৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মে ১৭২০১৭
 
 ১৭/০৫/২০১৭  Posted by

আমীর আজম খান-এর একগুচ্ছ ছোট কবিতা ও কিছু প্রশ্নোত্তর

১. কবিতা দিন দিন ছোট হয়ে আসছে কেন? দীর্ঘ কবিত সৃষ্টি ও চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কারণ কি? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টির দম দুর্বলতা-ই কী ছোট কবিতা বেশি বেশি লেখার কারণ? নাকি, ছোট কবিতার বিশেষ শক্তি এর অনিবার্যতা? কী সেই শক্তি?

আমীর আজম খানঃ
বাঙলা ভাষায় কাব্য সৃষ্টির সূচনা পর্বে বিশেষ করে মধ্যযুগের চর্যা পদের কবিদের ক্ষেত্রেও লক্ষ করা গেছে কবিতায় অবয়ব বা পংক্তির সংহত রূপ। কবিতায় নির্বাধ দিশেহারা শব্দসমূহের যথেচ্ছ ব্যবহার নয়। বরং ছোট অবয়বের মধ্যে একটা অসীমের বিদ্যুৎ চমকের মতো বিপুল ব্যঞ্জনার উদ্ভাস থাকা চাই। কাজেই দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টি ও চর্চা কমে যাবার প্রশ্ন উঠছে কেন? কোনো কালে তো এমনও দেখা যায়নি যে অনবরত আমাদের কবিরা শুধু দীর্ঘ কবিতার চর্চা করেছেন!
প্রতি মুহূর্তে ব্রহ্ম-ের সকল জৈব-অজৈবের পরিবর্তনশীলতা বয়ে চলেছে। এটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। অগ্রসর ও বিকাশমান মানুষ চৈতন্যেও ঐ পরিবর্তনেরই যেন সহগামী। গত শতাব্দির আশি দশকে এ বাঙলায় কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান লিখলেন, ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’। দোলায়মান বাঙালি মানসের জন্য তিনি শেকড়ের মর্মমূল ঢুঁড়ে গর্বিত মন্ত্রণার মতো শোনালেন আমাদের উত্তরাধিকারের কথা। নিজেদের বলশালী অস্তিত্বে অনুভব করতে পারি আমরা মোটেই উৎসবিহীন নই। এই যে চৈতন্যে হুসের পেরেট ঠুকে দেওয়া যথার্থ কবি ও কবিতার কাজ। আমার বিবেচনায় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান দীর্ঘ কবিতা লেখার পণ করে এটি লিখেননি। বোধের জারিত আধারে ফকির লালনের ভাষ্যে ‘পোনা মাছের ঝাঁকে’র এক অসহ উদ্দীপনায় কবি বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপ-রস ভিয়ানে সৃষ্টি করে চলেন কবিতা। বৃহৎ আঙ্গীকে ইতিহাস মিথ ও কালের গণনায় রূপরেখা তুলে ধরতে সৃজনের পরিসর বড় অথবা ছোট হতে পারে। কে কখন কোনটা লিখবেন অন্তত কবিতার ক্ষেত্রে সেটি নিরিখ করে লেখা সম্ভব নাও হতে পারে। কারণ কবিতা ভাবের ঘরের কা-ারি। ভাবের উর্মি ও স্রোত তাকে কোথায় নিয়ে যাবে অথবা টেনে ধরবে তার হাল ঐটি একান্ত ভাবের মর্জি।
কাব্যকলা একটা বিশেষ সৃজনীশক্তির বিকাশ। শেষ পর্যন্ত কবিতা কবিতাই, এর আঙ্গীকের রূপরেখার বিন্যাস ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। তবু সর্বোপরি কবিতার অনিবার্য শক্তিতেই রূপান্তর ঘটে। ছোটবড় এখানে অন্য অর্থ খুব একটা বহন করে না।
প্রতিটি ভাষায় রয়েছে লক্ষ লক্ষ শব্দ। শব্দ ব্রহ্ম হলেও তাকে প্রাণ দেওয়ার কাজ করতে হয় সাধক মুনি ঋষি কবিকে।

২. এক লাইনেও কবিতা হয় আবার সহ¯্র চরণেও। আকারে অবয়বে দীর্ঘ বা ছোট হলেই কি একটি কবিতা দীর্ঘ বা ছোট কবিতা হয়? ছোটকবিতা ও দীর্ঘ কবিতার বিশেষত্ব কি?

