৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ৩০২০১৬
 
 ৩০/১০/২০১৬  Posted by
কবি বীরেন মুখার্জী

কবি বীরেন মুখার্জী

পরিচিতি

বীরেন মুখার্জী। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৬৯, মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার দরিশলই গ্রামে। কবিতায় নিবেদিত বীরেন মুখার্জীর পেশা সাংবাদিকতা। বর্তমানে দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত।

কবিতাগ্রন্থ: উদ্ভ্রান্ত সময় (১৯৯৮, কলকাতা), প্রণয়ের চিহ্নপর্ব (২০০৯), প্লানচেট ভোর কিংবা মাতাল বাতাস (২০১১), নৈঃশব্দ্যের ঘ্রাণ (২০১২), পালকের ঐশ্বর্য (২০১৩), মৌনতা (দীর্ঘকবিতা ২০১৩), জলের কারুকাজ (২০১৪), হেমন্তের অর্কেস্ট্রা (২০১৬)।
গল্পগ্রন্থ: পাগলী ও বুড়ো বটগাছ (২০১৬)।
প্রবন্ধগ্রন্থ: কবির অন্তর্লোক ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০১২), সাহিত্যের প্রতিপাঠ (২০১৪)।
সম্পাদিত প্রবন্ধগ্রন্থ: বাংলা কবিতায় ঐতিহ্য (সম্পাদনা ২০১৪)।
সম্পাদিত ছোটকাগজ: ‘দৃষ্টি’ (প্রথম প্রকাশ ১৯৯৪। ১৫টি সংখ্যা প্রকাশিত)

বীরেন মুখার্জী’র কবিতাভাবনা

কবিতাকে মনে করি জীবন উপলব্ধির অন্যতম বাহন। আমার যাবতীয় মান-অভিমান, কল্পনা-অনুরাগ, প্রকাশ-অনুভূতি সব-ই কবিতাকেন্দ্রিক। কবিতা দিয়ে প্রচল ধারণাকে বাজিয়ে দেখার ইচ্ছে আমার ভেতর শৈশবেই জন্ম নেয়। এ ধারা এখনও বহমান। জীবনকে ধরা কিংবা জীবনের সমগ্রতার অনুসন্ধান চালাই কবিতা দিয়ে। কবিতায় আত্মসুখ নিবিড়।  আর কবিতায় সাজানো শব্দের ভেতর যে চিন্তা দুল্যমান, তার যে ব্যাপ্তি, পরিবর্তন এবং সম্প্রসারণ তা নিয়ে নিয়ম ভাঙার মায়া-বিভ্রমে মেতে থাকতে ভালো লাগে। আলো-ছায়ার পক্ষপাতিত্ব বা বিরোধাভাসে জীবনকে খুঁজে ফিরি অবিরাম। যে জীবন ছড়িয়ে আছে বৃক্ষ-লতায়, ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি কণায়। সৃষ্টিবিশ্বের অমেয় উপলব্ধি, বিশ্বসংসারই আমার আরাধ্য। কবিতা তার অন্যতম নিয়ামক। আমার বিশ্বাস ও চিন্তার সারবত্তা কবিতায় তুলে ধরতে চাই। কবিতা আমার কাছে এক অমৃত অহঙ্কার, তাই কবিতাকে এগিয়ে রাখতে চাই জগতের সবকিছু থেকে।

বীরেন মুখার্জী’র ১০টি কবিতা


বিপরীতমুখী

দিনমান, ছড়িয়ে পড়ার আগে
স্বপ্নের ভেতর উঁকি দেয়া গানগুলো
হয়ে ওঠে প্রণয়কাতর; আর-
যাত্রাপথে নোঙর করা নাবিকেরাও
পান করে

 -চূড়ান্ত মহুয়া;

মাতালের বায়োস্কোপ থেকে
বিপরীতমুখী দুটি দৃশ্য
খুব বেশি দূরত্বে থাকে না।

ত্রস্তপায়ে, স্বপ্নগুলো ছড়িয়ে পড়ার আগে,
আগামীর শস্যখেতে হেসে ওঠে

-বিলম্বিত বিচ্ছেদজীবন!


