৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ১৬২০১৭
 
 ১৬/০১/২০১৭  Posted by

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতা: চশমার কাচে গোপন শিশির
– আকরামুজ্জামান মুকুল

গৌরাঙ্গ মোহান্ত

গৌরাঙ্গ মোহান্ত

এক
কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের তিনটি কাব্যগ্রন্থ ‘আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর’ (২০০৯), ‘শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ’ (২০১২) ও ‘ট্রোগনের গান’ (২০১৬) বক্ষমাণ নিবন্ধটির আলোচনার প্রতিপাদ্য। এর মধ্যে ‘আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর’ তার প্রথম কবিতাগ্রন্থ এবং ‘ট্রোগনের গান’ ২০১৬ এর ডিসেম্বর অব্দি তার প্রাকাশিত কবিতাগ্রন্থের মধ্যে শেষতম। কাজেই ২০০৯ হতে ২০১৬ এর মধ্যে তাঁর কবিতার যাত্রা, অভিজ্ঞান, ভ্রমণ ও আবিষ্কার এবং অনুসন্ধানের অভিলিপ্সা নিয়ে সারিবদ্ধ কবিতাদের সামনে দাঁড়িয়েছি। তারা অনেকটা মানুষের মতো, কোথাও স্পষ্ট, কোথাও অস্পষ্ট।

দুই
কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতায় অরণ্য থাকলেও তা আরণ্যক নয়, অরণ্যগামীও নয়, বরং নগর-অন্ধকারের অনুগামী। তার কবিতায় প্রবলভাবে উপস্থিত গ্রাম আর অরণ্য, তবে তা গ্রামীণ নয়, আরণ্যকও নয়। কারণ গ্রাম আর অরণ্যের আড়ালে অগভীর গোপনে জেগে থাকে অন্য কোন ছায়াপথ। এভাবে তার চিত্রকল্প আর বক্তব্যে প্রারম্ভবিন্দু থেকে বিপরীতমুখী অভিযাত্রায় কোথায় পৌঁছায় কেউ তা জানে না। তবে বাস্তব-অবাস্তবের মধ্যে দিয়ে পরাবস্তব এক অন্তর্গত স্থান আর সময় নির্মিত হয় তার কবিতায়। একইভাবে নগরের চিত্রকল্পে নাগরিক কোলাহল অনুপস্থিত তার কবিতায়, সেখানে বরং পাওয়া যাবে অরণ্যের দিনরাত্রি, নির্জনতা, আর অন্ধকার। এভাবে পরস্পরবিরোধী এক ভ্রমণ রেখায় যুক্তি, সংযুক্তি ও সংযোগহীন এক নীরব অভিযাত্রা শুধু তার কবিতাজুড়ে। তার কবিতায় জীবন এক অন্তর্গত অবলোকন; যেখানে স্মৃতি শেষ হয়ে আসে, সেখানে তার কবিতা এসে দাঁড়ায়। সেই স্মৃতি সুহৃদ সয়ংবৃতা হয়ে যায়। তাই তার কবিতা আত্মস্বীকৃতিমূলক। তাই ব্রাডফোর্ড বা বীরামপুর শুধু স্থান নয়, সময়ও বটে, ইউটোপীয় সময়। প্রস্থানের প্রসঙ্গ এলে তিনি বলেন,

“বিকেলের সূর্য যখন নির্মল ধানক্ষেতে নেমে আসে, হলুদের হিন্দোলিত জমিন পেরিয়ে অন্তরবৃতা তোমার বাড়ি যাবো।” (শ্যামল অন্তর্গৃহ) তবে অন্বেষণ আছে জীবনে। কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের অন্বেষণের হদিস মিলবে নিচের কিছু চরণে;

১)    “যে ওকদৃশ্য উদ্বাস্তু আলোককে দৃশ্যান্তরে নিয়ে যায় আমি তার রহস্যময় শক্তির ঘ্রাণ খুঁজি।” (অভিবাসী জল)
২)    “আমি প্রস্রবনের খোঁজে ছুটে চলি, বাতাস রংবুক গ্লেসিয়ারের বরফজল ঢেলে দেয় স্নায়ুগঙ্গালিয়ায়।” (পাখিপরিমল শিস)
৩)    “আমার কম্পিত দৃষ্টি বিরামপুরের স্ফীত পথে প্রসারিত হলে তুমি মুহূর্তেই চীনের বসন্ত-ফুলের উচ্ছলতা নিয়ে আবির্ভূত হও।” (শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ)

‘পারমিতার প্রত্যুক্তি’ শীর্ষক কবিতায় বিষণ্ণ পারমিতা আজো অপেক্ষা করে। কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞান ও বিস্মৃতির গল্প, সামাজিক সংঘ ও শ্রমণের কথা সেখানে সাংকেতিক। তাই মানুষ বা রাষ্ট্রের জন্য নয়, তিনি “একটি শব্দের জন্য প্রান্তর বা রাস্তার নির্জনতায় নেমে পড়েন।” (প্রকৃত কোনো শব্দ)।
এই সব দ্ব্যর্থবোধক উচ্চারণের আসলে কোনো মানে নেই, যেমন নেই এই বেঁচে থাকার। তাই নির্জনতার অভিলাষ আছে তার কবিতায়, আছে স্বপ্নভঙ্গ, আছে বিভাজন, কারণ, সব রকমের অভিলাষ আর আকাক্সক্ষাসহ আমরা “হুইসেল কর্কের অনির্দেশ্য ঘূর্ণনে” “ভিজতে ভিজতে দুদিকে ফিরে যাই।”

মানুষের বিপন্নতার বোধ, আর তার নির্মল প্রাণের সংরাগ আছে যুগপৎ তার কবিতায়। অনুভবযোগ্য প্রতিটি পাতায় তার নিজস্ব সবুজ খুঁজে পান কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত। কেননা, আকাঙ্ক্ষায় বিশ্বাস আছে তার, অপেক্ষায় যদি বা নাও থাকে। কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত পাঠ এক অভিজ্ঞতাই বটে। কবিতা পড়ে মনে হয় নির্জন প্রান্তরে হাঁটছি বহুক্ষণ একা একা, বিষণ্ণ। বাতাস চতুর্দিকে থেমে আছে কেননা,
প্রথমত,
“নির্মলতার কোন সর্বাদৃত মানদ- নেই” (তীরধস তাড়িত জল, নির্মলতা)
দ্বিতীয়ত,
“গণিত চূড়ান্ত বিষয় নয়। চূড়ান্ত বিষয়ের অভিজ্ঞতা কোন কালসারণী যোগে অধিগম্য নয়।” (ঐ)।
এবং তৃতীয়ত,
“ভবিষ্যৎ কমলা রং ভোরের মতো স্পষ্ট নয়” (ঐ)।
পুনরায়, কবি কুমার চক্রবর্তীকে উৎসর্গকৃত ‘সময়’ কবিতায় কবি বলেছেন,
“গণিতচেতনাশূন্য সময় ক্ষণিকতা ও ধ্রুবতার প্রভেদ যুগপৎ স্বীকার ও অস্বীকার করে।”
এখানে তাই, “সন্ধানের নেই কোন ব্যগ্রতা।” (ঐ)।

