায়, ধূসর আকাশের নিশ্বাস ছুঁয়ে ক্লান্ত বলাকা ফিরে আসবে না বৎসলা বাঁশবনে। সেদিন কোনো সুদীপ্ত শকট ফিরে আসে যদি, নিভৃত গৃহের বিবর্ণ অঙ্গন হতে নিয়ে যাবে এক বুক তুষারগ্রস্ত রিক্ত বাতাস! পরিপক্কতার কাল স্বল্পায়ু ও অবর্ধিষ্ণু। প্রস্থানবিন্দু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হবার আগে কালকরবীর অনন্য আভায় পথরেখা চিনে নেয়া জরুরি। আমি জেনেছি, পথের ধুলো দুর্মূল্য জাফরান-রেণু। জয়নুলের চশমা হতে আজও ঝরে পড়ে অদৃশ্য ঝোরার হাহাকার। যমুনাবক্ষের ভেজা বালুর মূল্যহীন সরসতা নিয়ে তরঙ্গিত হই; কালজ্ঞ ভাটির চিমনি কখনো হরিদ্রাভ খামে ভস্মগন্ধি বার্তা পাঠায় – আমি কালের অন্তস্থ সঙ্গীতে নিমগ্ন হতে থাকি। সোনালু পাতায় মোড়ানো পিঁপড়ের পেলব আবাসে করি বাস। দিগন্তচারী ধূসর ঈগল একদিন ঠুকরে খাবে আমার স্বাদু শরীর; আমি সে দৃশ্য দেখবো শুধু, ব্যাখ্যার পাবো না সময়। কালের দিকে করি করুণ নেত্রপাত। পাথুরে মূর্তির নিস্পন্দ চোখ, বাক্যহীন ওষ্ঠাধর, হৃৎপি-হীন শীতল অবস্থা হতে পারে অনুভবময়। স্পর্শানুভূতিহীন জীবন কি মৃত্যুর সমান? উৎস ও অনিবার্যতার মধ্যকালে সংবেদনার প্রাকৃত রূপায়ন মানুষের শ্রেষ্ঠ কীর্তি। প্রাপ্তি চেতনাবাউলকে পূর্ণতার চেয়ে শূন্যতার দিকেই নিয়ত করে চালনা। শূন্যতা ত্বরান্বিত করে মহাশূন্য মৃত্যুর প্রস্তুতি। অন্ধকার মৃত্যুর ধ্বনি তোলে; আলোয় জাগে তার প্রতিধ্বনি।

২৬
অর্কিড ও অন্তর্গত দৃশ্য

প্রেম ও মৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়ে আছি। ক্ষুদ্র জানালা দিয়ে দেখা যায় কেবল রোদদীপ্ত মেঘের মহড়া। সাদা মেঘের নিচে নীলের আলপনা তুলে আনে যমুনাকে। যমুনার মাঝে দাঁড়িয়ে মেঘের মধ্যে নদীর প্রতিভাস লক্ষ্য করি নি। মেঘের পাশে দাঁড়িয়ে নদীস্রোতে ভেসে যাই। আমি ভেসে যাই অদৃশ্য হাত ধরে। ভেসে গেলে মৃত্যুর কথা মনে আসে কেনো? ক্রাউন প্লাাজার নির্জন কক্ষে বসে একা থাকতে পারি নি আজ সকাল বেলা। বিশাল আয়নায় বিন্যস্ত অর্কিডের  মাঝে প্রতিফলিত ছিলো অন্তর্গত দৃশ্য। দৃশ্যের ভেতরে ঢুকে, থেকে থেকে দেখেছি সূর্য-বিনাশের ছবি। বাস্তবতার সংকেতময় ভূমিকায় বিস্মিত হয়ে পড়ি। যন্ত্রের সহযোগী হয়ে ভুলে যাই ফুলজোড় নদীর নাম; যন্ত্রশব্দে কান রুদ্ধ হয়ে এলে গভীরবর্ণ জারবেরা অক্ষয় দেয়ালে লিখে রাখে উজ্জ্বল হাহাকার।

