৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মে ০১২০১৭
 
 ০১/০৫/২০১৭  Posted by

কবি পরিচিতি

আমিনুল ইসলাম

আমিনুল ইসলাম

নাম: আমিনুল ইসলাম। জন্ম: ১৯৬৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর।

প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ
ক. কবিতা
১. তন্ত্র থেকে দূরে-২০০২
২. মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম-২০০৪
৩. শেষ হেমন্তের জোছনা -২০০৮
৪. কুয়াশার বর্ণমালা -২০০৯
৫. পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি-২০১০
৬. স্বপ্নের হালখাতা -২০১১
৭. প্রেমসমগ্র-২০১১
৮. জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার-২০১২
৯. শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ-২০১৩
১০. কবিতাসমগ্র-২০১৩
১১. জোছনার রাত বেদনার বেহালা-২০১৪
১২. আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকউন্ট-২০১৫
১৩. প্রণয়ী নদীর কাছে-২০১৬
১৪. ভালোবাসার ভূগোলে-২০১৭

খ. ছড়া
১. দাদুর বাড়ি-২০০৮
২. ফাগুন এলো শহরে-২০১২
৩. লিচুর দেশে

গ.প্রবন্ধ
বিশ্বায়ন বাংলা কবিতা ও অন্যান্য প্রবন্ধ-২০১০

আমিনুল ইসলাম-এর কবিতাভাবনা

কবিতা আমার জীবনদৃষ্টি। জগৎ আমার কাছে কবিতাময়। প্রকৃতির মাঝে, বিশ্বলোকে আমি দেখি কবিতার ছন্দ এবং বহুরৈখিক সৌন্দর্যের প্রতিভাস। ‘লোক থেকে লোকান্তরে আমি যেন স্তব্ধ হয়ে শুনি / আহত কবির গান। কবিতার আসন্ন বিজয়।’-আল  মাহমুদের এমনতর অনুভূতির মাঝে আমি আমার নিজের কাব্যানুভূতির কথা ব্যক্ত হতে দেখি।  রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে তিনি যখন গানের ভিতর দিয়ে জগৎটাকে দেখেন, তখন তাকে তাঁর সত্যিকারভাবে জানা হয়। আর জগৎকে আমি দেখি কবিতার ভিতর দিয়ে। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি পৃথিবীর এবং জীবনের প্রতিটি বিষয়কে কবিতায় উপস্থাপন করতে পারি। যা আমি গদ্যে ব্যক্ত করতে পারি না, যা আমি মুখের কথায় বলতে পারি না, যা আমি সাংকেতিক ভাষায় প্রকাশে অপরাগ, সেসবের সবকিছুই আমি কবিতায় তুলে ধরতে পারি অর্ধ-প্রকাশ আর অর্ধ-আড়ালের শব্দচিত্রে। যে ভালোবাসা সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয় না মুখের কথায় বা প্রেমপত্রে অথবা ইনবক্স মেসেজে তা পূর্ণ-প্রকাশ লাভ করে কবিতায়- ভাষা ও ব্যঞ্জনার সম্মিলিত সহযোগিতায়। প্রকৃতিতে যা দৃশ্যমান তা চর্মচোখে দেখেন সবাই। সবাই যা দেখেন যতখানি দেখেন, কবি দেখেন তারও বেশি কিছু, তারও বেশি অনেকখানি। কবির কাজ এই অতিরিক্ত অবলোকন এবং সেই অবলোকনকে শব্দে-ছন্দে মূর্তিমূর্ত করে তোলা।

