৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ০৬২০১৭
 
 ০৬/১১/২০১৭  Posted by

অলোক বিশ্বাস
আমার কবিতা ভাবনা

অলোক বিশ্বাস

অলোক বিশ্বাস

সাহিত্যের যেকোনো আন্দোলন থেকে নতুন চিন্তার সূত্র খুঁজে পাই। দেশ-বিএশের চিত্রকলার বিমূর্ততার উন্মেষ চেতনাকে ভীষণ ঝাঁকি দেয়। অতীতের শিল্প-সাহিত্য-সিনেমার বাঁকবদল আমার কবিতার উৎসশক্তি হিসাবে কাজ করে। ডাডাবাদ, ইমপ্রেশনিজম, এক্সপ্রেশনিজম, অস্তিত্ববাদ, অ্যান্টিপোয়েট্রির যাবতীয় ইতিহাস থেকে শুরু করে অষ্টাদশ উনবিংশ শতকের সামন্তবাদ বিরোধী বিপ্লব বিদ্রোহ থেকে ফুকো, বাখতিন, জাক দেরিদা, সার্ত্রের চিন্তাধারা, এমনকি প্রাচীন ভারতবরষের জৈন ও বৌদ্ধযুগের সামাজিক-ধরমীয় উন্মেষের ইতিহাস পাঠ করে আমি চেতনাকে সম্প্রসারিত করি। যেকোনো সামাজিক রাজনৈতিক আন্দোলন, ইংল্যান্ডের গৌরবময় বিপ্লবের ইতিহাস থেকে শুরু করে চিলি, কিউবা, বলিভিয়া, ভিয়েতনামের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাস থেকে নির্মাণ-বিনির্মাণের পাঠবস্তু খুঁজে বেড়াই। এসব আমার চেতনাকে সম্রসারিত করলেও, এগুলোকে আমি কবিতায় ইমপোজ করার বিরোধী, এগুলোকে পাশে রেখে আমার কবিতা নির্মিত হয় না। আমরা জানি, পাশ্চাত্য চিত্রকলায় বিমূর্ততার উন্মেষ ছিল তৎকালীন প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার ফলক। যেমন আমাদের এখানে কল্লোল যুগ থেকেই বাংলা সাহিত্যের বহুদিশাময় অব্রাম্মিক কর্মকারিতা শুরু হয়ে যায়, যা চল্লিশের দশকের কবিদের ও কথাকারদের শিল্পের ভাষাকে আন্তর্জাতিক শিল্পের ভাষার সঙ্গে সেতুবন্ধনে সাহায্য করেছিল। পরাম্পরাকে আমি কখনো অস্বীকার করি না। পঞ্চাশের দশকের কবিতাকে কখনোকখনো আধুনিকের অবক্ষয়বাদের প্রসঙ্গে টেনে আনা হয়। এখনো পরযন্ত কোনো অশককেই আমার অবক্ষয়বাদী বলে মনে হয়নি। বরং পঞ্চাশের দশক বাংলা কবিতার অপর ধারার মাইলফলক নির্মাণ করলো বলে আমার মনে হয়েছে। হ্যাঁ, পঞ্চাশ-ষাট-সত্তরের দশকের অনেক কবি তেড়েফুঁড়ে প্রাতিষ্ঠানিকতাকে সরাসরি উত্তাপ দিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানও তাদেরকে দিয়ে ব্যবসা-পত্তর করে নিয়েছে অবাধে। স্বাধীনতার পরে, এছাড়া অন্য কোনো পথ ছিল না। সবাই একত্রে প্রাতিষ্ঠানিকতার জঙ্গমতার বাইরে কাজ করবে তা কখনো সম্ভব নয়। প্রাতিষ্ঠানিকতার অবস্থানটি সুদঢ় না হলে, প্রাতিষ্ঠানিকতার বাইরে থাকার কাজগুলোর বৈচিত্রের অপরত্বের রূপ ও রূপান্তর চোখে পড়ে না।