আমীর আজম খানঃ
কবিতায় অঙ্গ সৌষ্ঠব ব্যাপার নয়। তবু আঙ্গীকের দিক দিয়ে হ্রস্ব ও দীর্ঘ কবিতা আমরা দেখতে পাই। কিন্তু প্রশ্ন হল পাঠক কবিতায় কী চায় বা কী দেখতে পায়। এক বা দুই চরণের কবিতাও পাঠক তার অনুভবকে কবিতার অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে আনন্দ পেতে পারেন। বা নিজস্ব অন্তর্নিবিষ্ট বিশ্বাসের দেখা পেয়ে সুখী হতে পারেন। অবশ্য কথাটি আনন্দ নয় পাঠক তার হৃদদর্পণে যতরকম বোধ রয়েছে তিক্ত-সিক্ত, মিলন-বিরহ, প্রেম-অপ্রেম, আনন্দ-বিষাদ, দেশপ্রেম-প্রকৃতি প্রেম এমন কি ঘৃণা-বিদ্বেষ পর্যন্তও দেখতে পেয়ে মনকে তৃপ্ত করতে পারেন। আবার কবি যে বোধে জরিত হয়ে কবিতার বিকাশ-প্রকাশ করেছেন পাঠক মানসলোকে তার অন্যতর আবিষ্কারে হতে পারেন সমৃদ্ধ। বরং কবি একমাত্রিকভাবে লিখলেও পাঠকের কাছে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা পেতে পারে একই কবিতার। মানুষের মন সর্বদা গতিময় চলিষ্ণুতার দিকে ধায়। কোরানের ভাষায়, ‘অবিরাম বিষয়রাজির আগমন নির্গমন ঘটে’। এখন এ বিষয়রাজির ওপর নিয়ন্ত্রণই সালাত বা ধ্যান। ভাল ও মন্দ গ্রহণ বর্জনে সিদ্ধতা সালাত। কবিতায় এ বিষয়রাজির যথাযথ নির্বাচনের মতোই ব্যাপার অনেকটা। কবি কতটা ধরে রাখতে পারবেন শব্দ বন্ধনের মধ্যে তা। এবং পাঠককুলের পাঠ ও হৃদ সংবেদী অনুবাদের ভেতর দিয়ে প্রবহমান নদীর মতো চলিষ্ণু থাকা এর বৈশিষ্ট্য। দীর্ঘ হ্রস্ব ব্যাপারটি এখানে গৌণ। বিন্দুতে সিন্ধু ধারণ যেখানে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সেখানে আকার-আয়তন ভাবনা আমার একান্ত বিশ্বাসে তেমন স্থান পায় না। এতক্ষণ কবিতা প্রসঙ্গে যা যা বলেছি ঐগুলো কবিতার বিশেষত্ব। এখানে বিভাজন করে ভাবনার অবকাশ আমি পাই না। অখ- কবিতার উপরোল্লিখিত বৈশিষ্ট্য জাজ¦ল্যমান বলে আমি মনে করি। সিদ্ধ প্রাজ্ঞ কবিগণ সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যসমূহ নিয়ে হয়ত আলোচনা করবেন।

৩. ক) ছোট কবিতার গঠন-কাঠামো কেমন হওয়া উচিত মনে করেন?

আমীর আজম খানঃ
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি কুড়ি-পঁচিশ চরণ যুক্ত কবিতাও ছোটকবিতা। তবে মতামতের উদ্দেশ্যে নির্ধারণ করে দিয়ে, অভ্রান্ত ধরে নেওয়া; অন্যের উপর আরোপ করবার মতো কর্তৃত্ববাদী মনোভাব ঠিক নয়। তাই কারও বেঁধে দেওয়া ছক অনুযায়ী ঠিক ঠিক নির্ধারিত পরিমাণ চরণ হলেই শুধুমাত্র ছোটকবিতা এমন ধরনের কোনো সংজ্ঞা সূত্র রয়েছে কিনা আমার জানা নেই! অবশ্য আমাদের কোনো কোনো খ্যাতিমান কবির দীর্ঘ কবিতা রয়েছে। যেগুলো হয়ত পঞ্চাশ থেকে একশত চরণের মধ্যে অথবা বেশি পরিমাণও হতে পারে।

খ) ছোট কবিতা পাঠে পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায় কি?