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতায় অনেক কিছুই প্রকাশ্য নয়। ফ্রয়েডীয় সংরাগে ছুঁয়ে থাকা এ জীবন ছায়াবাজির আলো আঁধারিতে মিশে থাকে অপার বিস্ময় আর বিপন্নতার সংবেদ নিয়ে। রাষ্ট্র তার কবিতায় বাস করে গভীর গোপনে। ক্ষমতা-সম্পর্ক আর উৎপাদন সম্পর্কও তার কবিতায় নিয়ত ক্রিয়াশীল আবর্তনচক্রের অবশ্যম্ভাবিতা নিয়ে। গোপনে প্রেম এসেও দাঁড়িয়েছে জীবনের ছায়ায়। যৌনতা কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতায় ইঙ্গিতময় সংকেতরেখা ধরে এগিয়েছে গোপন আকাঙ্ক্ষা আর বুনোপথের কুয়াশায়। এসব কিছুই প্রকাশ্য নয় মগ্ন এ জীবনে। প্রকাশ্য শুধু এই বেঁচে থাকা। এসব কিছুর মধ্য দিয়েই তার কবিতা সমাগত এক ব্যক্তিগত অনুরাগী রেখা জুড়ে আঁকা অটোবায়োগ্রাফি যে নিজেই নিজেকে ক্রমাগত লিখে লিখে নির্মাণ করে চলেছে। তবে অন্যদের আকাঙ্ক্ষায় নিজেকে নির্মাণ করার চেষ্টার মধ্যে একটা ভাঙা-গড়া আছে যা সর্বদা ক্রীয়াশীল এবং অসম্পূর্ণ। তাই কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতায় যে সত্তা (Self) পাওয়া যায় তা লাঁকানীয় সেলফের মতোই অসম্পূূর্ণ ও চলমান। একাকীত্ব, নির্জনতা, বিচ্ছিন্নতা, অস্তিত্বের সঙ্কট, গোপন প্রণয় আর গোপন আকাঙ্ক্ষা আর যৌনতার অবচেতন চিঠি ঠিকানা খুঁজে পায় চেতন স্তরের সংকেতময়তার মধ্য দিয়ে তবে ঠিক এখানে কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতা থেমে থাকে না, তিনি ইতিহাস ও আত্মপরিচায়ক শহরকে বিনির্মাণ করে মানুষের চিন্তন প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করে নতুন জ্ঞানসূত্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে। ফ্রয়েডীয় তিনি এই মর্মে যে, তার কবিতায় প্রগাঢ় এক গোপন অনুভব দূরের অবচেতন স্তর থেকে চিঠি পাঠায় চেতন মনের সাংকেতিক ঠিকানায়। মানুষের অবচেতন মনের ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যায় সেখানে। স্থান ও সময়ের মাপে বাঁধা পৃথিবী তিনি অস্বীকার করেছেন। তার কবিতা প্রায়শই দূরবর্তী গ্রহের গোপন টেলিগ্রাফের মতো সংকেতময় যেখানে হৃদয়ের অনাবিষ্কৃত অনুভব আর বাস্তবতা নতুন ঠিকানা আঁকে। নীলে আসক্ত কেউ সেখানে আজো দুপুরের চিঠি পড়ে।

প্রেম, যৌনতা ও অন্যান্য দুর্ধর্ষ গোপন আকাঙ্ক্ষারা তার কবিতায় এসেছে নানারকম চিত্রকল্পের সংকেতময়তার মধ্যে দিয়ে। কিন্তু এই ফ্রয়েডীয় সমীকরণের সম্ভাব্যতায় থেমে থাকেন নি কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত, তিনি তাকে আরো বিস্তৃত করেছেন, কারণ অধিবাস্তবতা ও পরাবাস্তবতার পৃথিবী তার কবিতাকে অরাজনৈতিক করতে পারেননি, তবে রূপক আর প্রতীকাশ্রয়ী করে তুলেছে। ক্ষমতা-সর্ম্পক ও উৎপাদন-সর্ম্পক তার কবিতার চিত্রকল্প ও যাপনের গভীর সংরাগে সংকেতময়। কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতার চিত্রকল্পে যে বস্তু ও ঘটনা উপস্থিত সেগুলো সবই ইঙ্গিতময়, সংকেতময়। তারা অন্য কোন পৃথিবীর দুর্বিনীত গোপন আকাঙ্ক্ষাজাত সংবেদ। একারণেই তার কবিতার দৃশ্যকল্পগুলো একসময়ে রূপক আর প্রতীকে পরিণত হয়। তার কবিতায় অনিবার্য কেবল রহস্যময়তা আর ইঙ্গিতময়তা। তার কবিতা গোপনীয়তা আর বিমূর্ততার অভিলাষী।

সেইখানে অনেকগুলো আয়নার প্রতিবিম্বের মতো অনেকগুলো প্রতিযুক্তি, প্রতিবাস্তবতা, প্রতিঅনুভব ভ্রমণরত। সেইখানে ফ্রয়েডীয় অবচেতন জুড়ে উড়ে যায় মানুষের পাখিসত্তা গভীরতম পৃথিবীর ঠিকানায়। ফ্রয়েড একবার বলেছিলেন যে যেখানেই যাই দেখি একজন কবি সেখানে আগে থেকে এসেই বসে আছেন। অতএব গোপন সংকেতই কবিতার ভবিষ্যৎ। কেননা জীবন সংকেতময়। তার কবিতার চিত্রকল্প তাই অন্য কোন সংরাগ, সংবেদ আর অনুভবের কথা বলে। অবচেতন আকাঙ্ক্ষার সংকেতময় প্রকাশ সবটাই থাকে চেতন তার। তাহলে রূপকের আড়ালে কী বলতে চান কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত সেটা খুঁজলে দেখি অন্বেষণে অনির্দিষ্ট তিনি। সংকেতের আড়ালে যে গোপন পৃথিবী অন্বেষণ করেন কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত সেখানে তিনি লাঁকানীয়। লাঁকা বলছেন যে, পৃথিবীতে যা পাওয়া যায় না তা খোঁজাই হলো প্রেম। কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের সেই গোপন আকাঙ্ক্ষা তো অজানা আর রহস্যময়, সেটা শেষ রজনী পর্যন্ত ফাঁকা বা শূন্য (Void) থেকে যায়। তবু সবকিছুতে ইলুশন বা বিভ্রম বলে উড়িয়ে দেবার মতো উত্তরাধুনিক তিনি নন। তার কবিতা রহস্যময়, তবে অধ্যাত্ববাদী নয়। মানুষে মানুষে যোগাযোগ যেখানে এসে ভেঙে পড়ে সেইখানে তার কবিতা এসে দাঁড়ায়, অস্তিত্বের মগ্ন উপস্থিতি নিয়ে। জীবনের নির্জনতা, একাকীত্ব, বিপন্নতা, বিহ্বলতা, রহস্যময়তা,সম্ভাবনা, অসম্ভাব্যতা, অস্তিত্বের সংকট, গৌরবহীনতা, গোপন আকাঙ্ক্ষা, অপ্রাপ্ত কামনা আর যৌনতা সংশ্লেষে তৈরি হওয়া টেনশন, উদ্বেগ আর উত্তেজনা তার কবিতায় আছে। সেখানে তিনি নিজস্ব সময়, স্থান আর শরীর নির্মাণ করেছেন। স্থান ও সময়কে ফালি ফালি করে কেটে তার মধ্যে আটকে রাখা মানুষ তিনি অস্বীকার করে নির্মাণ করেছেন নিজস্ব সময় ও স্থান। তাই সময়, স্থান আর ইতিহাস অতিক্রম করে তার কবিতা নিজস্ব মিথ নির্মাণ করে। কবিতাগুলোকে একসময় নিজস্ব স্মৃৃতিচারণ আর কথোপকথনের সীমান্ত অস্বীকার করেন। রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক চেতন-অবচেতন দ্বিবিভাজনের রেখায় বিভক্ত পৃথিবীর বাইরে এসে অন্য এক জীবনের মুখোমুখি হন কবি। সম্ভাব্যতার প্রশ্নে জীবন সীমাহীন আর সম্ভাব্যতার প্রশ্নে কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতাও সীমাহীন। তাই তার কবিতা অস্তিত্ব থেকে অনস্তিত্বে ক্রমাগত অগ্রসরমান। সকল সর্ম্পকসমূহ থেকে তিনি বেরিয়ে আসতে চাননি বরং নতুন সর্ম্পকসূত্র নির্মাণ ও আবিষ্কার করেছেন কবিতায়।

