৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ২৩২০১৭
 
 ২৩/০১/২০১৭  Posted by

কামরুল ইসলাম-এর পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতাগুচ্ছ

বিহঙ্গখচিত লণ্ঠন

০১

এক অলৌকিক সন্ধ্যার ব্যাকরণ আমি
ঝুলিয়ে রেখেছি তুঁতগাছের ডালে-
আর সেই অসমাপ্ত আয়নার গভীরে
তালপাতার ফালি ফালি অন্ধকার,
সেখানে তোমার তন্দ্রাগুচ্ছ লিখে গেছে-
দ্যাখো, আমার পুড়ে যাওয়া মানে
বিস্তারিত যন্ত্রণা নিয়ে
জঙ্গলের বিশদ ভূগোলে গান গেয়ে যাওয়া…

বিকেলের যে খেয়াঘাট আকাশের প্রতিভা নিয়ে খেলছে
আমি সেখানের  ছায়া থেকে
মাঝি ও নৌকোর গোপন অসুখ তুলে নিয়ে
ভরে তুলছি বাঁশবাগানের সাঁঝবেলা…

০২

না-ফেরা ধ্বনিদের বলি, একটু দেখে যাও
এই যে রাতগুলো পড়ে আছে , যেন সব
মৃত মৃত মাঝিদের প্রেতাত্মার অনুশন;
ভেবে দেখো শুকনো রুটির যৌবন ছুঁয়ে
আমরাও একদিন হেঁটেছি সেই পথে-
আজকের এই  ধুলোমাখা ক্লান্ত পোশাকের তলে
লুকিয়ে থাকা জীবনেরে বলি:
দেখো কত অন্ধ মিস্টিক,  ডাকবাক্সের অবাধ সাঁতারে
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চিঠিময় স্বপ্ন বোনে দেহের সুতোয়
সেখানে একদিন খুঁজে পাবে জাল ও মৎস্যের
নির্জন পুঁথিঘর ,দোতরা ও মাদল,খনার জিহ্বা

০৩

খুলে দাও রঙের কৌটা-
পানবরজের কিনারে কোনো ভার্জিন মেরির বমিভাব হলে
ফতোয়া উড়তে থাকে মহুয়া বাতাসে, আর প্রতিটি নবান্নে
হেলেন কিলারের ছায়া এসে মাসিমার ঘুম ভাঙায়

মাসি গো, এই শীতে উষ্ণ করো শেয়ালের বাড়ি, আর
তামাক পাতার সবুজ চত্বরে যে কলজে-রঙের উঠোন
ছড়িয়ে দেয় রোদের কঙ্কাল, সেখানে আর কতক্ষণ তুমি
রঙিন পালের গল্পটা বাঁচিয়ে রাখবে ?

০৪

গানের দিকে ফেরা, প্রাণের ডিঙিতে জল ওঠে
আমি পাট ক্ষেতের আড়ালে
ফেলে আসি আমার অসুখী প্রেম ,আর ভাবি-
যে প্রেম মরে গেছে প্রত্যুসে তার কোনো বিকল্প হয় না…

সাত দিন সাত রাত পরে প্রেমবীজে জেগে ওঠে বন
নদীরাও সেখানে প্রান্তিক গেষ্ট,
তোমার সিলিং ফ্যানে স্রোত কেটে যায়
বাড়ি ফিরি ছেঁড়া পালের হাওয়ায়-

০৫
প্রজাপতির পাখায় জ্বলছে বিহঙ্গখচিত লণ্ঠন
সেখানে আমার কৈশোরের নতুন
গোঁফ-গজানো ধূসর ফোটোখানা
ব্যাট হাতে মাঠে নামে- মাঠের কিনারে ঘাট
ঘাটের কিনারে পড়ে আছে অমলের লাশ
বৃষ্টিতে ভিজে ওঠে হাওয়া-মন
ও মন, কতদূর নেবে আর ঘাটের প্রচ্ছদে আঁকা ঢেউগুলো-

০৬

পাতি খদ্দের এসে বলে গেল- কিনে নেব তোমার আবাস
আনন্দপ্রহরগুলো, গোধূলির দামে-
কয়েকটি শাদা বক এসে থামলো উঠোনে
আমরা ওজু করে বের হলাম ধুলোময় পথে

সেই খদ্দের বিড়ালমার্কা লুঙ্গি পরে
সবুজ ঘাসের যোনিতে বীর্যপাত সেরে
খেয়ে ফেললো পটাসিয়াম সায়ানাইড
তার বিলম্বিত মৃত্যুর দিকে আছড়ে পড়লো
কিংবদন্তীর মৃদু ঢেউ

আমাদের আনন্দগুলো তার লুঙ্গির নিচে ঘুমিয়ে পড়লে
আমাদের আবাসভূমিতে শুরু হলো বেহুলার দৌড়
আর বউ বউ খেলার জন্যে মানুষেরা জড়ো হলো
হাসপাতালের নগ্ন কবিডোরে-

০৭

ফাল্গুনের স্তব্ধনীল আকাশের দিকে চেয়ে
আজো  আমি দেখে  যায় গুল্মময় নক্ষত্র-সমাধি…

