৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ০১২০১৭
 
 ০১/০১/২০১৭  Posted by
অরুণ মিত্র

অরুণ মিত্র

আমার জন্ম ১৯০৯ সালের শেষদিকে যশোর শহরে। একটু বড় হয়ে আমি যদিও কলকাতায় চলে আসি তবুও জন্মস্থানের সঙ্গে আমার সংস্পর্শ অক্ষুন্ন ছিল। আমার শরীর মনের পুষ্টি আমি সেখানেই আহরণ করি। একদিকে যেমন আমার দুরন্ত সঙ্গীদের সাহচর্যে গ্রামীণ প্রকৃতির পরিবেশে আমি উচ্ছাসিত হয়েছি, অন্যদিকে তেমন ঐ শহরেই আমার মামার বাড়ির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আবহাওয়া আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে মানব-ভাবনায়। এই দুই উপাদানে গড়ে উঠেছে আমার কবিতার মূর্তি ও স্বভাব।

মানুষের ভাবনা অন্য একভাবেও আমাকে প্রভাবিত করেছে আমার মনে হয়। তা বাস্তবক্ষেত্রে আমার মনোভাবে এবং আচরণে বিভাজন বিলুপ্ত করে দিয়েছে। সেখানে শিক্ষিত অশিক্ষিত, কবি অকবি, বুদ্ধিজীবি অবুদ্ধিজীবি ইত্যাদি ভেদরেখা নেই। যে-কোনো হৃদয়বান মানুষকে ঘনিষ্ঠ বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে আমার বাধে না। প্রসঙ্গত বলি মানব-অনুভূতিই আমাকে বেশ অল্পবয়েসে আকৃষ্ট করে ফরাসী সাহিত্যের প্রতি—ভিক্‌তর য়ুগোর উপন্যাস “লে মিজ়েরাব্‌ল্‌”-এর বাংলা অনুবাদ মারফৎ সেই সূত্রেই পরবর্তীকালে আমার ফরাসী ভাষা ও সাহিত্য চর্চা।

বিশ্বচরাচরের কেন্দ্রে মানুষ এবং তাকে বাদ দিলে জীবনের কোনো তাৎপর্য নেই, এই বোধই আমার দৃষ্টিকে টেনেছে মানবদশার দিকে। এ-দশা আমাদের কালে এবং আমাদের পৃথিবীতে এক অভিশাপের মতো, যেখানে “সুখ শান্তির গায়ে শুক্‌নো রক্তের দাগ” লেগে থাকে। এর বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই আমার মন বিদ্রোহী আর সেইসঙ্গেই এক সুস্থ মানবিক ভবিষ্যতের কল্পনায় আপ্লুত।

সমগ্র নিসর্গপ্রকৃতি এবং প্রাণীজগৎ জড়িয়ে সেই দিকেই আমার চিরন্তন মানসিক যাত্রা। আরম্ভকালের উচ্চকন্ঠ বিক্ষোভ অবশ্য অচিরে রূপান্তরিত হয়েছে অস্থিমজ্জার একান্ত উচ্চারণে, কিন্তু আমার ঐ চলা কখনো থামেনি। এ-পথের অভিজ্ঞতাই আমার সমস্ত প্রকাশের পট। সেখানে শিশু ও বয়স্করা সমান প্রত্যক্ষ। সেখানে আশা ও নৈরাশ্যের, প্রেম ও বিচ্ছেদের, উল্লাস ও যন্ত্রণার বিরামহীন দ্বন্দ। সান্তনাদায়ক সরল কোনো ছবি নয়। বুলার হাত ধরে বর্তমানকে ছাপানো অন্য এক সময়ের কথা এবং তার ছোট্ট মুঠোয় ধরা আশ্বিনের সূর্যের নিচে আমার বাংলাদেশে পৌঁছনোর কথা আমি যেমন বলেছি, তেমন বুলার আর্ত মুখও আমি দেখেছি। আর কামিলার কাছে যাবার জন্যে আমি এক রক্তপথ হাতড়ে এগিয়েছি। কখনো বা বিষাদকে চাপা দিয়ে শ্লেষে এবং আত্মবিদ্রূপে আমি নির্মম হয়েছি।

তবু সংগ্রাম ও স্বপ্ন ক্ষান্ত হয়না—“তুমি সম্পূর্ণ ভূমিসাৎ হওয়ার আগে তোমার মশাল নিতে প্রস্তুত/ শতছিদ্র ভাই বোনেরা/ তারা পরপর সময়ের সীমান্ত পায়ে দলে এগোবে,/ ততক্ষণ চলুক তোমার লড়াই/ শূন্যতার বিরুদ্ধে”। অথবা বলি— “তারা যতই বিজয় তোরণের দিকে ততই রক্ত ছোটে তাদের জখম থেকে”। কখনো-বা এইভাবে—“দুই মাথার উপর বাতি জ্বলবে বাতি বটে আনাচ কানাচ মুছে দিয়ে আপন করে চেনানো তারপর রজনী প্রভাত হইলো জাগো হে”। আমার জীবনের সীমা যতদূর প্রসারিত ততদূর পর্যন্ত আমার এই চলমান অন্বেষণ, যন্ত্রণায় বিদ্ধ আলো অন্ধকারে চিহ্নিত।
– কবি অরুণ মিত্র

অরুণ মিত্র -এর ৪০টি কবিতা


এই আমি

আমি কতবার যে নিজেকে বলি তুমি ‘ধন্য ধন্য হে’ । এটা আত্মনির্ভরতার যুগ। সুতরাং আত্মপ্রচার করতেই হয়। অবিশ্যি নেপথ্য ব্যবস্থাও আছে, কিন্তু তার কোনো প্রয়োজন আমার নেই। নিজমুখে বলাটাই আমি বেছে নিয়েছি।

আমি একজন অতি উৎকৃষ্ট (সর্বোৎকৃষ্টও বলা যায় হয়তো) অভিনেতা। যাঁরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে নাটক করে হৈ চৈ লাগিয়ে দেন, অনেক সময় বিশ্বজয় করেন, আমি তাঁদের দলে পড়ি না। আমি তৈরি-করা মঞ্চটঞ্চের ধার ধারি না। জীবনটাই আমার মঞ্চ।  আমার অভিনয়কে তা থেকে পৃথক করা যায় না।

এই মূর্হুতে যখন আমার হৃদপিণ্ড ফাটব-ফাটব করছে, তখন আমি তারুন্যের জয়গান গাইছি। আর যদি তার দুর্বলতার কথা ওঠে, তাহলে বলতে হয় হৃদয়দৌবর্ল্য আমার আজন্মর ব্যাধি। সেজন্যে মেয়েদের কাছ থেকে আমি স্বান্তনা পেয়েছি বরাবর। কিন্তু এখন যদি তারা জেনে যায় যে , আমার দু পাঁজরার মধ্যে ঘুরনকাঁটাটা বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম করেছে, তাহলে সর্বনাশ। তারা আর আসবে না। কাকে স্বান্তনা দিতে আসবে? সেজন্যে তারুন্যের কথাই বলে চলব আমি। বলব অভিযানের কথা । বলব চাঁদসূর্য নিয়ে খেলা করার অতিমানবিক অভিজ্ঞতার কথা। এবং তারই ফাঁকে একটু চুপ করে শুনে নেব ঘড়িটার টিকটিক। কারো বোঝার সাধ্যি নেই আমি অভিনয় করছি। জীন-অভিনেতা আমি। আমার আসল নকল তফাৎ করবে কে?


ডাকছি

পুরোনো কথা ঝলমলিয়ে ওঠে। সেই সময় আমি খুব উজ্জ্বলের মধ্যে প্রবেশ করেছিলাম যেমন হয় দেয়ালায়। তোমার দু চোখ ছেঁকে নিয়েছিল হীরেচুর, সে এক ভেলকি আলো আলোর ঢেউয়ে ভাসছিল আমার রক্তমাংসের শরীর ইটকাঠ গাছপালা-পশুপাখি আঃ কী ঝলক , আমার ঠোঁটে সেই স্বপ্নহাসি যেমন ফুটত শুনি খুব কচি বয়সে । কোনো ভাবনা কি কাছে ঘেঁষতে পারে তখন? তা তখনই পর্দা নামল ঝপাং। আর না, ইবার ফেরো হে জ্যান্ত শহরে।

সাঁকোটা ভিড়সুদ্ধ মড়মড় ভেঙে পড়ে । আমি ছিটকে যাই পাতালের দিকে। নামছি তো নামছিই আর মুঠো করে ধরছি ঝুরঝুর বালি পিছল নুড়ি। পড়তে পড়তে ভাবছি পুরোনো কথা আর তোমাকে ডাকার জন্যে ঠোঁট খুলছি। কী নাম যেন তোমার? কঙ্কাবতী? কাঞ্চনমালা? না, অমন রূপকথার মতন নাম কি তোমার হতে পারে কখনো? তবে কী? মুখে না আসুক, মনে মনে তার সঙ্গে কত যে মিল আসছে। পা হড়কায় না এমন সমতলের। পাপড়ি মেলেছে এমন ভুঁইচাঁপার।  সোনালি হয়েছে এমন ধানের, আর তাপজুড়োনো গানের, ভয়তাড়ানো চোখের, ঘুমের দাওয়ায় বিছোনো শীতলপাটির । না, রূপকথা না, জলমাটিমানুষের সত্যিকারের জায়গা চেনার মতন। তোমার সেই নাম ঘুরছে আমার শিরা উপশিরায়, লাল কণিকাগুলো চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে। শুনতে পাচ্ছ না? গলার আওয়াজ যদি মরে মরুক, তাতে কী? তুমি সাড়া দাও। আমাকে পা ফেলবার জমিতে টেনে তোলো।


