৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মার্চ ২৩২০১৭
 
 ২৩/০৩/২০১৭  Posted by

কবি পরিচিতি

এ কে এম আব্দুল্লাহ

এ কে এম আব্দুল্লাহ

এ কে এম আব্দুল্লাহ। জন্ম তারিখ: ২৬ জুন, ১৯৭০। জন্মস্থান : গোলাপগন্জ, সিলেট, বাংলাদেশ। বর্তমান ঠিকানা: লন্ডন, যুক্তরাজ্য। পেশা: ব্যবসা। abdullah.20@hotmail.co.uk

প্রকাশিত গ্রন্থ
কাব্যগ্রন্থ : সচেতনা (সংগীতা প্রকাশনী, ইউকে) ২০১৩; হৃদয়ে রক্তক্ষরণ (নয়ন বই ঘর, ঢাকা) ২০১৪; রাতের জল (কাব্য প্রকাশ, ঢাকা) ২০১৬; মাটির মাচায় দণ্ডিত প্রজাপতি (বাসিয়া প্রকাশনী, সিলেট) ২০১৭

উপন্যাস : ক্ষুধা ও সৌন্দর্য (নয়ন বই ঘর, ঢাকা) ২০১৫

এ কে এম আব্দুল্লাহ’র কবিতাভাবনা

যদি খুব সহজ ভাবে বলি, তাহলে বলব : কবিতা হচ্ছে নিজের উপলব্দির প্রকাশিত একটি শৈল্পিক রূপ। কবিতা নিজস্ব এক সৃষ্টি। কবিতার মাধ্যমে একজন কবি তার ভিতরের সৌন্দর্যকে প্রকাশ করেন আর সেই সাথে শব্দ এবং বিষয়কে কাব্যিক অলংকার দিয়ে সাজিয়ে উপস্থাপন করেন। একটি রাস্তা দিয়ে একজন সাধারণ মানুষ আর একজন কবি হঁটে গেলে দুজনের দেখার দৃস্টি ভঙ্গির মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকে। সমাজে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা কবির উপলব্দিতে বাস্তবতাবোধের প্রকাশ ঘটান। সমাজ,রাস্ট্র যেখানে অনিয়ম অন্যায় হয়েছে কবি তার কবিতার মাধ্যমে সেখানে আঘাত করেছেন। কবি কবিতার মাধ্যমে মানুষের বিবেক জাগ্রত করেছেন। একটি কবিতা যখন কাব্যিক ফরমেটে লেখা হয়,সে কবিতা যেমন পাঠকের মনে আনন্দ এনে দেয়, তেমনি মানুষকে ভাবুক করে তোলে। মানুষকে প্রেরণা দেয়। সাহসী করে তুলে। মানুষকে ভালবাসতে শেখায়। আমার কাছে কবিতা হলো : একটি নিজস্ব বিপ্লব, একটি প্রতিবাদ। একটি নিজস্ব বিনোদন এবং একটি একান্ত নিজস্ব কথা বলার মাধ্যম।

এ কে এম আব্দুল্লাহ’র কবিতা


নতুন শহরের গল্প

এই নাও হাত। ধরো। এবার চলো হাঁটি।
পানেরপিক ফেলা দেয়ালটা অতিক্রম করলেই
নতুন শহর। জোনাকির ডানা থেকে ঝরে পড়া
সোডিয়াম আলোয় ভিজে, আমাদের কিছুক্ষণ
চুমো’র গন্ধ মাখা গলি-ঘুপচি দিয়ে হাঁটতে হবে।
আর আমাদের সাথে ছায়াবেশে আসতে পারে
কিছু অনাকাংখিত মৃত্যু সংবাদ।

মাঝে মধ্যে ঘামভেজা দরজার ফাঁকে শুনবে চুড়ি আর বিচিত্র হাসির ব্যাকুল ধ্বনি। ফুটপাতে পাতা অসংখ্য সংসারগুলোর মতো, নতুন শহরে পাবে অসংখ্য রঙিন শামিয়ানা টাঙানো সংসার, আর সেখানে প্রদর্শিত হবে হিমোগ্লোবিনের ঘনত্ব। আধুনিকতার ডিজিটালস্ক্রিনে দেখবে ফ্যশন-শো, টকশো এবং নতুন শহর গড়ার মার্জিতকাহিনী।

আমি নতুন শহরের বারান্দায় বসে তোমাকে শোনাবো রাতভর; শহরের চিকামারা-দেয়ালের দীর্ঘশ্বাসের আতংকিত আত্মকথা।


