৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ২৩২০১৬
 
 ২৩/১০/২০১৬  Posted by
কবি অপু মেহেদী

অপু মেহেদী

কবি অপু মেহেদী’র কবিতা


পরাজয়ের আশ্চর্য হলাহল

পরাজয়ের সান্ধ্যগীতে থাকে না কোনো স্বরলিপি, থাকে কিছু আশ্চর্য হলাহল। বুকের আস্তিনে জেগে থাকে কিছু অন্ধকার গলিপথ। চোখের অনূদিত ঢেউয়ে ভেসে যায় নীল নদের ঘ্রাণ। উড়ে আসে কালো আলোর জ্বোনাকদল।

হ্যালোজেন জোছনায় একা পড়ে থাকে ঘৃতকুমারীর বন।

পরাজিতরা আত্মঘাতী হলে-
খসেনা কোনো নক্ষত্র
নেভেনা কোনো মাঝরাতের কুপি
ভাঙেনা কারো বুকের বাঁধ।

কেবল একটি বিউগল বেজে যায় দূরে …


ক্ষমা করবেন না প্লিজ

তারপর কুয়াশার জঙ্গলে পড়ে থাকে কিছু ভয়াল নীরবতা।

সারা গায়ে আকাশ মেখে যারা ভোর নামিয়েছিলো, তাদের পালক চুঁইয়ে পড়ে আছে তামাটে অন্ধকার। এখানে আজ নীল নীল শোকমিছিল, মেঘ ও বৃষ্টির মধ্যবর্তী শূন্যতা। থেমে গেছে গল্পের ক্লাস। পকেট পকেট বিষণ্ণতা নিয়ে ছেড়ে গেছে ভোরপাখীদের স্কুলবাস।

বিষণ্ণতাও এক প্রকার মেঘ, এর অধিক কোনো নীরবতার জন্ম হয়নি পৃথিবীতে।

নীরবতাও একপ্রকার ক্ষমা।
ক্ষমাও একপ্রকার ঘৃণা।


বিরুদ্ধ হরফের সুর

তারপর কোনদিন, বিফল মৃত্যুর আগে-

যারা আয়ূরেখা ধরে হেঁটে যায় তাদের বুকের মাঝখানে লুকিয়ে থাকে অগণিত দুঃসময়। দুঃসময়ের পায়ে নূপুর নেই; ভুলদরজা দিয়ে ঢুকে সেও হয়ে উঠে এক আশ্চর্য কুহক।

তারপর কোনদিন, বিফল মৃত্যুকালে-

আকাশমুখী সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে পাতাল পাতাল ঘুম। ঘরভর্তি কোজাগরি রাত; আলোগুলি হয়ে উঠে ঈশ্বরের মতো ঝাপসা।

তারপর কোনদিন, বিফল মৃত্যু হলে-

নেশাগ্রস্থ কোকিল গায় বিষণ্ণ রেহেলের সান্ধ্যপুঁথি। পড়ে থাকে সংসারের ভাঙা ভাঙা হাড়; দূর থেকে ভেসে আসে এক বিরুদ্ধ হরফের সুর-
ওঁ নমঃ মানব জন্ম
ওঁ সর্ব ত্রুটি ক্ষম …


বৃক্ষ বিষয়ক আদিখ্যেতা

বৃক্ষ বিষয়ক সকল আদিখ্যেতা ধারণ করেও মানুষ নামে বেঁচে থাকা কতটা শোভনীয় তা আমার জানা নেই। যেমন জানা নেই কালো গোলাপের রক্তিম হবার সূত্র কিংবা সবুজ ক্যাকটাসে হলুদ ফুল ফোঁটানোর কৌশল।

গত বর্ষায় চুমু খাওয়ার অপরাধে যারা বৃক্ষ হয়েছিলো, মানুষের হাহাকার বুকে নিয়ে তারা আজ নির্ভুল নিমগাছ। তাই বর্ষা এলে আমারও চুমু খেতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু বৃক্ষ হওয়া হয়ে ওঠে না।

যদিও স্বভাবে বৃক্ষই আছি। তবু মানুষ আর বৃক্ষ নিঃশেষে বিভাজ্য কিনা তা নিয়ে এবার কিছু তর্ক শুরু হতে পারে …


শাস্ত্রীয় প্রেমের বিপরীতে

সব প্রেমিকের বুকেই থাকে কিছু অদৃশ্য আগুন। মানুষ যাকে প্রেম বলে তার ছায়ার ভেতরে লুকিয়ে থাকে আত্মহত্যার প্ররোচনা।

শাস্ত্রীয় প্রেমের বিপরীতেও কিছু প্রেম হয়। ভাঙা কাঁকনের সাক্ষ্য নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় হন্তারক প্রেমিকা।

প্রেত পেরোনো সন্ধ্যায় কেউ কেউ খুন হয়। আপসি মেঘের বুকে ছুরি চালায় অনাপসি বিদ্যুৎ। আমি চর্যাপদ থেকে পালিয়ে পুনরায় চর্যাপদেই জন্মাই।

