৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
আগ ০১২০১৭
 
 ০১/০৮/২০১৭  Posted by

অরবিন্দ চক্রবর্তী’র ১৫টি কবিতা

১.
কুস্তিজীবন

কুস্তিখেলার পাশে দাঁড়ানো উত্তেজনা থেকে লেখা হয় একজন মাসল-ম্যানের জীবন
এত জল এত রক্ত কোনটাকে একাকার ঘাম বলা হবে বুঝে ওঠার আগে ঝরে যায় উল্লাস।
সহায় দস্তানা লুটিয়ে করে ফোঁসফাস। চোখ ছিটকে পড়ে পিংপং বলের ছুটন্তি নিয়ে।
তখন পৃথিবীর মানুষ হয়ে বোঝা যায়, তুমি কোনো এক হত্যা-জগতের রাহুত- আধখাওয়া ফলের
আবেদন দেখেছ, অথচ বুঝতে চাইছ না ফুলের মতো সম্ভাবনাগুলোও ফোটাতে পারে তারাকথা।

২.
সান্ধ্যভাষা

তারা দেখতে বসলে আকাশের চাঁদ মেনকার ভূমিকায় যায়
চোখের পরকীয়ায় যায় দেউলের দৃশ্যঅভাজন।
এ কেমন মুরারি তুমি, পাশে থাকতেই মন ঘর-বেঘর করে।
গবেষণায় যায় এর-ওর পুকুরঘরে।

আনন্দের ভরসায় হাতের কাছে তখন হাত খুঁজি
না পেয়ে বুকপটকা ছুড়ে দিই গতির সুতোয়।
নিমেষেই পুরাতীর্থে ছড়াতে থাকে আমাদের প্রণয়প্রবাহ।

এভাবে তোমার বাঘ ঘনিয়ে আসে
ধ্যানবিন্দু দোলে শরমিনদাবাগে-
জানপাখির বাবা-মা, আপনারা জানেন না কেন
মেঘ এলে পায়ে ঘুঙুর মেখে নাচতে লাগে ময়ূরের কনসার্ট
আমি তখন লিবিডোগামী কয়েকজন বিশ্বামিত্রের সান্ধ্যভাষা হই।

৩.
পলায়ণপ্রবণ

ত্রিভুজ একটা চরিত্র। কাউকে যখন সে খুন করবে বলে শয়নযাত্রায় একাদশী ফাঁদে। পুরুষালি দ্বিধায় বলি তাকে, ডুব মারো। সংবাদটা রটে যায়, ওদিক ঘটনা ঘটে দৃশ্যের ওপর সুতো বা মই না রেখে। দেখি, ডোবার অতল থেকে উঠে এল এক তাগড়া মহীয়ান।
একপক্ষ ধরে তার অনশন।

বিষয় : না জানা।

তদন্ত স্বার্থে, ধরা যাক, তুমি তার বউ। তোমার নাকফুল খোয়া গেছে চর্যা-রাতে। সে যাক। এবার দেখো তো, আমার চোখে জলের নবুয়ত কী-না? দেখলে যা, পেলে বিন্দুফুলের ব্যবহার, পুরোদস্তুর জয় বাবা অমানাথ। বুঝলে পৃথিবীর রক্ত ধুয়ে ফেলতে হবে এবার। হাসতে হবে বেদনার দিকে জীবন তাক করে। লাফাতে হবে রক্তে রক্তে প্রাচীন বলের আপন হয়ে।

৪.
নামের মাংস

উটদৌড়ের আয়োজন নিয়ে সেজেগুজে বসে আছেন
কয়েকজন ঠাণ্ডামাথার বুলডোজার।
সকালফোটা বন্দরের পাশে নাকউঁচু দুর্গ করে
আলগোছে আয়ু খুঁটছে জিপসি ক্লাউন, পরিখায় ঝরে পড়ছে
ইতিহাসবাহিত সেই নামের পালক।
ধূলিসংরক্ষণ বিভাগ একযোগে দাবি তুলছে,
ডানার আয়োতন গুঁড়িয়ে দেয়া হোক
মুদ্রার মাংস পচে গলে ধসে যাক।
মেহরোগী শুধু হেরেমশালা খুলে
নিয়তিবাচক ফুর্তি করুক মধুমদ বিষয়ক ধারণাধামে।

