৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মার্চ ২৩২০১৭
 
 ২৩/০৩/২০১৭  Posted by

বাংলাদেশের কবিতা: উত্তরাধিকার ও প্রবণতা
– ড.পাবলো শাহি

রুটি আর ফুলের জন্য লড়াইয়ের মধ্যে- মানুষের শিল্পী হয়ে ওঠা, মাথায় ভালোবাসার ফুল গুঁজে দেবার প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে। জাগতিক প্রয়োজন, ক্ষুণ্ণবৃত্তি আর মনের শিল্পীত অনুপূর্ব ইতিহাসের সঙ্গে তা অলিখিত সূতায় লিপিবদ্ধ। বাংলা কবিতার সূচনা বৈরী পরিবেশে ছায়াময় সান্ধ ভাষায়- অনেকটা ধর্মচিন্তার ভাষা দ্বারা এই প্রাথমিক কাব্যচিন্তা আবৃত। কিন্তু মানুষের ধর্মতো জীবনের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিরই ফল। সেই সূত্র ধরে হাজার বছরের পুরনো বাংলার চর্যাপদে ‘দ্রোহ, নিরন্নকাল, সমাজের ক্লীবতা, শারীরিক উত্তাপ ও প্রেমজ প্রপঞ্চ লুকায়িত। সঙ্গত কারণে পারিপার্শ্বিক বাস্তব রূঢ় জীবন অনুভব ‘বাড়িতে চাল নেই নিত্য অতিথির আনাগুনা’র মতো কবিতার চরণও চর্যাপদ-এ দুর্লক্ষ্য নয়। তারপর সেন ব্রাহ্মণ কর্তৃক বিতাড়িত বাংলার আদিকাব্য চর্যাপদ নেপাল থেকে বেরিয়ে আসা ভাষাকে প্রথম পৃষ্ঠপোষকতা দেন গজনীর সুলতান মাহমুদ। এবং তাঁর অর্থানুকুল্যে (মহাভারত, রামায়ণ) অনুদিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার নোতুন ভিত্তিমূল রচনা হয়। পরবর্তীতে ব্রিটিশের খ্রিস্টিয় বিভাজননীতি যুগের বীজ উপ্ত হয়। বিভাজিত হয়ে পড়ে বাঙালি মুসলামান ও হিন্দু। এই সময় সৃষ্ট কলোনির ভাষা সময় ও কালখ-কে প্রভাবিত করে। ফলে, কৃত্রিম ‘অন্ধকার যুগ’ নির্মাণ মুসলিম বিদ্বেষের ফল, এর সত্যতার অস্তিত্ব বাস্তবে গ্রহণযোগ্য নয়। তারপর ‘ফোর্ড-উইলিয়াম কলেজ’ এর উইলিয়াম কেরি কর্তৃক বাংলা ভাষার প্রাণসম্পন্দন আরবি-ফারর্সিকে (যা বাংলাভাষায় শব্দ ভাণ্ডারের অর্ধেক) বর্জন। রামরাম বসু, গোলকনাথ শর্মা, চণ্ডীচরণ মুন্সী প্রমুখের সহযোগিতার (যদিও মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার মৃদু প্রতিবাদ করেছিলেন) মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার মধ্যে ষড়যন্ত্র ও হীনতার বীজ বপন করা হয়েছে। যার ফল হয়েছে ভারত-পাকিস্তান অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, খণ্ড বাংলার ইশতেহার। পরবর্তীতে রক্তবীজে দ্রোহ জাগিয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলা নামের দেশের জন্ম। রাষ্ট্রিক বিছিন্নতার কারণে নোতুন মানচিত্র ও ভিন্ন পতাকার শিকারে পরিণত হয়েছি আমরা, বাঙালি নামক অন্তর প্রদেশের মানুষ। ফলে আমাদের আত্মপরিচয়ের দিগন্তে নিরন্তর অবান্তর ঘুরে ফিরে আসে খণ্ডিত বাস্তবতা ও ভিন্ন সমাজে বেড়ে ওঠা আলাদা হয়ে ওঠা সংস্কৃতি। বাংলাদেশ, পশ্চিম বাংলা, বরাক উপত্যকা ও ত্রিপুরার মতো বাংলাভাষী অঞ্চলগুলি তাই নাড়ির বন্ধন ছিড়ে আলাদা হয়ে যাওয়া বেদনাহত বিছিন্নতার শিকার। ফলে ভাবে ও তাৎপর্যে, সংরাগ ও সংকটে, কেউ দ্রোহী হয়ে (বাংলাদেশ), কেউ নিজস্ব ভাবের খবর থেকে বঞ্চিত হয়ে ভারতীয় হয়ে (পশ্চিমবঙ্গ), কেউ রক্ত দিয়েও অবদমিত থেকে গেছে (বরাক উপত্যকা)।

