৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ১৪২০১৬
 
 ১৪/১১/২০১৬  Posted by
কবি অনন্ত সুজন

কবি অনন্ত সুজন

কবি পরিচিতি

অনন্ত সুজন। জন্মঃ ২৭/১১/১৯৭৭ [ব্রাহ্মণবাড়িয়া]। পেশাঃ লেখালেখি। শিক্ষাঃ স্নাতকোত্তর [রাষ্ট্রবিজ্ঞান]। মুঠোফোনঃ ০১৭১২০৯৭৭৬৬ । ই-মেইলঃ anantasujon77@gmail.com ।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থঃ পিপাসাপুস্তক (২০১০) ;  জেল সিরিজ (২০১৩) : লাল টেলিগ্রাম (২০১৪) ; সন্ধ্যার অসমাপ্ত আগুন () ; হাড়ের জ্যোৎস্না (২০১৫)।
প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থঃ লীলা রিরংসা (২০১৭)।
সম্পদনাঃ শূন্যের সাম্পান [প্রথম দশকের নির্বাচিত কবি ও কবিতা] ; অনতিদীর্ঘিকা [প্রথম দশকের দীর্ঘ কবিতা সংকলন]
সম্পাদিত ছোট কাগজঃ সুবিল।

অনন্ত সুজন -এর কবিতা-ভাবনা

কবিতা ভাবনার বিষয়টি মূলত পরিবর্তনশীল—অন্তত আমার ক্ষেত্রে। সুচনাকাল থেকে অদ্যাবধি এ এক বিচিত্র বিস্ময়! ঈর্ষাজাগানিয়া, সন্মুখগামী উন্মুল রহস্যের আজন্ম সূতিকাগার। যতই ধর্না দেই, ততোই অধরা। আমি মনে করি, কবিতাকেন্দ্রিক চিন্তা-ভাবনাগুলো একজন কবির স্নায়ুর সন্তরণ। যেখানে শুধুই সৃষ্টির পিপাসা—যা প্রতিমুহূর্তে নিজেকে অতিক্রম করার অদম্য উৎসাহ যোগায়। কম করে হলেও সহস্রাধিক কবিতা তো লিখতে চেষ্টা করেছি। প্রকৃতঅর্থে কয়টি কবিতা যথাযথ হয়ে ওঠেছে—এই নির্মম জিজ্ঞাসার কোন সদুত্তর কি দিতে পেরেছি? সম্প্রতি জীবন ও জগতকে অবলোকন করছি কঠিন দায়িত্বশীলতায়। ধ্যানগ্রস্থের মতো সন্ধান করছি স্বকীয়তা নির্মাণের। যাকে একান্তই নিজের বলে দাবি করা যায়। অব্যাহত আছে নিজের সাথে নিজের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও তুমুল বোঝাপড়া। সমাধান অনিশ্চিত জেনেও ধারণ করতে চাইছি, বহুবর্ণিল শোভাযাত্রার, অনুদ্ধারিত নন্দনের।

অনন্ত সুজন -এর কবিতা


ঘটনা

এখনো ভোর লেগে আছে তার জঙ্ঘায়
যাই, বলে সারাটা রাত কামড়ে ধরেছিল অন্ধকার
ঢেউগুলো পড়ে আছে—যা সে শিখেছিল নদীর কাছে
কত যে শীত গেছে, হবে হয়তো একহাজার রাত্রির সমান
স্বদেশী ফণা তুলে রাঙ্গিয়ে দিয়েছে কুয়াশাকুঞ্জ।

হঠাৎ ভ্রমণ শেষে সে তার কোমরের ক্রোধ ঢেলে
জড়তার পাহাড়ে রেখে গেলো  স্থিতি
দেখেছে লন্ঠন—জলাবর্ত, স্নায়ুর স্পর্ধা।


বার্তা

আমার একটি মাত্র সশস্ত্র চুম্বন
তোমার অসংখ্য যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিতে সক্ষম।