৫.
ব্যবহারিক

চোখ দেখেছিল, আমার সিঁড়ি কার বন্দীশ করতে করতে উপরে উঠে যায়
এদিকে আমি আলোর শরীর নিয়ে নদীর ভরসায় মোম গেড়ে বসে থাকি।
উঁচুত্যকা আশকারা দেয়, কানকথায় মুকুট ছুঁয়ে আসতে বলে।
রাবনসম্প্রদায় জানে না, আমি সমতলকে কথা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঘাটোয়াল
কথার সঙ্গে কথা বলি। হৃদয়ভাণ্ডকে বোঝাই এ আমার আনন্দলোক,
নাচুকের ঘুঙুর থেকে একটি পালক ছিটকে গেলে সে দায় তোমার করতালির।

৬.
সাবান তালাশের কসরত

টিনেজ স্কুলের মাঠে চাঁদ দেখাদেখির পিরিয়ডে আপনি ফিজিক্সের অধ্যাপক
প্রাণিজগৎ বিষয়েও আপনার ব্যাপক আগ্রহ,
ব্রহ্মাণ্ডের কেউ ছিলেন না বলে দীর্ঘশ্বাসরোগীর পাশে তালগোল মানত করেন
সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, মন খারাপের দিনগুলো একমাত্র বউকে আর বুঝতে দেবেন না
যাবেন কচিকাচার আসরে। দেখলেন সেখানে একগুচ্ছ বউসমাজ
ছেলেমেয়েদের মতো খেলছে, আপনি দুধভাত হয়ে যেতে চাইলেন।
একমাঠ হাসাহাসি হলো। আঁচ করলেন, পুকুরে তারা সাবান হারাতে পারদর্শী।
জ্যোতিষশাস্ত্রে আপনার বেসরকারি দখল থাকায়
বুঝে নিলেন, পুকুরে মাছ নেই, সুযোগ রয়েছে চাষের, এক পশলা বর্গা পেলে হয়।
একাকার স্বভাবে একদিন বন্যা এল, ঘরে ঘরে বর্ষা। সে বছরেই আপনি শরীরশাস্ত্র সহায় করে
‘ছোট্ট কোথায় টেনিস বল… ছোট্ট কোথায় টেনিস বল…’ বন্দীশ করতে করতে সাবান খুঁজতে নেমে গেলেন।

৭.
চোখ

ফুল দেখা চোখও লাশ দেখে, নিজের।
এরপর মুর্দা পালক আয়না পাশে রেখে স্মৃতির রং মোছে।
বন্ধুকে বহন করতে গেলে শব পিছলে যায়, এগিয়ে আসে হাটবাজারের পা।
প্রসঙ্গত শিমুলপরিবারের কাছে প্রশ্ন থাকে সবার
লালের নামে যে রং আগুন ধারণ করে
তা কি মৃত্যুঘটিত কোনো সংবাদমাধ্যম থেকে আপন করে আনা সুবর্ণরেখা?

৮.
সমঝোতা চুক্তি

সকল বর্ণের গায়ে পলাশ শিমুল ঢেলে বসন্তের গাছসম্প্রদায় খেলছে আগুন আগুন।
কিছু দূরে লেখা হচ্ছে তরমুজ গোত্রের গোটা গোটা লাল। ফায়ার সার্ভিসের ঋতুতে,
প্রকল্পের দুপুরে নেমে কেউ চাইছে আস্ত পুকুর, কেউ চায় বরফখ- জল।
আমি সকল পঙ্গুমানবের হাঁটুভাঙা ইমেজ কপি করে তাকে দিই কাটাফাটা
দৃশ্যের পাশে কবরভ্রমণের নির্দেশ, অমরতার হাশিখুশি প্রণোদনা।
মেঘ বর্ণের পক্ষ নিয়ে আকাশ বর্ণের সেনাপতি কোকিলের সঙ্গে করি দক্ষিণদ্বার ওপেন সিক্রেট,
বৈঠকে জানায় আমাকে দেবে সে দুপুর-ভৈরবী। আমি চাই, নীরব দেশলাই, নরম সকালিয়া।
কারণ, আমিই জানি, জলকে পোড়াতে আগুনের প্রয়োজন, আগুনকে পোড়াতে আমি।
তুমি নিশ্চয় জানো না, দেশলাই আমার বারুদ বহন করে, আর আমি করি চৈত্রের সাগরেদগিরি।