ভালোবাসাবাসি

এই রকমই চলুক-না। সাপে নেউলে খুব ভাব। কুকুর বেড়ালেও। সাপের যদি পাঁচটা না হোক দুটো পা-ও বেরোত আর অন্যদের চার পা আলাদা নড়াচড়া করত, তালে গৌরনিতাই দৃশ্য হত। প্রেমের জোয়ারে ভাসছে ঘরবার চরাচর। দুপায়ে হাঁটা জন্তুরাও আলতো নেই, ছোঁয়াচেই আছে। শত্রু-মিত্র ভেদ মুছে গেছে। তুমি আমার মাথায় কাঁঠাল ভাঙো, আমি ভাঙি তোমার মাথায়। রস তো বেরোবে, তুমিও খাবে, আমিও খাব। রসের কোনো জাতবিচার নেই। রসিকরা তা ভালোই জানে।

আমদরবারে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শন এখন স্থগিত থাক। মনে মনে প্রদর্শন করো যত ইচ্ছে। কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু সামনাসামনি খালি প্রেম। যদি কোনো হতচ্ছাড়া গজগজ করে; ‘বেহায়া বজ্জাত’, হাসিমুখে থেকো, শুনেও শুনো না। যা মারবার মেরে যাও। আর প্রেম করো। প্রেমের বন্যায় ভাসি দাও আমদরবার। শত্রুমিত্র ভেদ নেই। লাভ-লাভ-লাভ-লাভ-লাভ মঁসিয়ে ভেরদু।


ন্যাতাপরা ছেলেমেয়েরা

ন্যাতাপরা ছেলেমেয়ে গলির এখানে-ওখানে এসে জড়ো হয়। আমার সঙ্গে তারা সোজাসুজি কথা বলতে পারে না, যদিও কথা তাদের বুক ঠেলে আসে। আমাকে দেখে তাদের ঠোঁট একটু খোলে, গোল হয়, ছড়িয়ে যায়। একটা নাম সেখানে পরিষ্কার আঁকা হয়। কোনো ঝড় ওঠে না, নিঃশ্বাসের বাতাস তাকে জড়িয়ে ধরে সমস্ত গলিটা পারাপার করে।

বারান্দা থেকে এখন কেউ আর হাত নাড়ে না। তবু রাস্তার আওয়াজ একবার সামনে এসে একটু থেমে পড়ে। যেন আশার বীজ এখানকার ধূলোতে বোনা হয়েছে। ফটকখোলা বাড়িটা বন্ধুতে জারিয়ে আছে। যে-ভয়গুলো প্রথমে জ়েঁকে থাকতে, বুলা তাদের হেসে হেসে তাড়িয়ে দিয়েছিল। তার হাসির টানে মানুষের চোখমুখ কোনো পাঁচিলে আটকা থাকতে পারেনি।

এক গাদা ছেলেমেয়ে আদুড়গায়ে ধূলো মেখে তাদের মিতালিকে কেবলই জিজ্ঞাসায় তুলে ধরে। তারা জানে না, এই ছোট উৎস থেকে বেরিয়ে ভালোবাসা পৃথিবীর চওড়া মোহনায় বিস্তৃত হয়েছে।


রিক্সাওয়ালা

রিকশার চাকা দুটো ঘুরতে-ঘুরতে এইখানটায় এসে দাঁড়ায়। আমার বাড়ির সামনে অপেক্ষা করে।

যে লোকটা চালায় একদিনও তার কামাই নেই, এই বিষম ঠান্ডাতেও না। এমনকি তাকে দেখে আমার চেনবার কথা নয়, কারণ তার মুখটা রোজই বদলায়। চাকা দুটোর ঘোরা থেকে চিনি।

সন্ধের পর ছেলে-বউকে অন্ধকারের মধ্যে ঠেলে দিয়ে সে বেড়িয়ে পড়ে। কোন মহল্ল থেক তা আমার কাছে পরিস্কার নয়। শুধু এইটুকু বুঝতে পারি, ভুতুড়ে আলোগুলো পার হয়ে গেলে একটা যে প্রকান্ড শীতের রাত পড়ে, তার ওপারে সে থাকে। যেখানেই থাকুক কিছু আসে যায় না।
আমার বাড়িটা যে তার চেনা, আমাদের দুজনের পক্ষে এটাই বড় কথা।

শীতের ঢেউ যে সব রাস্তায় আছড়ে পড়ে সেই সব রাস্তা দিয়ে রিকশা চড়ে আমি অনেকবার গিয়েছি। তখন মানুষটার মধ্যে আগুন গনগন করতে দেখেছি, যেন তার অস্থিমজ্জা জ্বলছে।
আমার গায়ে সেই আঁচ এসে লেগেছে। তার সুতির ফতুয়াটা তখন তীব্রভাবে উড়তে থাকে এবং আমার ভয় হয় আমার গরম জামাকাপড় বুঝি দাউদাউ করে জ্বলে উঠবে। কিন্তু না, প্রত্যেকবারই সে ভুতুড়ে আলোগুলোর ভেতর দিয়ে আমাকে আবার এখাে ঠিকমত পৌঁছে দিয়েছে। এমন কি, তার বাড়িটা যে একসময় খুব কাছাকাছি এসে গিয়েছিল, এ অনুভুতিটাও আর লেশমাত্র থাকেনি। আজও সে আমাকে নিয়ে শীতের রাতের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়বে এবং নিরাপদে আবার ফিরিয়ে আনবে।

খুব সম্ভব কোনো একদিন সে আর আসতে পারবে না। ভেতরের আগুনটা নিবে গিয়ে সে ঠান্ডায় জমে পাথর হয়ে কোথাও পড়ে থাকবে। কিন্তু তা বলে রিকশার চাকা দুটো তো মাটিতে গেড়ে যাবে না। তারা আবার ঘুরবে এবং তাই থেকে আমি বুঝব সেই রিকশাওয়ালা হাজির হয়েছে, এখন যেমন বুঝি। এটাই আমার কাছে এক স্বস্তি।


অমরতার কথা

বাসনগুলো একসময় জলতরঙ্গের মতো বেজে উঠবে। তার ঢেউ দেয়াল ছাপিয়ে পৃথিবীকে ঘিরে ফেলবে। তখন হয়ত এই ঘরের চিহ্ন পাওয়া যাবে না। তবু আশ্চর্যকে জেনো। জেনো এইখানেই আমার হাহাকারের বুকে গাঢ় গুঞ্জন ছিলো।

আমার বদ্ধ বাতাসে যে-গান পাষাণ হয়ে থাকে তা ভেঙ্গে ছিটিয়ে পড়ুক, কল্পনার স্বর সমুদ্র হোক এই আশায় আমি অথৈ। অবিশ্রাম অনুরণনে পাঁচিল ধ্বসে যাবে, কলরোলে ভিটেমাটি তলাবে। তখন ঘূর্ণির পাকে বুঝে নিয়ো কোথায় সেই বিন্দু যেখান থেকে জীবন ছড়িয়ে পড়লো মৃত্যুর গহ্বরে।

কাঠকুটো আসবাব আবার বন্য হ’য়ে উঠবে। ওরা কচি পাতার ঝিলিমিলি মুড়ে ঝিমোয়, ভিতরে ভিতরে কোথায় হারিয়ে থাকে অঙ্কুরের ঝাপটানি। তবু সূর্য ডুবলে আমার চোখে বার-বার ঘনিয়ে আসে বন।

ওরা আবার বন্য হ’য়ে উঠবে। আমার ছাত দেয়াল মেঝের শূন্যতা ভ’রে অরণ্য জাগবে। সবুজের প্রতাপে এই শুকনো কাঠামো চূর্ণ হবে। সেই ধ্বংসের গহনে খুঁজে নিয়ো আমার বসতি, সেখানে পোড়া মাটি-ইটের ভিতরে রস ছিল অমৃতের মতো।


ছাই

এমন ছাই উড়ছে কেন রে, এত ছাই ? দিন নেই রাত নেই সর্বক্ষণ উড়ছে।
থামতে দেখছিনা এক সেকেন্ডও। আমার কোনো কিছু করার কি উপায় আছে? কবিতা লিখব, ধীরে সুস্থে ভাবব ছন্দ মেলাব ছত্র মেলাব, তা না তক্ষুনি চোখের পাতায় এসে নেমে পড়ল ছাই। আমার খিদে পেয়েছে, ভাত মুখে দিয়েছি, ওঃ ছাইয়ে মাখামাখি। দাঁতে দাঁত চেপে বা মুখ গোমড়া করে হাসিঠাট্টায় গল্পগুজবে মেতে যাওয়া, সে তো মনুষ্যজন্মে অসাধ্য। হাঁসজারু জন্ম হলে বোধ হয় ……

যাই হোক, ঝুঁকির মধ্যে থাকাটা আর ঘোচেনা। হয়ত জমজমাট পাঁজর-দোলানো ফোয়ারা ওঠানো কোনো কথাকাহিনী মনে এসে গেল, ব্যস জেই মুখ খোলা অমনি ছাই! এমন কি ঘুমের মধ্যেও ঢুকে পড়ে ছাইমাখা দুঃস্বপ্ন! একটু যে সুখভালোবাসার স্বপ্ন দেখব তার জো নেই! নিদ্রায় জাগরণে অষ্টপ্রহর এই!
কেনরে এমন ছাই, এত ছাই?