সেইখানে কবিতাও জীবনের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় যেখানে জীবনের মুহূর্তগুলোকে কবিতার চিরন্তনতা র্স্পশ করে। তার কবিতা যেখানে গিয়ে শেষ হয় তার বদলে অন্য যে কোন জায়গায়ই শেষ বা শুরু হতে পারতো, জীবনও তাই, শুরু বা শেষ যে কোন জায়গাতেই হবার সামর্থ  ও সম্ভাবনা রাখে। তার কবিতা জীবনের মতো যে কোন জায়গায় শেষ এবং শুরু হতে পারার সম্ভাবনা রাখে। তার কবিতায় চিত্রকল্প অবিশ্বাস্য রকমের সংবেদনাময়, গভীর, ক্ষেত্রবিশেষে জটিল।

তার কবিতার কিছু পঙক্তি প্রায়শই প্রবাদতুল্য। উদাহরণ কতিপয়:

১)    “সংবেদনশীল জীবন করণকৌশলগত নয়; প্রযুক্তির র্স্পশে সে ফিরে যেতে পারে না আরম্ভ বিন্দুতে।” (জীবন-প্লাবিতার কথকতা)
২)    “প্রতীক্ষা জীবসত্তার আমূল পরিবর্তন ঘটায়।” (বৃষ্টির আলোকময় পাখা)
৩)    “কোনো অন্ধকারই উৎসবকে আচ্ছন্ন করতে পারে না।” (রাজবাড়ি ক্যাম্প)
৪)    “সূর্যতপ্ত সমাজ কিংবা টিকটিকি সংঘের কবলমুক্ত হবার জন্য মুখোশ সহায়ক হলেও বিবেকের জন্য নয়।” (মুখোশ ও মৃত্যু)
৫)    “প্রতারণাদগ্ধ মেঘের হাহাকার আমাদের অগভীর চুলে দুর্বহ কোরাসের প্রতিধ্বনি তোলে।” (শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ)
৬)    “বিষণ্ণতা প্রায়শ নির্মূল-অযোগ্য – এর সূক্ষ্ণ শেকড় সকল দৃশ্যের মধ্যে সঞ্চারিত।” (দৃশ্যের পেছনে দৃশ্য)
৭)    “যা অর্থময় তার পূর্ণ অর্থ উপলব্ধি অসম্ভব।” (নদী ও স্নানস্বপ্ন)
৮)    “আমাদের মৃত্যুর সাথে সংখ্যাতত্ত্বের অবসান নিশ্চিত, প্রজান্মান্তরে তা প্রচারিত হবার কোনো সুযোগ নেই।” (সংখ্যাপদ্ম)
৯)    “রক্তের উজ্জ্বলতার জন্য ছায়াকে জরুরি বলে চিনি।” (মাছের সৌন্দর্যছায়া)
১০)   “দিগন্তচারী ধূসর ঈগল একদিন ঠুকরে খাবে আমার স্বাদু শরীর; আমি সে দৃশ্য দেখবো শুধু, ব্যাখ্যার পাবো না সময়।” (অন্ধকার ও ট্রোগনের গান)
১১)    “মানুষ বস্তত অসংকীর্ণ জীব।” (ঝালাইকরা আকাশ)

এরকম উদাহরণ দেয়া যাবে আরো অনেক। জীবনে বিশ্বাস অনিবার্য, অনিবার্য অবিশ্বাসও। তার কবিতা আমাদের মগ্নচৈতন্যে শিস দিয়ে যায় অবারিত প্রান্তরের নিমগ্নতায়। তার খোঁজেই কোথাও নিরুদ্দেশ কেউ। তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না আর। সেই নিরুদ্দেশের যাত্রী কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত।

তার কবিতায় বিবিধ শব্দ প্রচলিত আভিধানিক অর্থের বাইরে বেরিয়ে এসে নিজস্ব অর্থের আকাশ প্রায়শই নির্মাণ করেছে। প্রথমত, কবিতার উপমা, রূপক, চিত্রকল্প, প্রতীক এসব কিছুর মধ্য দিয়ে একটা সময় আর স্থান এসে দাঁড়ায়। কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতায় সেই সময় আর স্থানের ধারণা ঠিক কীরকম? তার কবিতায় পরাবাস্তব চিত্রকল্প আর আত্মজৈবনিক বাস্তববাদের উপস্থিতি আমাদের চেনা জগতের আড়ালে থাকা রঙহীন ছায়ার মতো আরেক জগতে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তার কবিতা তাহলে তো স্মৃতিরেখা ও নদীর ধারের মানুষ। তাই তার কবিতা বিয়োগাত্মক, বিষণ্ণ, অভিযোগহীন অথচ সিরিয়াস। অন্ধকার তার কবিতায় নানা রঙ, গভীরতা, সম্ভাব্যতা আর নৈরাশ্যসমেত সমাগত।