অবশ্যই ছোটকবিতা পাঠে পূর্ণ কাব্য তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব, নইলে পাঠক কেন কবিতা পাঠ করেন?

গ) ছোট কবিতায় মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া যায় কি?

হ্যাঁ, ছোট কবিতায়ও মহাকাব্যিক ব্যজ্ঞনা থাকতেই পারে। সেরকম কাব্য সৃজনের কবিও নিশ্চয় রয়েছেন কেউ না কেউ। আমার ব্যক্তি অভিজ্ঞতায় দুই বা চার লাইনের কবিতা অথবা লিমেরিক অসংখ্যবার প্রাণ-মনে নাড়া দিয়ে যায়। যেমন: কবি আবুল হাসানের ‘ঝিনুক নীরবে সহো ঝিনুক নীরবে সহো/ ঝিনুক নীরবে সহে যাও/ ভিতরে বিষের বালি মুখ বুঁজে মুক্তো ফলাও’ অথবা  হেলাল হাফিজের ‘পরমানু বোমা বোঝ/ মানুষ বোঝ না’ কেউ বলতে পারবেন যে এটি সার্থক কবিতা নয়?!

৪. ক) আপনার লেখালেখিও পাঠে ছোট কবিতা কীভাবে চর্চিত হয়েছে?

আমীর আজম খানঃ
শৈশব কৈশোরে শামসুর রাহমানের ‘এলাটিং বেলাটিং’ ছড়ার বইটি ভীষণ মোহাবিষ্ট করেছে। ঐ গ্রন্থের ছন্দ সুরের ঝংকারটি এখনও শুনতে পাই। ছড়াগুলোতে শৈশব-কৈশোরের বর্ণগন্ধের আকুতি পেছনের হারানো মুহূর্তগুলো হাতছানি দিয়ে যায়। বাঙলা ভাষার বিশেষত বাংলাদেশের কবিদের মধ্যে অসংখ্য নামের মধ্যে এই মুহূর্তে মনে পড়ছে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, সিকদার আমিনুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, হেলাল হাফিজ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান, আসাদ চৌধুরী, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, শহীদ কাদরী, তসলিমা নাসরিন, ওমর আলী। অন্যদের নাম মুহূর্তের খেয়ালে ভুলে থাকলেও তাঁদের লেখনিও আমাদের পঠন-পাঠনে অনেক উৎসাহ দান করেছে। ওপার বাঙলার পুর্নেন্দু পত্রী, সুনীল গঙ্গোপাখ্যায়, বিনয় মজুমদার ভাবনার ক্ষেত্রে বিশেষ মাত্র দিয়েছে।
এ যাবৎ আমি দীর্ঘ কবিতা লিখেছি বলে মনে পড়ে না। যদিও কোনো কোনো কবিতার অঙ্গ সৌষ্ঠবে তার ছিটেফোঁটার ছাপ থাকতে পারে। দীর্ঘ কবিতার গতিময় আবেগ ধরে রেখে চলমান থাকা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ একটু বিচ্যুতির গন্ধ পেলে তাতে পাঠক ঠকানোর স্পষ্টতা ফুটে উঠতে পারে। তবু কথা থেকে যায়জ্জযদি গভীর ও ব্যাপক চিত্রপটের আকুতি মনে স্থান পেয়ে থাকে, তা প্রকাশে কখনও না কখনও সে বাধ্য! কসরৎ করে নয় বরং প্রসব যন্ত্রণার আনন্দ বেদনার মধ্য জন্ম হতে পারে একটি অনন্য কবিতা। এটি কবি ও কবিতার ধর্ম! প্রশ্নগুলোর কোনো কোনো অংশের উত্তর আমার জানা নেই তাই আপনাকে সবিনয়ে অক্ষমতার কথা জানিয়ে দিলাম। এক্ষেত্রে অনেকানেক প্রাজ্ঞ কবিদের ঐ প্রশ্নগুলোর যথাযথ উত্তরের প্রত্যাশায় রইলাম!

