৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মে ১৫২০১৭
 
 ১৫/০৫/২০১৭  Posted by

রঞ্জনা বিশ্বাস-এর একগুচ্ছ ছোট কবিতা ও কিছু প্রশ্নোত্তর

১। কবিতা দিনদিন ছোট হয়ে আসছে কেন? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টি ও চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কারণ কী? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টির দম-দূর্বলতা-ই কি ছোট কবিতা বেশি বেশি লেখার কারণ? নাকি, ছোট কবিতা’র বিশেষ শক্তি এর অনিবার্যতা? কী সেই শক্তি?

“ছোট কবিতা” কনসেপ্ট এর আগে ছিল কিনা তা আমার জানা নেই। সত্যি বলতে,  কবিতার অবয়বগত এই ধারণা সম্পর্কে এর আগে কখনও আমি শুনিনি, ভাবিওনি। মূলত কবিতার ওয়েব ম্যাগ “ছোটকবিতা” যখন এ বিষয় কিছু প্রশ্ন পাঠায় তখন কবিতার অবয়বগত দিকটি বিবেচনায় আসে। আর এ কারণেই মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ কণিকা’, ‘ লিখন’ আর ‘ ‘স্ফুলিঙ্গ’-এর কথা।

বিশ শতকে ইউরোপেও হ্রস্ব কবিতার চল নজরে আসে। জাপানে  ছোট কবিতার কদর সর্বজনবিদিত। অতএব, কবিতা দিন দিন ছোট হয়ে আসছে এটা বলা ঠিক নয়, বরং আমরা বলতে পারি, ছোট কবিতা চর্চার প্রতি আমাদের আগ্রহ বেড়েছে। আবার ছোট কবিতার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে বলে দীর্ঘ কবিতার চর্চা একেবারেই কমে গেছে তাও ঠিক নয়। হ্যাঁ, এটা ঠিক, দীর্ঘ কবিতার ঝুঁকি বেশি, শুরু থেকে টানটান মেজাজ ধরে রাখা জসীমউদ্দিন বা আল মাহমুদ  কিংবা মাইকেল, রবীন্দ্র ক’জন আছে? গীতল ও বর্ণনাধর্মী কবিতার ক্ষেত্রে দীর্ঘ কবিতা অতুলনীয়। সময় এখন গদ্য কবিতার বা কংক্রিট; ফলে, ছন্দের দীর্ঘ কবিতা চর্চা তুলনামূলক কমেছে। এর মানে এই নয় যে “কবিদের দম-দুর্বলতা”ই দীর্ঘ কবিতা চর্চা কমার প্রধান কারণ। গদ্যে দীর্ঘ কবিতা কিন্তু লেখা হচ্ছে।

অনিবার্য শক্তির কারণেই ফিরে আসছে ছোট কবিতা। এর বড় শক্তি কবির কাঁচা ও তরতাজা আবেগ, অনুচ্চারিত অনুভূতি– যার গতি অদম্য। তাই ছোট কবিতার কবি যত দ্রুত তার রূপ বদলে ফেলতে পারেন অন্যত্র তা সম্ভব নয়। আমাদের চিরচেনা রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন –“গড টায়ার্ড অফ দেয়ার প্যারাডাইস,  এনভি ম্যান”, তখন এক বাক্যের এই ছোট কবিতার জন্মদাতাকে কি মনে হয়? নাস্তিক? অথচ ভাবুন রবীন্দ্রনাথ তাঁর “স্ফুলিঙ্গ” কাব্যেই লিখেছেন এমন কাব্যগন্ধী বাক্য। অতএব ছোট কবিতার একটা অমোঘ শক্তি তো থাকতেই হয়! তবে কী সেই শক্তি তার উদাহরণ দেয়া যত সহজ ব্যাখ্যা নয়। আমি এটা ভাবতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি যে ছোট কবিতা ফিরে আসছে এক একটা স্প্লিন্টারের শক্তি নিয়ে। ঊনবিংশ ও বিশ শতকে জার্মান ও ফ্রান্সে যে সকল তরুণ কবি কবিতায় তুমূল ভাংচুর করেছেন, কবিতাকে দূর্বোধ্য করে তুলতে তুলতে একেবারে অনুবাদানোপযোগী করে তুলেছিলেন তারাও কিন্তু বহাল আছেন বিশ্বসাহিত্যে! আমদের হতাশাটা যদি বড় কবিতা চর্চা কম হওয়ার জন্য হয় তবে বলবো – রবীন্দ্রনাথ – এক “স্ফুলিঙ্গ” দিয়েও বিখ্যাত হতে পারতেন। নেহাত পরিকল্পনাটা মাাথায় এসেছে অনেক পরে!!