‘বাংলা কবিতার সাম্প্রতিক প্রবণতা’ এই আলোচ্যে শুধু বাংলাদেশের কবিদের একটা রেখচিত্রের আভাষ দিতে চাই মাত্র। এই প্রবন্ধে ‘বাংলাদেশ’ নামক ভূখ-ের মানুষ নিজস্ব আত্ম পরিচয়ের অনুধ্যানে কেমন নানামুখি প্রশ্ন-জিজ্ঞাসার মধ্য দিয়ে সদা সৃজনশীল ও রক্তাক্ত থেকেছে তার ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা। এখানে রাজনীতির ঘূর্ণাবর্ত ও সহিংস মূর্তি সাহিত্য ও মননশীল ভাবপ্রবণতাকে সদাচঞ্চল ও দোলায়িত করেছে। ফলে, পশ্চিমবাংলা থেকে ভিন্ন বাঙালির সংজ্ঞা নির্ণয়ের প্রশ্ন দ্বারা আলোড়িত বাংলাদেশ, তা তার কবিতা-গান সংস্কৃতির মোড়ক দ্বারা আবৃত। ১৯৪৭ থেকে এই সৃজনশীল তৎপরতার গতিপথ চি‎িহ্নত। বাংলদেশকে স্বাধীন দেশ হওয়ার বহু চড়াই-উতরাই পার হয়ে, প্রবল রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সংঘর্ষময় থাকতে হয়েছে। ব্রিটিশ চলে যাবার পর ১৯৪৭ এবং ১৯৭১-এ অল্পসময়ে দু’দুবার মানচিত্র ও পতাকার বদল। দ্রোহ আর রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের মানুষের মনভূমিতে দাগ কেটেছে- আর এই দ্রোহ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা জাতিগঠনের কেন্দ্রভূমিকে  বারবার রক্তাক্ত করেছে। এখনও সেই দ্রোহের কারণ ও চি‎হ্ন মুছে যায়নি বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে।

কাব্যপ্রকরণ ও বিষয়ের এই নোতুন অচেনা ঘরানা যা বাংলাদেশের কবিরা বিনির্মাণ করেছে এবং পশ্চিম বাংলা ও ঈশান বাংলার কবিদের থেকে আলাদা হয়ে উঠেছে তা ব্যাখ্যায়-এই আলোচনার সূত্রমুখ। কোনো এক সময় যৌথ স্থানাঙ্ক দ্বারা কবিতার যে ঘর নির্মাণ হয়েছিল বাংলায় বিশ শতকে তার চেহারা ভিন্ন রকমের। দ্রোহ আর রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের মানুষের মনভূমিতে দাগ কেটেছে এর এই দ্রোহ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা জাতিগঠনের কেন্দ্রভূমিকে বার বার রক্তাক্ত করেছে। এখনও সেই দ্রোহের কারণ ও চিহ্ন মুছে যায়নি বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে ফলে, ‘বাংলাদেশের দ্রোহী কবি’রা কবিতার সমস্ত বর্ণমালাকে করেছে রক্তে রঞ্জিত, বেদনায় বজ্রাহত। কাজেই কোনো ছক নয়, বাংলাদেশের কবিতার উত্তরাধিকার আর নোতুন অর্জন’ তার রাজনৈতিক অস্থির সময়ের উপলব্ধিতে পুরা আছে। উহ্যত, পূর্বসূরিতার প্রশ্নে চর্যাপদ, মঙ্গল সাহিত্য, পুঁথি সাহিত্য, মর্সিয়া সাহিত্য, ময়মনসিংহগীতিকা, খনার বচন পরবর্তীতে খিস্টিয় সভ্যতায় প্রভাবিত ত্রিশের কবিতা, জসীম উদ্দীনের ঘরে ফেরা- এই সব কিছুর মোচড় দ্বারা বাংলাদেশের কবিতা ঘূর্ণিত, সদভ্রাম্যমাণ। এই ভাবনার মধ্যে লুকায়িত দার্শনিকতার হদিস।