৯.
বাংলাদেশ

পৃথিবীর দূররেখা এসে সাঁওতাল নদীর কোমর ছুঁয়ে ঢেউ ঢেউ মিলিয়ে যায়।
আহা আঁকিয়ে সম্রাট, শুনেছি তুমি বাংলাদেশ বিষয়ক অঙ্কন প্রতিযোগিতায় শুধু ইউটার্ন ব্যবহার করো।
ব্যাপার মন্দ নয়, হাঁটুতে যাদের আলো থাকে তারাই নাচের তলে ফোটাতে পারে
সোনালু আঁধার। সহায় ঘুঙুরের নামে দৃশ্যের স্রোতে ভাসাতে রাখে একক অধিকার।
আমি খুশিমুখ নিয়ে মিসমিসে ডেরায় বসে দেখতে পারি সম্ভাব্য আলোকিত ভোরের প্রয়োগ
-যা আমার একান্ত বাংলাদেশের।
আজ এই অক্ষরনিহিত রাতে ভাবতেই বেগানা লাগে, হাসন-লালন-সুলতানের দেশে
কারা যেন আত্মঘাতী-তোমার মুখে সাদা সাদা দুঃখ বিস্তার করতে ভীষণ বেপরোয়া।
এদিক আমরা কজন স্বপ্নদেখক খোসপাঁচড়া দিবস নিয়ে জ্যোতিষরেখায় আয়ুযাপন করি।

১০.
পাখালি

অপেক্ষা করো, লাশ হয়ে যাওয়া শরীর কোনো মুহূর্তে নেচে উঠবে।
যখন জেনেছে, আংশিক সত্য হয়ে থাকা প্রাণ কুস্তিগিরের পক্ষে যায় না,
এতে পাবে না সে তুলতুলে জগদীশ। সেই থেকে মাছ তার প্রিয় বিষয়,
বকের পায়ে হাঁটা তার বৈকালিক পাখালি। ফলে, সন্ধ্যা ও বিকেলের
সন্ধি বরাবর অবস্থান কাউকে নিতেই হবে। জনকের ভূমিকায় গীতিনৃত্যে
সঙ্গত ধরতেই হবে। আমাদের নিয়ে শ্যাওলা ছেঁটে যেতে হবে তলিয়ে
যাওয়া ডুবুরির খোঁজে। যেখানে আজও খুল্লাম-খুলছি করছে অরূপ মহুয়ার তলপেট।

১১.
শীতসকালের অবদমন

কথার পাশে তুষার জমছে, যেন দুধসর
প্রসঙ্গত তোমার ঋতুতে ফুটে উঠছে মধু মধু হাওয়া
ফলত উড়ে আসছে পৃথিবীর সকল সফল পাহাড়
ফুলত পাশের গুহামুখে ওই দেখা যায় আলো।
যা হয়
শুধু তুমি নও, যেকোনো কবি শীতসংকেতের আড়ালে
মাফলারের ভাষায় কথা কয়। আমরা কজন কিংবদন্তি-মুখোশ
নিরীহ আগুনের পাশে গোল গোল রূপালি কথার স্বামীভাই হয়ে শুনি কেবল শুনি…

১২.
হত্যা

কিছু নিচে লাল ছড়িয়ে পড়ল।
একজনকে গোয়েন্দা করলাম- দেখলাম সুযোগ তুলে নিচ্ছে, রক্তমাখা কুড়াচ্ছে।
তোমাকে বলব, এ সর্বনাশ প্রবাহিত হোক-
নিহত বিশেষণগুলো সর্বনামের পাশে বসাতে থাকো। জুড়ে দাও পালক।
কাটাফাটা যন্ত্রণা সইতে কে বলেছে তোমাকে? শুধু ব্যান্ডেজ করে দাও।
সব শিরস্ত্রাণ মেনে নাও। অভ্যস্ত হও।