২। এক লাইনেও কবিতা হয়, আবার সহস্র চরণেও। আকারে-অবয়বে দীর্ঘ বা ছোট হলেই কি একটি কবিতা দীর্ঘ কবিতা বা ছোট কবিতা হয়? ছোট কবিতা ও দীর্ঘ কবিতার বিশেষত্ব কী?

দীর্ঘত্ব হ্রস্বত্ব দিয়ে কবিতার গুণবিচার চলে না। কবিতাকে হয়ে উঠতে হয় মর্মস্পর্শী। এটা আকার প্রধান নয়, ভাবপ্রধান। এটা এমন এক ইন্দ্রিয়গত চেতনা যা ভালোলাগা ও মন্দলাগার মাধ্যমে শেষ হয়ে যায়- ব্যাকরণের ধার সে ধারে না।

“কণিকা”য় যে রবীন্দ্রনাথ অবসান হওয়া প্রেমের প্রাপ্তি স্বীকার করেন মাত্র তিন লাইনে “কোন খসে পড়া তারা/ মোর প্রাণে এসে খুলে দিল আজ/ সুরের অশ্রুধারা।” সেই রবীন্দ্রনাথকে  এই স্বীকারোক্তি দিতে “অনন্ত প্রেম” নামক বিশ লাইনের কবিতাটি লিখতে হয়!!

বলার অপেক্ষা রাখে না যে অনন্ত প্রেমে রয়েছে প্রেক্ষাপটসহ উপসংহার, আর কণিকায় কেবলই উপসংহার। আমরা বলতে পারি, কবির অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার কৌশলই নির্ধারণ করে দেয় তার কবিতার ধরণ।

৩। ক) ছোট কবিতা’র গঠন-কাঠামো কেমন হওয়া উচিত মনে করেন? খ) ছোট কবিতা পাঠে পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায় কি?  গ) ছোট কবিতায় কি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া সম্ভব?

কবিগুরু পাঁচবার জাপান ভ্রমণ করেন। সেখানে ছোটক কবিতা ও কাব্যের খুব কদর। অটগ্রাফশিকারীদের তৃষ্ণা মেটাতে গিয়ে কবি সেই সময়  ছোট কবিতার প্রেমে মজে গিয়েছিলেন বলে নিজেই এক জায়গায় স্বীকার করেন। কবির এই সব কাব্যগন্ধী বাক্যনিশে নিউইয়র্ক থেকে বের হয় “ফায়ারফ্লাইজ” বাংলায় “স্ফুলিঙ্গ”। রবীন্দ্রনাথের ” কণিকা”, “লিখন” আর “স্ফুলিঙ্গে”র কবিতাগুলোর আকৃতিগত দিক বিবেচনায় আনলে এগুলোকে ছোট কবিতাই বলা চলে। “কণিকায়” যে সব কবিতা আছে তার মধ্যে সবচেয়ে ছোটগুলো দুই লাইনের আর বড় গুলো বারো লাইনের। “স্ফুলিঙ্গে” সবচেয়ে ছোট এক লাইন সবচেয়ে বড় দশ লাইন। রবীন্দ্রনাথ নিজে হয়তো ছোট কবিতার কনসেপ্ট নিয়ে আলাদা করে ব্যাখ্যা বা সঙ্গা দেননি ঠিকই কিন্তু ভেবেছিলেন বোধ হয়।

