৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ২০২০১৬
 
 ২০/১২/২০১৬  Posted by

অনুপম মণ্ডল -এর একগুচ্ছ কবিতা


আলাপ

ঘুমের শান্ত নীল ডানাটি, কেউ এসে গেঁথে নিয়ে যায়। এইখানে অল্প তারার আলো। ভেজা রূপের থোপা। থেকে থেকে আলস মালতির গন্ধ ঝরছে। পালঙ্কের ওই কোমল ঝোপলতা মাড়িয়ে, দুএকটি প্রপাতের শাখা। বুঝি তার পিপাসার দিকে তলিয়ে যাচ্ছে।


ঋষভ

শরতের, কোন এক স্বচ্ছ হ্রদের গভীরে তুষারের হালকা নীল ডানাটা। আর রাস্তা বোঝাই সন্ধ্যাগুলো। আমাদের নির্জন জানালার পাশ দিয়ে, কোথাও হারিয়ে গিয়েছে। ওইখানে বিকেলের দীর্ঘ স্তূপ। দোলনার অল্প দুলুনি, এইসব। এইসব কারো আস্তে পেরিয়ে যাওয়া। ঝিঁঝিঁদের আলতো হেঁয়ালির কাছে তারপর। ঝুঁকে থাকা শুধু এক গীটারের শাখা।  


মীড়

ঝিঁঝিঁর আবছা গানের তলে পুঁতে রাখা ঝরনার স্তূপ। একটা ছোট্ট জলধারা। নির্জন সন্ধ্যার বাতাসে। আরো কিছুটা ঘুমের কাছে জেগে ওঠে। পাতাগুলো ঝরে ঝরে পড়ে। আরো দুরের দিকে। তারার স্তিমিত আভায়। পাতাগুলো ঝরে ঝরে পড়ে।


ডাকিনীলোক

শহরের বাইরে
ফিলিং স্টেশন
ফেলে রাখা
হাতে বোনা অন্তর্বাস
আর দীর্ঘ কোনো হাইওয়ের দিকেই
আসলে, হেলে গেছে
আমাদের গোধূলি
শাটার টানার শব্দ
মলিন ফেস্টুনগুলো
ভরে উঠছে
সবুজ কার্ডিগানে
শুধু
ভাঁজ করা
আমার আর্ট পেপারে
নৈঃশব্দ্য
অবিশ্রান্ত


স্নো ফ্যল

***
আর কারো হারানো বাগানে, নিদ্রিত এক আঙুরের দেহ চিরে জেগে ওঠে পথ।
ওই তীর, তারা রক্তের ভার নিয়ে বুঝি বা গড়িয়ে নামে।
সুরেলা কোনো ক্রন্দনের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে দেখি.
সৌরগন্ধের মতোই আরো গভীর হয়ে ওঠে!
গভীর হয়ে ওঠে, ওই পিপাসাপ্রহার।

***
কেনবা অসমাপ্ত ব্যথাটুকু বয়ে চলে বিহ্বল ফলরাশি
ওই শান্ত নক্ষত্রের অভিঘাত তারা বুঝে নিতে চায়
তৃষ্ণার উপকূলে এসে
দেখি

থামে সেই দাঁড়
থেমে যায় অস্ফুট বিভার দিকে কোনো অস্তরাগ
কত বিগ্রহ; বিমিশ্র লহরী খুঁড়ে
ওই উন্মাদের অবয়ব আমরা চিহ্নিত করি

কত অপাঠ্য গুঞ্জন রাত্রির বাগানে
সুরভির স্তনভার
ভাসে
আয়ত ভুজে
বুঝিনি যদিও
দিনশেষে

তারা ছিল ধীর কোনো নরদেহ
দাস
অবিনীত ওই কারাগার মুছে যাওয়ার পর

ফুলে ওঠা প্রতিটা লাবণ্যগান্ধার

***
সে খণ্ড সুর
অর্ধনিমীলিত কোনো শিখার একাগ্রতা থেকে
আছড়ে পড়ছে
ওইখানে

ক্রমবিলীন সমস্ত বাক্যরাশি
একটা মলিন ফলের ভেতর প্রতিসারিত
হয়তো

কোনো কোনো ক্রোধ আজ লয়হীন সন্ধ্যার কাছে
ম্রিয়মাণ
কোনো পাপ বাঈজী ঢলের মতো বাঁকহারা
আমরা তাই ব্যক্তিগত পাথর-হৃদয়ের পাশে
রেখে আসি সমস্ত তিরস্কার
অনেক গানের জরায়ু ছিঁড়ে
যারা আজ মৃদু শোভা ভেঙে জন্ম নেয়া
যারা
নূপুরের হাড়ের মতন তির্যক