যারা ইতিহাস খুলে বসেছিলে, নিশ্চয় পেয়েছ পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় হাড় ও ধার্মিক ছবি।
বোঝোনি? কোনো দিন এ পৃথিবী স্বপ্নকাটা ঘর ছিল।
মানুষ এরই উপরে করেছে সরাইখানা। পশুসব ভুলভাল আনন্দী নাচছে।

১৩.
মহিয়ান

তুমি একজন তুমি
দেখলাম তার ভেতরে নিরালম্ব ঢুকে গেলে
যার অশেষ বর্তুল

উপত্যকা নির্ভর অসহায় গৌরব উদ্যাপনের
দেওয়ানি আছে।
তিনি তক্তা স্বভাবের ঢালু সামনে রেখে
খরচ করে যাচ্ছেন জগতের আয়ু।

বন্ধু এরস, বুঝতে পারছি না
আমি কার হাঁটুর সমান্তরাল
অথবা নিচুতলায় হয়ে উঠছি আবাসিক;
একদিন নগর-মেয়রের খাসকামরায়
করব ওপেন সিক্রেট…
অধিকার রাখব তোমার করতলে বসে
ব্যবহারিক জিওলকে করে দিতে
রজতজল ফেনাজল।

*এরস : রোমান পুরাণে বর্ণিত কিউপিড হচ্ছেন কামদেবতা। যিনি প্রেমের দেবী ভেনাসের পুত্র। গ্রীক পুরাণে এ কিউপিড হচ্ছেন এরস।

১৪.
মাপক

যতদূর চলে এসেছি, এত উঁচুতে না ওঠাই ভালো।

এখানেও যদি ভয় সাপের, তবে সরে যাক সিঁড়ি
এরচে’ ভালো হবে তোদের কলোনির সঙ্গে হাসাহাসি করা, টাকা উড়িয়ে,
মাস্তি করে জীবন তামা করে দেওয়া।

এতে কত যে আনন্দ বন্ধু!
ফুল আর ফুল থাকে না, ধুলো আর ধুলো থাকে না
হয়ে ওঠে স্বর্ণরেণু, মানুষের স্পর্শ-পাখোয়াজে।

১৫.
মোমালোক অথবা স্ট্যাচুনৃত্য

দাঁড়িয়ে থাকার পাশে আরেকটা মুদ্রা স্থির থাকে।
একজন মোম কখনো এই ভাস্কর্য-ইশারা দেখে না।

শুধু
স্বয়ম্বর গোয়েন্দা করে পৌরুষ বাসনায় সায়ন্তসভা খেলে।
পোশাক রক্ষায় এক ধরনের জীগীষা নিয়ে
তোমাকে খুশিমতো ধারণা সাজতে বলে,
কাউকে নিধান নিধান নামে ডাকে।

ওদিক
আদা বিনিময় স্বভাবী এক শরীরশিল্পী
জলঘোরের গোলে রাখে পদ্যম খুলে আসা আকুল ভ্রম, মল্লিকা কত্থক।


অরবিন্দ চক্রবর্তী

অরবিন্দ চক্রবর্তী

পরিচিতি

অরবিন্দ চক্রবর্তী
জন্মদিন : ১১ আগস্ট ১৯৮৬
জন্মস্থান : রায়পাড়া সদরদী, ভাঙ্গা, ফরিদপুর, বাংলাদেশ
কবিতার বই : ছায়া কর্মশালা (২০১৩), সারামুখে ব্যান্ডেজ (২০১৬)
সম্পাদনা : দ্বিতীয় দশকের কবিতা (২০১৬)
অখণ্ড বাংলার দ্বিতীয় দশকের কবিতা (ডিসেম্বর ২০১৬)
সম্পাদক : মাদুলি
ইমেইল : aro.maduli@gmail.com
যোগাযোগ : অরবিন্দ চক্রবর্তী, সম্পাদনা বিভাগ, আলোঘর প্রকাশনা, দিশা, ই/৭, বর্ধিত পল্লবী, মিরপুর সাড়ে ১১, ঢাকা- ১২১৬, বাংলাদেশ। মোবাইল : ০১৭৫৭১৫০৬২৫

Save

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E