৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মে ৩০২০১৭
 
 ৩০/০৫/২০১৭  Posted by

অনন্ত সুজন-এর একগুচ্ছ ছোট কবিতা ও কিছু প্রশ্নোত্তর

১. কবিতা দিন দিন ছোট হয়ে আসছে কেন? দীর্ঘ কবিত সৃষ্টি ও চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কারণ কি? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টির দম দুর্বলতা-ই কী ছোট কবিতা বেশি বেশি লেখার কারণ? নাকি, ছোট কবিতার বিশেষ শক্তি এর অনিবার্যতা? কী সেই শক্তি?

অনন্ত সুজনঃ
প্রশ্নটা অধিক মাত্রায় পক্ষপাতসহ এককেন্দ্রিকতার প্রতিনিধিত্ব করছে। সবিস্তারে যার সত্যাসত্য নিয়ে তর্ক-বিতর্কে যাওয়া যায়। তাই বলে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন-অমূলক নয়। কারণ, আমরা সময়ের গতবিধির বাইরে তেমন একটা বিচরণ করতে পারি না। এটি সময় বাস্তবতার একটা দিক হতে পারে মাত্র। আবার অন্যভাবে খতিয়ে দেখা যেতে পারে—যন্ত্র-সভ্যতার উর্বর যুগে বলতে গেলে হাতের মুঠোয় চলে এসেছে পৃথিবী। বিনোদনের অসংখ্য দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। ফলে কবিদের একটা অংশ স্বল্পের ভেতর অধিক কথা নিরূপণের প্রশান্তি খুঁজছে।

বাংলা কবিতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, দীর্ঘ কবিতা’র চর্চা বা সৃষ্টি শুরু থেকে অদ্যাবধি প্রায় সমান্তরাল। উল্লেখ্য, কোন কোন সময়, কোন কোন কবি এ শাখায় বিশেষ মনোযোগ বিনিয়োগ করেছেন। তাঁদের সফলতা নিয়ে সুখী হওয়া যায় নিঃসন্দেহে। অপরপক্ষে বিশ্ব সাহিত্যে ব্যতিক্রমও আছে। এডগার এলান পো দীর্ঘ কবিতার অস্তিত্বকে শেষতক স্বীকার করেন নি। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টি সবার হাতে সমান শোভা পায় না। এখানে জাত চেনানোর মারাত্মক চ্যালেঞ্জটা অন্তরিত অনুধ্যানের আয়াত যেন! যেখানে ম্যারাথন দম অপরিহার্য। ছোট বা দীর্ঘ যে কোন কবিতার শক্তি নির্ভর করে স্বকীয় দক্ষতায়। অর্থাৎ কবির উপলব্ধি পাঠকের মনোলোকে কতটুকু অনুরণন তৈরি করলো তার উপর।

২. এক লাইনেও কবিতা হয় আবার সহস্র চরণেও। আকারে অবয়বে দীর্ঘ বা ছোট হলেই কি একটি কবিতা দীর্ঘ বা ছোট কবিতা হয়? ছোটকবিতা ও দীর্ঘ কবিতার বিশেষত্ব কি?

অনন্ত সুজনঃ
এক লাইনে আদতে কবিতা হয় কি-না ব্যাপক সন্দেহ আছে, তেমনি সহস্র চরণেও ব্যর্থতার সংজ্ঞা নিখুঁত দাঁড়াতে পারে। নির্দিষ্ট আকার-অবয়বে কবিতাকে বন্দি করতে আমি অন্তত নারাজ। তবে হ্যাঁ, দীর্ঘ কবিতার বিশেষত্ব বহুবিস্তৃত। অনেকটা নদী, বন, পাহাড়, সমুদ্র একযোগে পাড়ি দেয়া পরিপাটি সুদীর্ঘ ভ্রমণের নামান্তর।

৩. ক) ছোট কবিতার গঠন-কাঠামো কেমন হওয়া উচিত মনে করেন? খ) ছোট কবিতা পাঠে পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায় কি? গ) ছোট কবিতায় মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া যায় কি?

অনন্ত সুজনঃ
   ক} ‘ছোট কবিতা’ এই তকমার ভেতরেই তার গঠন-কাঠামোর যথার্থ ইঙ্গিত দেয়।
   খ} রূপ-রস-ঘ্রাণ যে কোন ধরণের কবিতার তৃপ্তি আস্বাদনের পূর্ব শর্ত।
   গ} মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা প্রদানে ছোট কবিতা উপযুক্ত নয় আসলে। তবে ছোট কবিতার ছত্রে ছত্রে চমক সৃষ্টির আনন্দটা ক্ষণিকের হলেও আকর্ষণীয়।

৪. ক) আপনার লেখালেখিও পাঠে ছোট কবিতা কীভাবে চর্চিত হয়েছে?