***
অপরিজ্ঞাত, একটা শিখার ভেঙে যাওয়া দৃশ্যে; অই প্রেতের সম্ভাষণ
জেগে রয়েছে
নিশ্চিহ্ন বিম্বের দিকে ছুটে যাওয়া হ্রেষায়; অস্থির জঠর আঁকড়ে ধরে
অবছিন্ন গিরিখাতে  

***
সেইখানে করধৃত ঊরুর ফাঁকে কারো শীতল নিঃশ্বাস
জিহ্বার অনালোকিত ছায়ায়
নেচে নেচে ওঠে
রূপের ছাল ছাড়িয়ে জেগে থাকে
কোনো নির্ভার লুব্ধতা
আর
তার অশ্রুর অন্বয় থেকে
ওই আলোকপরিধির দিকে সরে যায় কেউ
হয়তো
গানের ঘুমন্ত প্রশাখা থেকে কারা
ধীরে ধীরে গুটিয়ে নেয় তার শান্ত পদক্ষেপ
মৃতের শত শত মৌন আর্তিগুলি ভেসে আসে
বহু ভাঙা কবর খুঁড়ে
ওই সবুজ আপেলটিই কেবল দুলতে খাকে
দুলতে খাকে
অচিহ্নিত কোনো উপকূলে

***
এই প্রণতি; পরিহাস; প্ররোচনা দিগন্তে ছড়ানো
আর ভাস্বর সে ধাতুর আয়তন নড়ছে
একা একাই; হয়তো তারার দিকে; অন্ধকারে

***
একটা তুলোর বল নিয়ে
খেলছে কেউ
লালচে-বেগনী
সন্ধ্যায়
ঝরনার খোপ
ঢালু প্লাটফর্ম
আথবা নির্জন পার্কের বেঞ্চি
যেইখানে আসলে লেখা থাকে
কোনো ডাইনী শিকারীর
টুকরো বিষাদ

নিভে যাওয়া বাতি
শুভ্র অন্ধকার এসে দোলখায়
সেইখানে
ডুবুরির পোশাকের মতোই ঝরে পড়ে
জলপাই
দমকলের শব্দ

***
আন্দোলিত কোনো তরঙ্গের ঝাপটা পড়ে আছে
এইখানে
তারাদের মাঝে অন্ধকার ভাসমান
নীরক্ত সন্ধ্যার ডালা থেকে
মৃদু কোনো প্রভা
পৌঁছাতে চাইছে
ধ্বনিময়
কোনো ক্রন্দনের নিকটে
পিপাসার পরিখায়
জাগ্রত নরখাদকের গুহায়
ধরি
তারাই আজ প্রার্থনারত
অস্তোন্মুখ এক ডালিমের স্বপ্নে
গম্ভীর নিস্বন
রাক্ষস জাতক যেন
ছিন্ন কোনো অক্ষপরিধি থেকে জেগে ওঠে
অথবা
অনালোকিত একটা নাদের আবাহনে তারা মুছে যেতে চায়

***
বিশুষ্ক এই ঢেউ
নিথর তৃষ্ণা ছেনে নেমে আসে শিলার পাঁজরে
আর
অদেখা সেই বেশ্যাটির শাপ এসে যেন লাগে
তীরে
হালকা হিমের মতোই শান্ত
মূঢ় ওই নাভি
ঢেকে রাখে আধো খসা তার রাগ
অঝোর জবার তরঙ্গ
আর
যে ছোবল
স্বনিত কোনো ডালিমের স্খলনে
হালকা আলোড়িত
তির্যক তার আভায়
অন্ধ এক ব্যাধের স্তব্ধ শোচনাটুকু
শুধু চিনে নেয়া যায়
থেকে থেকে পশুর ওই দ্বিধাহীন
গান

