৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ১৩২০১৭
 
 ১৩/১১/২০১৭  Posted by

বাবলু গিরি

কবিতাভাবনা

কবি এক সৃষ্টির অনুভূতি, এক নির্বেদ প্রকাশ, যেখানে তিনি ব্রহ্মাণ্ড দর্শন করেন শব্দসরসীতে কবি স্নান করে। সেখানে তিনি মহযোগী, যোগী যেমন, সাধনায় মগ্ন থাকেন, কবিও তেমনি সৃষ্টির উল্লাসে রচনা করেন রূপান্তর l অরূপ পরিবর্তনশীল, রূপ সর্বদা একই থাকে l কবি কিন্তু সাধনার মধ্যেই অরূপকে রূপে পরিবর্তন করেন, অনন্তের সাধনা করে সৃষ্টির গতিকে নতুন নতুন রূপে প্রবাহিত করেন, যেমন-পূর্ণিমার চাঁদ, তাকে সহস্র কবি সহস্র রূপে বর্ণনা করেন।
সৌরজগৎ-এ যেমন- সূর্যের চারধারে গ্রহ সব ঘুর্ণায়মান।
তেমনি- একটা পদার্থে পরমাণুর ভিতরেও, নিউক্লিয়াসকে ঘিরে, ইলেকট্রন ঘুরে চলে। আবার যদি ভাবি- কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ‘নিউক্লিয়াস’, তাহলে রাজ্য মন্ত্রিসভা সব ইলেকট্রন।
ঠিক সেইরম- সংসারে বাবা-মা যদি নিউক্লিয়াস হয়, সন্তানেরা ইলেকট্রন।
অর্থ্যাৎ একই সিস্টেম বিভিন্ন রূপে ব্যাখ্যা করলে দেখা যাবে একই রূপ বিভিন্ন রূপে
লীলা করছে।
কবিও তেমনি বিভিন্ন রূপে ও অরূপে সৃষ্টি সাধনায় লীলা করেন।

কবিতাগুচ্ছ


খুঁজে চলি

পর্যেষণে, খুঁজে খুঁজে ভ্রমণে।
বৈঠকখানা বাজারে
অখিল মিস্ত্রি লেনে।

কলেজ্স্ট্রিটে অক্ষর বাজারে।
খুঁজে যাই হেগেল কেন্ট কামু কাফকা।
রবীন্দ্র, জীবনানন্দ, নীরেন্দ্র, শক্তি, মুস্তাফা।
কফিহাউসে খিচুড়ির আলোচনা সেরে
তোমায় খুঁজতে বেরোই -শকুন্তলা।
দুষ্মন্ত হয়ে হারিয়ে যাই কালো দীঘির জলে।
খুঁজে যাই মিশরে, হেলেন, নেফেরতিতি-স্বপ্নবালা।
নীল নদীর পাশ দিয়ে, আফ্রিকার জঙ্গলে।
ডায়মন্ড হারবারে, হাওড়া ব্রিজের উপরে।
বেনারসের ভুলভোলানো অলিতে গলিতে।
কুশীনগরে বুদ্ধ ..তোমায় খুঁজেছি।
জেরুজালেমে, রক্তাক্ত গোলগাথার পর্বতে –
পেরেকবিদ্ধ যীশু, তোমায় খুঁজেছি।
মথুরায় ঘুরেছি কংসের কারাগারে।
কুরুক্ষেত্রে খুঁজেছি জনার্দন, হে সারথি।

পর্যেষণের ভ্রমণে, ক্লান্ত আমি ঘনযামিনী।
আর্কিমিডিসের মতো মাস্তুলে চেয়ে থাকি।
ভল্গা নদীর তীরে পেরুণ তোমাকে খুঁজেছি।
তোমার বজ্রের ঝলকানিকে খুঁজেছি।
মোকোশ মা, তোমাকেও খুঁজেছি।
গঙ্গার তীরে খুঁজেছি ভাগীরথের বংশকে।
খুঁজেছি মহেঞ্জদাড়ো শহরে, নালন্দার ধ্বংসস্তূপে।
মেরিন ড্রাইভে, কর্গিলে, টেমসের তীরে, লশভেগাসে।
বসন্ত কেবিনে চা খেতে খেতে,
তারাপীঠে গাঁজার ছিলিম হাতে।
শকুন্তলা তোমাকে খুঁজে চলেছি।
হে মহাপ্রেম, তোমাকে খুঁজে চলেছি।
—————————————
নেফেরতিতি –মিশরের অতীব সুন্দরী রাণী l
পেরুণ — বজ্রের দেবতা রাশিয়ার l
মকোস –মাতা দেবতা l রাশিয়া l
পর্যেষণ — অনুসন্ধানের ভ্রমণ l
—————————————