মেনে নিই সেই সত্য, যা আমার  মনকে টেনে নিয়ে
শূন্য গবাক্ষের পাশে বসিয়ে বলে- দ্যাখো হে, রাজমিস্ত্রির
কাঠামোগত যৌবনে কত সব শীত এসে
ঝরিয়েছে পাতা ও পল্লব-
আমার দেহ থেকে তখন
বনভূমির নতুন নাটকের সাঁঝরাতের মহড়াটা
প্রবল প্রতাপে কচ্ছপের ঘুমের আঙিনায় চলে যায়-

০৮

তালকানা মাছির চোখে হারিয়ে গেছে
কয়েকটি বোবা নদী, শিকস্তি-পয়স্তি আর জলের বিপণন-
যদি বলো, এই কেচ্ছা কাঁঠাল পাতার নৌকোতে চড়ে
তীর্থে যাবে, আমার কিছু বলার নেই।

আমাদের মর্ষকামী সুতোরেরা মাদি ঘোড়ার
ঘুমটুকু ছিনিয়ে নিয়ে পাটের কোষ্ঠা দিয়ে দড়ি পাকাতে পাকাতে
নদীর অদৃশ্য মোকামে চেয়ে দ্যাখে:
ভণিতা-জড়ানো  সোনালি মেঘেরা রাংতায় মুখ ঢেকে
ভিজিয়ে নিচ্ছে শরীরের রূপালি জিমনেশিয়াম
আর  বৃষ্টিরা পালিয়ে পালিয়ে
দেখতে থাকে যৌনাঙ্গের গোপন  সিঁড়িগুলো জলের আয়নায়-

০৯

জলসীমা ছেড়ে যাওয়ারও বুদ্ধি ছিল মেয়েটির
লোকটি ঐ নিরামিষ বুদ্ধিটুকু আটকে দিল
তর্জনীর ছোঁয়ায়;
বাতাস এসে জানিয়ে  গেল-
ঘরের ভেতরেও ঘর আছে, যার সীমানায় দাঁড়িয়ে তুমি
দেখতে পারো যা-কিছু হয়নি সেসব নৃত্যছলাকলা-

তালপাতার  উড়াল দেখে একদিন তুমি
উড়তে গিয়ে  বোঝেছ-
ডানার ভেতরের  টক্সিক আঁধার কীভাবে আদিগন্ত
টেন্ডনগুলো বেঁধে রাখে নির্জন ঘরে;
পড়ন্ত বিকেলের দিকে যে-মরণ স্বতন্ত্র ফণা তুলে
দেখতে চায় নিভে যাওয়া লণ্ঠনের সীমা ও গতি
তাহাতে আটকে আছে আমাদের সমূহ নিয়তি-

১০
বারান্দায় ঘুমন্ত রূপসী ইলিশটি আয়না দিয়ে
দেখতে দেখতে যখন অন্ধকারগুলো অনুবাদের জন্য
তেলজল মেখে নেমে পড়ি জলে
তখন আমার মনে পড়ে ‘ সনস অ্যান্ড ডটার্স
বিহোল্ড, আই অ্যাম ওদিপাস’… মন ভরে যায়
আতাগাছের জীর্ণ পাতার ছলনায় আর কেশবপুরের
মানুষের দ্যাখে: সাধু পাখির নীরব ঘুমে
গোধূলির প্রান্ত চুঁইয়ে রক্ত ঝরে অবেলায়…শত বছরের
ক্ষত নিয়ে সহস্র চোখের আলোতে আহত মানুষেরা
জানে না কান্নার বিকল্প কোনো পদ্যের ধ্বনি
সাঁকোর ওপারে জেগে আছে কিনা-

এদিকে বর্ণবিপর্যয়ের ঘোরে জল ওঠে পথে
আমরা ক’জন সুবহ সাদেকের রঙ মেখে মুখে
জাল পেতে বসে আছি শুধু ধু ধু মাছের নেশায়
যে মাছটি একদিন  মেঘ হয়ে ভেসে গেছে
বিষণ্ণ ঝাউয়ের শাখায়, কিংবা যে পথ ভেঙে গেছে, সেইখানে-

 

………………………………

কবি পরিচিতি

কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম। জন্ম  ১ নভেম্বর, ১৯৬৪। কুষ্টিয়ার ফিলিপ নগর গ্রামের গোলাবাড়ী পাড়ায়। নব্বইয়ের দশকে চূড়ান্তভাবে কবিতার জগতে প্রবেশ। পেশা: সরকারি কলেজে অধ্যাপনা। বর্তমানে রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজে ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :  দ্বিধাান্বিত সুখে আছি যমজ পিরিতে (১৯৯৯),  ঘাসবেলাকার কথা (২০০১), যৌথ খামারের গালগল্প (২০০৬), সেইসব ঝড়ের মন্দিরা (২০০৮), চারদিকে শব্দের লীলা (২০১০), অবগাহনের নতুন কৌশল (২০১১), মন্ত্রপড়া সুতোর দিকে হাওয়া (২০১৪), দীর্ঘশ্বাসের সারগাম (২০১৬)।

প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থ : বিহঙ্গখচিত লণ্ঠন

প্রবন্ধগ্রন্থ:  কবিতার বিনির্মাণ ও অন্যান্য(২০০৯), রবীন্দ্রনাথ: বিচিত্রের দূত (২০১৩), কবিতার স্বদেশ ও বিশ্ব (২০১৫)।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E