অপর কবিতা ভাবনার অন্যতম অবস্থান প্রত্যেক কবির কবিতাভাষার ও অবয়বের নিজস্বতা। এই নিজস্বতা বজায় রাখা কঠিন শিল্পের কাজ। তাই, আমার পক্ষে নির্দেশমতো ভুরিভুরি কবিতা লেখা সম্ভব হয় না। চাপের কাছে নতিস্বীকার করে কবিতা নির্মাণ ও সরবরাহ করলে নিজস্বতার অপরত্ব বজায় থাকে না। অপরের আমূল চিন্তার অতলে চলে গিয়ে তার সামগ্রিকতার প্রকৃতি দেখো, কিন্তু নিজের লেখার টেবিলে অপরকে সসম্মানে দূরে রেখে মাত্র তার অপরত্বের চিহ্নগুলিকে চিনে রাখো, যদি সম্ভব হয়। আমার মনে হয়, একজন বি-শৃঙ্খলিত কবি সেটাই করেন। আমাদের দেশের গড়পড়তা কবিদের সংখ্যাই বেশি। তারা অন্যের ভাবনা বিষয় ও ভাষাশৈলিকে অনুসরণ করেন, বিশেষ করে যা-কিছু জনপ্রিয়তায় ব্যবসায়ীদের হাত ধরে বা অন্য কোনো মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তাকেই তারা অমোঘ সত্য বলে মনে করেন, অপরত্বের ঝুঁকি নিতে চান না। আবার আমি এটাই মনে করি যে প্রাতিষ্ঠানিক কবি বা অপ্রাতিষ্ঠানিক কবি বলে কিছু হয় না। আপেক্ষিকতাকে আমি এখানে মান্যতা দিই। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, একজন কবিকে যখন প্রাতিষ্ঠানিক বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তখন অন্য কোনো অবস্থানে তিনি অপ্রাতিষ্ঠানিক। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শক্তি চট্টোপাধ্যায় একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকেও বামপন্থী আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যে বামপন্থী আন্দোলনের ধারক-বাহকেরা পুঁজিকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের বিরোধী। কবিতায় বা যেকোনো শিল্পে ও শিল্পীর ভূমিকায় চরমতা বলে কিছু থাকে বলে আমার মনে হয় না। আমি একসময় নতুন কবিতার আন্দোলনে বা আলোড়নে ছিলাম। কিন্তু সেখানকার নেতৃত্বপ্রবর্তিত রুলস এন্ড রেগুলেশন যখন কবিতা ধারার মুক্তির প্রতিবন্ধক বলে মনে হলো, আমি সেখানে সমর্পিত হতে পারলাম না। কবিতা লেখার পটভূমিতে কোনো দর্শন, কোনো শৈল্পিক তত্ত্ব বা সমাজ-বিষয়ক ব্যাপার অনিবার্য কিনা এটা ভাবার বিশেষ কোনো অবসর আমার কোনোদিন হয়নি। একই সঙ্গে এটাও মনে করি, কবিতার উপকরণ মালমসলা হিসেবে কিছুই ব্রাত্য নয়। আমার কবিতায় কখনো কোনো বিষয়ধরমের দরশনগত অবয়বগত বা বিশেষ শৈলিগতর রূপকে চাপিয়ে দিতে অক্ষম আমি। আমি কখনো বলি না। আমি অপর কবিতা লিখি। অপরত্বের ভাবনা অন্যান্য অপরত্বকে গ্রাহ্যতা দেয়, মান্যতা দেয়;- এখানে কোনো বিশেষত্বই একমেবম নয়, অবিভাজ্য নয়। এভাবেই মনে মনে হয়, অতিচেতনার কবিতা, পোস্টমডার্ন কবিতা বা পুনরাধুনিক কবিতা বলতে যা বোঝায় তা হলো, এসব কবিতার পেছনে ওইওই দৃষ্টিভঙ্গির ওয়েব কাজ করে, এবং কাজ করে আপেক্ষিকভাবে, চূড়ান্তরূপে নয়।

হ্যাঁ, আমি কবিতার ভাষা নিয়ে ভীষণ ভাবি। কবিতার ভাষা একটি কবিতার সামগ্রিকতার অংশ হলেও, এর ব্যবহারের ওপরেই কবিতার পাঠযোগ্যতা নির্ভর করে। আপেক্ষিক সময়ের ওপর দাঁড়িয়ে একজন কবি র্যাবো, মালারমে বা অ্যাপলিনিয়েরের মতো বা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মতো ভাষায় আর কবিতা লিখতে পারেন না। পারেন না টি. এস. এলিয়ট বা রবার্ট ফ্রস্টের ভাষায় কবিতা লিখতে। আমাকে একজন চল্লিশোর্ধ বয়সের কবি কবিতা ক্যাম্পাসের জন্য একগুচ্ছ কবিতা পাঠিয়ে বললেন, তিনি তার মতো করেই লেখেন। আমি দেখলাম, তার সমস্ত কবিতা বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার ভাষার অক্ষম অনুকরণ হয়ে গেছে। একথা জানাতে তিনি খুব রুষ্ট হলেন। পৃথিবী এভাবেই কিছুটা পেছোবে, এবং অনেকটা এগোবে। আমার কিছু করার নেই শুধু আমার সামান্য অভিজ্ঞতায় কবিতাকে চিহ্নিত করা ছাড়া।