আর্তে ঈ গার্তেস বলেছিলেন যে আধুনিক চিত্র ও শিল্পকলার বিমূর্তায়ন তাকে মানুষের কাছে দুর্বোধ্য, জটিল ও দূরবর্তী করে তুলেছে। এক ধরনের বিমানবিকীকরণ ঘটেছে শিল্পের যা বোধগম্যতার প্রশ্নে শিল্পকে মানুষ হতে দূরবর্তী করে তুলেছে। কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতা বহুগামী ও বিমূর্ত তবে তা জীবন থেকে দূরবর্তী নয়। বিমূর্তায়ন আসলে কবিতাকে অর্থগত দিক দিয়ে সংকেতময় ও বহুগামী করে তুলেছে। তাই আধুনিক কবিতা ব্যক্তিগত – তার সামাজিক পাঠ অনুপস্থিত। পুঁজিবাদ আর শিল্পায়নের পূর্বে কবিতার সামাজিক পাঠ অবারিত ছিল। পুঁজিবাদ অর্থকে বহুমাত্রিক, দুর্বোধ্য আর ব্যক্তিগত করে তোলে। কেননা কেউ কোন অর্থ ও জীবন সর্ম্পকে নিশ্চিত নয়, সবই আপেক্ষিক। অর্থময় ও অর্থময়তা সবই মনোগত। জীবন ব্যক্তিগত, তবে যা ব্যক্তিগত তাই রাজনৈতিক। তার কবিতায় প্রবলভাবে উপস্থিত গ্রাম আর অরণ্য, তবে তা গ্রামীণ নয়, আরণ্যকও নয়। কারণ গ্রাম আর অরণ্যের আড়ালে অগভীর গোপনে জেগে থাকে অন্য কোন ছায়াপথ। বিমূর্ততাই কবিতাকে বহুগামী করে তোলে। তবে বিমূর্ততা কবিতাকে স্বাধীনতা দেয়, কিন্তু এটি কবিতাকে অনির্দিষ্ট এবং প্রায়শই নিরুদিষ্ট করে তোলে; তবে বির্মূত না হয়ে কবি গৌরাঙ্গের উপায়ও নেই কেননা –
“এই সমস্ত দৃশ্যের পেছনে আরো দৃশ্য থেকে যায়।” (দৃশ্যের পেছনে দৃশ্য)

শ্রমজীবী জীবনের সংগ্রাম ও বঞ্চনা তার কবিতায় উপস্থিত। অলৌকিক ও জাদুকরী চিত্রকল্প তার কবিতাকে অন্তর্বীক্ষণ ও জীবনদর্শনের দৃশ্যান্তরে থাকা দৃশ্যের উন্মোচন ঘটায়। তার কবিতা নীরবতা, অন্ধকার আর গভীরতার গান হয়ে প্লাবিত করে আমাদের সকল স্নায়ুমণ্ডলের সীমানা; প্রকৃতি ও জীবন এক অপার বিস্ময় আর রহস্য নিয়ে সমাগত তার কবিতায়। রহস্যময় প্রোজ্জ্বল সংকেতের ইঙ্গিত আর আহ্বান তার কবিতাকে গভীরতর সংবেদনাময় এক জগতের অভিযাত্রী করে তুলেছে। অন্ধকারের সীমান্তে যে মানুষের বাস তার সকল দ্বন্দ্ব আর বাস্তবতার ছায়াপথ তার কবিতায় উপস্থিত।

তাই কবিতায় তিনি অন্বেষণ করেন অন্ধকার, বিস্ময়, বিহ্বলতা আর অতিকায় প্রগাঢ় এক সর্বব্যাপী আছন্নতা, জীবনের অনিবার্য অনিশ্চয়তায় শূন্য থেকে আকস্মিকভাবে ঝুলতে থাকা জীবন তার কবিতাকে পরাবাস্তববাদী উঠোনে নিয়ে এসেছে। রাজনীতি, ক্ষমতা-সম্পর্ক ও উৎপাদন-সম্পর্ক তার কবিতায় এসেছে সংকেতগভীর ছায়াপথ ধরে। মানুষের দুর্দশা আর ক্লেশ সেখানে আছে, আর আছে সংগ্রাম আর প্রতিরোধ।

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতা ক্ষেত্রবিশেষে অনতিক্রম্যতার সীমারেখায় আমাদের ঝুলিয়ে রেখে চলে যায়। তার কবিতা ক্ষেত্রবিশেষে গোপন অনুরাগে সংরক্ত। কোথাও বক্তব্যে, কোথাও চিত্রকল্পে। রবার্ট ফ্রস্টের কবিতায় চিত্রকল্পের অনুসন্ধান তাকে নিশ্চয়ই সমৃদ্ধ করেছে, তবে কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতায় চিত্রকল্প এসেছে তার নিজস্ব ধরনে। জানা শব্দগুলো মিলে এক অনিশ্চিত অনুভূতির অভিজ্ঞান তৈরি করে তার কবিতার চিত্রকল্পেরা। কবিতায় ছুঁয়ে যান তিনি অনুভব, উৎপ্রেক্ষা, সংরাগ আর চিত্রকল্প। তবু চিত্রকল্পে তিনি জীবনানন্দীয় না হয়ে শেষ পর্যন্ত গৌরাঙ্গীয় হয়ে উঠেছেন অনুভবের অবগাহনের স্নানে। বিশ্বাস ও চিন্তায় তার কবিতা আলাদা। তার চিত্রকল্পসমূহ অজানা পৃথিবীর রহস্যময় ইঙ্গিতরেখা; অন্বেষণপ্রবণ ছায়াময় গভীর উপত্যকার সংকেত সেখানে মুখ্য।

জীবনানন্দ সময় আর রাজনীতিকে অস্বীকার না করলেও তা থেকে দূরবর্তী দ্বীপের বাসিন্দা ছিলেন এমনকি রাজনীতিও তিনি বিমূর্ততার ছাঁচে ফেলে দেখেছেন। দোয়েল জীবনের কাছে রাজনীতি অপ্রাসঙ্গিক। তাই সাম্প্রদায়িক ঝঞ্ঝাতাড়িত স্বদেশের মুখ খুব তো দেখি না কোথাও ঝরাপালকের গানে। কিন্তু গৌরাঙ্গ মোহান্তের ট্রোগনের গানে, শরণার্থী জীবন, যুদ্ধ আর ঋত্বিক ঘোটকের চিত্রকল্প প্রায়শই গভীর সংবেদনমায়। প্রকৃতির ছাপচিত্র খোদাই করে তিনি জীবনের গভীরতম ‘বোধ’ নয়, অনুভবকে মেনে নেন। জীবনানন্দে মানুষ ক্ষেত্রবিশেষে তার নিয়তির মতো অনতিক্রম্য এক বোধে আক্রান্ত প্রাণী। গৌরাঙ্গে বরং অনুভবের গভীর প্রদেশে সীমাহীন এক সত্তায় অন্তর্লীন সবাই তাই বলে তার কবিতা প্লাতনীয় আদর্শবাদী জগতের অনুগামী নয়। সমস্ত বর্তমান বস্তুনিচয়ের পেছনে বিমূর্তসত্তার ছায়া তিনি খুঁজে পান, বাংলা পেরিয়ে তার কবিতা কবে যেনো হান্ ঘোড়াসওয়ারের কাছে গেছে। কবিতায় তার বক্তব্য অবশ্যম্ভাবী। সেই গোপনতম সংরাগ আর সংবেদনা তার কবিতায় এসেছে এভাবেই – “অন্ধকারে ফেরস বাতিঘর নির্মিত হবে না জেনে গুরুমস্তিষ্কে জিইয়ে রাখি অগণিত মৃত্তিকা-কীট – আমার উচ্ছ্বাস-নিবিড় স্মৃতি ও স্বপ্ন পান করে তারা পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে।” (গুহাপথ গ্রহদৃশ্যহীন)।