ও মেয়ে তুই বল্‌তো আমায় এ কি তোর শরীর পোড়া ছাই?


বাড়ি

চুনবালি খসার বিরাম নেই। ইটের জিরজিরে পাঁজর সামান্য একটু নিশ্বাস নিলেও নড়ে ওঠে। ভেতরটা আর ঢেকে রাখতে পারে না। কাঠের আঁশগুলো আস্তে আস্তে ছেঁড়ে। সরু ফাটল বেয়ে বুক থেকে রক্ত চুঁইয়ে নামে। এবং একটার পর একটা ফোঁটা সমুদ্রের মতো কোলাহল করতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

পোড়-খাওয়া জোয়ানবয়সি চেহারাটা চৌকাঠের ওপর স্থির হলে ছবির তন্ময়তা আসে। জ্বলন্ত বেলা তাঁকে অনবদ্যভাবে ধরে, এমনভাবে তাকে ফুটিয়ে তোলে যে মনে হয় তার ব্যর্থতাই এক অক্ষয় মহিমা। ঝিঁঝিঁর ডাক এসে ধাক্কা না দেওয়া পর্যন্ত তার একটা রেখাও ভাঙবে না। ততক্ষণে ঘাসগুল আরও শুকোবে, উচ্ছেপাতা আরও হলদে হবে আর লাঠি ঠুকঠুক-করা বুড়ি দরজার ফাঁক দিয়ে একশোবার বাইরে তাকাবে।
সূর্যাস্ত যে এত কাছে তা ভাবা যায় না। হঠাৎ পূর্ণিমা বা অমাবস্যার টান এসে লাগে। তখন সামাল-সামাল। ভিত পর্যন্ত চড়চড় করে ওঠে। বাড়িটা নোঙর ছিঁড়ে বুঝি ভরাডুবির দিকে ভেসে যাবে। করবার কিছু নেই, শুধু নড়বড়ে দেয়ালের মধ্যে মেঝে আঁকড়ে শুয়ে থাকো। ওর উপরই তো একদিন মা তার কোলের শিশুকে সম্রাট মনে করে শান্তি পেয়েছিল…


নিয়ন-আলোর ভিতরে

নিয়ন-আলোর ভিতরে ঘরবাড়ি নটনটী। আমার সঙ্গের ভাবনা-চিন্তাগুলো আমি পায়ের নিচে মাটিতে চেপে ধরেছি এবং চোখের সামনে এই নীলকে অপার্থিব সত্য হয়ে জ্বলতে দিয়েছি। কারও কোনো চেনাচিনির ধাঁধাঁ নেই, সাজসজ্জা রং আসবাবপত্র উষ্ণ ঘনিষ্ঠ হয়ে আছে।

আপাদমস্তক সমঝদার ব্যবহারে রাত ঘোরালো হয়। আর দেরি সয় না। চলো এবার ভারহীনতার চূড়ান্তে উঠে যাই। শিকড়গুলো কাটা হয়ে গেছে, আমাদের বুকের মধ্যে আর কোনো অভিকর্ষ নেই। আমাদের মেদমজ্জা একশো কোটি যন্ত্রণার বাইরে রয়েছে। এসো এইবার তাদের মহাশূন্যে বাজাই।
গূঢ় আলাপের যতখানি নিকটে আসা যায়, আমি এসে পড়েছি। এখন বানানো দিগন্তে সূর্য ওঠার খাতিরে আমাকে একটু ঘুমিয়ে নিতে হবে।

১০
জন্মভূমিতে

প্রপাত আমি দেখিনি। আচমকা জল আর পাথরে কেউ কেউ গম্ভীর আশ্বাস শুনতে পেয়ে আমাকে এসে বলছে। কিন্তু ও-কথা আমার কাছে যথেষ্ট নয়।
আমার নিরিখ এই : আমি তার একান্ত নিকট হতে পারি কিনা, সে কতখানি যন্ত্রণা কতখানি-আকুলিবিকুলি কতখানি ছোঁয়া আমাকে দিতে পারে। এর কোনো সঠিক উত্তর না পাওয়ায় আমি আর আগ্রহ বোধ করিনি। আমার মনে হয়েছে, তুমুল লাফের মধ্যে শক্তি অবশ্যই আছে, কিন্তু তার আশেপাশে এমন সব লিপ্সার দৈত্য বড়ো হয় যারা আমার আত্মার সঙ্গে শত্রুতা না করে পারে না।

নিশ্চয়তার আর এক নাম জন্মভূমি। আমার জন্মভূমি আমাকে হঠাৎ দিশেহারা করে না। আমি নামতে পারি না এমন কোনো খাদ এখানে নেই, আমি এগিয়ে যেতে পারি না এমন কোনো পথ এখানে নেই। সে আমাকে খুব দুঃখ দেয়, আমাকে খুবই আপন করে। এবং আমাকে সে তীব্রতম প্রতীক্ষায় রাখে।

মাড়ানো ঘাসমাটির সমতলে আমার জন্মভূমি আমাকে সব চিনিয়েছে। যখন শস্য ছিল তখন শস্য দিয়ে এক-একটা মস্ত চিহ্ন ফেলেছে। শস্য লোপাট হওয়ার পর সেই চিহ্নগুলোকে আরও পরিস্ফুট করেছে।

না, আমার বাঁচবার চৌহদ্দিতে কোনো জলের গর্জন নেই। শুধু একটা মন্থর প্রবাহ আছে। মাঝে মাঝে তাও আবার যায়-যায় হয়। সূর্য তাকে অনেকখানি শুষে নেয়। কিন্তু কখনও তা একেবারে মরে না। আঁজলা করে তৃষ্ণা জুড়োবার জল আমি যে-কোনো সময় পাই।

আমি জানি এই প্রবাহ একদিন আমার ভস্ম বয়ে নিয়ে যাবে। এবং আমি জানি এই জলে একদিন আমার আকাঙ্খারা ফলে উঠবে। এই প্রবাহ আমি চৈত্রেও তোমাকে দেখাই।

১১
গ্রীষ্মকেই তারা

গ্রীষ্মকেই তারা উৎস বলে জানে।

তাদের প্রণয় বা বন্ধুত্ব কোনো ধারাজলে পুষ্ট হয়নি। রক্তের মুখে উষ্ণ হাতের চাপ তাদের অনুভবে রয়েছে। কাঁকরে আর আগাছায় তাদের শরীর ছিঁড়েছিল এবং সেই প্রথম তারা দিনের ভগ্নাংশগুলোকে একত্র হয়ে তপ্তকাঞ্চন বর্ণে ফুটতে দেখেছিল। তখন থেকেই মমতার জাদু তাদের সামনে দুপুরের আচ্ছন্ন বীথি মেলে রেখেছে। তারা রোজ সেখানে দু-দণ্ড গা এলিয়ে দেয় এবং স্মরণে আনবার চেষ্টা করে কোন কোন উত্তাপের লগ্নে তারা আবিষ্কৃত হয়েছিল।
আরও বড় ক্ষত যখন গোপনে বুকের ভিতর হয় তখন আঁধি আছে। ধুলোর ঘূর্ণিতে উত্তাল বাঁচার আস্বাদ তারা নিশ্বাসের সঙ্গে নেয়। সেখানে অবশ্য একটুও স্থিতি নেই। কিন্তু তারপরই তো চুম্বনের লালে শেষ বেলাকে ঢলতে দেখার শান্তি।

কোথায় এক রাজ্যে নাকি বিশল্যকরণী জন্মায়। তার অলৌকিক কাহিনি তারা প্রায়ই শোনে। কিন্তু রোদের বাস্তব থেকে মেরুসমান দূরে সে কি কোনো মৃত দেশ নয়? হঠাৎ উন্মনা হয়ে যাওয়ার পর তারা আবার স্পষ্টতায় ফিরে আসে।
গ্রীষ্মের কাছে বিদায় নিলে ভীষণ একলার পথ শুরু হয়, তারা ভাবে।

১২
দিনলিপি

সকাল হতেই দোকানগুলো জেগে উঠেছে। নখদাঁত শানানো হয়ে গেছে। তবু ঠোঁটে মিষ্টি হাসির অলৌকিক টান। বাচ্চাদের হুল্লোড় লাগলেই মিটমিট করে তাকাবে। আহা, কী চমৎকার কচি শরীর সব। দ্যাখো, কাঁচের শার্শিতে মুখ সেঁটে দ্যাখো। তারপর এসে ঢোকো হাঁ-র মধ্যে যেখান থেকে কাউকে ফেরানো যায় না।

থরে থরে ফলে সবজিতে মারাত্মক রং। আমি নাড়াচাড়া করে দেখি আর আমার হাত বিষিয়ে ওঠে। তাদের গায়ে যেন পারমাণবিক ছোঁয়াচ। এই বিষ কী করে ছাড়ানো যায়? আমি বাগান থেকে ঘরে, ঘর থেকে বাগানে নিঃশত্রু বীজের ডানামেলা দেখতে চাই।