ইদানিং অনু কবিতা বা অনুকাব্য নামেও কবিতার আকারগত একটা ধারণার চল লক্ষ করা যাচ্ছে। অতএব বিষয়টা যখন এসেই পড়ছে তখন কেউ যদি এ বিষয় ভাবে, সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চায় তা হলেও তো দোষের কিছু নেই।
আমার তো মনে হয় এক থেকে চার লাইনের কবিতা যদি অনুকবিতা হয় তা হলে ছোট কবিতা এক থেকে দশ বা বারো লাইন হলেই ভালো হয়। এক্ষেত্রে অনু কবিতা ছোটকতিতারই অংশ হয়ে যাবে।

যা হোক, কবিতা পাঠে আমার পরম শান্তি। কবিতায় আমার অরুচি নেই, কবিতা আমার বেডরুমের মতো। তবে কবিতায় মহাকাব্যিক ব্যাঞ্জনা খোঁজার পক্ষে আমি নই, কেননা কবিতা ছোট বা বড় যা-ই হোক মহাকাব্যিক ব্যাঞ্জনা এখানে অলীক।

৪। ক) আপনার লেখালেখি ও পাঠে ছোট কবিতা কীভাবে চর্চিত হয়েছে?

ছোট বড় জ্ঞানে কবিতা চর্চা যে হয়নি কখনও, বাস্তবিক ওরকমটা হয়ও না। কবিতার পাঠক হিসেবে ভালো লাগা মন্দ লাগাটুকুই আমার শেষ সিদ্ধান্ত, চুলচেরা বিশ্লেষণ কবিতার দাবী নয়। সেরকমটা হলে  হাট্টিমাটিম ছড়া বা কবিতাখানি মূল্যহীন হয়ে যেতো। লেখার ক্ষেত্রে ফরমেট মানা মানুষ আমি নই। যতটুকু লিখেছি কবিতার দাবীটাই মেটাতে চেয়েছি। এতে করে হয়তো কিছু কবিতা আকৃতিগত ভাবে ছোট হয়েছে এই যা!

৪। খ) আপনার একগুচ্ছ (৫-১০টি) ছোট কবিতা পড়তে চাই।


আর্তনাদ

আমার চোখে কেবল তোমার ছায়া আর তেমার চোখ অন্ধগোলাপ।
কার কাছে যাই?
যতই বলি তুমি থাকো, তুমি থাকো,
থেকে যাও আমার যাবতীয় অসম্মতির ভিতর,
ততই তুমি নির্বকার, ততই তুমি দূরবর্তী রাত।
আঁকো বিশ্বাসের যে কোনো রঙে

যেমন খুশি আঁকো,
বিশ্বাসের যে কোনো রঙে পাথরের পুরনো কাব্য, যা খুশি। যেমনটা তোমার পছন্দ।

শূন্যে ঝুলে থাকতে থাকতে ব্যথা হয়ে গেছে চোখ।

বাকি মৃত্যুগুলো ঘন হবার আগে আমাদের কিছুটা মানবিক হতে হবে নেহাৎ একটা সাকোর মতো।


ঘাম ও গোলাপ

মস্তিষ্কে শুকিয়ে যাওয়া লালগোলাপ আমাকে কোথাও নেয়নি। তুমি তবু গলগল করে ঘামছ।
আমার অলিন্দে অন্ধকার

তুমি নুয়ে পড়লে নিঃশব্দে নুয়ে পড়ি।
সূর্য মাথায় নিয়ে যখন দাঁড়াও-
পায়ের তলায় প্রাণান্তকর প্রয়াস, আমার ছায়া।