অনন্ত সুজনঃ
গাণিতিক বিচারে কত পংক্তি বা কত সংখ্যক শব্দের সন্নিবেশ থাকলে ছোট কবিতা বলা যায়, তা নিয়ে দ্বিধায় দিন গুজরান করি। ‘হাইকু’, লিমেরিক’কে যদি ছোট কবিতার দলভুক্ত করি, তাহলে পাঠক হিসেবে যতটা অগ্রসর, নির্মাণের ক্ষেত্রে ততোটা পারঙ্গম নই আমি।  

খ) আপনার একগুচ্ছ (৫-১০টি) ছোট কবিতা পড়তে চাই।


ঘটনা

এখনো ভোর লেগে আছে তার জঙ্ঘায় ।
যাই, বলে সারাটা রাত কামড়ে ধরেছিল অন্ধকার
ঢেউগুলো জেগে আছে—যা সে শিখেছিল নদীর কাছে
কতো যে শীত গেছে, হবে হয়তো একহাজার রাত্রির সমান
স্বদেশী ফণা তুলে রাঙ্গিয়ে দিয়েছে কুয়াশাকুঞ্জ ।
 
হটাৎ ভ্রমণ শেষে সে তার কোমরের ক্রোধ ঢেলে
জড়তার পাহাড়ে রেখে গেলো অগ্নি-স্থিতি
দেখেছে লন্ঠন—জলাবর্ত,  স্নায়ুর স্পর্ধা ।


উপমা

অজুনষ্ট সৌন্দর্য তোমার!
চক্ষুজোড়া জ্বলে যাচ্ছিলো
অবলোকনের
অধীর
বধীর
অসহ্য
আরামে!


বউ

আহা তেঁতুল!
উচ্চারিত চিত্রকল্পে
      উত্থিত বারবার
পূর্বাপর ধারণার ভেতর
প্রলোভনে, দূর্বার কামে
উপচে ওঠা জলের গরিমা ।
 


মৈথুন

হাত ও শিশ্ন সংঘর্ষে নামে
শরীরে উঠলে রোদ ।


কাঠঠোকরা

চুম্বন জানে ভালো কাঠঠোকরা
দেখেছি, বসন্তের ডালে—
রতির অভিঘাতে প্রস্ফুটিত, ব্যাকুল
পান করছে অধরমদিরা!


মুকুট

ভুলের অভিজ্ঞানে
ফুল প্যারেড হচ্ছে—
কাঁপছে লাল স্যালুট বক্স ।


বায়স্কোপ

তোমার স্নানঘর মানেই বাদ্যনির্ভর জাদুর অপেরা!
জলের আদরে বিভাসিত, সুবহানআল্লাহ—
কি অপূর্ব, বিবসন-বিভোর!

নায়াগ্রা জলপ্রপাতের সামনে বসে থাকি—
উঁকি ও ঝুঁকিবহুল!  

——————–

কবি পরিচিতি

অনন্ত সুজন

অনন্ত সুজন

অনন্ত সুজন। জন্মঃ ২৭/১১/১৯৭৭ [ব্রাহ্মণবাড়িয়া]। পেশাঃ লেখালেখি। শিক্ষাঃ স্নাতকোত্তর [রাষ্ট্রবিজ্ঞান]। মুঠোফোনঃ ০১৭১২০৯৭৭৬৬ । ই-মেইলঃ anantasujon77@gmail.com ।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থঃ পিপাসাপুস্তক (২০১০) ;  জেল সিরিজ (২০১৩) : লাল টেলিগ্রাম (২০১৪) ; সন্ধ্যার অসমাপ্ত আগুন (২০১৭) ; হাড়ের জ্যোৎস্না (২০১৫)।
প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থঃ লীলা রিরংসা (২০১৭)।
সম্পদনাঃ শূন্যের সাম্পান [প্রথম দশকের নির্বাচিত কবি ও কবিতা] ; অনতিদীর্ঘিকা [প্রথম দশকের দীর্ঘ কবিতা সংকলন]
সম্পাদিত ছোট কাগজঃ সুবিল।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E