৪। খ) আপনার একগুচ্ছ (৫-১০টি) ছোট কবিতা পড়তে চাই।

আমীর আজম খানঃ


সুরমিতা

সুরের গন্ধ পান করে করে
আজ তাই কলমিলতা।
জলে সূর্যরশ্মিতে ভাসি।
আকস্মিক ঢেউ দস্যুতায়ও ডুবি।
নিচে। টলটলে লাজুক ঝিনুক
মুক্তো খুলে হাসে।
এ কোন পরবাসে! রাতের
জলসায়। চন্দ্রবদন ঝিনুক বালিকাদের
নৃত্যছন্দে নূপুরের আশেপাশে-
দাঁড়িয়ে সঙ। এক ভ্যাংচি কাটের ব্যাঙ।
আমার গানের উপহাসে
সামলে দেখি। দোতরার হাওয়ার আওয়াজ তো খুবই।


চাঁপাইগাছি বিল

সরে সরে যায় মেঘময় চুলের ঝঁকড়া বাবলারা
দ্বিপ্রহরের হেলে পড়া ঘন ছায়া ছাপিয়ে
তীর্যক রশ্মিতে ভেসেছে সারস সারি
গল্পটি রৌদ্দুরের নাকি মেঘলা বাতাসের
শ্বাস ঝরে ঝরে উড়ন্তদের নবিশি সন্তরণ।
স্মৃতিকণায় অঘ্রাণের বাতিক পাওয়া শীত ছুঁই ছুঁই করছে…
সেই পুরনো তুণ থেকে নেওয়া ঘ্রাণ
তাই সরপুঁটি দেখতে গিয়েছি চাঁপাইগাছি বিলে;
দেখা পেলাম পেল্লাই কার্ফজাতের
উচ্চবর্ধনশীল অদ্ভূতুড়ে যেন রাম গজার!
হায়! স্বপ্নের মধ্যেও তড়ফানি যেন
মোগল বাদশাহী যথেচ্ছার।
সব বদলে গিয়েও বদলায়নি
আশ্বিন কার্তিক অঘ্রাণের তুরীয়
রোমকূপসমূহ নিয়ে এই বিলের জল
     আর পানকৌড়ির ডানায় রৌদ্র ঝর্ণার বিমুগ্ধ কোরাস!


স্মৃৃতির কণায়

বহুদূরের পথ; প্রথম যৌবনের…
নিউরণ কণায় যেন ঘুমন্ত রত্নদ্বীপ
পায়ে বিধে আছে ছোলা খেসারির
অম্ললতার ঘায়ে মৃদু জ্বলুনি

প্রতিদিন পেরনো এক একটি ঋতু
তবে শীত ও শীতোত্তর গন্ধরা বেশি উন্মাদ
কখনও বেপরোয়া গ্রামীণ ধুলোয় গড়ানো
কিশোরের চাকা ছিনিয়ে ক্ষণিক ঘোরানো
পড়শিদের বাড়ি বাড়ি ধোঁয়ার তীব্রতা…
অতএব সবকিছু অস্পষ্ট…সময়গুলো দেওয়ালে
ঘড়ির কাঁটায় সাঁতরানো টিকটিকি
কখনও যেন কামারের শ্রান্ত হাপর
কখনও শুকানো জল; পানিস্বল্পতা রোগীর মতো
চেলা মাছের ঝাঁক- পুকুর খাল বিলে

যদি ক্লান্তিহীন সূর্যের চাপে দুপুরটি আর একটু
 দীর্ঘক্ষরা হতে পারতো
তাহলে উজ্জ্বল ফ্রকপরিহিত মেয়েটি হেঁয়ালিতে দাঁড়াতো
ঝাঁকড়া বাবলাকীর্ণ পুকুর পাড়টিতে

হঠাৎ মাথাঘোরা মুহূর্তে দেখা যেত
যেন ডিমের কুসুম চক্রে ঘুরে চলেছে মেয়েটি
ক্রমে ক্রমে সায়াহ্নের ডুবন্তপ্রায় লালিমায়জ্জ
মেয়েটি-কুসুম-সূর্য যেন এককেন্দ্রিক স্নায়ুর স্নান
এই আমাদের প্রথম যৌবনের গল্প!