মহা গর্ভ

পৃথিবীর গর্ভে আমার জন্ম-
সূর্য্যের গর্ভে পৃথিবীর জন্ম।
ব্রহ্মার গর্ভে-সূর্য্য-নক্ষত্রলোক
প্রতিটি ব্রহ্মান্ডের ক্রোমোজোম
প্রতিটি মানুষের ক্রোমোজোম-
প্রতিটি পদার্থের, গাছের, বাতাসের, আলোর
প্রতিটি ক্রোমোজোমে লুকিয়ে আছে নতুন ভাষা।
লক্ষ লক্ষ বছরের ইতিহাসের ক্রোনোলজি-
যুগ যুগান্তরের প্রবহমান-রূপ রূপান্তর।

বিরাট যন্ত্রণার শব্দে যোনি ছিন্ন করে বেরিয়ে পড়ি
প্রাণ ভরে বিষাক্ত-পবিত্র বাতাস পান করি
আমার শরীরে জন্মবীজ- জন্মময় হয়ে ঘুরি।
আমার শরীর থেকে-আবার শরীরের জন্ম…
আবার জন্ম…আবার আমি পদার্থে, আলোতে,
বায়ুতে, মিলে মিশে ক্রোণোলজি হয়ে যাই-
আমি পৃথিবীর গর্ভে, সূর্য্যের গর্ভে, ব্রহ্মাণ্ডের গর্ভে-
প্রতিদিন জন্মময় হয়ে- জেগে জেগে রই।
আমি সৃষ্টির বীজ হয়ে- মহা গর্ভ হয়ে যাই।
—————————————————–


অবনীর সংসার

আমি ব্রহ্মাণ্ডর পর্যেষণে।
পৃথিবীর ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে দেখি,-
একটি শিশু খেলছে। মাটি কাদা জল মাখা মাখি।
একটি গাছ প্রসব করে ছড়িয়ে দিচ্ছে সন্তান।
তারপর খুঁজতে খুঁজতে ঢুকে যাই,
সেই গাছেদের সংসারে, পাখিদের সংসারে।
রাশিচক্রে ঢুকে পড়ি, হাড় গিলগিলে কৃষকের ঘরে।
ভগবানের মতো মাদুলি দিচ্ছে, সুখ কিনছে মন্দিরে।
তন্ত্রে ঢুকে যাই, সমাজ তন্ত্রে, লোকতন্ত্রে, তন্ত্রের যন্ত্রে।
রামুদার চায়ের দোকানে ডুবে যাই ভাষণতন্ত্রে।

আবার- খুঁজতে গিয়ে দেখি, ব্রহ্মাণ্ডের উপর
পৃথিবীটা চক্কর দিচ্ছে, রামুদার চায়ের ঘর,
হাড়গিলগিলে কৃষকের মাদুলি, গাছেদের সংসার,
শকুনের সংসার, নেতাদের সংসার, সবকিছু নিয়ে
ঘুরপাক খাচ্ছে, খিল খিল হাসছে, সূয্যিকাকুর উঠোনে
আর প্রত্যেকে খুব ব্যাস্ত প্রসবদিতে। ব্যাস্ত ধর্ষণে।
ব্যাস্ত সব-কাদা জল মেখে, সঙ্গমে।


অবনী বাঁই বাঁই ঘুরছে

অবনী বাঁই বাঁই ঘুরছে, বাতাসটার কি জানি কি তাড়া,
খালি দৌড়ুচ্ছে। গাছেদের জঙ্গলের সংসারে
বন্দুকের আওয়াজ। বাঘেরা সঙ্গম ভুলে গেছে।
তারপর ভুবন চাষার ক্ষেতে বৃষ্টি নামে। সৃষ্টিছাড়া
হড়পা, পুকুর ঢুকিয়ে দেয় পোয়াতির ঘরে।
কই মাছ লাইন দিয়ে চলে অন্য জলাশয়ের তরে।
কখন শিশুর মতো খেলাচ্ছলে তালগাছে উঠবে চড়ে।
মানুষের দুঃখ খুঁড়তে খুঁড়তে, উদ্বাস্তুর কাফেলা চলে।
হাঁ করে আছে মনু, অবনী একটু পানীয় দাও।
বীজপ্রসূ, একটু তোমার গর্ভজাত অন্ন দাও।