প্রবাদ

সমুদ্রের জল থেকে লবণকে আলাদা করা যায় না
যেমন সব নারীই মৃত্যু অবধি উচ্ছল যুবতী

 —রঙয়ের বাগিচা।


স্তন  

প্রতিনিয়ত খুন হয়ে যাই
ভূ-গোল রহস্য ছুঁতে গিয়ে—বারবার
ছুঁয়ে আসি কামনার মিনার

সম্পর্করীতি আকীর্ণ জেনে
ঘোরলাগা সমুদ্র ভ্রমণে
দেখা হলো পুত্র এবং পিতার।


আত্মজ্ঞান

কিছু ভুল ফুল হয়ে ফুটে আছে

হাড়ের গভীরে—
অনন্তবাগানে

শত্রুদের প্রেম এখনো পাহারা দেয়

গন্ধহরণে—

সামান্য কিছু পাপ থাকা ভালো
এতে মানুষ মনে হয় নিজেরে।


মর্ম

নীরস রাত্রির ক্লেদ উপুড় হয়ে পড়ে আছে ভোরের শিবিরে
বলেছে পতনমুগ্ধ ঝরা-বকুল—আজ কাউকেই সে ঘ্রাণ দেবে না ।
কিছু একটা ঘটতে চলেছে, পাখির লেজের ভিতর ৫২টা তাস!


ঘড়ি

যে আমায় রাতজাগা শেখালো, সে-ই বলে
চলো, ঘুমাতে যাই। এই গান গুঞ্জরিত হলে
নড়ে ওঠে গ্রহের কাঠামো, অদেখা ঐ পল্লবিত
ঘ্রাণের বাগান। সে এক মুহূর্ত বটে, অর্বুদপ্রেমে
চূর্ণ হওয়া মুখশ্রী-মদিরা, নেশা ঝলমল
বদ্বীপের জাদুকর।


বসন্ত

আদরের প্রাচুর্যে তোমার দম
বন্ধ হয়ে আসছিল—ফিসফিসে স্বরে
গুঞ্জন করছে ফুল ও পাখি

—বসন্তের ডালে

কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম উৎসাহে
ছুটে আসছে এ্যাম্বুলেন্স
রূপালী বিদ্যুৎ বয়ে নিতে।


পালাবদল

ঝুলে আছি—
সতেজ-সবুজ সন্ত্রাসে
সবুজাভ সবজি কোন !
ভবকাল সংক্ষিপ্ত যদিও—
অভিসন্ধির অভিন্ন উড়াল তাই
বন্দরের দিকে ধাবিত ।
আজকাল শহরগুলো গ্রামে ফেরে
শুধুই আয়ুর পরিধি বাড়াতে ।
এ নির্মমতা জেনেও—
জলফড়িং,মেঠোপথ,ঘাসফুল
হিজরতের নিয়ত করে
নগরমুখী নরকে !

১০
পরিচয়

আমি ক্লান্ত কোন জাহাজ না—
বন্দর দেখলেই নোঙ্গর ফেলবো ।
নই কোন সৌখিন রেলগাড়ি—
জংশন এলেই বিশ্রামে থামবো ।
আমি পৃথিবী
জন্মের পর থেকেই
ঘুরছি আর ঘুরছি….

১১
জনক

বাড়ির সামনের অংশটা তখনই বাগান
যখন, কখনো-কখনো হঠাৎ ক্ষণিকের অবসরে
পিতার পা তোমার চুমুর রংয়ের মতো
বিকেলের নরমে পায়চারি করে ঘাসের গালিচায়
ঘাস সুযোগ পেয়ে উঁচু করে ধরে বাংলার
শীর্ষ সবুজ। ফুলকুঁড়িদের তখন বয়ঃসন্ধি,গোলাপ
তির্যক আবেগে সে কি লাল! ঘ্রাণে ঘ্রাণে বাতাসেরও
ওজন বাড়িয়ে দেয়। চুরুটের ধোঁয়া তাঁর ফুসফুস
বাহিত—ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল
ঘ্রাণেরা গুঞ্জন করে, বিস্মিত হয়! গোলাপ এগিয়ে
এসে পরিচয় করিয়ে দেয়, তিনি আর কেউ নন
আমাদের সবার পুষ্পপিতা।

১২
মোজেজা

অবগুণ্ঠনের অপার-অতুল অন্তরালে
ভ্রমণ ও বিশ্রামের মনোলোভা দ্বীপ
আহা, ঘামের বনায়নে শিশিরের ডানায়
পরাবর্তের উচ্ছ্বাস, মূর্ত নীহারিকা
নিঃশ্বাসের মিহিন স্পর্শ আর ঝিল্লীতে
মিতবাক বরফখণ্ডটি ঈষৎ গোলাপি-
গরিমায় গলে গলে যায়
বাষ্পীয় হাওয়ায়, দূর অদেখায়।
অবলোকনের অফুরন্ত আরামে
উড়তে থাকে অনন্ত বিমান
নীলের কাছাকাছি, মেঘের উঁচুতে।