দীর্ঘশ্বাস

দৃশ্যের ওপাশে, ঘুমন্ত চেতনায় হাত গুলো সেঁকে, উষ্ণতা খোঁজে।

বিশেষণের ডালে ঝুলে মানবতা।

আর আমরা মানববন্ধন করি, মানবিক হই। আমাদের দীর্ঘশ্বাসের দেহ থেকে ঝরে রক্ত।

ভাবনারা বিধবা হয়। সাঁওতালপাড়া পোড়ে
নাসিরনগর কাঁদে আমরা ‘মগ’ইতিহাস পড়ি।
আর অপেক্ষা করি ঘুমের ভিতর কেউ ঢেলে
দিক এক ইতিহাস আগুন। আমরা দর্শক
গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে দেখি ধার্মিক, বণিক
আর দস্যুর ধামাইল। ফিলিস্তিন ….রঙ্গুন
নিয়ে কেউ লিখে গান, নাগরিকের মার্জিন
মন্তব্যহীন। পৃষ্টার পয়ার জুড়ে কেবল রক্ত
রক্ত রক্ত। শিশু রক্ত, যুবক রক্ত, মায়ের রক্ত
বাবার রক্ত। ভাবনার চোখ থেকে ঝরে মানুষের
রক্ত। এভাবে অভ্যস্ত হতে হতে একদিন আত্মার
মৃত্যু হয়। আর ধূসর দেহে জড়িয়ে গ্যেসোলিনের মখমল শাড়ি; আমরা পুড়ি, পোড়তে ভালবাসি।


দীর্ঘ রাত্রি শেষে

মাঝে মাঝে কয়েক পঙক্তি ভালোবাসা
এটিএম থেকে উঠে আসে আমার
বুকপকেটে। আর তুমি জড়িয়ে রাখো
আমাকে তোমার বুকের উত্তাপমেশিনে;
যেখানে, দেওয়ালহিটারের উষ্ণতা হয়ে যায় বিলীন।
আর আমাদের মুখ থেকে ঝরে পড়া-
লালায় উড়ে নতুন নোটের গন্ধ।
টেবিলের উপর রাখা চেকবই  থেকে
উঠে আসে লক্ষ লক্ষ মৌমাছি। আর
আমাদের ঘিরে ধরে ফুলের মতো।
আমারা লাল, হলুদ আর গোলাপি হতে থাকি।

এভাবে রাত শেষ হয়ে যায়। আর চামড়ার
ভাঁজ করা পকেটকোষে, পড়ে থাকে
মেয়াদ উত্তির্ণ কিছু পুরুকাগজের ফলক।


একটি আধুনিক দু:খের গল্প

আমাদের চিন্তা বড় হতে হতে,ছোট হয়ে আসে পৃথিবী। আর যুগান্তরের ঘুর্ণিপাকে এখন হাতের মুঠোয়। রেডিয়েশনে পুড়ে আমাদের অন্তর। আমরা ফিডারে অভ্যস্ত করি ভবিষ্যত। ফিগার আর বৃদ্বাশ্রমে আয়ুর দর্পন টাঙিয়ে আমরা ঈশ্বরকে দাফন করি বাসনার কাফনে। তন্দ্রার আল্পনায় মানুষের নৃত্য দেখতে দেখতে – ট্রাফিক সিগন্যালের পাশে হাত পেতে দাঁড়ায়, লালফিতায় বাঁধা দাসত্বের স্বপ্ন।

আর এভাবে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হয়। আর নামহীন
লাশের ভিড়ে রচিত হতে থাকে দু:খের নতুন গল্প।


ভুলে যাচ্ছি নেশাতুর সম্পাদকীয়

যে ফুলটি তীব্র অভিমানে
ঝরে গেলো অথবা আত্মহত্যা করলো
নিতে পারিনি তার সাক্ষাৎকার।
সময়ের ব্যাকুল চ্যাপটারে
ভুলে যাচ্ছি নেশাতুর সম্পাদকীয়।
এখন বিজ্ঞাপনি কলামের ফাঁকে খুঁজি
একটি নিশিগন্ধা আর চাঁদের সংলাপ।


দীর্ঘশ্বাসের দামাইল

পৃথিবীর খোলা মাথায় আজকাল যেনো খেলা করে,কালবোশেখি ঝড়। আমরা ঝড়ের ব্যাকুল আগুন মেখে দিব্যি করি অফিস। বাজার করি, খেলা করি, স্কুল-কলেজও…  পথে-প্রান্তরে পিতৃপুরুষের হাড্ডি পুড়িয়ে করি- কার্তিকী উৎসব। এখন আমরা উৎসব পছন্দ করি। নানারঙ উৎসব : মৃতের উৎসব পোড়ার উৎসব – রক্তের উৎসব। চারদিকে উড়ে উৎসবের ফুলঝুরি। দিন-রাত পৃথিবীতে আলো ঝরে, নদী বহে; তবু আমাদের ভিতরটা অন্ধকার, গতিহীন। একদিন স্পর্শ করবে সূর্য, এই ভেবে টেবিলে সাজিয়ে রাখি দীর্ঘশ্বাসগুলো। গহিন রাতে চমকে ওঠি- দেখে দীর্ঘশ্বাসের দামাইল।