২৭
মেঘের মেটামরফসিস

মেঘচূড়ায় সূর্যের শুভ্রতা পৃথিবীর একটি প্রান্তকে আলোড়িত করে তুলছে। গতিময় বাহন থেকে আমি আপাত তাপহীন দৃশ্যের ভেতর তোমার অস্তিত্ব অনুভব করছি। গোলকার্ধের বিশ্রান্ত পথে তুমি আচ্ছন্ন অতীতের করবীরসে রক্তিম করে তুলছো করতল। হাতের অবিনাশী আভা মেঘের বিচিত্র স্থাপত্যে ক্রমশ ছড়িয়ে দিচ্ছে গভীর প্রলেপ। মেঘের মেটামরফসিস অন্তর্গত তুলোর ভেতর রচনা করছে শ্রেষ্ঠ প্রহর। দীপ্ত সুতো থেকে ঝরে পড়ছে তরল গা›ধার। সাঙ্গীতিক তরলতা হাতের রঙ বিষয়ক অনুচিন্তনকে পৃথিবীর সমস্ত  উপাদান থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছে। মেঘ আমাকে নির্জন করে রাখে।

২৮
ডায়মন্ড ব্লেড

ব্যথাতুর মৃণালে জেগে আছে স্নো-পদ্ম। ভাইবারে ভেসে ওঠা শুভ্র দ্রাঘিমা ক্রমশ উন্মোচন করে ইলেকট্রন-অঙ্কিত ত্রিভুজতত্ত্ব। বহির্ফ্ল্যাটে ডায়মন্ড ব্লেড কেটে চলে স্বপ্নবর্ণ টাইলস। ঝনঝনায়মান আকাশের শীর্ষে ওড়ে পদধ্বনিময় রুমাল। চেতন-অবচেতনকে কাঙ্ক্ষিত ব্লকে কেটে জন্মগন্ধময় মৃত্তিকায় খাড়া করবার চেষ্টায় থাকি নিয়োজিত। অনুচ্চ ভবনের পাশে পড়ে থাকে শুকনো, পচা, তাজা রক্ত। রক্তসাক্ষ্য স্বীকার করে না ম্লানতা; ধুলোকণায় রেখে যায় মিহি উজ্জ্বলতা, বাতাসে সতেজ স্নো-স্বপ্ন।

২৯
পাখিসত্তার ক্রন্দন

পাখিসত্তার ক্রন্দন নিয়ে জেগে থাকি। ওয়েস্টবেরির গৃহদৃশ্য থরথরিয়ে ওঠে, অনতিদূর পার্ক থেকে ভেসে আসে নিশ্বাসের উত্তাপ। বাস্তবতা দৃশ্যকে প্রসারিত করে; কিছু দৃশ্য অধিবিদ্যক অর্বিট রচনা করে – সেখানে পাখিসত্তা ঘুরে চলে, ডানাকেন্দ্রে কম্পন জাগিয়ে রাখে, গভীর চুমুকে তুলে নেয় অনিঃশেষ স্মুদি। তার চোখের ভেতর অর্থময় হতে থাকে রাত্রির কথকথা – আকস্মিকভাবে সে হয়ে পড়ে চেতানহীন। রাতশেফালি ফুটে ওঠে, রাতের উদ্ভাসন পাখিসত্তার দৃষ্টিতে রেখে যেতে পারে না কোনো গূঢ় প্রহর।

৩০
ভাষা, দৃশ্যের বিকৃত প্রচ্ছায়া

শুভ্র মেঘের ঊর্ধ্বগামী তরঙ্গে লেগে আছে ধূসর ছোপ। উজ্জ্বলতার অনির্ভর বিকাশ নেই। ধূসরতার শক্তি দৃশ্যকে পূর্ণ করে। বস্তুত দৃশ্যকে ভাষান্তরিত করা যায় না।  ভাষা, দৃশ্যের দূর  বিকৃত প্রচ্ছায়া। জীবনের উজ্জ্বল-ধূসর রহস্যের সত্য কোনো প্রতিরূপ নেই। নিরন্তর ব্যর্থ বর্ণে এঁকে যাই অতি ক্ষদ্র আকাশ। আকাশকে চিনিয়ে রাখি প্রতীক বলে। আমাদের জীবনকে ঘিরে থাকে অজস্র দুর্বল আকাশ। আকাশগুলো আমাদের চরিত্রের স্মারক হয়ে ওঠে। আকাশে ভেসে ওঠে প্রেমের দুর্বোধ্য পারিজাত, হৃদয়ের বিপ্রতীপ পল্লব। ব্রহ্মাণ্ডের ধূলোকণার কাছে আকাশ মূল্যহীন; এ আকাশের জন্য আমাদের যুদ্ধ, বিজয়োল্লাস। আকাশের মনস্তাত্বিক ইতিহাসের মূল্য হয়তো এখনো নির্ধারণ করা যায়নি।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E