৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মে ০৩২০১৭
 
 ০৩/০৫/২০১৭  Posted by

বনবিহারীর জার্নাল
অপু মেহেদী

১.
আকাশপোড়া হলুদ দুপুরে পশুর নদী পেরোতেই দেখি আমার জন্য অপেক্ষা করছে একদল বিষণ্ণ চিত্রা হরিণ। বনমহিষের একটি নখ খোওয়া গেছে বলে সে আজ অনুপস্থিত। তার পরিবর্তে উচ্চশিরে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি কেওড়া গাছ তাদের দীর্ঘশ্বাসের বাতাস দিয়ে স্বাগত জানাল। দূর থেকে কে যেন ডাকলো সুরেলা কণ্ঠে। মাথার উপর পাতায় মোড়ানো আকাশ- সেখান থেকে টুপ করে দু’টো পাতা ঝড়ে পড়লো। পাতা নয়, যেন দু’ফোঁটা অশ্রু!

২.
ঝরাপাতা পতনের আছে নিজস্ব মুর্ছনা। বৃক্ষেরও রয়েছে বর্ণহীন ভাষা- যেন লাল-নীল বেলুনের পিছু নেয়া উন্মাতাল শিশুদের হল্লা। জলাভূমির বুক জড়ে থাকা ম্যানগ্রোভের শেকড়গুলো যেন মুষ্ঠিবদ্ধ হাত। এখানে শ্লোগানের সুযোগ আছে, মিছিলের নেই। মিছিল মানেইতো গতি- বৃক্ষ অসাড়। তবুও হয়তো এই বৃক্ষরাজির মধ্যেও কালেভদ্রে জন্ম নেয় নুর হোসেন কিংবা ক্ষুদিরাম!

৩.
আমার ক্লান্তিগুলো সব ভেসে ছিলো শ্যালা নদীর জলে। অথচ চোখে কোনো জলের দাগ নেই। কানে বাজছে জলের শব্দ। এখানে শব্দই জলের প্রতিনিধিত্ব করে। অথচ কালে কালে মাছকেই জলের প্রতিনিধিত্ব করতে দেখা গেছে । নোঙড় করা হয়েছিলো বালুচরের কাছাকাছি। স্বচ্ছ জলে একটি লাল কাঁকড়াকে মাছ ভেবে যেই না ভ্রম হলো, তৎক্ষনাত একটি খরশুলা লাফিয়ে পড়লো আমার সামনে। তার গা ভর্তি গন্ধ- তেলে ভেজা কয়লার!

৪.
হলুদ আলোর চারপাশে জড়িয়ে আছে সবুজ হাতছানি। এ অরণ্য মায়াময়। পথে পথে ছড়ানো রোমাঞ্চ। হরিণ ছুটছে- তার চোখে ভয়, মৌমাছি ছুটছে- তার হুলের ভেতর মধু, সিংহ ছুটছে- তার বুকে দাউ দাউ আগুন। এসবই ছন্দময়তা। এর মাঝে মানুষ এলেই হয়ে ওঠে ছন্দহীন। একদা বাঘের রাজত্ব এই সুন্দরবনে মানুষ ছিলো অনুপ্রবেশকারী, আর এখন মানুষের পদগুঞ্জরিত সুন্দরবনে বাঘই অনুপ্রবেশকারী!

৫.
সূর্যাস্তই পাখিদের বাড়িফেরার একমাত্র সংকেত। পাখিরা বাড়িফেরে পালকভরা গোধুলির স্পর্শে। নিঃশব্দে পিছু নিয়েছি পাখির, গন্তব্যহীন। ঘাসের সবুজ বুক কেটে যেতে যেতে জলজ ভাবনায় লীন। এইসব উদ্দেশ্যহীনতাও এক ধরণের উদযাপন। কেননা সকল উন্মূখতাই সমান সম্ভাবনাময়। এই ভাবালুতা নিয়ে শিবসার জলে পা রাখি। সে তার বিস্তীর্ণ বুকের নাচ থামিয়ে বলে- ডানে বঙ্গোপসাগর, ওখানে এখন বর্ষা, নবোঢ়া মাছের গর্ভকাল। আর বামে, তোমরা যাকে বলো রামপাল, সেখানে এখন আগুনকাল। পুড়তে চাইলে যাও!