আমাদের দীর্ঘশ্বাসগুল বনোয়া মশার মতো উড়ে উড়ে কামড়ায়; আর আমরা দশকের পর দশক – এভাবেই বেঁচে থাকি।


বিস্ময়বৃক্ষ

আর একদিন বসন্ত এলে পাহাড়ের বুকে আমরা মিলিত হলাম পর্বতচুড়ায়। আকাশের পবিত্র জ্যোৎস্না মেখে চারপাশে শুরু হলো ফুলের নাঙা উৎসব। ছোটেযাওয়া নক্ষত্রবৃন্তের কষ-ক্ষতে ল্যেপটে আমরা ঘুমিয়ে গেলে, রমণীদের হাতে হাতে অঙ্কিত হলো গাড় মেহেদীর আলপনা। বুকের ঘন সৌরভে কুয়াশার মতো ঢেকে গেলো পুরো পৃথিবী। আর আমাদের মিলনে জন্ম নিল সূর্য এবং সাগর। সময়ের হাত ধরে নাড়িকাটা উৎসবে বিচ্ছিন্ন হলো রাত আর দিন। চোখের ক্লান্তি ভোরের ডানায় উড়ে গেলে দেখি: সুনামির শেষ পৃষ্ঠার মতো চারদিকে পড়ে আছে-ছেঁড়াকাপড়, ছিন্ন-ভিন্ন বিছানা, চুড়ির টুকরো, ভাঙা আবেগপাত্র।

পাশ ফিরে তাকাই। দেখি, তুমি সেজদারত; ঈশ্বরের খোঁজে।


একটি অপেক্ষা

কথার উদ্দীপ্ত ঘর্ষণে উৎপন্ন শব্দে – বধির হয়ে আজ জন্ম নিলো যে শিশু; সে কি কোনোদিন শুনতে পাবে যুগল শালিকের প্রেমালাপ? সে কি কোনোদিন শুনতে পাবে কথার প্রজ্বলিত চুল্লিতে- মানবতার ব্যাকুল হাহাকার? সময়ের রুঢ় উত্তাপ মেখে আমি সেই দিনটির অপেক্ষায় বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে রব; যেই দিন এই শিশুটি বড় হবে হিমালয়ের মতো,আর মেঘের পায়ে সে বেঁধে দেবে বৃষ্টির নুপুর।


গৃহযাত্রা

জান্নাত থেকে নেমে এলো যে মাটির পুতুল
সে ভুলে গেলো ফিরে যাবার পথ
এখন, কোস্টায় বসে জীবনপেয়ালায়
পান করে হটচকলেটের বুদবুদ।

বহুযুগ কেটে গেলো ঘুমে
যে ঘুমের ভিতর ভাঙলো পর্বত, নূহার তান্নুর
ফেটেগেলো আকাশের বিশাল দুয়ার
সে এখন ভাসমান খড়ের মতো –
ঘুরপাক খায় কুইয়ারা জলকুণ্ডলীর ভিতর।
ক্ষত-বিক্ষত অদৃশ্য ভাবনা
ফ্রেমের মতো ঝুলে আছে দেয়ালে, দ্বিধান্বিত।
নিঃস্ব জীবন সীমান্তে-এখন চেয়ে থাকে মুখপানে
মায়ার পাঁজর ছিঁড়ে অবশেষে পরাজিত সৈনিক।

১০
আঁধারবাস

যেনো শকুনের ঠোঁট – ফুটো করে দিলো
সূর্যের বুক; আর কালো হয়ে গেলো পৃথিবী।
এখন অন্ধকার গুহায়
অন্ধ পরিদের সাথে আমার বাস।
আমি বন্ধ করে এসেছি পিছনের দরজা।

রাত গভীর হলে দরজায় নেমে আসে পাহারাদার
আমি তার হাতে তুলে দেই বহুযুগ পূর্বে থেকে জমানো পিতৃপুরুষের সঞ্চয়।

স্বজ্ঞানে সাজাতে থাকি আঁধার, আনন্দ-উৎসবে
হঠাৎ পায়ে গড়িয়ে আসে – পরিদের নিথর আরাধনা
কেঁপে ওঠে বুক, ভয়ে ভিতর থেকে নেমে আসে চিৎকার!