অবনী বাঁই বাঁই ঘুরছে, সূয্যিকাকুর উঠোনে।
ভুবনের বৃক্ষরা গর্ভবতী হলে, ফুলে ফলে সেজে ওঠে।
প্রসববতীর পেটে লাথি। মায়ের পেটে মা আছে বলে।
লড়ছে, মারছে, মরছে, অবনীর সংসারে।
ব্যাস্ত জৃম্ভণে। ব্যাস্ত সব প্রসূতির খেতখামারে l
ব্যস্ত সব কাদা বায়ু জল মেখে সঙ্গমে।
অবনী বাঁই বাঁই ঘুরছে, অগ্নিগর্ভার উঠোনে।


সময়কে মাড়িয়ে

বুড়োটা বসে আছে সময়কে বগলদাবা করে।
মাঝে মাঝে হুঁকো টানে, আগুনটা দপ করে জ্বলে ওঠে আবার নিভে যায় l
যুদ্ধ এইভাবে দপ করে জ্বলে- ওঠে,জেহাদীরা জানে যুদ্ধ করেই বেঁচে থাকতে হবে l
কবরের ভিতরে শুয়ে শুয়ে মাটি হচ্ছি, তারও আগে কিটানু, পোকা, কাহারো খাদ্য হয়ে, ফল হয়েছি।
দূর্বা তৃণ হয়ে কোষা কুশি দিয়ে পবিত্র জল ছিটিয়েছি
যুবতীরা উদ্ধত কুচ নিয়ে, সময়কে মাড়িয়ে জন্মবতী হয়।
অবনী মহাকাশে উড়ে চলে, সময়ের হুমড়ি খাবে বলে l
এইভাবে কবি হয়ে শব্দ ছড়াই, রসুইঘরে তেল নূন হলুদ আর অগ্নির মতো নশ্বর ব্যঞ্জন হবে।
আর অশরীরী বাষ্প বয়ে যাবে, অগ্নিকে চেখে চেখে।


অবনীর আড্ডাখানায়

আমায় ডেকো না,
একটু সুন্দর করে নাক ডাকতে দাও।
বেদনার ও সুখের তন্দুরী চিবিয়েছি
আর স্বপ্নের ঘরে তোলপাড় করে চলেছি।
কেন ডাকো, কড়া নাড়ো।
ডেকে যাও, তোমাদের আড্ডাখানায়।

আমায় ডেকো না
আমি খুঁজে চলেছি,
আমাদের পিতৃপুরুষের ঠিকানা।
কোন শ্রদ্ধাবান আত্মারা, আসছে
অবনীর আড্ডাখানায়!
কোন আত্মা পৃথিবীকে রক্তাক্ত করে যাবে
তাদের গোপন ঠিকানা খুঁজে যাই।
আমায় ডেকো না
খুঁজে নিতে দাও
শান্তির পথ, অবনীর আড্ডাখানায়।


ফিরে আসে অশ্বমেধের ঘোড়া

কি সেই গোপন ব্যাথা
খস্ খসে বাতাস শুনিয়ে যায়।
কি সেই গান কুলু কুলু গেয়ে যায় নদী।
জোনাকিরা আঁধারে
ভেসে ভেসে কাহারে খোঁজে।
এই যে ভোর আসে, শীতল কুয়াশা ঘিরে।
ফিরে আসে জন্ম ও সভ্যতা,
অশ্বমেধের ঘোড়া।
হে মহাতস্কর,শব্দরত্নে
শব্দচোর, মহাপ্রেমিক।
শব্দস্নান সেরে, ধীরে ধীরে
ঢুকে পড়ি অগ্নিঘরে।
ওই দেখ আসন পেতেছে শব্দদেবী,
বিদ্যুতের মহামন্ত্রে, অর্নজ ঝরে।
আমি শব্দসরসীর তীরে,
বসে আছি অনন্তকাল ধরে।
ফিরে আসি আত্মজ হয়ে,
ব্রহ্মবীজ হয়ে অশ্বমেধের ঘোড়া।


আমি পুড়ে যাবো, উড়ে যাবো, মাটি হবো

ওই দেহ জ্বলে যায় রুদ্রাবাসে।
আমি মিশে যাবো, বায়ু-মাটি আর নদীতে।
তোমারই অঙ্গনে বাতাস হয়ে বয়ে যাবো।
মাটি হয়ে বৃক্ষ ও ফল হবো, বর্ষা হবো।
ভিজিয়ে দেবো তোমার উর্বর শরীরকে।
এইভাবে বেঁচে রবো অবনীর দুয়ারে।
ওইখানে জ্বালিও, আমি যজ্ঞ হবো।
আহা আমি পুড়ে যাবো, উড়ে যাবো, মাটি হবো।
ঘুরে ঘুরে পৃথিবীর আদিরসে মগ্ন হবো।
শব্দখণ্ডে জ্বালাও, পোড়াও অক্ষর দিয়ে।
পাখির কূজন হবো, কবি হবো ব্রহ্ম শব্দে।
নিনাদে নীরবে জড়িয়ে রবো পঞ্চভূতে।
ভূমি হবো বৃক্ষ হবো, তোমার আঙিনাতে