বস্তা উপুড় করে দিলেও মাত্র কয়েক মুঠো। শস্যের দানাগুলো রাস্তার শানের ওপর পড়ে। মনে হয় তারা ভেঙে গেল। কাঁচের মতো। তারা এমন ভঙ্গুর হয়েছে। ভেঙ্গেই যায় বোধহয়। তবু তাদের জন্যে কাড়াকাড়ি। কেন না খেতখামারের পথ নিষিদ্ধ হয়েছে। কেননা অঙ্কুরগুলো সোনায় বাঁধানো হয়েছে। ভাঙা ডানা ক-টাই দাঁতে তুললে বুঝবে জীবনের কত স্বাদ।

১৩
দু-জনকে দেখেছিলাম

গমের খেতে তাদের দুজনকে দেখেছিলাম। পাকা শিষগুলো উঁচু করে তুলে ধরেছে যেন সামনের সমস্তটা পথ তাতে আলোকিত হয়ে যাবে । চড়ুই বুলবুলিরঝাঁক তাদের হাতের নাড়া লেগে পালানোর পর সারা মাঠে তারা তাদের উজ্জলতা ঢেলে দিয়েছে। যেটুকু কুয়াশা ধুতি আর শাড়িতে তারা জড়িয়ে এনেছিল তাও আর নেই। কাছে এবং দূরে বাড়ি ঘর পাথর পুরোনো গাছের গুঁড়ি তখনও ভয়ংকর হয়ে আছে, কিন্তু সে-সবে ঘেরাও হয়েও তারা এক নিবিড় উৎসবের প্রবাহ ধরতে পেরেছে, আমার মনে হয়েছিল।
আমি আশা করেছিলাম আবার তাদের দেখা মিলবে। উদভ্রান্ত হাট থেকে বেরিয়ে এসে দুটো মুখের আদল দেখে থমকে দাঁড়ালাম। তারাই বুঝি গাঁয়ের আবছা কোণে দু-খানা পোড়া রুটি সামনে নিয়ে বসে আছে। কিন্তু এতছানি ব্যর্থতা আমার বিশ্বাস হল না। তাই আবার এলাম খেতের ধারে। তারা নেই। সারা মাঠ খাঁ খাঁ করছে। গমের যে-দানাগুলো ঝরে পড়েছিল সেগুলো খোঁজাখুঁজি করে কয়েকজন ধুলোর রাস্তায় উঠে এসেছে। তাদের জিজ্ঞেস করতে তারা চিনল
উত্তর দিল : এরা দু-জন তো সেই কোন কালে স্বপ্ন দেখতে চলে গিয়েছে।

১৪
পুরোনো চিঠি খুলতে গেলে

আমি যখন পুরোনো চিঠি খুলতে যাই, আমার বিশ্বব্রহ্মাণ্ড হায় হায় করে ওঠে অক্ষরের পেছনে ভাঁজে ভাঁজে বিপদ যেন ওঁত পেতে আছে এখুনি ঝাঁপিয়ে পড়বে, ওই আমরা প্রিয়রা টুঁ শব্দ যদি না শোনা যায়, অমন সুন্দর গলা অমন স্বরগ্রাম বাঁচা মরা বাঁচা একদিকে ভোর অন্যদিকে গোধূলি এই টানা সুর সুরের ঝড় আর অন্ধকারের দীপক যদি না শোনা যায়। মানুষগুলো ভালো ছিল মানে তাদের ভালোবাসা ছিল নইলে ভয়ংকর ঘৃণা, তারা আমাকে পৌঁছে দিয়েছিল গোলমোরের রাস্তায় রক্তদিঘিতে পদ্ম দেখিয়েছিল আর হাত চিৎ উপুড় করে বুঝিয়েছিল কোথায় থাকে মখমল কোথায় ইস্পাত। ম্যাজিকের মতো।

আমি বাইরের দিকে ঘুরে বসি, জঙ্গলবাড়িতে অন্য চলাফেরা সাদাকালোয় ওই সব হাতপায়ের ঝকমকে চালচলন নয় সবই আবছা, হঠাৎ দেখতে পাই চিঠির কাগজের ছবি চেনা-চেনা মুখের আদল ঝুঁকে পড়েছে নীচে জাহান্নমে, আমার সামনে সর্বনাশ।

১৫
মনে আসবে

প্রজাপতি ওড়ার ছোট্ট জায়গা। হালকা আর গাঢ় কিছু রঙে হাওয়া বুঁদ হয়। গুটিকয় মাত্র কুঁড়ি, কিন্তু তারা বুঝি সারা আকাশ জুড়ে ফুটবে। নরম জমিতে কয়েকটা উল্লসিত পায়ের দাগ। কারা ছুটে গিয়ে সূর্যের আলোর মধ্যে উধাও হয়েছে।

অস্থির উত্তাল খেতটা আরও দূরে। তবু এখান থেকেই দেখা যায় কাস্তেগুলো হঠাৎ অবাক হয়ে থেমে গিয়েছে। এক প্রতিশ্রুত অপরূপ আকাশ যেন তাদের ওপর। মাঠভাঙা দুরন্ত নিষ্ঠুর স্রোত থিতিয়ে সোনার দিঘির মতো হয়েছে।

কিন্তু এখানে দাঁড়িয়ে থাকার সময় নেই। রোদের ভিতর নতুন নগর উঠেছে। বাড়ি ঘর রাস্তা যদি জ্যোৎস্নায় বা অন্ধকারে ডুবে যায় তাহলে প্রদীপ্ত উৎসব হবে কী করে? ঝাড়বাতি সাজাবার আছে, তোরণ তুলবার আছে। তারপর আবার নতুন নগর।

বড়ো বড়ো স্তম্ভের পেছনে হয়তো বন্ধুদের মুখ; তারা অভ্যর্থনা অভিনন্দন উচ্ছ্বাসের দমকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাবে। আমরা কেউ কারও খোঁজ পাব না। কিন্তু এ-জায়গাটুকুর কথা আলাদা করে আমাদের সবারই মনে আসবে। অশ্রুর পথ পেরোতে গিয়ে এখানে সবাই এক মুহূর্ত দাঁড়িয়েছি। একা একা।

১৬
এইবার শান্ত হল

সারাদিন ধরে হাপর ফুঁসেছে। এইবার শান্ত হল। আমি ঠায় সামনে বসে এই সময়টার দিকেই তাকিয়েছিলাম। অনেকেই আমার কাছে এসেছে এবং অবাক হয়ে আমাকে দেখেছে। তারা মনে করেছে আমি আগুনে ঝাঁপ দেবার এক পতঙ্গ, জ্বলে যাওয়ার আহ্লাদে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছি। আমার শরীরে মেঘের নেশা তারা টের পায়নি। সুতরাং বিশ্বাস করতে পারেনি এই সময়টা পর্যন্ত আমি টিকে থাকব।

তাপ ছেঁকে ছেঁকে আলোর ছোপ আমি আপাদমস্তক মেখেছি। তোমার অন্ধকার লেগে তা ঝংকৃত হবে বলে। আমার চামড়ার নীচে যে-মৃত্যু থমকে রয়েছে তার পটভূমিতে এই আলো তোমার সামনে ধরব বলে।

আমার আলস্য নিয়ে মেঘের খেলা একদা আমি দেখেছিলাম। প্রসন্ন মাটি দেখেছিলাম। তারপর আর তাদের সন্ধান নেই। কিন্তু বসে বসে আমি ভেবেছি সমুদ্র তো আমার চেনা, তার বাষ্পের হাওয়ায় আমি ছাড়িয়ে গিয়েছি। ভেবেছি ঘুমন্ত সব বীজ আমি ছুঁয়ে আছি। তাই অপেক্ষা করে থাকা গেল।

ধুলোর ফুলকিগুলো এখন নরম হবে, তোমার মন্তরের জন্যে স্থির হয়ে শোবে। ভোজবাজি কখন শুরু হয় সেই আগ্রহে আমি কতবার যে তাদের মুঠোয় ধরেছি আর ফেলে দিয়েছি তার ঠিক নেই।

এবার এসো। ঝরোঝরো বৃষ্টি নিয়ে তুমি এসো।

১৭
রাতের পর দিন

ঘুলঘুলি থেকে তারার আকাশ সরে গেল। ভেবেছিলাম আমাদের মিলিত বাহুর ধারা সেখানে উপচে উঠবে, বয়ে যাবে চারিধারে। কিন্তু তা হয়নি। আমার প্রত্যাশা পাথর হয়ে থাকল।

ভেবেছিলাম আমরা বাঁধ হব অন্ধকার প্লাবনের মুখে, কিন্তু বালির মতো ধুয়ে গেলাম।

তোমার চোখে তাকিয়েছিলাম, সাড়া পেলাম না। সে-প্রান্তরে আমার ডাক মিলিয়ে গেল। কোনো অশ্রুর গণ্ডি দিয়েও তুমি তাকে ঘেরোনি।

সকাল এল। শিশিরের রূপোর মাঠ খানখান হয়ে গেল এই মুহূর্তে। আমাদের জাদু লাগলে সেখানে পরির রাজ্য নামত, সেখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে শক্ত মাটির ঢেলা, অসাড় নির্জন পথ।

সকাল এল। আমাদের সদর দরজার কাছে শিউলির বরফের রাশ স্তূপীকৃত হয়ে পড়ে। কবে একে হটানো যাবে? দুই বুকের মাঝখানে ফোটানো যাবে দিনরাতের ফুল?