ফলে, বাংলাদেশের কবিতায় মুদ্রার দু’টো পীঠ বিদ্যামান, একটি জ্ঞানদাস, জসীমউদ্দীন অন্যটি ত্রিশের ইউরোপীয় আধুনিকতার। আমার আলোচনায় ইউরোপীয় আধুনিকতা দ্বারা আছন্ন কবিরাই অধিকাংশ বা প্রধানতম অংশ। সঙ্গত কারণেই অন্যধারার কবিদের সংখ্যা অল্প এবং এই লেখায় অনুল্লেখ থাকার তর্কমুখর উৎস উসকে দেবে হয়তো? তারপরও পূর্বসুরীদের স্রোত থেকে বাংলাদেশের কবিতা ইউরোনন্দন আক্রান্ত অংশে (বড় অংশ) মোটিফ বা মুদ্রা হয়তো এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠবে?

উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বাংলায় খ্রিস্টিয় শাসন আমল থেকে বিশ শতক অব্দি আধুনিকতার নামে বাংলা কবিতা কেন্দ্রকে অর্থাৎ শাসকের ভাষার কাছাকাছি যেতে চেয়েছে- আর এই হচ্ছে বাংলা কবিতায় আধুনিকতার দিকে যাত্রার নামে খ্রিস্টিয় সভ্যতার দিকে যাত্রা। এই যাত্রায় বাঙালির অবলম্বন ছিলো কলোনী জীবন। এখানে লুকায়িত বাঙালির জীবন, দর্শন ও শিল্পের কনফ্লিক্ট। এই সময় কলোনীর ভাষা সময় বা কালখণ্ড দ্বারা প্রভাবিত হয়, ফলে বাঙালির মনন সামাজ্যবাদের মনোভূমির কেন্দ্রে স্থাপন করার প্রবণতা জাগে। তার ধারাবাহিকতায় বাংলা কবিতার বোধশাখাও সেদিকে ধাবিত হয়। ফলত, বাংলা ভাষার ঐশ্বর্য ক্রিয়াভিত্তিক ভাষা ছেড়ে বাঙালি প্রতীকী ভাষায় নিজের জীবন বেদনাকে প্রকাশের প্রয়াস নেয়। ভারতচন্দ্র পর্যন্ত এই ক্রিয়াভিত্তিক ভাষা ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। মধুসূদনের ভাষা ক্রিয়া ভিত্তিক থাকলেও চিন্তায় ঈধঢ়ঃরাব ষধফু লেখার প্রেরণায় উজ্জীবিত। আর রবীন্দ্রনাথ পুরোপুরি প্রতীকী ভাষায় বিনির্মাণ করলেন তাঁর অম্লমধুর কাব্যবচন। নজরুলের দ্রোহ আছে সামাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, আর তিনিই প্রথম উচ্চারণ করেন- ‘এদেশ ছাড়বি কিনা বল, নইলে তোদের কিলের চোটে হাড় ক’রিব জল।’ কিন্তু ততদিনে বাঙালি সাহেব হয়ে উঠেছে। সে গালি দেয় চাষা বলে, সে নির্বুদ্ধিতাকে ঘোষ বলে, যা বাঙালির কৌম সমাজের প্রাণস্পন্দন, রক্তের নাড়িতে বেড়ে ওঠা মানুষকে অবজ্ঞা করতে শেখায়। ফলে, খ্রিস্টিয় সভ্যতা শিখানো ভারতের অর্থনীতির ইতিবৃত্তকে ‘বাৎসায়ণের অর্থশাস্ত্র’ না বলে ‘বাৎসায়নের কামসূত্র’ হিশাবে চিহ্নিত করতে, পৌরাণিক কাহিনী যা প্রকৃত অর্থে ভারতের ইতিহাস তাকে  অপাঠ্য বিদ্যা হিশাবে দেখানো আর পুঁথি সাহিত্য যা বাংলার প্রাণস্পন্দন তাকে নেগলেট করা হলো বটতলার সাহিত্য নাম দিয়ে; বাংলার ভাবের চাবিশব্দ বাউল, ফোককালচারকে ব্যাকডেটেড বলে উড়িয়ে দেওয়া হলো। উহ্যত, এই খিচুড়ি পাকানো সংস্কৃতি পাতে তুলে নিলেন বাংলার কবিরা। এই কাব্যক্ষেতের মাঝে জসীমউদ্দীনরা ব্যতিক্রম হয়ে চিহ্নিত হয়ে থাকলেন।