আর রাত এলে আমার বাম অলিম্দে অন্ধকার।
আর তুমি  স্বপ্ন দেখো হীম সবুজ।।


ব্যথার নীল তিসি

মেঘের মাটিতে রোপন করে দিলাম শরীর।
মেঘ ডাকে–
শুনতে পাও আমি ডাকি?
দহনে দখনে ঝরে যাই,
গলে যাই।
আর তুমি?
আকাশ জুড়প হেসে ওঠো ব্যথার নীল তিসি।।


নিয়তি

হঠাৎ তার নিঃশ্বাস ঝরে পড়ল পাথরের মতো
আর আহত হবার আগে ছিঁড়ে গেলো আলো।

আমরা  হাঁটছিলাম পাশাপাশি আয়নার ভেতর।


কান্না,চিৎকার ও ভেঙে যাওয়া মদ্যপ সোরাহি

পাথরের কাছে আমাদের কান্না,
কান্নাগুলো রক্ত,
রক্তগুলো গড়াতেই থাকে পাথর থেকে পা পর্যন্ত,
চিৎকার করছি– “জাগো, জেগে ওঠো,
আমাদের সাহস দাও।
সরে যেও না  ডানে কিংবা বামে, সরে যেও না হে  জলপাই হৃদয়।
থামো, থেমে যাও আর জেগে ওঠো”, একদা
থেমে যায় চিৎকার। তবু জাগে না কেউ- না
পাথর, না কান্না। পাথর চুইয়ে গড়াতে থাকে ঘাম। চিৎকার প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে,
প্রতিধ্বনি কিছু নয়, টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যাওয়া মদ্যপ সোরাহি, ঈশ্বর এবং আমাদের প্রার্থনা।


কবি পরিচিতি:

বিশ্বাস রঞ্জনা

বিশ্বাস রঞ্জনা

রঞ্জনা বিশ্বাস। এ শতাব্দীর প্রথম দশকের কবি। ১০ ডিসেম্বর ১৯৮১, বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া থানার রাধাগঞ্জ ইউনিয়নের খাগবাড়ি গ্রামে খ্রিস্টিয়ান পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা নির্মল বিশ্বাস ও মাতা পরিমলা বিশ্বাস। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম,এস,এস ডিগ্রী। ‘ভুলস্বপ্নে ডুবে থাক আদিবাসী মন’ (২০০৯) ও ‘আমি তিনবেলা বৃষ্টিতে ভিজি’ (২০১০) তাঁর কবিতার বই।  কবিতা ও ফোকলোর তাঁর আগ্রহের বিষয়। কবিতাচর্চার পাশাপাশি ফোকলোরচর্চাকেও তিনি ব্রত হিসেবে নিয়েছেন। কোটালীপাড়া এলাকার রূপকথার সংগ্রহ বেরিয়েছে ‘ জয়নালবাদশা ও রাজপুত্র তাজেম’ (২০১১) নামে। এছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণাকর্ম ‘ বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা’ (২০১১)।  বাংলাদেশের পালকি ও পালকিবাহক: নৃ-তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিকধারা (২০১৫)। বাংলাদেশের বেদেজনগোষ্ঠীর নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয় (২০১৫)। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প নিয়ে তাঁর গবেষণাগ্রন্থ ‘রবীন্দ্রনাথ: কাবুলিওয়ালা, সুভা ও দালিয়া’ (২০১২)। এবছর বেরিয়েছে তাঁর গবেষণাগ্রন্থ ‘সাহিত্যে বেদে সম্প্রদায়’ ও বাংলা একাডেমির ‘তরুণ লেখক প্রকল্প’,‘ লোকজ সংস্কৃতির বিকাশ প্রকল্পে কাজ করেছেন। ‘বাংলাদেশের পালকি ও পালকিবাহক’ বইটির জন্য তিনি ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরুস্কার-২০১৫’ লাভ করেন।।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E