১৩
প্রদর্শক

রাত্রির নাভি হতে নেমে আসছে—
বুনো-বাদাম, সবুজাভ এলাচের ঘ্রাণ
বনভূমি জুড়ে বিপুল বৃষ্টি, ছন্দ-অথৈ
প্রেমাবেগে
কামাবেগে
হরিণ ছুটছে হরিণীর ছায়ায়
গাছেদের যৌনতাবিষয়ক আলাপ
বিশুদ্ধ বিজ্ঞান—উসকে দেয় খুব!
ব্যাকুল বাঘও বাঘিনীর ডেরায়
ময়ূর আমি, তোমাকে ভেবে
শোভাযাত্রা বর্ণাঢ্য ও নিশ্চিত রাখি!

১৪
মিথ

স্বর্গের প্রস্ফুটিত ফুল ছিল শুধুই সাদাগোলাপ
বাম পাঁজরের হাড় হাওয়াকে পেয়ে অপ্রতিরোধ্য
আদম নিজেকে প্রথম পুরুষ বলে বিশ্বাস করেছিল।
ওষ্ঠে বাঞ্ছার জাদু রাখতেই—
প্রেমে
কামে
ঘামে
ম্রিয়মাণ সাদাগোলাপ মুহূর্তেই লালগোলাপে পরিণত
হয়ে বিস্ময় ছড়িয়েছে বাগানে-বাগানে!
রাতের তৃতীয় প্রহরে, আমার নিমগ্ন চিন্তাকক্ষে
গোপন আলাপচারিতায় ঘটনাটা বলেছিল—
ফেরেশতা জিবরাঈল।

১৫
সাইরেন

আজকাল বাতাসের রঙ কবন্ধ-কালো
প্রেমিকের চোখ আচম্বিত চোরাবালি
প্রেমিকার দু’হাতে খেলা করে অগ্নি ও ঝড়!
অসম্ভবের নেই কিছু বাকি আর!
মুখ সব মুখোশের অশুভ দূত
সঙ্গ-শয্যা-সহবাসে তাই সন্দেহ বিপুল
বিস্ময় শব্দটি জাদুঘরে সুরক্ষিত!
বেঁচে আছি, এইতো বেশি!

১৫
মোহ

ঘাগরার নীল অন্তরালে জাদুর নগরী
প্রতিটি ঘূর্ণন মুহূর্তে তৈরি করছে বিদ্যুৎ—
প্রেমে, কামে,মোহাবিষ্টতায় অপার সিম্ফনি!
বিপর্যয়ের পদে পদে আসক্তির উন্মাতাল
বিউগল বাজে। রক্তের অস্থির ঢেউ
ত্বকের উপরিভাগে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে!
রাতা মোরগের লাল ঝুঁটির প্রস্তুতি আমার!

১৭
প্রবাহ

মেয়েটি অসহ্য সুন্দর,  আনন্দের অপেরা
স্নানের তাজা বিহ্বল কামিনীঘ্রাণ আর অগণিত
লোলুপ চোখ আজন্ম তার দাসত্বে বিলীন!
এ অভিজ্ঞান অবদমনের আয়াত হতে উৎসারিত!
হয়তো নিজেও জানে না—অজান্তে, আড়ালের
নির্মেদ-নির্জনতায় প্রতিনিয়ত লুণ্ঠিত
অজস্র চিত্রকল্প বা মৈথুনে!
স্নানঘরের সাক্ষাৎকার নেবার প্রাক্কালে ব্যাপক
তুফান সামাল দিতে হয়েছিল—অবিবাহিতের
গমন মাত্রই নিঝুম-নিধুবন! ঝড়ের পাপড়িগুলো
করুণ ছড়ানো ছিল। গোপনে ফেলে রাখা তরল
বিদ্যুৎ, ছোপ ছোপ রূপালী দাগের অন্তরঙ্গে
সে-কি উষ্ণ, দিকহারা রঙ্গিন অভিযোগ!
এই যে হঠাৎ বৃষ্টির বিষয়টি তোমার বুক থেকে
ওড়না সড়ে যাবার দুর্লভ বিভুতি—
হাড়ের গভীরে প্রকাণ্ড গ্রীষ্ম ঠেলে দেয়।
মনে মনে আমি তখন ক্যাটরিনার স্বামী!