তাই হয়তো কোথাও “অনুসন্ধানের নেই কোন ব্যগ্রতা।” (তীরধস তাড়িত জল, নির্মলতা)

ড. বিনয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিবেদিত কবিতা “অলক্ষ্য লিথস্ফিয়ার” কবিতায় সন্ধ্যা প্রদীপের মতো উচ্চারণ,
“শালবাগান পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে একদা কিছু বৃষ্টিসিক্ত স্ফটিক লুকিয়ে রেখেছিলাম; সেগুলো চোখের জলে ধুয়ে রাখা দরকার।”

গভীর সংবেদ আর বিষণ্ণতার সন্ধ্যা নামে আমাদের চারপাশে কবির এই স্মিত উচ্চারণে। শেষ পর্যন্ত কবিতায় তিনি প্লাতনীয় অভিজ্ঞানবাদী নন, যতই অতিন্দ্রীয় ছায়াবাজি থাকুক সেখানে জীবনের পরতে পরতে। কেননা আদর্শ কোন ধারণার দেখা মেলে না তার কবিতায়, এমনকি বিরামপুর বা ব্রাডফোর্ডেও নয়। বস্তুর পেছনের ছায়াকে দেখা যায় তার কবিতায়, কেননা বস্তুত কোয়ান্টাম স্পেস তত্ত্বে এমনকি গণিতেও জীবন সাবজেক্টটিভ বা মনোগত। নিউটনীয় সময় ধারণা থেকে বেরিয়ে তার কবিতা আইনেস্টাইনীয় সময়-স্থান-কালের  অভিমুখে পরিক্রমণশীল। ‘সময়ের সুরঞ্জিত ঝালর’-এ (অধিগ্রহণকাল) পরিব্যাপ্ত বিশ্বচরাচর। তাই ভগবান বুদ্ধের মতো কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তও ভেবেছেন শূন্যতা সর্বব্যাপী। মহিমাহীন আর অবতারহীন এ জীবনের পর আর কোন অন্বেষণ নেই। জীবনের কোন নির্বাণ না মেনে বলেছেন, জেগে থাকে শুধু সংবেদ আর অনুভব।

তার কবিতায় উপমা, উৎপ্রেক্ষা আর চিত্রকল্পে উদ্ভিন্নযৌবনা মধ্য এশীয় পাহাড়ের সানুদেশ, চৈনিক সন্ধ্যার অশ্বারোহী আর ইউরোপীয় বৃক্ষদের প্রাচীন শরীরের উপস্থিতি আছে স্বদেশের আরণ্যক দিবারাত্রির সঙ্গে মিশে। যৌনতা সবসময় তার কবিতায় প্রতীকাশ্রয়ী খামের ভেতরে থাকা চিঠি। কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতায় যৌনতা এসেছে ফ্রয়েডীয় গোপনীয়তার টেলিগ্রাফিক সংকেতে।

তিন
তার কবিতায় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গল্প রয়েছে। তবে তার কবিতায় ঘটনাসমূহের মধ্যকার সূত্রহীন জায়গাগুলো বুনে গল্পটাকে আবিষ্কার করার একটা ব্যাপার আছে বৈকি। তার প্রথম কবিতা গ্রন্থের প্রথম তিনটি কবিতায় ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধকালীন শরণার্থী ক্যাম্পের জীবনের গল্প আছে দৃশ্যকল্প জুড়ে। ‘রাজবাড়ি ক্যাম্প’ কবিতায় আছে ক্যাম্পে শরণার্থী জীবনের অপমান আর গ্লানি, শ্লাঘা আর বেদনা। ‘আগুনের পলাশমুদ্রা ও স্বদেশ’ কবিতায় দেখতে পাই গৃহস্থ মানুষ কীভাবে শরণার্থী হয়ে যায়। তবু এই কবিতাগুলো বক্তব্যপ্রধান নয়, বর্ণনাপ্রধান। তাই মানুষের শরণার্থী হওয়ার পেছনের ক্ষমতা সম্পর্কের সূত্র সেখানে গোপনে লুকিয়ে রাখা, যা গভীর অনুসন্ধান দাবি করে। রাজনীতি সেখানে গোপনে বাস করে। তবে শরণার্থী জীবনে ক্যাম্পের কদর্যতা যেমন সত্যি, তেমনি সত্যি মনোজাগতিক ভিটেমাটির মনস্তত্ত্ব। একটা পৃথিবী বাইরের আরেকটা ভিতরকার। তাদের মধ্যকার সর্ম্পক দ্বান্দ্বিক। তাই দুটি সত্য নিয়েই আমাদের অস্তিত্ব অনস্তিত্বে দ্বন্দ্বমুখর এই বেঁচে থাকা। তাই তার উচ্চারণ,
“হৃদয় যত শ্যামল, তত শূন্যতায় পূর্ণ” (প্রতারণাগহন রাত্রিজল ও শূন্যতা)।

জীবনের অপস্রিয়মান ছায়ার পিছে ধাবমান ছায়া যেন এক একটি কবিতা। বক্তব্যে কবিতাগুলো বেশ সরল, যেন বা গ্রামে শাঁখা হাতে কোন এক মা। অনুভূতিকাতর সংবেদনাজাত এক প্রার্থনার মতো গ্রহের অধিবাসী কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত। বক্তব্যের যুক্তির চেয়ে সত্য জানি অনুভবের নিজস্ব আকাশ। ভাই ‘মুক্ত ভিটেমাটির স্বপ্নে-কঙ্কাল-কাঁকালে জেগে ওঠে যমুনার ঢেউ” (রাজবাড়ি ক্যাম্প)। দেশ বলতে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গঠিত ও পরিচালিত কোন সামাজিক সংগঠন বরং দেশ থাকে আবেগে ও মমতায়, কল্পনা ও আকাঙ্ক্ষায়। কিন্তু জীবন ও যৌবন তার সকল আবেগ ও শরীর সমেত ঘামের মতোই পরিশ্রমজাত আর দ্রুত উদ্বায়ী। দাবি করে তীব্র অনুভব আর তাড়না। যেমন যৌবন দ্রুত উবে যায় জীবন থেকে। তাই তার কবিতার উচ্চারণ-
“টুকরো ম্যাকেট হতে উবে যায় যৌবনঘাম” (আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর)।

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতায় নগর থাকে গভীর গোপনে। নগরে ব্যবসা আছে, আছে প্রচার আর প্রসার। তাই তিনি লিখেছেন,
“শহরের বিপ্রতীপ ধুসরতায় ধান জন্মে না বলে উজ্জ্বল অরণ্যের গন্ধে ডুবে থাকি” (অধিগ্রহণকাল)।