অনেক বিষয় আছে, যাদের একথায় বলা যায় অনির্বচনীয় অর্থাৎ সাধারণ ভাষায় অপ্রকাশযোগ্য। সেসবের প্রকাশের মাধ্যমও কবিতা। কবির কাজ হচ্ছে অনির্বচনীয়ের মুখে ভাষা দান, অশ্রুতির অস্তিত্বে শব্দ জুড়ে দেয়া এবং অদৃশ্যের শরীরে রূপের প্রলেপ লাগিয়ে উপস্থাপন। কবিদের ইনটুইশান বা স্বজ্ঞা অত্যন্ত প্রবল, ঘ্রাণশক্তি খুবই প্রখর, অনুভব-ক্ষমতা সুগভীর এবং দৃষ্টিশক্তি নিবিড়ভাবে অন্তর্ভেদী। সেজন্য তাদের উপলব্ধি-দর্শন-শ্রবণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে আর দশজন মানুষের থেকে অনেকখানি স্বতন্ত্র হয়। তারা তাদের সেই স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা-অভিজ্ঞানকে শিল্পে রূপ দেন অর্থাৎ কবিতা করে তোলেন। সেই সৃষ্টি হয়ে ওঠে প্রাতিস্বিক। তাদের ব্যক্তিগত বেদনাও অনেক সময় অদ্ভুত ধরনের হয়ে থাকে। সেই অদ্ভুত বেদনা মূর্তি লাভ করে কবিতায়। তবে তার প্রকাশ সংবেদনশীল মনকে স্পর্শ করতে পারলে,- পাঠকের সৌন্দর্য-পিপাসার জল হলে, তবেই তা সার্থক সৃষ্টিতে উন্নীত হয়। তবে একান্ত বিমূর্ত ব্যক্তি-অনুভবের প্রকাশ শেষপর্যন্ত যেন কোনোকিছুু কম্যুনিকেট করে,-স্পষ্ট অর্থ না হোক, অন্তত একটুখানি নান্দনিক রস কিংবা সৌন্দর্যের আভাস অথবা ভালোলাগার মতো অন্য কোনো ব্যঞ্জনা। এটি যেন সর্বোতভাবে রসহীন-নিরানন্দ-অর্থহীন-অদ্ভুত-শব্দসমষ্টিতে পর্যবসিত না হয়ে যায়।

কবিতা মানেই আলো-আঁধারি; কবিতা মানেই খানিকটা প্রকাশ, বাকিটা আড়াল। প্রকৃতি ও জীবন থেকে মূর্ত বিষয় নিয়ে উপমিত করে, চিত্রকল্প-কল্পচিত্র রচে এদের দৃষ্টিগ্রাহ্যরূপে প্রতিভাসিত করে তুলতে হয়। মাঝে মাঝে এধরনের বিমূর্ত চেতনা দখল করে বসে আমার মন। মনটা ছটফট করে। একধরনের আনন্দের আগুনে পুড়ি, একধরনের বেদনার বৃষ্টিতে ভিজি। কখনোবা ঝড়ো হাওয়ার বেতসবন হয়ে ওঠে মন। মনের সেই অবস্থাকে কবিতা করে তুলতে হয়। তা না হলে অস্থিরতা থেকে মুক্তি মেলে না। এ ধরনের কবিতার সুপরিসীমায়িত অর্থ ঠাহর নাও হতে পারে। এখানে অনুভূতি-অনুভবটাই মুখ্য বিষয়। তার সাথে চিত্রকল্প বা কল্পচিত্র উদ্ভাসিত করে তুলতে পারে কিছু নান্দনিক সৌন্দর্য। সব মিলিয়ে ভালো লাগার মতো কিছু একটা দাঁড়ালেই হয়।