ভালবাসি, কিন্তু ভালবাসাতে পারি না।


পৌষ-মাঘের রোমান্টিসিজম

পৃথিবীর সব রোদ কুয়াশা হলে- হাওয়াজলের ওম জমে পরিযায়ী পাখির ঠোঁটে।

ঋতুবদল এক বিভ্রান্তিকর ব্যাপার। তাই শীত এলেই আমার ঘাতক হতে ইচ্ছে হয়- এ খবর রটে গেছে এফএম তরঙ্গে তরঙ্গে।

এই শীতে আমি প্রেমিক হব- দৃষ্টির বিনিময়ে চাহনী, ছোঁয়ার বিনিময়ে স্পর্শ, ক্ষোভের বিনিময়ে অভিমান।

হিপপকেটে জমে আছে জলের খেয়াল, করতলে তুষারঘন রাত। তোমার কার্ডিগানের পকেটে হাত রেখেই কাটিয়ে দিচ্ছি তুমুল শীতকাল।


তুলাবিহীন বালিশের লিরিক

একটি জেলফেরত স্বপ্ন টলতে টলতে বিছানায় হারিয়েছে- এই নিয়ে সিলিংয়ে সিলিংয়ে রটে গেছে অপবাদ।

কবে যেন বালিশের ভেতর ঢুকে পড়েছে অনিদ্রা, অগোচরে। সেই থেকে চিরকালের মেঘ হয়ে উড়ছি এই হত্যাপ্রবণ শহরে।

মেঘের গর্জন থেকে বৃষ্টির দূরত্ব যত, মানুষের স্বপ্নের আয়ু ততটুকু। তবু অর্থহীন স্বপ্নগুলোর শেষকৃত্যে নেমেছে কবেকার আগুন। আমি ছাই হতে হতে শুনি বালিশের আর্তনাদ, বিবিধ ভাঙন।

বালিশ, সকল স্বপ্নের এক মায়াবী মহাজন।


টাইটানিক ফেরত যাত্রীর নোট

ডলফিনের রাজসভা দেখে যে মাছেরা আজ সমাজতন্ত্রী তাদের দলে আমিও ছিলাম। কোনো এক গৈরিকা নদীকে হাওড়ের পথ দেখিয়ে ভুলে গিয়েছিলাম কৈবর্ত জীবন। তাই সমুদ্র সংক্রান্ত তেমন কোনো স্মৃতিই আমার নেই। যেটুকু আছে তাকে টাইটানিক বলা চলে।

টাইটানিকের বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের পকেটে আজীবন কম্পাস রাখতে হয়। দিক ভুলে গেলে সব নাবিকই হয়ে উঠতে চায় ভাস্কো দা গামা। অথচ আমার ব্যক্তিগত কোনো কম্পাস নেই। নেই কোনো বায়োস্কপী দূরবীন কিংবা আতসী মানচিত্র। যা আছে তাকে শুধু ইরেজার বলা চলে।

ইরেজারে মুছে ফেলা ছবিগুলোতে কোনো মৃত্যু থাকে না। অথচ আমার স্মৃতিতে শুধু ভাসে জ্যাক ডসনের মৃত্যুর ট্র্যাজিক …।

ইরেজার দিয়ে যদি মোছা যেত মৃত্যুপ্রবণ অতীত …!


জীবন যোগ আনন্দ দাশ

‘আবার আসিব ফিরে’- কথাটির মাঝে যতটা মিথ্যা লুকিয়ে আছে মানুষ তা জেনে ফেলে শৃঙ্খলিত কৈশোরে, উন্মত্ত যৌবনে কিংবা পাপবিদ্ধ বার্ধক্যে। মৃত্যুর আট বছর আগের একদিন সুরঞ্জনাদের চিঠি লিখে যায়- ‘কোথাও জীবন আছে, জীবনের স্বাদ রহিয়াছে’।

তবুও কেউ ফিরে আসে পুনর্জন্মের স্বাদ নিয়ে। রূপসার ঘোলাজলে- কিশোরীর হাঁস হয়ে- শঙ্খচীল শালিকের বেশে- বনলতার ভ্রমে।

একজন কবি আত্মহত্যা করেছিল পরবর্তী জীবনের লোভে।

১০
ডোন্ট টেল টু ইওর ওয়াইফ

নারীর প্রসঙ্গ উঠলেই আমরা পরস্ত্রীর দিকে তাকাই।

রাত হলেই নগরীর ব্রথেলগুলো খুলে যায় গণিকার ঘাগরায়। ভেলভেট গন্ধে মাতে নর্তকীর বনসাই কোমর। ক্লিওপেট্রার উরুতে বাজে মধ্যরাতের প্রণয়সুর। বিছানায় সকল রমণীই এক চৌকষ উকিল। তবু নির্বোধ প্যারিসেরা আত্মসমর্পন করে হেলেনের জানালায়। আফ্রোদিতির পাথরস্তনে ফোটায় লেবুগন্ধ বকুল।

পরস্ত্রী আর স্ত্রী। মাঝখানে কিছু সম্পর্কের চোরাবালি আর মুখস্ত খোলস। নিয়ন আলোয় উভয়েই এক নীল প্রজাপতি।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E