এখন আলোর স্ফটিকে কত নির্বাসিত মুখের ছায়া। তাদের সকলের স্তব্ধ শ্বাসের চাপে এই স্তব্ধতা কি ফাটবে না ?

হে বন্ধ্যা, তোমার গর্ভে যন্ত্রণা একবার নড়ুক।

১৮
শিশু

ছন্দ গেঁথে দেওয়া যেতে পারে
চোখ ফিরিয়ে দুলে বা না দুলে
অন্ত-মিল দেওয়া–তাও যায়
বন্ধ চোখে মন যা আওড়ায়
এই যেমন দিলাম এখন।
কিন্তু সে আমাকে এরকম করতে দেয় না যখন তখন নাটমঞ্চ ছরকুট করে চোখের দুই পাতার মধ্যে চলে আসে আদুড়-গা বাচ্চা। দিনরাত্তির বলে কথা নেই আস্তাকুঁড়ের পাশে বা ফুটপাথে বা ধসা দাওয়ায় রাত্তিরটা খুব ছোটো আর দিন তো জ্বলে ওই জায়গাগুলোর বুকে, ওইখান থেকে আসে। ওইখানে এইখানে অক্ষরের ছড়াছড়ি শহরের কাগজে কাগজে দেওয়াল জুড়ে ছয়লাপ শব্দের নকশা ঢাকঢোল চোঙে গেরামভর। কী করবে সে? মস্ত হাঁ করে কিন্তু অক্ষর সে খেতে পারে না শব্দ সে খেতে পারে না। খিদে খিদে খিদে। তখন হাপর থেকে ছিটকে পড়ে জ্বলুনি সমেত একেবারে আমার চোখের গোড়ায়। শীত গ্রীষ্ম বলে কথা নেই খোলা চামড়ায় বেজায় তাত লাগে। রাস্তা পুড়ে ছাই-ছাই অথচ তাত ঘষে তার ফুলকি ছিটোতে ছিটোতে এইখানে। ঠাণ্ডায় গরমে এমন। আহা নিষ্পাপ শিশু! কিন্তু সে কী করবে? আহা নিষ্পাপ–কিন্তু সহানুভূতি সে খেতে পারে না দরদ সে খেতে পারে না। খিদে খিদে খিদে। এত শব্দ আর অক্ষরের ফাঁকে তাঁর চিৎকার এইখানে আগুনে।

১৯
নিসর্গের বুকে

আমি এত বয়সে গাছকে বলছি
তোমরা ভাঙা ডালে সূর্য বসাও
হাঃ হাঃ আমি গাছকে বলছি
অন্ধকার হয়েছে আর আমি নদীকে বলছি
তোমার মরা খাতে পরী নাচাও
হাঃ হাঃ আমি নদীকে বলছি
থরায় মাটি ফেটে পড়ছে
আর আমি হাঁটছি রক্তপায়ে
যদি দু-একটা বীজ ভিজে ওঠে
হাঃ হাঃ যদি দু-একটা
নিসর্গের বুকে আমি হাড় বাজাচ্ছি
আর মাদারির মতো হেঁকে বলছি
এই আওয়াজ হয়ে যাবে একমাঠ ধান
ঝিঁ ঝিঁ হুতোম প্যাঁচা শেয়াল
আস্থায়ী আর অন্তরায় রাত ধুনছে
আমি বলছি একমাঠ ধান
হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ

২০
আর এক আরম্ভের জন্যে

আমি বিষের পাত্র ঠেলে দিয়েছি
তুমি প্রসন্ন হও।
আমি হাসি আর কান্নার পেছনে আমার প্রথম স্বপ্নকে ছুঁয়েছি
তুমি প্রসন্ন হও।
আমি অরণ্যের কাছে গিয়ে ঘাসের ফুলের উপর নত হয়েছি
অবাক হয়ে পুবের দিকে তাকিয়েছি
অবাক হ’য়ে ঝর্ণায় সোনার রং দেখেছি
আমার আশ্চর্য হওয়ার উপহার তুলে ধরেছি
তুমি প্রসন্ন হও।
আমি সূর্যের নিচে স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছি
প্রত্যেক রোমকূপ দিয়ে শুষে নিয়েছি রোদের বিন্দু
আর চৈত্র থেকে আষাঢ়ে আমাকে এগিয়ে দিয়েছি
তুমি প্রসন্ন হও।
আমি হাটে হাটে ভেসে এসে থেমেছি
মাটিতে পা গেড়ে দিয়েছি
ফুসফুসে ভ’রে নিয়েছি মহুয়ার আর ধানের বাতাস
আমের বোলের বাতাস
মনের মধ্যে এঁকে রেখেছি অঙ্কুর আর কিছু নয়
তুমি প্রসন্ন হও।
আমি জনতার মধ্যে শিশুর কণ্ঠ শুনতে পেয়েছি
আমি কোলাহলের খরজে আমাকে বেঁধে নিয়েছি
এই তো নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো উচ্চারণ করেছি মানুষ
আমি তোমার প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করতে পেরেছি
তুমি প্রসন্ন হও।

২১
খুঁজে আনো

ভোরগুলো সব বেমালুম হাওয়া,
নিরেট অন্ধকার থেকে জেগে
একেবারে দাউদাউ দুপুরে।
হাত বাড়িয়ে দিলেই ঝরা পাতা মরা পাতা
আর ইটভাঁটার মুঠোমুঠো ছাই।
কোথায় যে ফুটে আছে ঘুমছোঁয়া শিশিরচোখ
এলিয়ে আছে ভেজা নীলের আকাশ।
খুঁজে আনো ভোরগুলোকে, খোঁজো।

২২
টিটিপাখি

টিটিপাখি ডানা মেলেছে
এই বুঝি উধাও হল দিগন্তে
হয়তো দিগন্তেরও পারে।
তুমি উড়োনা টিটি,
এইখানে বসে তুমি গান গাও
আর গান যদি না আসে তবে কাঁদো
আমাদের এই হাসিকান্নার সংসারে,
সেই তো আমাদের বাঁচা
সত্যিকারের বাঁচা।
তুমি উড়ে পালিও না টিটি।

২৩
গোপনতা

নানা গোপনতার মধ্যে আমি বাস করি,
আমার পায়ের আঙুলে লেগে নুড়ি বাজলে আমি শুনি ঝর্ণা
সে-আওয়াজ কি আর কারো কাছে পৌঁছয়?
একটা ঝিঁঝির ডাক যেই ওঠে সারা বন অন্ধকারে দুলতে থাকে
আর সারা শূণ্য গাছপালার কথা চালাচালিতে ভরে যায়,
ছড়িয়ে পড়ে অরণ্যের ছায়া তারপর কাঁকরমাটির সবুজ
পাহাড় আঁকড়ে-ধরা শেকড়ের খবর আসে,
আমি তা বুকে চেপে রাখি। কেউ কি তা জানে?
কেই-বা জানে আমার রাজ্য-সমাচার?
অনেক গোপনতা ধরে রাখার ফন্দিও আমার অনেক,
যখন চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে শিরাতন্তু থেকে
আমি হোহো হাসিতে চমকে দিচ্ছি আকাশ,
দ্যাখো দ্যাখো কী ফুর্তিবাজ বলে কত হাততালি জোটে
তখন আমি যেন জয়গর্বে আরো ফুর্তিবাজ হয়ে উঠি,
আমি যে সময়ের চকচকে ধারের উপর পা রেখে হাঁটছি
আমি যে এগিয়ে যাচ্ছি প্রকাণ্ড পাথরচাঙের ফাঁকে
সে-কথা কাওকে আমি জানতে দিই না। কেন দেব?
আমি তো জীবনমরণ খেলায় কাওকে আমার শরিক করিনি।
আমার গোপনতা নিয়ে আমি আছি
সবাই দেখছে চিকচিক চোখের কোণ ঠোঁটের বাঁকা টান
আর আমি দেখছি মুহুর্মুহু মেঘবিদ্যুৎ
বুকের মধ্যে শুনছি সমস্ত ওলটপালটের বাজনা,
গোপনতায় আমি বুঁদ হয়ে আছি।

২৪
বাগান

এক বাগান ধুতরো নিয়ে বসে আছি
পোস্টারও লাগিয়ে দিয়েছি
অক্ষরগুলো জোর গলায় হাঁকছে;
‘যদি মরন চাও এসো যদি স্মরন চাও এসো’।
অনেকেই আসছে, আসবেই তো,
বাঁচার হ্যাপা কি কম?
খিদেতেষ্টা আছে প্রেমপীরিত আছে
ধুতরো খেলে সব জ্বালাযন্ত্রনা জুড়োবে,
অবিশ্যি তার আগে একটু ছটফটানি আছে
তবে সে আর কতক্ষনই বা
জীবনের চক্কর তার চেয়ে ভীষনরকম বড়।