আধুনিকতার এইসব কূটবাক্যে পাল্টে গেল আমাদের ভাব, ভাবনা ও জীবন দর্শন। বোধশালাগুলিতে তৈরি হলো ইউরোপীয় চোখ ও ভারতীয় মনের কনফ্লিক্ট। এই দিকচিহ্নহীন আপত আধুনিকের ঘেরাটোপের ট্রেনে চাপা পড়ে গেল বাংলা কবিতা। বৈষ্ণব গীতিকবিতা এখন আর আমাদের ইউরোপীয় চোখ গ্রহণ করে না, সে বোদলের-এর মতো ফুটাতে চাই ‘ক্লেদজকুসুম’, মালার্মের মতো সংযত নিখিল বিবরে মুখ লুকাতে চায়। ফলত, আধুনিকতার নামে ত্রিশের পঞ্চপাণ্ডব আমাদের আদর্শের চোরাগলি হয়ে উঠলো? এর মধ্যে জীবনানন্দ দাশ ব্যতিক্রম হলেন প্রকৃতিলগ্ন বরিশালের জল-হাওয়ায় আর এক রকম বরিশালীয় ক্রিয়া ভাষার আধুনিক রূপায়ণ করে।

কাজেই আধুনিকতার নামে বাংলা কবিতা নিজের ভূগোল ও ইতিহাসকে ছাড়িয়ে ভাষিক ব্যঞ্জনায় বেশি দূর যেতে পারলো না। তা অনেকটা ইউরোপীয় কবিতার কেরানী ভাষ্যকার হয়ে থাকলো। তারপরও পশ্চিম বাংলার থেকে তা আলাদা এবং গতিমান হলো যুদ্ধ, রক্ত, দ্রোহ ও বাস্তব- কল্পনার পরিসীমার আর এই জীবন ইতিহাসের বাঁক বাংলাদেশের কবিদের ত্রিশ থেকে অনেকখানি সরিয়ে আনলো। ফলে ভাগ হয়ে যাওয়া বাঙালির ১৯৪৭-ই পূর্ব বাংলার কবিদের মূল কনটেন্ট। এই কনটেন্ট রাজনীতি ও সংস্কৃতির দ্রোহ যুক্ত হয়ে তা যেমন শ্লোগানমুখি করেছে তেমনি রাজনীতির কারণে রক্তমুখি, জীবনমুখিও করেছে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুআরি’ তাই শ্লোগান নয়, জীবনেরই অন্য উৎসারণ হয়ে উঠলো। আমরা দেখেছি ত্রিশের পঞ্চপাণ্ডব’রা আধুনিকতাকে ধারণ করার নামে আলো ফেলে ছিলো চৈতন্যে কিন্তু ব্যক্তির অবচেতন মনের কন্দরে সে ছায়াপথ তা তো ধার করা, ইউরোপীয়তার দিকে যাত্রা। কিন্তু ১৯৪৭ পরবর্তী বাংলাদেশের কবিতা তা থেকে অনেকটা সরে এসে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আবেগ প্রগাঢ় রক্ত রং ধারণ করে। তাই শ্লোগান কবিতা হয়ে ওঠে ‘আসাদের শার্ট নয়, ফুটো করে দিয়ে যায় বাংলাদেশের হৃদয়’ কিংবা ‘ট্রাক ট্রাক ট্রাক শুয়োরমুখো ট্রাক আসছে দুয়োর বেধে রাখ’ কিংবা ‘সাবধান সাবধান সাবধান বাংলার শক্ররা সাবধান’, ‘তুমি বাংলা ছাড়ো’ -এই জাতীয় ভাষিকদ্রোহ কবিতা হয়ে ওঠে।