কবিতা হচ্ছে বুঝা আর না বুঝার মাঝামাঝি শিল্প। কবি কিছুটা বলেন, বাকিটা পাঠক তার মতো করে বুঝে নেন, কিংবা আবিস্কার করেন। কবিতা রহস্যময় সৃষ্টি। দুর্বোধ্যতা নয়, রহস্যময়তা হচ্ছে কবিতার প্রাণ।  চেনা চেনা অথচ অচেনা। জানা জানা অথচ অনেকখানি আজানা। উৎকৃষ্ট কবিতা হয় সমুদ্রের মতো গভীর অথচ স্বচ্ছ, ড্রেনের পানির মতো অগভীর ও ঘোলাটে নয়। ভালো কবিতা আকর্ষণ সৃষ্টি করে; পাঠকমন ডুবুরী হয়ে ডুব দেয় অথবা হাওয়ার পাল তুলে নৌভ্রমণে পাড়ি দেয় অথবা সমুদ্রের সৈকতে দাঁড়িয়ে মুক্ত হাওয়ায় ভরে নেয় তপ্তপ্রাণ। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তার আবেদন নিঃশেষে ফুরিয়ে যায় না। তাছাড়া পাঠকবিশেষে তার আবেদন ভিন্ন হয়ে ওঠে। কারণ উৎকৃষ্ট কবিতা আবেদনে-অর্থময়তায়-সৌন্দর্যে বহুমাত্রিক ও বহুরৈখিক আকর্ষণ ধারণ করে রাখে। আবার ভালো কবিতাকে আকাশের সঙ্গেও তুলনা করা যায়। আকাশের শেষ নেই। আকাশের কোনো সুনির্দিষ্ট ও চৌহদ্দিঘেরা সংজ্ঞা নির্ধারণ করাও সম্ভব নয়। বিজ্ঞানের আবিস্কার মানুষকে নিয়ে গেছে চাঁদে।  মানুষ ঘুরছে অন্যান্য গ্রহের আশেপাশে। নানাবিধ ছবি তুলে পাঠাচ্ছে ভূ-উপগ্রহ। কিন্তু তাতে করে আকাশের কতটুকুইবা জানা হচ্ছে। অথচ আকাশের রহস্যময়তা দুর্বোধ্যতার কালো মোড়কে আবৃত নয়। যতদূর চোখ যায়, যতদর যেতে পারে মহাকাশযান কিংবা দূরবীনের চোখ, ততোদূরই আকাশ পরিস্কারভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে ওঠে। চাঁদ-সূর্য-নক্ষত্র-গ্রহ-উপগ্রহ-ছায়াপথ সবকিছুই চোখের সীমানায় তার অস্তিত্ব মেলে ধরে।  আকাশের নীলিমায়, রঙধুনুর রঙে, ছায়পথের আলো-আঁধারিতে, জোছনার যাদুবাস্তবতায়-আমাদের মন ভরে যায়। তারপরও আকাশ তার আবেদন ও আকর্ষণ ধরে রাখে। উৎকৃষ্ট কবিতাও তেমনি।
——-০০০——-

আমিনুল ইসলাম এর ১০ টি কবিতা


আমার আউশে দাও বাতাসের দোলা

প্রবাদের মই রাখিনি কাছে। তস্করের কাস্তেও নয়।
আমার মৌরসী হাল। আর ঘামমূল্যে দ্যাখো মোটে
এ’ ক’বিঘা জমি! বানরের লেজের মতো ঝোলে না
পদবী! মানি! অতখানি আশীর্বাদ ঢালেনি যে দেবী!
তবুও আমার ক্ষেতে, দ্যাখো চেয়ে, পূবালী বাতাসে
ওঠে সবুজের ঢেউ! নত কাতারের মতো নুয়ে যেতে
চায় কতো ঊর্ধমুখী শীষ! তাই আমি কুলো বেঁধে পিঠে,
নবান্ন হাসিবে জ্ঞানে সাঁওতাল বধূর মতো সাজায় উঠোন।
ভূস্বামীর প্রজা নই; বহিনা রোদেলা কাঁধে মহামাননীয়
কোনো সর্দারের লাঠি। শুধু জানি-আকাশের সহৃদতায়
উঠোনে রচিত হলে সোনালি গম্বুজ, সেইদিন সখা হে,
তোমারও নাসিকা হবে আমোদিত বাতাসের মুঠে পাওয়া
হৈমন্তিক ঘ্রাণে। তাই বলি, হে বন্ধু, ফেলে দিয়ে নিঃশেষে-
সোনালি নিবের পেটে উর্ণলালার মতো জমে থাকা যতসব
কালোমনা কালি- আমার আউশে দাও বাতাসের দোলা।


জ্বর

জ্বর আসে -জ্বর যায়
ডাক্তার বলেনি
তবে জেনে গেছি-
প্রিয়তম-দিন নয়
এইদিন-
থার্মোমিটার হাতে সাদা অ্যাপ্রন-পরা নার্স।

মাফ করো মেডিনোভা
মাফ করো স্কোয়ার-ড্রাগ ফ্যাক্টরি,
ভুুলে যেতে চাই
তাই-
আমি আর চাই নাকো-
দীর্ঘশ্বাসে তপ্ত কোনো জ্বরের দুপুর!


