৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুলা ০৭২০১৭
 
 ০৭/০৭/২০১৭  Posted by

আমীর আজম খান-এর তেরটি কবিতা


নশ্বর

যেটুকু পোড়ালে তা আমার নশ্বরতা
জ্বলে আছি এক জ্যোতিষ্কের অবিনশ্বরতার দিকে
ভয়-শঙ্কা মায়ার প্রলাপ-সংলাপ মেলে মহাকাল
কত জন্মের রক্তের হিম গলাতে পারেনি সে তাপ
ফুলে ফলে শষ্য মঞ্জরী, পত্রপল্লব
হিংস্র স্বাপদ আর নির্দোষ পশু শরীরের
সুখ-যন্ত্রণার অবিমিশ্র ঘানি বয়ে বয়ে
কলুর বলদ ঠুলির বন্ধনে দুচোখ

তোমার আমার কথোপকথনের ভেঙে যাওয়া সাঁকো
যেন মন তরণীর মায়া এপার ওপার ছুঁয়ে থাকা
যতই নৌকোর পাল তুলি রঙিন স্বপন…
পুনর্মুদ্রণের ভুল রয়ে যায় পাতায় পাতায়
জীবনের কূলে কূলে
নির্ভুল গণনা তোমারও নিশ্চিত নয়
মাঝখানে জ্বালাও পোড়াও নিরিবিলি অবকাশ যপনায়
হাতে পেলে যার তার নশ্বরতার এই ধূপ!


অহম

পৃথিবীর হাটখোলা দরজায়
সবাই কেবলি ডাক শোনে আয় আয়
আত্মগত অভ্যন্তরে আমার আমার মিশ্র ভৈরবী
গিদাল দোহার সুরে মনখানি সঁপে আছি
যার যার গৃহকোণে

পাহাড় নোয়ায় মাথা ঝর্ণা মূলে
সব নদী ফিরে যায় সাগরের বুকে
জলের তেয়াগ বিন্দু লেখে না তো
নাম ধাম ঠিকানা নদীর
পাহাড় নদীর গর্ব ভরে সবাই সান্ত্বনা বিলাই


মাছের মতো

জলের ভেতর কেন মাছ থাকে
চোখ দুটি ব্রহ্মাণ্ড জোড়া
উদাসী নিশির মতো
আলোর সংকেত নেই
সম্ভাবনার উদ্ভাস ছেঁড়া ছেঁড়া

আছে তাও মাতৃগর্ভ ভ্রুণে
দাদনের কড়ির উসুল
আমিও সংসার থির জলে মাছের মা হয়ে ভাসি
সামনে পিছে উপর নিচে
বুদবুদগুলো ভৈরবীর একঘেঁয়ে তান
সকলের পাওয়া না পাওয়ার গান
আঁচড়ে কাটা কলের গানের মতো ঘুরে ঘুরে গায়
কে আর কতটা চেনা তার
নিজেরই চোখ আর ঠোঁটের কামরাঙা
গিলে খায় অনিচ্ছুক জলে
আগুনের গোলায় দগ্ধ হতে হতে
মাছের দুটি জ্যোতিষ্ক
শুধু দেখে যায়…দেখে যায়
ভেসে থাকে সংসার সমুদ্রে তুচ্ছ কুটোর আঁচল


বাঁশিটির ফুঁ

সঞ্চিত পাহাড়ের
ঝরাও বিষাদ বালি
হালকা পালক খোলো
বিমনা পাখিটির

বাঁশিটির ফুঁয়ে নাচো
নতুন কল্লোল মেগে সুর হও
যেই দমে বুঁদ শ্যামকালা
রাধিকার নিধুবন-সজ্জা
একাকী পাটাতন খোলা
নিবৃত্ত রাত্রির অভিসার
স্মৃতির অন্তর্জ্বালা
স্বরাজ কষর্ণের মতি
ঢালো হে রায় কমলিনী
নইলে পাবে না থই চিত্তে
মথুরার এ নিশি!


ফসিল

দূর থেকে আমাকে একটি গাছ বলে ভেবেছিল মেয়েটি
ছায়ার আরাম পাতার সানাই ফলের মিঠাই
বল্কলে নখের সুখ ফালা ফালা
ভাববেই বা না কেন?অন্ধকার তেমাথা পথে
ল্যাম্বপোস্ট হয়ে আলো নিয়ে দাঁড়িয়েছি কত
পথিকেরা চিনে নিল চড়াই-উৎরায় খানাখন্দ
যার যার নির্ভুল গন্তব্য
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম
প্রাগৈতিহাসিক সেই কাষ্ঠদণ্ড ল্যাম্বপোস্ট গাছের ফসিল!


স্বপ্নদীপ

প্রখর রোদ্দুরে কানামাছি ছোঁ ছোঁ অছিলায়
দেখো বিকেলের কী বিশ্রাম!