কিন্তু ধুতরো বাগানে অনেকে আবার আসছেও না
তারা চলে যাচ্ছে অপরাজিতার কাছে
বিড়বিড় করে বলতে বলতে
‘ও বড় মধুর মরণ’।
তা যদি মনে করো, তবে অমনভাবেই মরো
তোমরা মধুরে মরো অপরাজিতায় মরো।
কিন্তু একবার ধুতরো বাগানে এলে পারতে
রূপলাবণ্য নেই বটে, তবে ধুতরো খেলে
সোজাসাপটা মরণ আছে
ধিকিধিকি জ্বলা নয় রূপসুবাসের জ্বালা নয়
দেখতে দেখতে ঢলে পড়া,
মরণ এবং বাঞ্ছা থাকলেও স্মরনও।

২৫
মধুবন্তী

আমাকে ছিঁড়ছে
কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলছে মধুমন্তী,
আমি শব্দ করতে পারছি না
আমার সব শব্দ গ্রাস করছে মধুমন্তী,
শব্দের যন্ত্রনা এক সুখ থেকে আরেক সুখে লুটিয়ে পড়ছে।
আমি কান পেতে শুনছি
কিন্তু কোথায় আমার কান,
কোন টুকরোয় জ্যোৎস্না হাসছে কোন টুকরোয় রোদের চিৎকার?
আমাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে কুরে কুরে ছড়িয়ে দিচ্ছে মধুবন্তী,
আমার লোমকূপগুলো খুলে যাচ্ছে ঘুরণস্রোতে
ধুয়ে যাচ্ছে তছনছ মুখ কপাল
থুতনির ঢাল বেয়ে অমৃতফোঁটা
ঝরে পড়ছে আমার জামাকাপড়,
আমি জিব বাড়িয়ে চাটব কিন্তু জিব কই?
আমি টেরও পাচ্ছি না কোন রন্ধ্রে আমার নিঃশ্বাস,
আমার ধুকধুক মীড়ে হলকতানে এলিয়ে পড়ে লাফিয়ে উঠে লণ্ডভণ্ড ।
এই মরণ, অথচ আশ্চর্য শোনো শোনো
মধুবন্তীর তুরপুন জড়িয়ে
গান গাইছে গুঁড়ো গুঁড়ো অরুণ
আমাকে নিয়ে কী জাদুগিরিতে যে মেতেছ তুমি মধুবন্তী!

২৬
কামিলার সময়ের ভিতরে

সকাল হতেই দেখি গরল ফেনিয়ে উঠছে,
তাহলে শিশির মাড়ায়নি আমা কামিলা,
ওর কপালই এমন।
কোনো চাপা গোঙানিও আমাকে পাঠায়নি,
যেমন ছিল রাত তেমন ভোর।
আমাকে এখন অপেক্ষা করে থাকতে হবে,
কিন্তু কোথায়, কবে পর্যন্ত?

আমার চারদিকে আওয়াজ শুরু হয়েছে
আমি টের পাচ্ছি হাড় ভাঙছে কলযে ছিঁড়ছে
আর মেশিনের জোড়দাঁত খুলছে বন্ধ হচ্ছে
ঠিক আমার সামনে।
এ হল কামিলার সময়
আমাকে উপহার দেওয়া আমার নেওয়া।

ও যখন ফিরবে তখন কি ধুলো হয়ে ফিরবে
আর-এক ধূলোয়?
 

২৭
একজন নিশ্চয় দাঁড়িয়ে

ট্রামবাসের ঝড় এইরকমই বয়,
ভোররাতের কুঁড়িটা মরে
আর আমি টলতে টলতে
তারস্বরে ঘন্টি লাগাই,
থামো,
বুঝি থামলেই আমি জমি পাব।

ওলটপালট হুহু পথ,
দোকানঘরের আগুন
দুই ধারে ছড়িয়ে যায়,
রাস্তার কোণগুলো গনগন করে।
আমার শিরার সব ঢেউ
চোরা পাথরে লাগে
আর আমাকে অস্থির করে,
এই থামো,
আমি এখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ব
যেখানে রাশ রাশ মানুষ ঘুরপাক খায়।
একসঙ্গে অন্ধকারে যাব
মাটির উপর দিয়ে হেঁটে
কখনকার সেই কথা আমি আঁকড়ে আছি।
আমার জন্যে একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে।
চৌরাস্তার কাছে
যেখানে ভীষন এলোমেলো টান
যেখানে সমস্ত মুখ ঘুরেযায়
আর অপেক্ষা করার জায়গাগুলো
হলকার ভিতরে কাঁপতে থাকে,
কাউকে ঠাওর করতে পারি না,
থামো, আমি এখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ি,
আমার জন্যে একজন নিশ্চয় দাঁড়িয়ে রয়েছে।

২৮
বাসে

সব আশ্চর্য বিষয় থেকে আমি সরে আসি
সরে আসতে বাধ্য হই।
কারণ?
সে তো এক অনন্ত সংখ্যা,
আপাতত দুটোই প্রত্যক্ষ;
একটা বাজারের খোকাথলি
আমা এক হাত আঁকড়ে,
আরেকটা বাসের হাতল হয়ে
আমার অন্য হাতে ধরা।
খোকা যদি হাতে পিছলে পড়ে যায়,
সর্বনাশ;
ঈড়া পিঙ্গলা সুষুম্না এবং তাদের
ছোট ছোট ভাইবোনেরা ডুকরে উঠবে,
হাহাকারে ভরিয়ে তুলবে
আমার মগজের একশ লক্ষ কোষ।
আর হাতল যদি শত্রু হয়ে
অন্য হাতকে ঠেলা দেয়
ঠেলতে ঠেলতে চাকার রহস্যে নিয়ে যায়
তাহলে বাস আর গুমটিঘর
বাজার শাকপাতা রূপোলি আঁশ
আমার জন্যে ঘুরতে ঘুরতে
পৃথিবীর অপরিমিত অন্ধকার হয়ে যাবে।

সাধে কি আমি ঝকঝকে দিনটার মধ্যে
খুব একলা নিবিড় নিবিষ্ট রয়েছি
বাসে?

২৯
আর একটু থাকো

তোমাকে এই স্বরব্যঞ্জনে রেখেছি,
তুমি তো মাঠের মেয়ে
খঞ্জনার নাচের মেয়ে,
তুমি ডানা ঝাপটাচ্ছ অনবরত।
আর কতক্ষনই-বা তুমি থাকবে এখানে
আমার এই কলমের নীচে?

তোমাকে ডাকছে রোদের আকাশ
ঝরন্ত ঘামের মাঠ,
এত ভালোবাসতেও তুমি পারো তাদের!
তবু বলছি তুমি আমার আঙুলের ডগায়
এই লাল বিন্দুতে একটু থাকো
আমাকে একটু শেখাও
কী করে রক্তলিপি লিখতে হয়
তারপর সেই ছাপ মাঠময়,
ভরা রোদের আকাশে
তোমার সঙ্গে জ্বলন্ত নাচের বর্ণমালা
আর  আমাদের ওড়া একসঙ্গে।

৩০
রাস্তা

রাস্তার কথা ছাড়া  কী আছে আর?
ঘরগুলোই তো রাস্তায়
উনুনের ধোঁয়ায় কচি আওয়াজ ঘুরছে,
জাদুখেলা চলছে
পুঁতির মালা পুতুল আর রঙিন ছবির,
ছাইগাদার স্বপ্নের চারা
ছোট ছোট পাতা নাড়ছে
খুকীর হাতের লাল রুলি
খোকার ধরা ঘাড়বাঁকানো ঘোড়া
বাতাস মজিয়ে দেখছে,
ক্ষুদে ক্ষুদে পাগুলোর শব্দ ঠিক গানের মতো।

অনন্ত নীল থেকে অনন্তপ্রসাদের গলা;
হেই রাত্রি হেই দিন
পাহাড় থেকে নদী বইয়ে দাও,
জলছপছপ ঘাসের ওপর দিয়ে খোকাখুকুরা
বড়োদের নিয়ে যাক গেরস্থালিতে,
রাস্তারা পড়ে থাকুক রাস্তায়।

৩১
ঘাসফড়িং

একটা ঘাসফড়িং এর সঙ্গে আমার গলায় গলায় ভাব হয়েছে,
ভাব না করে পারতামই না আমরা।
ঝিরঝির বৃষ্টির পর আমি ভিজে ঘাসে পা দিয়েছি
অমনি শুরু হয়ে গেল আমাদের নতুন আত্মীয়তা।
সবুজ মাথা তুলে কত খেলা দেখাল ঘাসফড়িং,
তার কাছ থেকে চলে আসার সময় আমার কী মনখারাপ
বলে এলাম আমি আবার আসব,
আমার ঘরের দরজা এখন সবুজে সবুজ।

এই আবার ঝিরঝির বৃষ্টি
আমি কথা দিয়ে এসেছি
ভিজে ঘাসের ওপর আমাকে যেতেই হবে আবার।

৩২
এখন খোলা আকাশ

চাঁদোয়ার লতাফুল গলে গিয়েছে
এখন খোলা আকাশ,
চাঁদ তারা সূর্য মেঘ ধ্বনির একই নীলে ভাসে,
এই নতুন শূন্যে আমি তাদের কাছাকাছি
বিলম্বিত লয়ে আমার স্বপ্ন অন্য সংসারে,
মহাজগতের কোনো ঘর
অসীম প্রান্তরের মর্মরে উদ্ভাসিত,
আমি দিনরাতের সীমানা পার হয়ে চলি।