জন্ম হবো মৃত্যু হবো, অবনীরে ভালোবেসে।


অন্ন

সেই যে মাটির উনুনে, কনকপ্রভা ধান,
মাটির হাঁড়ি ভর্তি, জননী-
গনগনে আগুন জ্বালিয়েছে।
সোনালি বাঁশ পাতা জ্বলছে, উল্লাসে।
ওই দেখ ক্ষুধার সুবাস, ধুম্রজালে
ম ম কর’ছে, আগুনকে খুঁচিয়ে দাও,
হব্য হোক তোমার তাপে।
নৈবেদ্য হোক আত্মার জঠরে।

এইভাবে অন্ন আসে,
কৃষকের হাত ধরে।
সমগ্র গ্রামে ভাত সেদ্ধর আতর ছড়ায়।
জননীর হাতে মাটির উনুনে
আগুন কেমন খেলা করে।
জন্মবীজ কেমন নৈবেদ্য হয়ে যায়।

১০
কবিযজ্ঞ

শব্দকুন্ডে ডুব দিই
হে মঘবা, জ্বলে ওঠো কবিকুণ্ডে।
হে দ্রুতগামী শব্দ, দীপ্তিমান হও
অংশুমতী নদী তীরে।
জ্বলে ওঠো যুদ্ধ শব্দে,
হব্য গ্রহণ কর কবি শব্দের।
হে ব্রহ্মজন্মা, শব্দরসের কবি।
মনুষ্য হই, দেবতা, অন্ন
ফসল হয়ে উঠি কৃষকের ক্ষেতে।
শ্রমিকের শব্দশিল্প হই।
সুখের শব্দ হই, বেদনার ঘরে।
এইতো মহাশব্দে মগ্ন হই।
ডেকে আনি দেবতাদের,মনুষ্য জন্মে।
জ্বলো অগ্নি, শব্দ জ্বলো, শঙ্খ বাজো
সৃষ্টির কবিযজ্ঞে।

১১
ব্রহ্মশব্দ

আমার বেদনা কড়া নাড়ে।
ফিরে আসে বারে বারে।
এইতো মায়া, জীবাত্মার ষোড়শ কলা।
চলে যাবে, তবু মমি হয়ে সেজে রবে।
তবু তুমি পিণ্ড খাবে, তর্পণ নেবে।
সেজেগুজে ইতিহাস হবে।
এই আমি কবি,শব্দের দোয়াত দানি।
লিখে চলি বেদনার উপনিষদ।

ওই যে একদিন উই ঢিপি হয়ে
মহাতস্কর, মহাকাব্য হয়ে গেলে।
অন্ধ হয়েও দেখেছিলে
শত পুত্রের মৃত্যু যন্ত্রণা।
শ্মশানচারি রাজন, পুত্রের সৎকারে,
বেদনা কড়ানেড়ে যায়।
এই আমি কবি, রচনা করি বাল্মীকি।
ব্রহ্মাণ্ড শব্দসরসীর, ব্রহ্মশব্দ হই।


বাবলু গিরি

বাবলু গিরি

বাবলু গিরি। জন্ম কলকাতায়। প্রথম জীবন মেদিনীপুরের গ্রামে। পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশুনা। গত শতকের সত্তর দশকের শেষের দিকে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি লেখালেখি শুরু এবং কবি নজরুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত ‘ছায়ানট’ পত্রিকার সম্পাদনা; এছাড়া ‘সিনে ক্লাপ্সটিক’ নামে একটি পত্রিকার সহ-সম্পাদনা এবং ‘কলাকুশলী’ নামে আরো একটি পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন। অল্প বয়সে পিতা সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়ায় জীবনে প্রচুর চড়াই-উৎরাই আসে। অর্থের মোহে মুম্বাই আসা এবং সেখানে বিভিন্ন মিউজিক কোম্পানিতে জেনারেল ম্যানেজার পদে চাকরি। বর্তমানে ব্যবসাসূত্রে মুম্বাইতেই স্থায়ী বাস। দীর্ঘদিন সাহিত্যজগৎ থেকে অন্তরালে থাকার পর এখন ‘দে’জ পাবলিশিং-এর ‘কমলিনী’ থেকে একটি কবিতার বই প্রকাশিত এবং শিঘ্রই আরো একটি কাব্য বেরুতে যাচ্ছে এ প্রকাশনী থেকে।

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E