রক্ত স্বল্পতায় সূর্যের ক্ষীণআলো; ঘন সান্ধ্যআবীর
আর আকাশ বিছায় ক্লান্ত বেডসিট
বেগুনি-সুনীল
ধূপছায়াময় স্মৃতি নগরীর
সিং দরজা পেরতেই
বেগম আখতারের ঠুমরীর মদে
নিঝঝুম চরাচর শান্ত আলয়
জাগে নিখিল স্বপ্নদীপ!
কুমারের রাজকন্যা পালঙ্ক সমেত।


বদলে যাওয়া

মানুষ এতটা বদলায় যে কেউটের খোলস পাল্টানোর
চেয়েও তা গুমরাহি। প্রথম নদী দেখে বদলেছে
আমার ভেতরের ঢেউগুলো জলের পায়ের নিচে তিরতির
করে সরে গেছে বালি যেন মাথার মধ্যে একটুখানি
শূন্য হওয়া ফাঁকা স্থানবিন্দুতে গিয়ে ঠাঁয়
সমুদ্র দর্শনে নুনের ক্ষরণ কাকে বলে জেনেছি জলজ ভূগোল
মানবতা ও অশ্রুর মতো আঁকাবাঁকা বহমান নদীরা সন্তান
শিরা-উপশিরা রক্তের মধ্যে যেন বিষাদের বালি

পাহাড়ের গিরি-খাত দেখালো ব্যবধান কত উঁচু ও নিচুতা ভীরু
চশমায় হারানো সরল চক্ষু কণিকা
দেখে না আর সমভূতিতে দাঁড়িয়ে অশ্রুত মানুষ
মূলত উন্মুল হাহাকার আর ভালবাসা সমষ্টির এত্তটুকু ছাই

মরুভূমিতে কবে ফুটবে বসন্ত বাতাস স্নেহের একটি গোলাপ?
অসার কাষ্ঠের নাও হবে কী সারৎসার জীবনের গতির প্রতীক?
অথবা বল: মনপাখি, কোথায় হারালো তোর উড়নি ডানার সঞ্চার?

যৌবন ও উত্তর যৌবনে নারী দেখাল তার বিহঙ্গ পেখমের নিচে
হিলহিলে সাপ ছোবলের দাঁত পরিপাটি…
আর বিধ্বংসীরূপ পোড়া কাঠ কয়লায় জ্বলা একমুঠো ঘাস!


স্মৃতিভাস

স্বপ্নবীজ এক। নওল শৈশব রাঙি, পৌঁছে যাব ঘুমে।
সাদাচুল গোয়ালা কুয়াশা ভেদ করে
আচানক হাঁকহাঁকি।
খড়-নাড়া-স্তূপে মিহির শিশির পোড়ায়
আহ্লাদের যত খেদ-জ্বালা ঘাসের গালিচা ভ’রে।
ছলকানো জলে উবু হওয়া বকেরা খুঁটে খাচ্ছে মাছ
মেঘের পরীর থেকে ঘুমটুকু কেড়ে এনে ছিঁড়ে
উঠানে দড়ির ঝুলে
আকণ্ঠ আঁধার গিলে কাক ডাকে-তবে তো ভোর
শিউলি উধাও। মনোবেদনায় হতাশ্বাস ফাঁকা টুরিখানা
মনে পড়ে প্রাতেই কুড়িয়েছি এত্তখানি
প্রজাপতি পাখনায় আঁকা। ফুলগুলো উড়ুক্কু মনপাখি!


অন্তরালে কথকতা

অখণ্ড সময়ের দিকে যাব
তাকাব না আর ঘড়ির কাঁটায় স্থির কম্পাসে
উত্ত্যক্ত করুক যত গোলাপী আভাস
তত কালো ঠিকরানোর ভয়
সে যে কী কপিস পাথর কায়া মনোবীণা
বাতাসে শ্বাসে যতসব পৃথুলা আশ্বাসে ধূ ধূ অবক্ষয়!
চোখের পাপড়ির ভুলভাল পাঠ- ডেকেছে কী মনোরমা?
ইশারা কী জলে ভেজা ভেজা? পদ্মপাতার নিচে
দেখোনি কী জলবোড়া মারণ চাহনী?
হয়ত কর্ণিয়ায় লেগেছে ছাপ মরীচিকার
পা সমভূমে রাখা ঠিকঠাক ঘোড়ার রেকাব
চপ্পলের শেষ পদক্ষেপ পেরুনো অপার নদী- বালুরেখা
চরের ঘাসে খচ্চর সুখী অন্যেরা নয়
ফিরেও আসব অখণ্ড অবকাশ মেপে
শার্সির কাচ ভেদ করে
যেমতি টাটকা রোদ প্রকৃতির স্নেহ!