কিন্তু বৃষ্টি নামে ।
হালকা সাদা মেঘ এমন ঘনঘোর হবে কে জানত?
আষাঢ় শ্রাবণ কলস্বরে ঝাঁপিয়ে পড়ে
আমার চোখে মুখে চেতনায়,
ঘুমন্ত উপকূল ভাসিয়ে সমুদ্রও এসে যায়
আর বাতাসে ভরে পঞ্চমুখী শাঁখ;
গুরুগুরু মেঘ সমুদ্র হৃৎপিণ্ড
ধমনির বিদ্যুৎ গমক
উতরোল নির্জনতা।

বৃষ্টি থামে।
ঘাসের ডগায় কচুপাতায় টলটলে ফোঁটা,
সুস্থির নিশ্বাসে তাদের ধরে রাখতে হয়;
আলোর দিকে অন্ধকারের দিকে মিড়
আমাদের চিরকালের আপন বসুন্ধরা
ললিত রঙের ছটা পুবে
পটদীপে সাজানো সন্ধ্যা
গম্ভীর রাত্রি যোগে আবিষ্ট প্রাণ ।

কখন আমি চোখ বন্ধ করেছি জানি না,
উত্তরঙ্গ পথের ওপর শান্তির আভা ফুটছে দেখি।
পাশ থেকে কে একজন জিজ্ঞেস করে কটা বাজল;
কী করে বলব?
আমি তো সময়ের আরম্ভে রয়েছি।

৩৩
একটি সূর্যাস্ত

সোনার রোদে অস্ত্রগুলো ফুটে উঠেছে
রক্তস্রোতেও আহামরি আভা।
আমি একেবারে বিভোর হয়ে গিয়েছি,
দৃশ্যের এমন বদল আমি কি ভাবতেও পেরেছিলাম কখনও?
আমার সামনে ছিল ধানক্ষেত সোহাগি মাটি
দৃষ্টির সীমায় নদীর রহস্য।
সেখানে অন্ধকার ফেটে বেরিয়ে চারাগুলো বাড়ছিল,
জোয়ান জোয়ান হাত
আকাশটাকে খুব উঁচু করে তুলে ধরেছিল
এবং ছেলেমেয়েরা প্রজাপতিদের সঙ্গে ঘুরঘুর করছিল।

এ যাবৎ কোনো দিনান্তই আমাকে নাড়া দেয়নি,
কিন্তু আমার সাধ ছিল বলবার মতো একটা সূর্যাস্ত দেখব।
তা, দেখা গেল শেষ পর্যন্ত,
অতঃপর বারান্দাটা যদি ভেঙ্গে পড়ে পড়ুক।
এই মুহূর্তে বিখ্যাত সূর্য ঝুলে পড়েছে
এবং ইস্পাতের পঙ্গপালের ওপর শোভা ঢ়ালছে,
আমি যাদের দেখেছিলাম তারা কেউ আর স্পষ্ট নেই
কেন না তারা শস্যের গলা জড়িয়ে মাটিতে লুটিয়ে রয়েছে,
আমি বারান্দায় স্তব্ধ দাঁড়িয়ে,
তীক্ষ্ন উজ্জ্বল ফলক থেকে
আমার ওপর রক্তের রং ঠিকরে পড়ছে।
আমি এক অসাধারণ সূর্যাস্ত দেখছি।

৩৪
বসন্ত-বাণী

বসন্তে আহ্বান এল : অস্ত্রে অস্ত্রে প্রতিরোধ করো,
তড়িতে আঘাত তীক্ষ্ন অব্যর্থ সন্ধানে হানো দেখি।
শীতের তুষার ক্ষয়ে রক্তের প্লাবন খরতর;
আকাশের শ্যেন দৃষ্টি, জলস্হল ক্ষুরধার যেন।
বসন্ত-বিহ্বল লোভ ঘিরে নিল ঘরে ও বাহিরে
সর্ব অঙ্গ । অনিবার্য আমন্ত্রণ সকলের কাছে;
প্রবেশের দ্বার খোলা নিষ্প্রদীপে সশস্ত্র শিবিরে।
শৃঙ্খলার সমারোহে স্তরে স্তরে সংঘাতের বীজ;
প্রত্যক্ষ মৃত্যুর ফাঁদ দেখে নেওয়া চূড়ান্ত এবারে,
অবিশ্রাম উন্মাদনা বিস্ফোরণ আনুক নিকটে।

বসন্তে-বাণী জ্বালা। ধ্বংসের প্রাচীন অধিকারে
একাত্ম অস্ত্রের শানে শেষের অধ্যায় গাঁথা আছে

৩৫
সময়

সময়কে নিয়ে অনেক মজা দেখা গেল।
কখনও তাকে ইন্দ্রধনুর রঙে রাঙানো হল,
কখনও হাসিতে উছলে তোলা হল
বা চাপা কান্নায় কাঁপানো হল,
কখনও-বা তাকে হৃদয়ে হৃদয়ে
বাজানো হল।

সৌরভ বিষাদের আভা কৌতুক
উজ্জ্বল পথ ধ্যানের সুষমা ধূপছায়া,
কত রকম।

চোখ নাক কান খুলেই রাখো,
বোধহয় দৃশ্যের চূড়ান্তে আসা গেছে।
এবার সময়ের গলায় দাঁত বসেছে,
লোভের দাঁত।
দ্যাখো এবার কী হয়!

৩৬
যেখানে উত্তাপ নেই

আমি বন্ধু হতে চেয়েছি
তাই দেয়ালে ঘা দিয়ে কথা বলেছি,
আড়ালের ওধারে
সংকেত করেছি
প্রান্তর আকাশ আর শস্যের
মোহনার,
আমার কথার মধ্যে নিয়ে এসেছি কত ঢেউ
ঘরের যে-অল্প আলোয় কেউ আমার মুখ দেখতে পায় না
আমি তাকে নিবে যেতে দিইনি
আমার সমস্ত আশার মধ্যে তাকে ধরে রেখেছি
মনে মনে সূর্যের মতো বাড়িয়েছি,
নিথর বাতাস
আমার ফুসফুসের আবেগে কাঁপিয়েছি।

তাই তো অবশেষে মৃত্যুকে বন্ধুর মতো বললাম
তুমি আমার উত্তাপ নাও
তুমি আমার দৃষ্টি নাও
পৃথিবীকে ধরে রাখবার আগ্রহ
তুমি আমার এই হাতে থেকে টেনে নাও।
কিন্তু মৃত্যু সে কথা শোনেনি।

শস্যের সীমানা থেকে আমি এখন কতদূরে
তার কোন হদিশ পাই না
আমার পায়ের শব্দ সরে এসেছে এক গহ্বরের ধারে
তার মধ্যে তাকালে আমি অন্ধ হয়ে যাই ।

যেখানে সব উষ্ণতা উবে গেল
সেখানে আমাকে এখন স্মৃতির মতো কারা রাখবে,
আমাকে নতুন বন্ধুত্ব দেবে?
আমি ঘুরেছি পাথর পোড়ামাটির দিকে
কাঁটাবনে রাত্তিরের দিকে
বলছি আমাকে পাথর আর পোড়ামাটিতে গড়ো
আমাকে কাঁটাবন আর রাত্তিরের মধ্যে ধরো।

৩৭
আহ্বান

কখনো-কখনো
মাথা তুলি পিপাসার গহ্বর ছাড়িয়ে ;
তোমার অমৃত-চোখ কী দেখে তখন
কী দেখে আমার মুখে?
হয়তো মহিম্ন স্তোত্র পাঠ করো বিধ্বস্ত কপালে,
প্রথম পাখির ঊষা বুঝি জেগে ওঠে বন্য চুলে
কিংবা কোনো জ্যোতিষ্মান কথার ঝংকার তুমি শোনো দুই ঠোঁটের পেষণে।

তোমার উদবেল বাহু তরঙ্গের জোয়ারে ভাসায়
দিগবলয় অন্ধ পথ সূর্যাস্ত বাসনা;
আমি কি অবাধ্য নৌকা
আলেয়ার তীর ঘেঁষে ডুবে যাব উচ্ছ্বাসের ফুঁয়ে?
হয়তো তা জানো তাই বননীল জাদু
ভুলে গিয়ে কাঁপো তুমি
শীতের গাছের মতো কখনো-কখনো।

এর চেয়ে ভালো তুমি
নেমে এসো পিপাসার গহ্বরে আমার,
তোমার অমৃত-চোখ খুঁজে পাঁক দিশা
অঙ্গের জ্বলন্ত রোদে,
জ্বলুক নিখুঁত মিলে আমাদের সহমর তৃষা…

৩৮
বর্ষমাণ

থমথমে বাড়ির সারিকে
অসহায় করে
বৃষ্টি এল।
এক বন থেকে অন্য বনে বিচ্ছুরিত সঘন গমক
এসে জোটে চৌকাঠের ধারে
মাথা কোটে বিষাক্ত গরজে,
সর্বাঙ্গে আপন করে তাকে ঘুম পাড়াবার
আমার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হল,
কয়লার ধোঁয়ার কুয়াশার
গ্রন্থিল স্পর্শের নীচে ধমনি কাতর।

পাঁচিলে গুলির দাগ স্ফীত হয়
জলে ভিজে,
দৈত্যের প্রকাণ্ড লুব্ধ মুঠির আকারে
স্ফীত হয় স্তম্ভিত প্রদোষে,
খরশান হাজার বল্লমে
পর্দাগুলো ছিঁড়ে কুচিকুচি
অলিন্দ চত্বর অসহায়।