অনুসন্ধান দু’রকমভাবে চলতে পারে। এক. কী কী আছে তা খুঁজে, আর, দুই. কী কী নেই তা দেখে। গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতা নাগরিক, মানবিক ও রাজনৈতিক, অথচ তার কবিতায় নগর, রাজনীতি  ও প্রেমের মতো প্রবল অভিজ্ঞানসমূহ এসেছে রূপকের আড়ালে। তার ‘সোনা ইরির গান’ একটি রাজনৈতিক কবিতা, সভ্যতা যে শক্তি আর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আর কোন কিছুই যে ক্ষমতা-সর্ম্পকের বাইরে নয়, তা বেশ বুঝতে পারা যায় এ কবিতাটি পড়লে। এ কবিতায় তার ফেরাটা এরকম –

“রোদ- চকচকে টুকরো পলিথিন ও ধুলো উড়িয়ে
আমরা ছয় পুরুষের ভিটের দিকে ফিরছি।
তিস্তা ব্রিজের নিচে পড়ে আছে প্রাতৈহাসিক
নদীর কঙ্কাল। সভ্যতা রাজপথে কপট ঘোড়া
ছুটিয়ে আচার্য সহিসদের ক্রমান্বয়ে করেছে নপুংসক।
এখন ক্রন্দনে বা মন্ত্র উচ্চারণে জীবন-দেবতার
টনক নড়ে না। নদীর জলতরঙ্গ জীবন ফিরে
আসবে না বলে পাম্পে সোনালি
তেল ঝরিয়ে বা দরবরি বিদ্যুতের শিহরণ
ঢুকিয়ে মাটির জরায়ু থেকে কৃষি-কুশল
মানুষ টেনে আনে জলের বিপণ্ণ ভ্রুণ।”

তার কবিতায় সকল রকম উত্তরাধুনিক সংশয়বাদিতা উপস্থিত। তবু তিনি শেষপর্যন্ত নৈরাশ্যবাদী নন। প্রত্যাশায় বিশ্বাস আছে তার। নদী আর মানুষ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা-সর্ম্পকের বাইরে নয়। উন্নয়নও আসলে রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্পর্কের আরোপিত কেন্দ্র যা দিয়ে মানুষকে ভোলানো যায় যেন বা ছেলে ভোলানো ছড়া। আন্ত:দেশীয় নদীপ্রকল্পের মতো রাজনৈতিক বায়বীয়তার ফলাফল এ জীবন, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও তিস্তাঞ্চল নিয়ে লেখা ‘ঋত্বিক ঘোটক’ কবিতায় তিনি বলেছেন,
“আজো নুন-ভাতে ভরে নি ফুটো শানকি।”

কবি গৌরাঙ্গের ‘ঢিবি’ কবিতাটিতে মা এতো সর্বব্যাপী যে তা আমাদের বিপন্ন করে প্রগাঢ় এক মমতায়। ১৯৭১ এর শরণার্থী আর ক্যাম্প জীবনের রূঢ়তা এসেছে তার কবিতায়।
তার কবিতায় রাজনীতি আছে সংগোপনে। সকল রাষ্ট্র ও সংগঠনের ভেতরে আবর্তিত যে মানবীয়, আরোপিত মূল্যবোধ ও জীবন, তার সন্তর্পণ ভ্রমণের হদিস রাখে তার কবিতা। তবু রাজনৈতিক প্রশ্নের কোন মীমাংসা সেখানে নেই, আছে শরণার্থী মুখ, ক্যাম্পের জীবন, সোনা ইরির গান, পলিথিন পথে বাড়ি ফেরা, বাঁধ দেয়া নদীর কঙ্কাল। অবশ্য অনুভবের গভীর রাজ্য রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বেতারযন্ত্র তো নয়। তবু রাষ্ট্রের নিগড়ে বাঁধা জীবনের খোঁজ তার কবিতার গোপন সংকেতে ঠিকই লেখা আছে।

অনুভবের বিমূর্তীয় প্রবণতা গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতাকে মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষার বিপ্রতীপ কৌণিকতায় স্থাপিত করে একথা বলা যাবে না, তবে তার বীক্ষণ আলাদা। এমনকি বাখতিনীয় কোন শরীরের দেখা প্রায় মেলে না তার কবিতায়। শরীর পরাক্রান্ত কোন ধর্মের মতো আসে না তার কবিতায় নিজস্ব কোন মহাগ্রন্থ নিয়ে, অথবা প্রবল রাষ্ট্রের মতো আসে না বিভাজনের তীব্র সীমানারেখা ধরে তার কবিতায়। বরং রফিক আজাদের কবিতায় শরীর ও রাষ্ট্র অনেকটা সরব। রাষ্ট্র গৌরাঙ্গ মোহান্তের কাছে নিজস্ব আর পাখিজীবনের মতো বিভক্তিহীন। মন আর তার সকল রকমের ব্যাপ্তি, বিকাশ আর বিকার নিয়ে এক মহাপরাক্রান্ত অস্তিত্ব হয়ে নিয়ত বিরাজ করে তার কবিতায়। তাই তার কবিতা এখন পর্যন্ত সক্রেটিসীয় অভিলিপ্সায় কাতর, মার্কসীয় উৎপাদন সম্পর্কের পৃথিবীর খোঁজ যেখানে মেলে সেখানে তার কবিতা আরো কৌতুহলোদ্দীপক, কেননা জীবনের এক অসীম সত্তার বাস্তবতা তিনি মানেন। মানুষ বিভক্ত শুধু বস্তু আর ধারণায়। তাই কবিতায় তার উচ্চারণ:
“আমার অন্তরিন্দ্রিয় থেকে তখন ঝরতে থাকে সৌর কিরণ; বস্তুরাশির খোলস ভেদ করে তা স্বরূপের সারল্য ঝলকিত করে তোলে।” (আত্মবিভক্তি)

এমনকী ভ্রমণও সত্য নয়, সত্য নয় আবিষ্কার। জীবন হয়তো কোনো মনোবিকারগ্রস্ত নাবিকের পুনশ্চ ছায়াপথ ভ্রমণ, তার ‘ভ্রমরসত্য’ কবিতায় সেই ইশারা মেলে যখন তিনি বলেন,
“মনোবিকারগ্রস্ত সূর্য নভশ্চারী ভ্রমরের পাখায় তুলে রাখে কুয়াশাদীর্ণ পথের কথকতা।”

আবার খোয়াই জলে ভেসে যাওয়া কবিতায় বলছেন,
“পার্থিব আর অপার্থিবের মধ্যকার ভেদরেখা, তো লোপাট হয়ে গেছে সেই কবে কেননা “আমি পার্থিব শব্দের সৈকতে হেঁটে হেঁটে পর্বতে প্রতিধ্বনিত অর্ফিয়াসের গান শুনি।”

চার

অতীত এক বিরামপুর, এক মনোজাগতিক সময়, দূরাগত পৃথিবীর অসীম দূরবর্তী মণ্ডল, অন্য পৃথিবীর দূরাগত অজানা সংকেত, পার্থিব-অপার্থিবের মধ্যবর্তী নো ম্যানস ল্যান্ড, সূক্ষদর্শী সংবেদনা, বারবার ফিরে আসে আর যায় চেতনা ও কবিতায়। তাই আমরা দেখি,
“বিরামপুরের নিভৃত অতীত টুকরো করে শূন্যে ছুঁড়ে চলি অনাশ্য ডিসক্যাস।” (ব্লেড ও নির্মোক)
তবু সেখানে বিপন্ন বিস্ময় সত্য, পিপাসা সত্য আর সত্য কেবল অনন্ত বিহ্বলতা। প্রকৃতি মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী তো নয়। তাই এই বিরামপুর কবির ভীষণ প্রয়োজন, কারণ,