মায়াবিভ্রম

ঘুরতে ঘুরতে আসি, নিদ্রাকাল পার হই

পুড়তে পুড়তে

ব্রহ্মাণ্ডের পুথি ধুলোয় লুটায়; দেখি-
আকাশের বৃন্ত থেকে খসে যাচ্ছে

নক্ষত্ররচিত মুদ্রা

লুণ্ঠিত হতে থাকা মানুষ উন্মুক্ত করছে ভূমি,
এবার লুণ্ঠিত হবে বুঝি অরক্ষিত খেত!

পরিবর্তন প্রত্যাশায় হেঁটে চলেছি-
লাশবাহী গাড়ি, সবুজ প্রান্তর আর
বিশ্বস্ত স্পর্শ সরে যাচ্ছে পাশ ঘেঁষে, দূরগামী

নিদ্রাকাল পেরিয়েও ঘুরছি দেখি একই বৃত্তে
অন্যদিকে সমান্তরাল উড়ছে দীঘল কবিতা!


ঘুমের প্রতনুমায়া

বঞ্চিত বাতাসে জারি রেখে প্রাচীন জিজ্ঞাসা;
তৃণভূমে, নাকি ঝড়ে, কোথায় জাগ্রত?

শত বছরের নিঃসঙ্গ সমাধিফলক
আর দৃষ্টিগ্রাহ্যহীন মহাশূন্য খুঁজে
ত্যাগ করেছি প্রকৃত চেতনা, এবার-
ইচ্ছাপত্রে মায়াচক্ষু বিছিয়ে বেজে উঠব

সহস্রাব্দের উচ্চনাদ,

তবুও নশ্বর এ জীবন, ঘুমের পাড় খসিয়ে
কতদূর যাবে আর!

জলের সীমায় এসে-
যে জীবন জলের মতো রঙ বদলায়;
তারই রহস্যরঞ্জন ভুলিয়ে দ্যায় সবটুকু গন্তব্য, আর-
ঘুমের প্রতনুমায়ায় কেউ কেউ অলক্ষে আঁকে

জীবনের প্রত্নচিতা!


বিপণিবিতানে ঝুলে আছে

আধপোড়া স্বপ্ন ঝুলে আছে বিপণিবিতানে
পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে অজস্র আলোক
অন্ধ যারা, যারা কৃশকায় কিংবা বধির
মাড়িয়ে যাচ্ছে তারা পর্বে পর্বে, গুচ্ছদৃশ্য ওই;

স্বপ্নের কী দোষ! প্রতিমুহূর্ত খেয়েছে যাকে
নিবিড় মমতা; তিলে তিলে বুদ্ধি ও বিবেক
তুলে নিয়েছে চতুর বিশ্বায়ন, মানুষের
নরম ভোর হেলে গেছে প্রযুক্তির স্পর্শে
তবুও স্বপ্ন ছেড়ে কোথায় পালাবে মানুষ?

বিপণিবিতান থেকে খসে পড়ে স্বপ্নের ঘোর
দেবীপক্ষ থেকে পালাবার পথ নেই।


অগ্রন্থিত ডানা

একটি ফুঁ থেকে জন্ম নিলে জ্যোৎস্নাসাগর;
গ্রাস করে উত্তাল দ্যুতি, ডুবে যাই নিঃসঙ্গ।

একটি ফুঁ থেকে জন্ম নিলে রাত্রির চৌকাঠ;
ভোরের পথিক হয়ে চেয়ে থাকি, অপলক।


অলীক
(জীবনানন্দ দাশকে মনে রেখে)

অলীক তক ডাকে-ঘুমের ভেতর
বেজে ওঠে ছিন্ন খড়ের নূপুর, যেন-
অঘ্রাণের শূন্য মাঠে, ফসলের মৃতরেণুগুচ্ছ!