উভয়সঙ্কট

ভয় ছিল-
স্বপ্নের ভূগোল থেকে হারিয়ে যাবে শ্রাবণের নদী
পোয়াতিধানের মাঠ
চাঁদনীরাতের মেঘ-ছায়া আড়াল;

ভয় ছিল-
মনের ভুলে খুইয়ে ফেলবো দুঃখহীনতার সূত্র
পথের মাঝে-পথ-না-হারানোর চোখ
ঘুমের মধ্যে-ঘুম-না-ভাঙ্গার মন্ত্র;

ভয় ছিল-
হাত ফস্কে হারিয়ে যাবে লাল বিকেলের চাবি
তোমার আঁচলে ঘুড়ি উড়ানোর হাওয়া
আমার দুর্বলতার গা-জড়ানো নাক্ষত্রিক চাঁদর।

আমাকে ঘিরে ছিল সতর্কতার চোখ
আমাকে ঘিরে ছিল আহ্নিকগতিক পা
আমাকে ঘিরে ছিল চলিতনিয়মের চাল।

আমাকে ছেড়ে গেছে ভয়
আমাকে ছেড়ে গেছে দোটানা
আমাকে ছেড়ে গেছে সন্দেহ।

এখন আমার হিসাবে খাতা ধরে টানে প্রবাদবাক্যের কুলো।


বেহুলার ভিটা

মহাকালের বুকে ধূসর আঁচলে আবৃত স্তন
স্তন হতে চুয়ে নামা দুধ-
ঝরনার মতো মিশে যায়-
কালের করতোয়ায়
সেই জল পান করে দুইতীরে বেড়ে ওঠে শিশুরা
তাদের পরনে ইস্কুল-ড্রেসের মতো ভালোবাসার ইউনিফর্ম।


তৃতীয় মাত্রা

সব সাফল্য— সাফল্য নয়
স্রষ্টার স্বঘোষিত প্রতিদ্বন্দ্বী যে শয়তান,
তার কতও সাফল্য !
সে সাফল্যের পাহাড় দেখে–
মাঝে মাঝে
গালে হাত দেয়–
অটল-সাফল্যের অধীশ্বর হিমালয় !
কিন্তু–
এত সফল যে শয়তান,
তার উপাসনা করে না কেউই,
এমনকি চোরডাকাতও নয়।

ইতিহাসের টর্চ নিয়ে
চোখ মেলে দ্যাখো–
বিজয়ী মীরজাফরের মাথায় নয়,
পরাজিত সিরাজের শিরেই
কোহিনূর মুকুট ধরে
দাঁড়িয়ে রয়েছে মহাকাল।

মিথ্যা শপথের রাতে– সম্মুখে
যতই রচিত হোক–
পলাশীর আম্রকানন
মোহনলাল-ভালোবাসা সরে আসে না পিছে ।


মহাবিশ্ব
(পৃথিবীরঙের এক মানবীকে)

অথচ তোমার জন্য বসে থাকি অজুহাতের স্টেশনে- ইচ্ছাকৃত ফেল করে  
আহ্নিকগতির ট্রেন! তুমি আসতে চেয়েছো অথবা চাও-এর বেশি কোনো
কিছুই তো ঘটেনি; তোমার আসতে চাওয়াটা কেন এত ব্যঞ্জনা রচে আমার
এলোমেলো ভাবনায়- আমি সেও বুঝি না! তুমি যদিবা আসোই-সেও তো
নিজ কক্ষপথে ফিরে যাওয়ার জন্যই আসবে-এতটুকুও রয়ে যাবে নাÑরেখে
যাওয়ার মতো কিছুই আনবে না সাথে,-তারপরও তোমার জন্য কেন এই
অদ্ভুত অপেক্ষা?