১০
সুর ও পূজা সংক্রান্ত

অজস্র সংবেদনা শুষে সুর তার
বাঁশরীর জ্বালিয়েছে হাওয়া
মৌনতাক্রান্ত মন দাহ্যগুণে
ফুরফুরে জোৎস্নাধারায় ঢালে জল
নীরব অভ্যন্তরে শিশির পতন
মনের যৌনাঙ্গে নিষ্কাম চাহনী জ্বালে
অনন্ত-বাসনা ধূপচি পূজারির

আজ আমি সাধ হব
নিজেরি সকল বিন্যাস বিছিয়ে
ফেলে আসা পথের চিহ্ন বুকে
শুশ্রূষার প্রসূতিসদন।

১১
চাঁদের কড়চা

দূরের নক্ষত্র কিংবা অদূর দৃশ্যমান চাঁদ বলে
মরমবীণার প্রার্থনা-সঙ্গীত পলকের নিচে টাঙালো সাগর
অতঃপর ঈশ্বরের উত্তর গোলার্ধে চিড়…ধবল জলরেখা নামে
আর কলঙ্কের দাগটাগ মুছে মর্ত্যে নেমে এল চাঁদ
অনন্ত লহমার বিষে জাপটে ধরেছি বুকে
চাঁদ বলল: যা ইচ্ছে কর; বাড়ি ফিরে যাব
ওখানে একটি জোনাকও নেই আলো জ্বালাবার মতো
চাঁদের বাড়ি! তার কথায় আমি কী না বলতে পারি?
মর্ত্য আর চাঁদের মাঝামাঝিই তো ব্যবধান; আড়ি!

১২
জল খেলানো মাছ

চোখে হারানোর জো নেই
পাহারা বসেছে জুলফিতেও
কোঁকড়ানো ঢেউ অনেকটা ফাঁপা
ভর করে আছে মন, ফিরাতে পারিনা বিপরীতে
না না বদলে কিচ্ছু চাই নে
এ তো মোহর কড়ি কিংবা নতুন চেরাগ নয় যে বদলযোগ্য
পুরনোটিই আলাদীনের
তবু আশ্চর্য হয়ো না
স্বপ্ন মুহূর্তের চোখ ফিরে ফিরে গন্দমে চায়
দীর্ঘ বাটনা বাটে স্বপ্নের
কুটনা কোটে হৃদয়ে স্মৃতি আলপনাময়
যথা জল খেলানো মাছ!

১৩
কাচরহস্য

মাঝখানে স্বচ্ছকাচ দুজনায় দেখতাম একে অন্যের
ঠোঁট নাক ভ্রু অভ্রতে পলকের ছায়াগুলো
ক্রমশ হাওয়ায় রূপান্তর
চাওয়া-পাওয়া-
দুইপাশে বয়ে যাওয়া নদী; তুফান দুর্দিনের
ডুব সাঁতার… কী জানি দুজনার চলা!
জমানো সময় শিশির হাতড়ে ফিরে চাইতেই
ছাল ওঠা ঘেয়ো কুকুর আর
তুষার আবৃত স্লেজগাড়িগুলো ঝলসানো
দুটুকরো কাচ হত হয়ে পড়ে আছে পাশে!

 


আমীর আজম খান

আমীর আজম খান

আমীর আজম খান। জন্ম ১২ ডিসেম্বর, উনিশ শ সাতষট্টি সাল। কুষ্টিয়া শহরের হরিশংকরপুরে। পিতাঃ আব্দুল মজিদ খান, মাতাঃ সুফিয়া খানম। শৈশব-কৈশোরেই প্রকৃতির নানারূপ বর্ণগন্ধ ঋতু পরিবর্তনে ভিন্ন ভিন্ন চিত্রকল্প কবির অনুভূতিতে আলোড়ন তুলে স্মৃতির ভাণ্ডার সমৃদ্ধি করেছে। প্রথম লেখা ছাপা হয়েছিল ১৯৭৯ সালে কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত ছোটকাগজ ‘ফুলে ফুলে’। কৈশোরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রকাশিত ছোটকাগজে নিয়মিত লেখালেখি ছিল। এ পর্যন্ত পাঁচখানা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম কবিতার বই বিপন্ন বণিকের দীর্ঘশ্বাস ২০০০ সালে। ২০০৬ এ পারিজাত প্রকাশনী থেকে যে কুসুমে জলের ঘ্রাণ, ২০০৯ এ পলল প্রকাশনী থেকে মাছের মুদ্রায় আছি ও ২০১০ এ পারিজাত থেকে স্বপ্ন জলে ব্যবচ্ছেদ, এবং কোলকাতা বইমেলা উপলক্ষে ২০১০ এ সাংস্কৃতির খবর থেকে শেকড়ের স্বপ্ন নীলজল নামে একটি কবিতার বই বেরিয়েছে। ‘উমেদ’ নামে একটি অনিয়মিত সংস্কৃতির কাগজের সম্পাদনা ২০০৪ সাল থেকে। এ পর্যন্ত সাতটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর লালন তিরোভাব বার্ষিক উপলক্ষ্যে মহাকাজে মহাধন্য [লালন ঘরাণার কালজয়ী ফকির মকছেদ আলী সাঁইয়ের জীবন ও কর্মভিত্তিক আলেখ্যগ্রন্থ] প্রকাশের অপেক্ষায়।

‘বাউলিয়া’ লালনধাম প্রাঙ্গণ, ছেঁউড়িয়া, কুষ্টিয়া-৭০০১। মোবাইল: ০১৭১৬৩৩৮৭৭১

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E