যে প্রবণতাগুলি বাংলাদেশের মানুষের অগ্রবীজ হয়ে বাংলার কবিদের বুকে আছড়ে পড়ে- তা হচ্ছে ‘পাকিস্তান আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৯৮১-র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। পাল্টে যাওয়া এই বোধের ভূগোল দ্বারা বাংলাদেশের কবিরা তাই আক্রান্ত ও অতিক্রান্ত হতে থাকেন। বাংলার বাস্তবতার মাটিতে এইসব গণবিস্ফোরণই কবিতার নায়ক, বর্ণখোচিত দুঃখিনী বর্ণমালা হয়ে ওঠে।

প্রসঙ্গত কারণে ১৯৭১ উত্তর বাংলাদেশের কবিরা ইতিহাসের ক্ষিপ্র আবেগের ধাক্কা ও টানাপোড়েন দ্বারা বিদ্ধ। এই রক্তাক্ত করাত কলের নিচে ইতিহাসের গতিমুখে ঝাপটায় বাংলাদেশের কবিদের ভাষা সংবেদন নির্মিত। ইতিহাসের দাবি মেটানোর বিচ্যুতি এতে থাকলেও তা সময়ের তাড়না দ্বারা অম্লমধুর, বাংলার মানুষ ও বাংলার নোতুন ভাষায় পৃথিবীর বেদনার বর্ণরূপ। কালের ও ভূখণ্ডের এই সম্পৃক্ততা ছাড়া বাংলাদেশের কবিতার স্বতন্ত্র ঘরনাকে চিহ্নিত করা যাবে না।
তাই বাংলাদেরশর কবিদের চৈতন্যে, রক্তে শিরায় চর্যাপদ, বৈষ্ণব কবিতা, খনার বচন, মর্সিয়া সাহিত্য, পুঁথি সাহিত্য দ্বারা স্নাত আর ত্রিশের দশকে তাতে ঘোর প্যাঁচ লাগে ইউরোপীয় বোদলেরীয় নান্দনীকতা। কিন্তু ৪৭ থেকেই তা ইতিহাস, ভূগোল ও রাজনীতির দর্পে ভিন্ন রাস্তায় হাঁটতে শুরু করে। সে দিক থেকে হয়তো একদিন জসীমউদ্দীন ও লালন, ফোক প্রেরণা হয়ে থাকবে। এগুলি বাংলাদেশের কবিতার স্বতন্ত্র ও নিজস্ব স্ববের উৎসবিন্দু, লোক জীবনের মহাকাব্য। এ পর্যায়ে রাজনৈতিক দ্রোহ বাংলাদেশের কবিদের মানসিক সীমান্ত লোক জীবনের বাস্তবতায় নিবদ্ধ করেছে। ফলে, কবিতার শরীরে কান পাতলে শুনা যায় সেই অভীষ্ট অভিজ্ঞান। বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘশ্বাস ও দ্রোহ তাই সেলাই করে গেঁথে তুলেছেন শব্দশিল্পীরা। তার মধ্যে উঁকি দিয়ে নগরজীবনের বিছিন্নতা, ব্যক্তিমনের বিপন্নতা কিন্তু মূল সুর তাঁর দ্রোহের-বিস্তারে, ভূমিজলে মাটি মানুষের কান্নায়।

কার্যত ১৯৪৭ পরবর্তী বাংলাদেরশর কবিতা পাশ্চাত্য কেন্দ্রিকতা থেকে সরে আসতে থাকে। সিকান্দার আবু জাফর তাই ‘বাংলা ছাড়ো’র ঘোষণা দেন, ফররুখ আহমদ ঐতিহ্য কেন্দ্রিক আদর্শে অবগাহন করেন, আহসান হাবীব মানুষের মুখরিত কলতানে স্পন্দন ফিরে পান, আবুল হোসেন মননদীপ্ত চৈতন্যে অবগাহন করেন, সৈয়দ আলী আহসান প্রেম ও প্রকৃতিতে স্থানাঙ্ক খোঁজেন। মূলত চল্লিশের কবি’রা সমাজ বাস্তবতার ভেতর বাংলা কবিতার কালখণ্ডকে তুলে ধরেন।