আমার এ-শহরের মাঝখানে নির্জন নদীর
ঘাস-মোড়া পাড়ে
পায়ে পায়ে মরা পথ বেয়ে
জাহাজঘাটায় আজ যদি যাওয়া যায়
দেখা যাবে সমস্তই অস্পষ্ট কাঠামো।

ঝাপসা ওড়না ছিঁড়ে
জাগল মন্থর
সংকীর্ণ কপাল সাদা,
সাদা ঠোঁট হিম গাল
স্তনভাঙা নিমীলিত ত্বক ।
করুণ আশ্রয়প্রার্থী অবয়বে দ্বিধা
আমাকে পীড়িত করে,
সায়াহ্ন দুঃস্বপ্ন আসে জলে ভেজা পাঁচিলের কূলে।

দ্বিধা ছাড়ো
তুমি দ্বিধা ছাড়ো
অন্ধ গলিমুখে
নিঃশব্দ কী হাসির বিদ্রুপ তোমাকে বিশ্লিষ্ট করে
তুমি জানো আমিও তা অনুভব করি।
বিভক্ত প্রতীক্ষা কেন
আর কেন?
হে সাথি
বৃষ্টি এল।

৩৯
স্বপ্ন দেখায়

আকাশে কোনোই আড়ম্বর নেই
তবু এই মুহুর্তটা পেখম তুলে নাচে
গুমট ভেঙ্গে ঠান্ডা হাওয়া ছড়ায়।
বাহবা তো দিতেই হয়
কেন না এই কুহক
ধুসর পর্দা চিরে ফ্যালে
মরুভুমি পার হুওয়ার সুর লাগায়।
আকাশ যেখানে টাল খেয়েছে
সেখানে না দেখা যা্য দিন না কোনো আলো
তবু সামনে এ কি বাহার
রঙ্গীন মেলা ফুটিয়ে তোলে
দুরন্তকে লোপাট করে,
ছন্নছাড়া মানুসষগুলো গুনগুনিয়ে ওঠে।
তপ্ত বালির ওপর সময়
যাদুকরের খেলা দেখায় স্বপ্ন দেখায়।

৪০
পরিস্থিতি

তোমার পলাশ-গোধূলির রাজ্য
আমি এক ঝলক দেখেছিলাম।
সে কি মায়া না মতিভ্রম?
যাইহোক, তখন থেকেই আমার ছটফটানি :
কবে যাব কবে যাব।
কিন্তু কী করে যাই?
আমাকে যখন তখন ঘিরে ফেলে
আগুন-চোখ বরফ-চোখ
মাঝেমাঝে আড় চাউনির বেড়াজাল,
ঘিরে ফেলে গাড়ি-জট বাড়ি-জট
গলিতে মোড়ে ছোরাছুরির আফসানি।
কী আর বলব, যাওয়া বড় শক্ত।
আমার প্রাণ তো আমি সঁপেই দিয়েছি তোমাকে,
কিন্তু তা যদি টুপ করে ঝরে পড়ে রাস্তায় …
রাস্তা খুঁজতে … তবে?

আমার রক্ত আর তোমার পলাশ-গোধূলি
এমন মিলত,
তখন না হয় যেত সবই ঝরে যেত একসঙ্গে।
এখানে তো আমি হারজিতের পালায়,
আমার হাড়মাংসে হাওয়ার তাত
কী আর করি,
আমি ঘেরাটোপে নিঃশ্বাস নিতে নিতে
ভালোবেসে এক-একবার আঁকড়ে ধরি
তোমার মায়া নাকি আমার মতিভ্রম।

……………………………
কবি পরিচিতি
অরুণ মিত্র (২ নভেম্বর, ১৯০৯ – ২২ অগস্ট, ২০০০) ছিলেন রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রথীতযশা কবি ও ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের খ্যাতনামা অধ্যাপক ও অনুবাদক। তিনি যশোর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন অধ্যাপক। তাঁর কাব্যগ্রন্থের নাম : প্রান্তরেখা (১৯৪৩), উৎসের দিকে (১৩৫৭), ঘনিষ্ঠ তাপ (১৯৬৩), মঞ্চের বাইরে (১৯৭০), শুধু রাতের শব্দ নয় (১৯৭৮), প্রথম পলি শেষ পাথর (১৯৮০), শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৮৫)।

জীবন
১৯০৯ সালের ২ নভেম্বর অধুনা বাংলাদেশের যশোর শহরে কবি অরুণ মিত্র জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতার নাম হীরালাল মিত্র ও মায়ের নাম যামিনীবালা দেবী। অল্পবয়সেই অরুণ মিত্র কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতার বঙ্গবাসী স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূত্রপাত ঘটে। ১৯২৬ সালে এই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯২৮ সালে বঙ্গবাসী কলেজ থেকে আইসিএস পরীক্ষা ও ১৯৩০ সালে রিপন কলেজ (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) থেকে ডিস্টিংশন সহ বিএ পাস করেন। এই সময়ে সাহিত্যের চেয়ে সঙ্গীতের প্রতি তাঁর অধিক আকর্ষণ পরিলক্ষিত হয়। আবার এই সময়েই ভিক্টর হুগোর উপন্যাস ইংরেজি অনুবাদে পড়ে ফরাসি সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ফরাসি ভাষা শিখতে শুরু করেন। বিএ পাস করার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পড়া শুরু করেন। কিন্তু পিতামাতার জ্যেষ্ঠপুত্র হওয়ায় সাংসারিক দায়দায়িত্বের চাপে এমএ পড়া অসমাপ্ত রেখেই ১৯৩১ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরি গ্রহণ করতে বাধ্য হন।

১৯৪২ সাল পর্যন্ত আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরি করেছিলেন তিনি। এই সময়ে বিভিন্ন সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, কবি ও লেখক গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর পরিচিতি ঘটে। বিশিষ্ট সাংবাদিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবী সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার ব্যক্তিগত সম্পর্কসূত্রে ছিলেন তাঁর নিকট আত্মীয়। আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরি করার সময়েই মার্ক্সবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন অরুণ মিত্র। সেই সূত্রে ‘বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ’ ও ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’র সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আনন্দবাজার ত্যাগ করার পর তিনি যোগ দেন সতেন্দ্রনাথ মজুমদার সম্পাদিত ‘অরণি’ পত্রিকায়। ফরাসি সরকারের আহ্বানে ১৮৪৮ সালে বৃত্তি গ্রহণ করে গবেষণার্থে ফ্রান্স যাত্রা করেন। প্যারিসের সরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর গবেষণা কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ডক্টরেট লাভ করেন। ফরাসি সাহিত্য অধ্যয়নের পর ১৯৫২ সালে দেশে ফিরে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপকের পদে বৃত হন। এরপর দীর্ঘ কুড়ি বছর সপরিবারে এলাহাবাদে-ই বসবাস করেন। ১৯৭২ সালে কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করে ফিরে আসেন কলকাতায়।

১৯৯০ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানিক ডি. লিট. উপাধিতে ভূষিত করে। ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যে নিরন্তর গবেষণার জন্য ১৯৯২ সালে ফরাসি সরকার তাঁকে ‘লিজিয়ন অফ অনার’ সম্মানে ভূষিত করে। ২০০০ সালের ২২ আগস্ট কলকাতায় অরুণ মিত্র প্রয়াত হন।

সাহিত্য
মাত্র ষোলো বছর বয়সে ‘বেণু’ নামে একটি কিশোর পত্রিকায় প্রথম অরুণ মিত্রের কবিতা প্রকাশিত হয়। তাঁর মৌলিক কাব্যগ্রন্থগুলি হল প্রান্তরেখা (১৯৪৩), উৎসের দিকে (১৯৫০), ঘনিষ্ঠ তাপ (১৯৬৩), মঞ্চের বাইরে মাটিতে (১৯৭০), শুধু রাতের শব্দ নয় (১৯৭৮), প্রথম পলি শেষ পাথর (১৯৮১) ও খুঁজতে খুঁজতে এতদূর (১৯৮৬)। শুধু রাতের শব্দ নয় কাব্যগ্রন্থটি ১৯৭৯ সালে রবীন্দ্র পুরস্কারে এবং খুঁজতে খুঁজতে এতদূর কাব্যগ্রন্থখানি ১৯৮৭ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হয়। তাঁর কাব্য সংকলন পনেরো খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।

১৯৭৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর একমাত্র উপন্যাস শিকড় যদি চেনা যায়। তাঁর মৌলিক প্রবন্ধ গ্রন্থ ফরাসী সাহিত্য প্রসঙ্গে প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। বাংলায় তিনি একাধিক গ্রন্থ অনুবাদও করেছেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভারত: আজ ও আগামীকাল (১৯৫১), কাঁদিদ বা আশাবাদ (১৯৭০), সে এক ঝোড়ো বছর (১৯৭০), ভারতীয় থিয়েটার (১৯৭৫), গাছের কথা (১৯৭৫), মায়াকোভস্কি (১৯৭৯), সার্ত্র ও তাঁর শেষ সংলাপ (১৯৮০), অন্যস্বর (১৯৮৩) ও পল এলুয়রের কবিতা (১৯৮৫)। [সূত্রঃ উইকিপিডিয়া]

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E