নক্ষত্র পাঠ

কখনো কোনো নারী আমার নক্ষত্রের দিকে
চেয়ে বলে, ‘তোমার চোখ অত রক্তাভ কেন?’
ওরা দৃষ্টিসীমার মধ্যে অহেতু এক বিপ্রতীপ
রেখাচিত্র টেনে দেখেছে
যেন অস্তমিত সূর্যের মিথ; সতত লৌকিক পাঠ
ম্লান আলোয় অযথা সৌরপাতের ঝর্ণা
যেনবা দিকচক্রহীন নিরাশা নাবিক
গভীর জলের ঘায়ে ভুলেছে সৈকত
বলি- মৃত মাছির ভঙ্গুর ডানা যথেষ্ট উড্ডয়ন অক্ষম…
সে এক হাওয়ার সংকটেরও অধিক
অতএব রক্ত বর্ণে কড়চা- সহিস সওয়ারীর ঘোড়ার খুর
আর শব্দময় এক আলোর সংকেত বলে মেনেছি।


চাদরে ভাদর

দে সরু সুতোর টান আস্তে আস্তে
হালকা শোলার টোপে ভাসতে ভাসতে
গভীর ঘুমের মাঝে স্বপ্ন চাদর
বিছানা বালিশ ভেজা চিমসে ভাদর
তবু যদি একটিবার কাছে আসতে।

লালায় ভেজানো চিড়ে কথারা উধাও
দাহ্য পোড়ামন বলে, ‘আলোক বাতাও’
স্বপ্নচূর্ণ ধু ধু বালি হাতড়ে ফেরে
কে ডাকে অসামান্য অধরা উৎসরে
নবমীর চাঁদ ওঠে সোনার কাস্তে?!


নাগরিক

ভেতরে গোপন তৃষ্ণা; চিৎকার, পানি পানি
বাইরে উপচানো সুখ নিয়নবাতির ঝলকানি
ত্বকের উজ্জ্বলতা ছাড়ে উপমা অপার দেখানি দেমাগ
ভেতরে সবাই বোঝে কাটে না তো শীত প্রবণ সে মাঘ
জীবন চলেছে সত্যেরে মিথ্যা আর মিথ্যারে সত্যের করে দুতিয়ালী
রঙের খোয়াবে ভুলে কাকে দেয় দেহ আর কাকে মনটার ফর্দ ফালি!


জিগোলো

নাভির মোচড়ে বেদনা উগরানো বমির মতো
সকল প্রার্থনা যৌবনঝড়ে গিয়েছে পুড়ে

গভীর রাতের নক্ষত্র সাক্ষী
যেন আকাশ বুনেছে ঝাপসা হাওয়ার ছাই
কসাইয়ের ছুরি ভালবেসে পেতেছি গর্দান
যেন আমি এক সু-বাধ্য পশু
অথবা কারো তৃষ্ণাকাতর শরীর ব্যবচ্ছেদ করা…লণ্ডভণ্ড
অনঙ্গ মন জ্বলে ধুতরা ফুলে
যতখানি আলো দেয় ক্ষত ও হুলে
যেন দিনমণি আলম্ব পশ্চিমে ঢলে

পদ্মপাতায় শিশির বিন্দুর এ জীবন খায় কুরে কুরে!


শব্দ খুঁজি

তন্ন তন্ন খুঁজি-‘বাঙ্ময়’ এখন পর্যন্ত এটুকুই চেনা চেনা
যেই চোখের কপাট দুটি ফেলি
বুঝি না মগজের কোষে চোরকাঁটা না এন্টেনা
আজব খবর আছে আকাশে ছাওয়া
ছড়িয়ে ওড়ে যেনবা সে এক ডাক পিয়নের চিল
আওয়াজ শুনি ঝমঝম খেজুরপাতার
দেখি ময়ূরীর নাচ পেখম সমান
বেদুঈন সন্ধান পায় বালুর হলুদ গর্তে আহার্য গুইসাপ
বজ্র বিদ্যুৎ ফনা অথবা গোলাপী রোদের কণা
জানিয়েছে কমসে কম রোদ-বৃষ্টির দাঁড়িকমা
অবশেষে অক্ষরে অক্ষরে মিলনের যতসব শব্দশিশু জমা!


নীল বাঁশরীর হাওয়া

না থাক! চাইলেই পাবে না সাড়া
নীল বাঁশিটির ফুঁয়ে- তোমার কড়ানাড়ার এক বা দুয়ে
মাঘের দুপুরে ঘাম ঝরঝরা-এও কী সম্ভব!