নুয়ে পড়া রাত, জেগে ওঠে ফের-ঘুমন্ত আঁধার
আমিও কী উঠিনি জেগে, একদিন-
ভালোবেসে ঝিনুকের সবুজ মুখোশ?
চূড়ায় উঠিনি কী, চোখে নিয়ে-অপার বিস্ময়!

হায়! তবু এই নগ্ন হাহাকার ফুঁড়ে
আঁধারের চুল বেয়ে নামে কেন-সোনালি ময়ূর!


আলোকের প্রস্তাবনা

শাশ্বত রাত্রিকে শূন্যে ছুড়ে দিয়ে
জেগে থাকে, প্রলোভনপ্রিয় অন্ধকার…

পথে পথে ঝিঁঝিঁদের গান টপকে
দূর পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে, কেউ দেখতে পায় না
সমতলের বিষণ্ণ গোলাপ, অথচ-
রাত্রির ধারণা নিয়েই যত তোলপাড়!

রাত্রির নির্জন শাখায়, আমিও বেঁধেছি কোরাস
অন্য কোনও পৃথিবীর সত্যে;
এ যোজনা মিথ্যের আকাশে উড়বে না কখনও-

অন্ধকার আমার ভয় করে না চারু
ভয় নেই দূরত্ব কিংবা প্রলোভনে, কেননা-
রাত্রির ভেতর জেগে থাকে আলোকের প্রস্তাবনা


সূচক

পথ পেরুলেই ঢেউ আঁকা নদী,
পথ পেরুলেই অনঙ্গ আকাশ
পথ পেরুলেই বাসনা ওড়ানো দিন
পথ পেরুলেই নিপূণ অভিমান
পথ পেরুলেই ছুটে চলা ইতিহাস
পথ পেরুলেই একটি উঠোন
পথ পেরুলেই চোরাবালি, ঝিনুকের হাড়!


যাপনের মতো ফেরার

নির্ভার হাত ভেবে ঘর ছেড়ে নেমেছি পথে
বিপদসংকুল অরণ্য-নদী-প্রাচীর ডিঙিয়ে
সোৎসাহে খুঁজে নিতে চেয়েছি ধ্যানের বিগ্রহ
অথচ, সরে গেছে যৌথচিন্তা আমাদের

ভ্রমণের দীর্ঘপথে।

প্রস্ফুটিত হওয়ার পর সুগন্ধ ও সৌন্দর্যের
বিপরীতমুখী বোধ ধরে রাখে পৃথিবীর ফুল

সান্ধ্য পানশালা থেকে যতটুকু কুড়িয়েছি নির্যাস
তত বোধ ধরেনি কোনও বৃক্ষ!

ট্রেনের জানালা থেকে, বার বার শূন্যে মিলিয়েছে
যে দৃশ্য, তা কি ছিল না যাপনের মতন ফেরার?

১০
একটি মধ্যবিত্ত প্রস্তাবনা

মা প্রায়ই বলতেন-

টাকা কী গাছে ধরে!

এই প্রস্তাবনায় মায়ের চোখে প্রতিদিন
টাকার গাছ দেখতে দেখতে আমিও এখন
কোনও না কোনও গাছের নিচে এসে দাঁড়াই
কবিতা কুড়াই, মা তার কিছুই জানেন না
শুধু মায়ের মুখটি ভেসে ওঠে কল্পিত শব্দগাছে।

মা প্রায়ই বলতেন-

টাকা কী গাছে ধরে!

আমাদের টাকা এখন গাছে ধরে মা
গাছ নাড়া দিলে ঝরে পড়ে, ঝুরঝুর!
কুড়ানো টাকায় পাল্টে যায় রুচি ও বোধ
কুড়ানো টাকায় পাল্টে যায় রসিকতাও!

দিন যায়, টাকাগাছের কদর বাড়ে,
আমিও মায়ের স্বপ্নের ভেতর শুয়ে পড়ি অবলীলায়
টাকা ছেড়ে কবিতা কুড়াই…
আর সন্তানকে বলতে শিখি-

টাকা কী গাছে ধরে!

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E