১৮
অস্তিত্বঝড়

সময়ের শরীরে হতে পারি সামান্য কোন শামুক-প্রাণ
ধীর, গম্ভীর, অনুমান ও অনুভবের সচল চাকা।
পিঠে রক্তক্ষত, অভিজ্ঞ শ্যাওলার পিচ্ছিলে যার
বহুখণ্ডের ইতিহাস। অনাত্মীয় গন্তব্য দূরগামী
জেনেও জলঘেরা সবুজ ঘাসের ডগায়
প্রণয়-চঞ্চল একাগ্র ফড়িং।
মুখভার সতীর্থদের ঈর্ষার চোখগুলো লাল রক্তকরবী
কাউকেই বলিনি, গদ্যময় পিপাসা-ভ্রমণের কথা—
পাহাড়, অরণ্যমেধা আর সমুদ্রের দক্ষ অভিলাষ
থেকে মাস্তুল তুলেছি। চন্দ্রগলিত জ্যোৎস্নার সাথে
তাই শিল্পের খেলা খেলি!
যাচাই-যন্ত্র বিকল হলেও অস্তিত্বের সাথেই কেবল
সহমরণে যাবো। পূবের নন্দন পশ্চিমের গোধূলিতে
চিরবিশ্রামে গেলে দেখবে, একটি নাম সপ্তর্ষিমণ্ডলের
জ্বলজ্বলে অধিপতি—ভূগোল রক্ষা করছে। যেমন,
স্তনের গোপনে অন্তহীন উদ্দীপক তিলের মহিমা !

১৯
উপলব্ধি

চোখ দুটো উপড়ে ফেলেছি
আগাছা ভেবে!
যমজ কানের সুড়ঙ্গে ঢেলে
গলিত শিসা!
কিছুতেই যে সয়না আর
চলমান জবাই সভ্যতা!

২০
বাংলাদেশ

দস্যু দিয়েছে ঝাঁপ, শতরঞ্জি ফুল-ঘ্রাণ
গতরগঞ্জে তোর! জন্মভূমি আমার একমাত্র
আদরের ছোট বোন। মসজিদ,মন্দির ও গির্জার
ছায়াতলে মৃত্যুর আগেই প্রস্তুতি নেয়া ভোরের
পবিত্র পাখি। ডানার পরতে পরতে বেদনাভরা
কাবার পাথর। শোভিত বেণীতে জলফড়িং, প্রজাপতি
নিয়ম করে প্রতি ওয়াক্তে কাঁদে রোজ!
বাতাসে চাপাতির শব্দ, মুখোশের আড়ালে
ফাঁদপাতা অসংখ্য মুখ! রক্ত ছড়ানো ভয়
ঘিরে আছে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল!
লাল-সবুজের পতাকায় সপেছি প্রাণ, নির্ঘুম
শংকা তবুও,  বুকের ওড়না কেড়ে নেয় যদি!

২১
বাঞ্ছা

যোনি-জমিনের নিঝুম দ্বীপ রহস্য সবুজ
আফিমের বনের পাশেই হরিৎ আপেলবাগান
ঘোরগ্রস্ত, নেশাতুর পথ ছুটে গেছে বহুপায়ে—
সন্ধ্যা ও সুদীর্ঘ রাতের সম্ভাষণে
ভ্রমণে যাবো বলে মনস্থ করেছি—
জুটে যায় যদি বিবাহ-ভিসা।

২২
রতিপুষ্প

ছায়া বিনিময় হয় নির্জন নিধুবনে—তাই
রাত্রির ক্যামেরা দৃশ্য শিকারে দক্ষ জাদুকর
অবশ্য নিবিড় রোমন্থন অনুরূপ ভ্রমণের
পুলক সঞ্চার ও প্রদানে প্রায় সমান উপভোগ্য!

আবার কখনো,ধারনার অনেক উঁচুতে
পৌঁছে গেলে মেঘের অন্তরালে নিখোঁজ হওয়া
বিমানের উদাহরণ তাসের আসর জমায়।
পৃথিবীর তিন ভাগ জল ঘুরে এসে দেখি—
স্থলের উপরিভাগে উড়ছে নিষিদ্ধ নিশান!
অবদমনের অস্ফুট আর্তিতে ব্যাকুল বিরহবাতাস

ঘামের সমুদ্রে ভাসে পারফিউমভর্তি জাহাজ।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E