কবিতাকে পৃথক পৃথকভাবে চিহ্নিত করতে আমার ভালো লাগে। আমার কবিতা র্যাবিশ আক্রান্ত হোয়ার আগেই আমি সতর্ক হই। কবিতার বিষয় নিয়ে আলাদা করে ভাবি না। যে কোনো বিষয়ই কবিতার বিষয় হতে পারে। আমার চারপাশে ছড়ানো অজস্র উপকরণ, অজস্র প্রবাহের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি। বিষয়ের ভেতরে কোয়ান্টাম খোজা আমার কাজ। বিষয়কে বাজানো যেতে পারে নানা মাধ্যমে। আমি বিষয়কে কবিতার বিষয়ে রূপান্তরিত করতে চাই। এই রূপান্তরে অন্যন্য ইংরিডিয়ান্টের সহযোগিতা দরকার, তা না হলে বিষয়ভিত্তিক কবিতা হয়ে যাবে। আবার ফর্ম নিয়েও চূড়ান্ত প্রবণতা দেখালে অবয়বটাই প্রধান হয়ে যাবে। এও আরেক প্রকার জবরদস্তি। কবিতা আমার কাছে খেলা। এই খেলায় মেতে থাকার জন্য অন্যান্য মাধ্যমের প্রয়োগ কৌশল লক্ষ্য রাখতে হয়। শুধু শব্দ সংস্থাপনে কবিতা হয় না। আবার শব্দের সংকীর্ণ ভাণ্ডার কবিতায় বৈচিত্র আনতে বাধা দেবে। মাঝে মাঝে মনে হয়, বেশ কিছু শব্দ একেবারে কবিতায় অচল, বহু পুরোনো সেইসব শব্দ বহুবার ব্যবহৃত হয়েছেও। সেইসব শব্দকে নিয়ে খুব চিন্তায় পড়ে যাই। ভাবি, এদেরকে কীভাবে ধোপদুরস্তের মাঝখানে বসিয়ে দেওয়া যায়।

আমি নিয়ম করে লিখতে পারি না। আমার কোনো চাপ নেই। কিছু কখনো দেখানোর নেই। জয়-বিজয় নিয়ে ভাবি না। কোনোদিনই ভাবি না। অনেকে আমাকে প্রতিপক্ষ ভাবে। কেন ভাবে তা আমি ঠিক জানি না। হ্যাঁ, আমি প্রশ্ন করতে ভালবাসি। নিজেকেও প্রশ্ন করি। এই প্রশ্ন করাটা হয়তো অন্যদের পছন্দ নয়। প্রচল ধারায় নিজেকে মেলাতে পারি না। হয়তো সেকারণেই হাঁকডাকের সুযোগ থাকে না। বিভিন্ন পত্রিকা দপ্তরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাথা নিচু করে বসে গল্প শোনার বা আজ্ঞা পালন করার সময় নেই আমার। এটা আমার ব্যর্থতা। একটা কবিতা লেখার বা প্রকাশের পর আত্মসন্তুষ্টি কাজ করে না। কোনো পত্রিকার পাতা খুলে অন্যদের কবিতার পাশে নিজের কবিতাটা রেখে পাঠ করে দেখি, কোথাও অপরত্বকে আঁকতে পারলাম কিনা। কবিতা নিয়ে আমার প্রতিযোগিতা নেই। প্রিন্ট মিডিয়ায় বা ব্লগে নিজের লেখা দেখলে ভালো লাগে ঠিকই, কিন্তু সেখানে অনিবার্য হাজিরা দিয়ে রাখতে হবে এমন বাধ্যকতায় আমি অপারগ। তবে নিয়মিত কবিতা পড়া বা লেখা না চললে, নিজেকে কেমন ফাঁপা মানুষ মনে হয়। আবার কয়েকমাস ধরে যখন লেখা হয় না, তখনো দেখেছি ভেতরের কবিসত্তাটি আগের মতোই আছে। নতুন নতুন কবিমুখের দেখা পেয়ে, তাদের কথা শুনে মনে হয়, আমার এখনো অনেক অধ্যয়ন বাকি থেকে গেছে। শুধু বইভর্তি লাইব্রেরিতে ঢুকলেই যে আমি সম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারবো, এ নিয়ে আমার শুধুই সন্দেহ।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E