“পর্বত, অরণ্য, সমভূমি কিংবা শহর –
কোথাও রাখোনি বাঞ্ছিত নিরাপত্তা।” (জলজীবন)

এভাবে একসময় দেখি মানুষ ও ঈশ্বরে কোন দুস্তর পারাবার নেই। কেননা পিপাসা অনন্ত ও অনিবার্য এবং কোথাও নেই তৃষ্ণার জল। তার ‘পিপাসার হাঁস’ কবিতা তাই বলে। তার কবিতা ত্রিপিটকীয়, তবে অবশ্যই ত্রিপিটকের টীকাভাষ্য নয়, তাই হয়তো
“অশান্ত জলস্রোত অথবা উদ্বেল পল্লব
অশ্রুধারায় খুঁজে পায় না
নির্বাণের ত্রিপিটকীয় টীকাভাষ্য” (শান্তিভাষ্য)।

এ রকম অবস্থায় ঈশ্বরের দেখা মেলে না তার কবিতায়, যদি কখনো বা মেলে তবে তা আরো কৌতুহলোদ্দীপক কেননা সেখানে মানুষের বিস্তৃতি কেবল স্মৃতি-বিস্মৃতি আর চেতন-অবচেতন জুড়ে। পারলৌকিক ঈশ্বরের খোঁজ সেখানে মিলবে না। এ কারণেই, “ছায়শীতল জলে তখন বাস করে যুথবদ্ধ মানুষ ও ঈশ্বর।” (নিরঞ্জন মানবের সৌর হৃদয়)

মানুষ প্রকৃতির বাইরেও নয়। ‘অন্ধকার ও ট্রোগনের গান’, কবিতায় এসেছে প্রস্থান আর বিস্মৃতির সংবেদ।
অন্য দিকে এক ধরণের নিয়তিবাদ দেখতে পাই তার কবিতায় যখন তিনি উচ্চারণ করেন,
“কুয়াশা কিংবা ব্রিজ আমাকে বিভ্রান্ত করে রাখে, কৃষ্ণচূড়া ফল চিরন্তন পথের পরিচায়ক হতে পারে না জেনেও আমার রেটিনা গ্রহণ করতে পারে নি ভিন্ন কোনো দৃশ্যসংবাদ।” (কুয়াশা কিংবা ব্রিজ)

পাঁচ

অপ্রচলিত ও স্বল্পপ্রচলিত শব্দের ব্যবহার অনিবার্য ছিল না সবক্ষেত্রে তার কবিতায়। ক্ষেত্রবিশেষে তার কবিতায় কুয়াশা নয় অস্পষ্টতার বিস্তরণ ঘটেছে। তার কবিতা অভিধানমুখী। বিশেষণ নির্ভরতা ও এর প্রয়োগ তার কবিতাকে ক্ষেত্রবিশেষে জটিল করে তুলেছে, ক্ষেত্রবিশেষে সাধারণ পাঠককে অভিধান নিয়ে আসতে হবে তার কবিতা পড়তে হলে। পরবর্তী কবিতায় বইয়ের বিশেষণগুলো বরং অতটা অভিধানআশ্রয়ী নয় বলে আমার ধারণা। তৃতীয় এবং এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তার শেষ কবিতাগ্রন্থ ‘ট্রোগনের গান’ (২০০৬) এ তিনি বরং অনেক তীক্ষ্ণ, পরিমিত আর নিজস্ব ধরণ, প্রকাশভঙ্গি ও বক্তব্যে ঋদ্ধ, শব্দের প্রয়োগে উদ্ভাবনমুখী। ফর্ম ভেঙে কবিতার চিরচেনা পঙক্তির বিস্তৃতির সীমানার তিনি পরিবর্তন এনেছেন। তার কবিতা পড়লে বোঝা যায় কবিতা পঙক্তিতে নয়, সংকেতে থাকে, আকাঙ্ক্ষায় থাকে।
তার কবিতায় অকর্মক ক্রিয়ার আধিক্য এমন ধারণা দেয় যে পৃথিবী এক অমোঘ নিয়তির টানে ভেসে চলা। পৃথিবী এক সংকেতময় অভিধান, এখানে দৃশ্যের পিছনে থাকে দৃশ্য, কারণেরও কারণ থাকে। তাই কবিতায় তার উচ্চারণ, “দৃশ্যের ভেতরে ঢুকে থেকে থেকে দেখেছি সূর্য বিনাশের ছবি।” (অর্কিড ও অন্তর্গত দৃশ্য)
অতীত এই জীবনে একমাত্র অধিক্ষেত্র যা স্থির আর চিরঞ্জীব। তার কবিতায় তা ফিরে ফিরে আসে, যেন বা, “গোলকার্ধের বিশ্রান্ত পথে তুমি আচ্ছন্ন অতীতের করবীরসে রক্তিম করে তুলছো করতল। (মেঘের মেটামরফসিস)

তবে কী সবই বিভ্রম, সবই স্নায়ুুুবিক। সবই এক তীব্র বিদ্রুপ আর উপহাস, এমনকি অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত প্রলম্বিত আয়ুষ্কাল। একবার তাই ভেবে তিনি উচ্চারণ করেন,
“স্নায়ুর ভেতরে কম্পনসূত্র রেখে যায় মনোরোগের নটে বীজ; বীজের গোলাপি আভা আমার শক্তি ও অস্তিত্বকে উপহাস করে।” (পাহারার অগ্নিবন্ধন)
জীবন কেমন তার দেখা মেলে দিন রাতের অদল বদলে। তিনি বিশ্বাস রাখেন নি এমনকি শুশ্রুষায়। তার “ঝরুক তারকিত সোমরস” কবিতায় তিনি বলেছেন,
“দিনগুলোর ভেতরে সাটিন টানানো নেই। আমরাই সেগুলোকে আলো অন্ধকারে বিভাজিত রাখি: কিছু কিছু দিন দাঁড়িয়ে থাকে আঠালো আকাশে; পটাশজলের শুশ্রুষা নিয়ে রোদে চিৎ হয়ে থাকে। আঠালো আর চিৎ-হওয়া দিনগুলো প্রতিনিয়ত চারিয়ে দেয় শেকড় মনমৃত্তিকায়।”