আমি তো গ্রহ-নক্ষত্রের ভিড়ের মধ্যেই থাকি যে ভিড়ে অংশ রয়েছে
আমারও; এমনিতেই ঝালাপালা কান; তো কীসের আবার নতুন ডাক!
অথচ তোমার কণ্ঠ শোনামাত্র কানদুটো ভারকেন্দ্র হয়ে ওঠে! মনে হয়-
মেঘলাকণ্ঠের সিক্তমাধুরী বাড়িয়ে দেয় তোমার মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের পরিধি-
যা ছুঁয়ে ফেলে আমার অন্তরঙ্গ অস্তিত্বের আঙিনা,-বাকি সারাটা সময়
যা রাষ্ট্রীয় ভূগোলের মতো স্থির থাকে বেড়াহীন সীমান্তে ও সীমানায়!

আমি স্বতঃসিদ্ধের হৃদয় নিয়ে ভেবে দেখি-নিপাতনে সিদ্ধির টিকেট নিয়ে
যদিবা তুমি এসেও যাও, আমার কোনো শূন্যতাই ভরে দিতে আসবে না,
আর আমার তো কোনো শূন্যতাই নেই; সবখানেই থই থই জল; ভদ্র বাতাসের
টোকাও সয় না! তারপরও ভরা নদীটি নিয়ে কেন আমি অপেক্ষায় থাকি-
একখানা মেঘলা আকাশের, কিংবা উজান-উপচানো নবীন ঢলের? আমি কি
নিজের পাড় ভেঙ্গে ছড়িয়ে যেতে চাই-অগন্তব্যের বিস্তারে,-যেখানে যুক্তি-
হীনতার অবাধপ্রান্তর,-অসংসারের হরিণ-উপবন? আমার মধ্যে কে সঞ্চার
করছে এই অগন্তব্যগামী মুক্তির বেগ? আমি তো চাই না এ উড়াল; অথচ
আমার এ প্রার্থনাতেও খাদ রয়ে যায়-‘হে পৃথিবী, হে আমার ডাঙা ও জলের
সবখানি ভালোবাসা, আমাকে ধরে রাখো-বাড়িয়ে দিয়ে তোমার অভিকর্ষীয় টান!’


বাবার জুতো

বাবা, সে কতদিন হয়-তোমার পা পড়ে না আমাদের এই সোনালি উঠোনে-
যা তুমি নিজহাতে গড়ে তুলে-দূ..রে.. চলে গেছো ছিঁড়ে ফেলে অভিকর্ষের
যাবতীয় টান! তোমার পায়ের শব্দে চমকে উঠতো যে-সূর্য-‘এই বুঝি
দেরী হয়ে গেল!’,- সে এখন আগের মতোই ওঠে বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে
অজস্র সোনার রেণুর ঢেউ; ধানের আলের ঘাসগুলোÑমাথায় নিয়ে শুভ্র-
সৌন্দর্যের স্থাপত্য- অপেক্ষায় থাকে পরিচিত দুটি পবিত্র পায়ের; আহ্নিক
গতির ট্রেন যায়- কিন্তু সেই সৌন্দর্য ও পবিত্রতার মহামিলন আর ঘটে না।

আল্নার নিচে পড়ে আছে বাদামিরুঙের একজোড়া জুতো যেন ড্রাইভারহীন
আধপুরোনো টয়োটা! আমার ইচ্ছে করে- জুতোজোড়া পায়ে দিয়ে হাঁটতে
থাকি- জমির আইলে, নদীর কিনারে, পবিত্র স্বপ্নের বারান্দায়; কিন্তু ভয় হয়-
আমার পা’দুটি তোমার জুতোর মাপের হলেও তাদের বিচরণের জগৎ
অভিন্ন নয়; তারা তো সিরাতুল মুস্তাকিম চেনে না- নানা অন্ধগলি ঘুরে ঘুরে
বদনেশায় বৃত্তাবদ্ধ তাদের গতি। আমি ঐ জুতোজোড়া পায়ে দিয়ে যদি
অভ্যাসবশতঃ কোনো অন্ধগলিতে ঢুকে পড়ি, আর অমনি তারা বিদ্রোহ করে
বসে- ‘হে নাদান মানুষ, তুমি আমাদের উপযুক্ত নও!’ এবং এই বলে খুলে
পড়ে আমার পা থেকে, আমি নগ্নপায়ের লজ্জা নিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো!


আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসবো, কেন ?