৬.
বাদাবনের মাথায় ভেসে উঠেছে চাঁদ। পাতা থেকে চুঁইয়ে পড়ছে নক্ষত্রঝরা আলো। তার ছায়ায় বসেছে লাল পিঁপড়ের মাধ্বী পানের আসর। নেশাতুর পিঁপড়েরা হেলেদুলে নাচছে, পায়ে তাদের স্বর্ণলতার নূপুর। পিঁপড়েরা কি ভরতনট্যম জানে? প্রশ্নটা ব্যক্তিক। তবু কেন আমায় দেখে ঝোপঝাড়গুলো হাউ হাউ করে হাসছে? হাসবেই তো, মানুষই ওদের কাছে একমাত্র কিম্ভুত-কিমাকার প্রাণী। অবয়বে নয়, আচরণে!

৭.
স্বর্নচম্পকের ছায়ায় দাঁড়িয়েই বুঝলাম এখন চন্দ্রসংক্রান্তি। চকচকে গোলপাতার ঝোপ আমায় জ্যোৎস্নাকেলির আহ্বান করছে। পাশেই একটি জবা গাছ। জবাকে এখানে অর্কপ্রিয়া নামে ডাকা হয়। সূর্যমুখীর ডাকনামটি হারিয়ে গেছে। আর ঐযে দূরে একটি রক্তকরবীর চারা, ওখানে গেলেই বনদস্যু রঞ্জনের দেখা পাওয়া যায়। রক্তকরবীর রঞ্জনরা বরাবর প্রেমিকই হয়। সুন্দরবনের রঞ্জনরাও প্রেমিক, দস্যুপ্রেমিক!

৮.
পৃথিবীতে একমাত্র মানুষেরই উপাসনালয়ের প্রয়োজন। এখানে এত এত প্রাণ, অথচ একটিও উপাসনালয় নেই! নিরহঙ্কার বেঁচে থাকাই ওদের কাছে প্রধান ও একমাত্র উপাসনা। জ্ঞান এখানে ব্রাত্য, বিজ্ঞান কার্যকর- প্রাকৃতিক বিজ্ঞান। মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য সব কিছুই এখানে সম্ভব। এখানে সাপ-নেউল একসাথেই বাস করে; বাঘ-মহিষও এক ঘাটেই জল খায়!

৯.
কখনো কখনো জীবনের চেয়ে ঘটনাই বড় হয়ে ওঠে। তখন মানুষ হয়ে ওঠে স্মৃতিকাতর। স্মৃতি মাত্রই অস্থায়ী, কেননা স্মৃতি হস্তান্তরযোগ্য নয়। তাহলে কি বিস্মৃতিই সত্য? অতীতই মানুষের আসল গন্তব্য? এই বনস্থল ছেড়ে আমাকেও ফিরতে হবে। যদিও ফেরার কোনো কার্যকারণ নেই- রয়েছে পিছুটান। সময়েরও কোনো অতিক্রম নেই- রয়েছে উন্মোচন!

১০.
এ সমস্ত অনুপুঙ্খই আমার বেঁচে থাকার রসদ। এই বিপন্ন বৃক্ষরাজি, পশুপাখি, লাতাপাতা সবই আমাকে শিক্ষা দিয়েছে। সামান্য জোনাক পোকাও আমায় পথ দেখিয়েছে জমাট অন্ধকারে। এখন আমি নিশ্চিন্তে ভেসে যেতে পারি সিন্ধুভৈরবীর হাওয়ায়। সজোরে হাঁটতে পারি সিঁদুর মেঘের তীক্ষ্ণ চূড়ায়। নদী পেরোলেই জনপদ। বাতাসে ভাসছে বনবিহারীর আশ্চর্য খেদ। মুছে যাচ্ছে সকল জল ও জঙ্গলের প্রভেদ!

———————

– অপু মেহেদী

অপু মেহেদী

অপু মেহেদী

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E