এ চিৎকার কেউ শুনতে পারেনি
ফিরে আসে আমার কাছে, জীর্ণ, শীর্ণ, ক্ষীণ হয়ে
আমি দৌড়াতে থাকি ভিতরে- অন্ধকারগুহার দিকে।

১১
জলের থিসিস

বুকের এই জায়গাটায় স্পর্শ কর না। এখানে পাথরের আগুন। যে আগুন নেমে এসেছে পাহাড়ের ধার থেকে। আমার সম্মুখে এখন কালারফুল সমুদ্র। তার ঢেউ থেকে বেরিয়ে আসছে ডলফিনের শিক্ষিত ঘাই। আমরা শিক্ষিত ডলফিন নই। আমরা মানুষ। স্বর্ণকেশি যে মেয়েটি ডলফিনকে শিক্ষিত করে তুলছে,তার পিচ্ছিলস্পর্শে এখন তারা কাঁপছে। ডলফিন আর মেয়েটি এখন পানির জন্য কাতরাচ্ছে। আসুন, এখন আমরা শামিয়ানা টাঙাই, আর জল নিয়ে একটি  রোমান্টিক থিসিস লিখি।

১২
পুড়া হাত

ধর্ষিতার চিৎকারগুলো মিলিয়ে গেলে ট্রাকেরডগায়; কিছুক্ষণ রোদে পুড়ি। আর মানবতার খোলস পরে ফিরি বাড়ি। ওয়াটস্আপে সেলফিগুলো আপলোড হতে হতে কুকার থেকে নেমে আসে একজোড়া পুড়া হাত। হাতগুলো এখন কিচেনের ল্যাবে, ডি এন এ টেস্ট হচ্ছে। রক্ত, ঝোল আর লবণ সনাক্ত হবে আজ।

১৩
অন্ধকারের শিকড়

প্রতিদিন ভোরে দেখা হয় তার সাথে। পায়ে হেঁটে পার হই রেললাইন। স্টেশনের পাশে পড়ে থাকা অকেজো-বগিটির কাছে, বোবার মতো কথাও হয়। মায়ের স্তনের শুকনোবোঁটা চুষতে চুষতে সে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। কখনও আধপুড়া ঘাসে শুয়ে থাকে; অনিচ্ছায় পান করে সূর্যরস। পাশেই, মা-লোহার হাতুড়ি দিয়ে ভাঙ্গে জীবনের দীর্ঘহাড্ডি।

বিকেলের ছাদ থেকে চুইয়ে চুইয়ে পড়ে হলদেরঙ; সে রং চেটে চেটে আমি ফিরি বাড়ি। আর আমার রাতের পাতে যখন, মাছের মাথার পাশে রাখি ভাতের দলা; সেখান থেকে সে বেরিয়ে আসে।

তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে, ফোঁটা ফোঁটা মসলামাখানো-ঝোল।

১৪
পাথরকাল

প্রিয়তমার সিঁথি ধরে
মৃত্যুরা হাঁটে কাস্তের দানায়।
আর রাত্রি হত্যা করে জন্ম নিলও যে ভোর
তার কান থেকে নিম্নশ্রেণির ছিনতাইকারি
কেড়ে নেয় সোনালীদোল।
লতি থেকে ঝরে পড়া ফোঁটা ফোঁটা প্রার্থনা
আমরা সন্ধ্যাউনুনে পোড়াই
আর মাগরিব শেষে
ঘামে মিশিয়ে ছাই; প্রিয়তমার কপালে
এঁটে দিই নিয়তির পোস্টার।

১৫
জেগে ওঠে আত্মা

আর বাদুড়ের ডানার ঝাপটায় নিভে যায় সূর্য। এবং কবুতরের কচি মাংসের মতো; যেনো মেয়েমানুষের ফুসফুস আর নিতম্বের মাংসে নেচে ওঠে খাবারের ব্যাকুল টেবিল। জেগে ওঠে ভিতরের রাক্ষুস, লালা ঝরে – টপ টপ…।

মাটির ঘ্রাণ মেখে আমি সংযত হই, পিতার মতো; ডানে বামে থুথু দিই আর সুরা এখলাস পড়ি তিনবার। আর টেবিল সাজাতে থাকি সবজির মতো কেটে কেটে – পিতার পুরুষালি মুখ, মায়ের হাতের কবজি- বোনের আঙ্গুল। আকাশ ছোঁয়ে নেমে আসে আমার আত্মা,গলায় ঝুলানো পুর্বপুরুষের কঙ্কাল।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E