নিশ্চেতনার শ্বাস কেমন উদাস বৃক্ষ-শাখে
মধ্যরাত; আকাশগঙ্গার বাঁকে বাঁকে
মেঘের খোলা দরজায় অন্ধকার জমে
কমে ক্লেদ ভেতরের ঘূর্ণায়মান সুঁইয়ে
স্বেদশুভ্র কপালের ওমে
বাঁকা চাঁদ পাতা ফাঁদ
কিছুতেই যায় না মোছা বাঁশরীর হাওয়া
থির থির কাঁপে নিদ্রা-জাগর মাঝামাঝি পাওয়া
চোখের পাতায়
যেন রয়েছি এক ধূসর নীল দর্পণে শুয়ে!

১০
স্বাক্ষর

নিয়মরেখার অক্ষরে ছাপা মুখ
বেদনার জলে ভেসে ভেসে…

তটরেখায় জাগ্রত মন নিয়ে
সে এক উদয় বিলয়ের নাও
বন্ধ কপাট ঝিনুক; মুহূর্তের চোখ
মধ্যে ঝমঝমিয়ে মুক্তোনুড়ির তান
জলরেখায় চলে এঁকেবেঁকে

ও মৃদুমন্দের পাল-যেন শবাধারের ঋতুলগ্না হাওয়া
শুধু হালের নোঙর তোল বক্ষে
ঢেউ ভাঙে ইচ্ছে গুঁড়োর
বৈশাখ জন্ম থেকে আটকে রয়েছি শীর্ণ নদীর সোঁতায়
কোনো প্রবহমান স্রোত আমাকে ছোঁয় না
পাই না নাগাল জলধীর; অমরাবতীর কৃপা!
মনোছবি আঁকা জলস্তম্ভকে উপাস্য মন্দির ভাবি
নতজানু অঞ্জলী পাতি যতসব হাজামজা পরিখায় ও কূপে
সময়রেখার একটি জীবন বরাবর তাই এঁকেছি স্বাক্ষর!


কবি পরিচিতি

আমীর আজম খানঃ

আমীর আজম খানঃ

আমীর আজম খান। জন্ম ১২ ডিসেম্বর, উনিশ শ সাতষট্টি সাল। কুষ্টিয়া শহরের হরিশংকরপুরে। পিতাঃ আব্দুল মজিদ খান, মাতাঃ সুফিয়া খানম। শৈশব-কৈশোরেই প্রকৃতির নানারূপ বর্ণগন্ধ ঋতু পরিবর্তনে ভিন্ন ভিন্ন চিত্রকল্প কবির অনুভূতিতে আলোড়ন তুলে স্মৃতির ভাণ্ডার সমৃদ্ধি করেছে। প্রথম লেখা ছাপা হয়েছিল ১৯৭৯ সালে কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত ছোটকাগজ ‘ফুলে ফুলে’। কৈশোরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রকাশিত ছোটকাগজে নিয়মিত লেখালেখি ছিল। এ পর্যন্ত পাঁচখানা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম কবিতার বই বিপন্ন বণিকের দীর্ঘশ্বাস ২০০০ সালে। ২০০৬ এ পারিজাত প্রকাশনী থেকে যে কুসুমে জলের ঘ্রাণ, ২০০৯ এ পলল প্রকাশনী থেকে মাছের মুদ্রায় আছি ও ২০১০ এ পারিজাত থেকে স্বপ্ন জলে ব্যবচ্ছেদ, এবং কোলকাতা বইমেলা উপলক্ষে ২০১০ এ সাংস্কৃতির খবর থেকে শেকড়ের স্বপ্ন নীলজল নামে একটি কবিতার বই বেরিয়েছে। ‘উমেদ’ নামে একটি অনিয়মিত সংস্কৃতির কাগজের সম্পাদনা ২০০৪ সাল থেকে। এ পর্যন্ত সাতটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর লালন তিরোভাব বার্ষিক উপলক্ষ্যে মহাকাজে মহাধন্য [লালন ঘরাণার কালজয়ী ফকির মকছেদ আলী সাঁইয়ের জীবন ও কর্মভিত্তিক আলেখ্যগ্রন্থ]  প্রকাশের অপেক্ষায়।
‘বাউলিয়া’ লালনধাম প্রাঙ্গণ, ছেঁউড়িয়া, কুষ্টিয়া-৭০০১। মোবাইল: ০১৭১৬৩৩৮৭৭১

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E