পঞ্চাশ দশকে এই বাস্তবতা ও দায়ভার আরো সোচ্চার যেমন হয় সমাজ জীবনে- ফলত কবিতা ও কবিদের চৈতন্যও তত আন্দোলিত হয়। শামসুর রাহমানের কবিতা তাই নাগরিক মধ্যবিত্ত মানুষের রাজনৈতিক অভীপ্সায় নিমজ্জিত। আজীজুল হক দায়বদ্ধ সমাজউচ্চারণের কাছে, হাসান হাফিজুর রহমান সমাজতান্ত্রিক ভাবনা দ্বারা তাড়িত, আল মাহমুদ জসীমউদ্দীন হয়ে আসা ঐতিহ্য ও কামতাড়না দ্বারা বিদ্ধ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ রাজনৈতিক চেতনার এপিক দ্বারা আবৃত, দেশ মাতৃকার প্রতি কমিটেড।

ষাটের কবিতায় দ্রোহ ও মেধা প্রেরণার সুর সংযুক্ত। পঞ্চাশের শেষার্ধে শুরু করা শহীদ কাদরী চৈতন্যপ্রবণ মস্তিষ্কনির্ভর কবি। এই দশকের কবিদের লেখায় যুক্ত হয় আত্মস্বীকারোক্তিমূলক, আত্মজৈবনিক মানসিক অবস্থান। শহীদ কাদরীর নাগরিক যন্ত্রণা সিকদার আমিনুল হকে এসে অন্তর্মুখী পরাবাস্তবতায় রূপ নেয়। নাগরিক ক্লেদ ও গ্লানি এসে আছড়ে পরে রফিক আজাদের কবিতায়, আব্দুল মান্নান সৈয়দ পরাবাস্তবতা, নিসর্গ ও প্রেমচেতনার কবি, ষাটের অন্যতম প্রধান কবি আবুল হাসান যিনি কবিতার নিয়ে এলেন আবেগের অকুতভয় সংশ্লেষ, প্রাত্যহিকতায় ও সৌন্দর্যে যে আত্মহনন আছে তা তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য।

সত্তরের কবিতা বীভৎসতা, পরাবাস্তবতা ও যুদ্ধ রক্ত দ্বারা স্নাত সময়ের, ফলে কবিতা ও কবি সে বোধ দ্বারা আক্রান্ত। ষাটে শুরু করলেও সাবদার সিদ্দিকী সত্তরে আলোচিত। লিবিডো ভাবনা তাঁর কবিতাকে বৃত্তায়িত করলেও, নানা রহস্য ময় মস্ত্রিষ্কপ্রবণ চিন্তা ও সংরক্ত তাঁর কবিতাকে রহস্যময় আধার দান করেছে। আবিদ আনোয়ারে যুক্ত হয়েছে কবিতায় লিবিডো চেতনা ও ব্যক্তি মানুষের সংবেদ।

আবিদ আজাদের কবিতায় লিবিডো চেতনার সাথে অস্তিত্ব সংকট সংযুক্ত। সত্তরের দায়বদ্ধ স্বদেশী ভাবনার কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। রাজনীতি তাঁর কবিতার অন্যতম শিল্প প্রকরণ।

আশির কবিতায় ঐতিহ্য-সচেতন, বিজ্ঞানমনস্কতা ও পুরাণের ব্যবহার উল্লেখ করার মতো। শোয়েব শাদাব প্রাগৈতিহাসিক ঋষিকে কবিতায় তুলে আনেন, শান্তনু চৌধুরী প্রকরণে প্রচল থেকেও বিষয়ে প্রাগৈতিহাসিক পুরাণ ব্যবহারে ঋদ্ধ হয়ে ওঠেন, মাসুদ খান বিজ্ঞান মনস্ক সিলিকন চিপস-এর কবি, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ উইট আর ছান্দসিক কবি, পাবলো শাহি’র কবিতার অন্যতম অনুষঙ্গ যৌনতা ও রাজনীতি। কবিতায় তিনি নির্দ্বিধায় এবং নান্দনিক দক্ষতায় ব্যবহার করেন যৌনগন্ধী শব্দ- যা যোনিগর্ভ, নাভিপদ্ম, কামিনীগুহা- এরকম অসংখ্য শব্দ সঞ্চালনের মধ্যে কবিতায় আঁকেন আকন্দগাছের ব্রহ্মা-ব্লেড। শিমুল মাহমুদ বাংলা কবিতার মিথ রূপান্তরের কবি।