আমাদের দুজনেরই কিছু কিছু অপূর্ণতা আছে;
আমার পকেটে যা আছে তা দিয়ে
আমি একটি নদী কিনতে পারি
কিন্তু তাতেই খালি হয়ে যায় পকেট;
তোমার কাছে যা আছে তা দিয়ে তুমি একটা
পাহাড় কিনতে পারো–
কিন্তু তার বেশি কিছু নয়;
অতএব এসো, আমরা দুজনে মিলে
একটা পাহাড় এবং একটি নদী কিনে ফেলি;
তখন সমুদ্রটা ফ্রি পেয়ে যাবো
আর প্রথম দেখার দিন থেকে সমুদ্রের জন্য
তোমার আগ্রহ তো লোভের কাছাকাছি প্রায়।

দ্যাখো-আকাশের শপিংমলে যে বিক্রয় বিজ্ঞাপন
ঝুলে আছে— নক্ষত্রের হকারদের লেখা–
‘দুটো কিনলে একটা ফ্রি,’–
তা ষোলআনা বিশ্বাসযোগ্য;
কারণ ওটা গাজার আকাশে ঝুলে থাকা
ফিলিস্তিনীদের জন্য কোনো মার্কিনী প্রতিশ্রুতি নয়।
 


ব্রেকিং নিউজ

সূর্যের ডাক নিয়ে কাল সারাদিন বাড়ি আসেনি দিন
কাল বন্ধ ছিল আহ্নিকগতির বাস;
চাঁদের চিঠি নিয়ে কাল সারারাত ঘরে ফেরেনি রাত
কাল বন্ধ ছিল আহ্নিকগতির ট্রেন;

কাল শাইলকের মন নিয়ে সুদ খোঁজেনি পুঁজিবাদ
কাল দুর্যোধনের মেধা নিয়ে ফন্দি আঁটেনি পেন্টাগন;
কাল ঠোঁটে খড় নিয়ে নীড় বাঁধেনি বাংলার বাবুই
কাল জোছনার সুতো হাতে জোয়ার রচেনি পূর্ণিমা

কাল পৃথিবীতে ঘটনা ছিল একটাই
সেকথা জানি আমি-
সেকথা জানো তুমি
সেকথা জানে না- বিবিসি-সিএনএন-আল জাজিরা।

১০
থুতু

আমার থুতু দিই। ওয়াক্ থু!
দেখুন- এ আমাদের হাল আমলের অভ্যাস
আপনারা যারা বিদেশি, দয়া করে ভয় পাবেন না।
আমরা কিন্তু ভিনদেশি কাউকে থুতু দিই না।

আমরা আকাশে থুতু দিই
আমরা বাতাসে থুতু দিই
আমরা সমুদ্রগামী নদীর মুখে থুতু দিই।

সাপের থলিতে যেমন বিষ
ঊর্ণ-অধরে যেমন লালা
সতীনের বুকে যেমন ঈর্ষা
আমাদের পেটে তেমনি থুতু।

আমরা একলা দাঁড়ানো তালগাছের মাথায় থুতু দিই
আমরা দাদুর মতো বটগাছের গোড়ায় থুতু দিই
আমরা ফলভারে নত ধানগাছের কাতারে থুতু দিই
আমরা ভাইয়ের উঠোনের সোনালি গম্বুজে থুতু দিই
আমরা অভ্যাসবশত মাঝে মাঝে
আমাদের আত্মপ্রতিকৃতিতেও থুতু দিই।

আমরা হিংসায়- প্রতিহিংসায় থুতু দিই
আমরা অক্ষম কাতরতায় থুতু দিই
আমরা কারণে অকারণে থুতু দিই
আমরা সময়ে অসময়ে থুতু দিই।

আমাদের মাকড়সার মতো উদ্ভাবনী মন
আমরা ডানে-বামে, উর্ধ্বে- নিম্নে, সামনে-পেছনে
সবদিকে থুতু দিয়ে রচনা করেছি তন্তুজালের মতো নিষ্ঠীবনফাঁদ।
আর এই থুতুব্যুহ ভেদ করে এমন সাধ্য কার!
—————-০০—————-

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E