কোনো এক সুরহীনতার দিকে তারা ফিরে যেতে চায়

***
অবন্ধ্য রুধিরের শিখা; পুনর্বার পার হয় তটভূমি

দাঁড় টেনে; অতিধীরে; আর কেউ এগোয় রাত্রিকাল

হয়তো সে লৌহের বিভাসা; দোলে; নিদ্রার সুস্থির নিস্তব্ধতায়

***
গভীর প্রতিটা তৃষ্ণার ঘ্রাণ
আমৃত্যু বহন করে চলে শীতের ভারী শরীর
আর নিদ্রাভর্তি ওই কাঠবাদামের উপর দিয়ে যেতে যেতে
আরো ঘন হয়ে আসে কোনো কোনো ঘণ্টাধ্বনি

ঝরা সুরের মতোই ভেজা ওই অস্তরাগ গলে গলে নামে শুধু মৃতের ভাষারা

***
ওই দাস নিরুত্তর তার জিহ্বার শোষণ ফেলে চাপা দিয়ে রাখে আভাকাণ্ড
তরঙ্গের বাগান থেকে হয়তো এভাবেই; পতিত নাদ গুলো মুছে যায়
মুছে যেতে থাকে, শান্ত তারকাদের মাঝ থেকে মৃত সব শিলারাশি

***
শীত,আপেলের যুগল স্তন ভরা

একটা তারার প্রশাখায় জেগে আছে সারা রাত্রি

***
আচ্ছন্ন এক নাভি চিহ্নিত করছে; সূর্যাস্তের গতিপথ
কারো, উন্মত্ত কেশরে গেঁথে; নিভে যেতে যেতে

***
কারা আজ ঢেলে দিয়ে যায় ওই অসামাপ্ত রাত্রির রাগ
গহিন বাতাসের বনে
নিঃশব্দে একটা আগুনের শিখা দুলছে

ফেলে রাখা ধনুকের গ্রীবা
ওই

ওই আধো জাগ্রত কবন্ধ
আর ফুলে ওঠা তারার অলিন্দ থেকে
নামছে

অনিদ্রা

নেমে আসছে

***
দিগন্ত। মৃত সে ঘোড়ার ক্ষুরে চিরে যাওয়া, এক

সুর।

 
***
স্খলিত ওই ঘণ্টার দিকে কারো দেহমহিমা
নক্ষত্রকুটিরে এসে হয়তো
শুকিয়ে গেছে

এইখানে আমরা অমীমাংসিত কোনো গানের পৃষ্ঠার দিকে
চেয়ে আছি

হিম লণ্ঠনের নীচে কেউ
তার করতল পেতে দাঁড়িয়েছে
মোহগ্রস্ত পাখিরা

ডানার ঝাপটা থেকে সরিয়ে নিচ্ছে
গাঢ় কোনো চক্র
গান শেষে

তারাই হয়তো উলঙ্গ জবাস্তন
অপরিণত শিখার ভিতর আভা কোনো
ক্রমবিলীয়মান সে ধ্বনি

প্রতিধ্বনিরাশির প্রতি গোধূলি নামছে

ওই ঘুমন্ত পশুর নিঃশ্বাস পেরিয়ে চলেছে; তীব্র এক তূণীরের তল

***
এই কুঁজ! ঝরা মাধুরীর মতোই আনত
তার আভার ভারে দুলে ওঠে লীলার ডালায়। আর,
এলানো ওই লহরীর পাতে, ছিটানো সুরের বেদনাটুকু একটু একটু করে যেন সে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়।
প্রপাতের ডাল জুড়ে শুধু ভরে থাকে তার রূপের নির্মাণ।

ওই দূরে। ধীরে। নিঝুম ওই বাঁশির বাণীতে গেঁথে জেগে ওঠো, তুমি রাগ।

***
নিদ্রায়, ঝরা একটা স্তনের ভার গেঁথে গেছে
ওই শান্ত গানের পালকে

***
আনত ওই জটার নিচে চাপা পড়া কোনো
সর্পিল ইন্দ্রজাল
একটু একটু করে কেউ শনাক্ত করে নেয়

মুছে যাওয়া সে শৃঙ্গের জন্য
হয়তো

আরও দীর্ঘ হয়ে আসে আমাদের
প্রার্থনা

ওই সোনালি লণ্ঠনের দিকে কেঁপে কেঁপে ওঠে চরাচর   

……………………………………….

অনুপম মণ্ডল

অনুপম মণ্ডল

অনুপম মণ্ডল। জন্ম ৮ ডিসেম্বর ১৯৮৮; কৃষ্ণনগর, খুলনা। সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। পেশায় শিক্ষক।

প্রকাশিত বই : ডাকিনীলোক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : anupamsoc@gmail.com

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E