বায়তুল্লাহ্ কাদেরী পুরাণ ও আধুনিকার মেলবদ্ধনের কবি। মুজীব ইরম আঞ্চলিক বাতাবরণের কবি। শামীম কবীর প্রাচীন পোশাকপরা মৃত্যুর ফেরিওয়ালা। টোকন ঠাকুর সহজ কবিতাশিক্ষা হাতে বর্ণমালার ফড়িং। এরপরে আরো এগিয়েছে বাংলা কবিতা। শূন্য দশকের কিংবা দু’য়ের দশকের কেউ কেউ উঁকি দিচ্ছেন হাজার বছরের বাংলা কবিতার দরোজায়।

***

পাবলো শাহি

পাবলো শাহি

ড.পাবলো শাহি : আশির দশকের কবি, গবেষক ও গদ্যকার। জন্ম: ০২রা ভাদ্র ১৩৭২, যশোর।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: যাও পক্ষী কহ তারে (ভূর্জপত্র ১৩৮৭); সেই ঘুম ঘুম ভিখারী আপেল গুলি (ভূর্জপত্র ১৩৮৮); দূত সুড়ঙ্গের বীজ (অনন্যা ১৪০০); ইহা এক অভিনব কাব্যভজনা (প্রতিশিল্প ১৪০৬); ক্ষম ওঁ নিঃশ্বাসযান (ভূর্জপত্র ১৪০৭); মেঘবালিকারমুদ্রা (ভূর্জপত্র ১৪০৭); বেহেশতি আদি বড় ও সহি হুরিনামা যাহা কেবল নরগণ পাঠ করিবেন (ভূর্জপত্র ১৪০৭); শব্দ বিশারদগণ কহেন উহা পেণ্ডুলাম শরীরের গোলাকার মহাপ্রাণধ্বনি (ভূর্জপত্র ১৪০৭);  কহে কবি নবীন বাল্মীকি (ভূর্জপত্র ১৪০৮); বর্ষা এবং আমাদের প্রাইভেসি (ভূর্জপত্র ১৪১০); ছলাপদ লেখে কবি শাহিপাদানাম (ভূর্জপত্র ১৪১৪); কসাইয়ের স্কুল (অ্যাডর্ণ ১৪১৬); পরাবাস্তব জামার বোতাম (ধ্রুবপদ ১৪১৮); সপ্তসিন্ধু চারদিগন্ত কাব্য সংগ্রহ (ধ্রুবপদ ১৪১৯); বঙ্গকবতিাবিদ্যা নির্বাচিত কবতিা (ছোঁয়া, কলকাতা, ১৪২৩); আদাবর তিনের বেণীবাঁধা বাড়ি (ছোঁয়া, কলকাতা); তান্ত্রিক জবাফুল (হাওয়াকল, কলকাতা) ২০১৭; ঈশ্বরের কুয়োতলা (ছোট কবিতা, ঢাকা) ২০১৭।

প্রবন্ধগ্রন্থ: আমাদের কোড আমাদের ইশারা এবং ভাষার বিনির্মাণ (ভূর্জপত্র ১৪১২); আজীজুল হকের কবিতা: ভাব ভাষা ও তাৎপর্য (ভূর্জপত্র ১৪১২); সাহিত্য পাঠ ও ভাবনা: বিবেচনা-পূনর্বিবেচনা (ধ্রুবপদ ১৪১৯)।

সম্পাদনাগ্রন্থ: আজীজুল হকের কবিতা সংগ্রহ (ধ্রুবপদ ১৪২৩)।

যোগাযোগ: পাবলো শাহি, ডি-৮২, উপশহর, যশোর ডাকসূচক- ৭৪০১, মোবাইল:+88 -০১৭১১২৮৩৮১৩/ ০১৬১১২৮৩৮১৩
ইমেইল: pablo.shahi1965@gmail.com

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E