কবিতাটির ইঙ্গিত প্রাত্যহিক বেঁচে থাকাকে প্রশ্ন করে, মুখ ব্যাদান করে উপহাস করে, কদর্য ইঙ্গিত করে চোখের ইশারায়। পঙক্তিগুলোর বিভা আমাদের আকর্ষিত করে আলো যেমন ঘাসফড়িংকে। তার কবিতায় শরীরের সংকেতময় উপস্থিতি প্রবল।
তবে কেন উত্তরাধুনিক মানুষ জীবনের লক্ষ্যে অনিশ্চিত তার একটা ব্যক্তিগত ব্যাখা তার কবিতায় আছে। ব্যাখাটা পাওয়া যায় ‘সৃষ্টিবিভাস’ কবিতায় যেখানে তিনি বলেছেন যে, আমাদের দেখার অক্ষমতাই “কেন্দ্রবিন্দু নিশ্চয়ন দুরূহ” করে তুলেছে।
তবে এই কেন্দ্রবিমুখ ঘূর্ণনে তবু “ধুলোকণায় রেখে যায় মিহি উজ্জ্বলতা, বাতাসে সতেজ স্নো-স্বপ্ন।” (ডায়মন্ড ব্লেড)
আবার ‘কম্পন’ কবিতায় বলেছেন,
“ক্ষয়ের কেন্দ্রে যা অক্ষয় থেকে যায় তাকে জেনেছি কম্পন, আমি আসছি, তুমি আমার কম্পন দেখে নিয়ো।”
এই ‘মিহি উজ্জ্বলতা’ আর ‘কম্পন’ কি এক জিনিস? ‘ট্রোগনের গান’ কবিতাগ্রন্থের শেষ কবিতাটির আগের কবিতা “ভাষা, দৃশ্যের বিকৃত প্রচ্ছায়া” পড়ে মনে হয়েছে তিনি ভিনগেনস্টেইন, স্টুয়ার্ট হল আর দেরিদার অনুগামী সেখানে যেখানে ভাষা বাস্তবতা বা সত্তার কোন প্রকাশ নয়, বরং এমন এক কাঠামো যেখানে বাস্তবতা ঢোকে তার নিজস্ব জুতোজোড়া খুলে রেখে। ফলে ভাষা ঘটনার নিজস্ব বয়ান বা পাঠ তৈরি করে ক্ষমতা সর্ম্পক অথবা স্নায়ুবিক অভিজ্ঞানের সূত্র ধরে। তাই এমনকি ভাষাও সত্য নয়। প্রাগুপ্ত কবিতায় তিনি বলেছেন,
“বস্তুত দৃশ্যকে ভাষান্তরিত করা যায় না, ভাষা, দৃশ্যের দূর বিস্তৃত প্রচ্ছায়া। জীবনের উজ্জ্বল-ধূসর রহস্যের সত্য কোনো প্রতিরূপ নেই।”/ তাই কবিতায় তার পৌরাণিক উপসংহারনামা নিম্নরূপ: “ব্রহ্মাণ্ডে ধূলোকণার কাছে আকাশ মূল্যহীন; এ আকাশের জন্য আমাদের যুদ্ধ, বিজয়োল্লাস। আকাশের মনস্তাত্বিক ইতিহাসের মূল্য হয়তো এখনো নির্ধারণ করা যায় নি।”
এবং “রাতশেফালি ফুটে ওঠে, রাতের উদ্ভাসন পাখিসত্তার দৃষ্টিতে রেখে যেতে পারে না কোনো গূঢ় প্রহর।” (পাখিসত্তার ক্রন্দন)

ছয়

কিছুই থাকে না জানি, তবু স্মৃতি থাকে, তবু থেকে যায় কতিপয় আশ্চর্য পিঙ্গল বিকেলের এই সব অরুণাভ ছায়াদল। সেই সব ছায়ারা কানে কানে সেদিন বলেছে,
“সাগর-সৈকত মানুষের কাছে কোনো দিন প্রার্থনা করি নি; অধিকারের সুবোধ্য সূত্ররাজি কখনো করি নি উচ্চারণ, অদৃশ্য সঞ্চয় নিয়ে আমার শুধু মৃত্যুময় বেঁচে থাকা। যে পথে না চললেও আমার দিন কেটে যেতো সে পথ মেলে ধরেছে অভিনব অভিজ্ঞতার অভিজ্ঞান। অভিজ্ঞতার অগ্নি জ্বালিয়ে দিয়েছে আমার শয্যাগৃহ। আমি রাত্রির অদ্ভুত নির্জনতায় বসে পাঠ করি দৃশ্যময় অন্ত:শীল পঙক্তিমালা; বিষণ্ণ বসনপ্রান্তে তুলে রাখি লোনা শিশির। আপনি আমার কম্পিত পার্থিবতার মনোগ্রাফ হাতে তুলে নেবেন কি?” (পারমিতার প্রতুক্তি)

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতা সম্প্রসারিত করে চৈতন্যের আঁধারে সঞ্জীবিত ত্রিকালদর্শী বাস্তবতা, কেবলই অন্তর্গত এক প্রবল পর্যবেক্ষণ সেখানে মুখ্য। সেখানে মুখরিত হয় সান্ধ্যচৈতন্য-বিভোর আঁধার। চিত্রকল্পের আবিষ্কার ও প্রয়োগে তিনি অভিনব, উল্লম্ফনপ্রবণ, ঊর্ধ্বমুখী ও উৎকেন্দ্রিক। তাই তার কবিতা পিছলে যাওয়া অন্তর্গত জীবনের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। সেইখানে ঝলমলে আঁধার তার সকল বিভা নিয়ে তার কবিতার একান্ত গভীরে পৌঁছে যায়। তাৎক্ষণিক সময় আর স্থান হঠাৎ করেই তার কবিতায় প্রারম্ভবিন্দু হয়ে নিয়ে যায় চিরঞ্জীব স্বয়ংসিদ্ধ এক সময়ে। সময়ের আড়ালে আরেক সময়, পৃথিবীর আড়ালে আরেক পৃথিবী আর তার পর্যবেক্ষণ থাকে তার কবিতায়। কারণ সংকেতময় ফ্রয়েডীয় ছায়াপৃথিবী কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতায় ফিরে ফিরে আসে, এমনকী দীর্ঘদিনের আলোতেও। তার কবিতার আবিষ্কার ও উপলব্ধিসমূহ তাই ইন্দ্রিয়াতীত। অতীন্দ্রীয় থেকে ইন্দ্রিয়ের ইঙ্গিতময় উল্লম্ফন তাই আমাদের অর্ন্তগত অভিযাত্রীর মগ্নতা ও উত্তেজনা দেয়। বুক পকেটে ভাঁজ করে রাখা প্রাত্যহিক জীবনে আমরা যা যা আড়াল করে রাখি – প্রেম, প্রত্যাখান আর রিরংসা, আঁধার, আলোয়ান আর প্রেষণা সবই তার কবিতায় একে একে এসে ফিরে চলে গেছে। অজানায় অধিকৃত জগৎ জীবন যেখানে, সেখানে কবির চশমার কাচে নিঃশব্দে আজো জমে কিছু গোপন শিশির। কবিতা সম্পর্কে শেষ পর্যন্ত কিছু বলা যায় না মানি, তবে জীবন সর্ম্পকে শুধু এটুকু বলা যায়,
“এ শহরে আজ ঘন ঘন বৃষ্টি হয়েছে। বুকে কম্পিত করুণ বাতাস নিয়ে ব্রাডফোর্ডের পথে হেঁটেছি অনেকক্ষণ।” (অদৃশ্য জল)

সেইখানে কোনদিন কারো চশমার কাচে জমেছিল নির্জন কুয়াশা।

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E