৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
এপ্রি ১৬২০১৭
 
 ১৬/০৪/২০১৭  Posted by

অহ নওরোজ-এর কবিতাভাবনা :     

জেহনাসিব

প্রপাতের জলকণার সুরভী অন্যরকম- বহু আগে থেকেই সেটা আমি জানি।

বিশাল নদীর অনেক উপরে ভেসে থাকা মেঘের মতো সে রাতেও মেঘ ছিল আকাশে। জোসনার রুপালি রেখা মেঘ কেটে কেটে যে রাতে দূর পাহাড়ের কোন এক জনহীন ভৌতিক উপত্যাকায় কুহক চাঁদনীরাত রচনা করে সে রাত কি পাষাণফলক না হয়ে পারে!

নিরুৎসব জীবন আমার। পাহাড়ের গা ঘেঁষে চন্দ্রনীল হয়ে থাকে বিশাল উপত্যকা। কিন্তু সাধ্য কার, আলোর দাগে হাত রাখে? আমি ছুঁয়ে দেখতে পারিনা। দীর্ঘতম আলোকরেখা আরো বেড়ে যায়, তবু ছুঁয়ে দেখার সক্ষমতা থেকে যায় অধরায়।

এভাবে ঘর ভরে ছড়িয়ে থাকা অন্ধকার, ছায়ার মাঝে বেজে ওঠা শব্দরাত, অথবা সমুদ্র সুরভিত বালিহাঁস কিংবা আলোকিত হলঘরে বসন্তের রতিবিলাস রোদ চকচকে জলের মতো মান্ধাতা আমলের ভেদরেখা পেরিয়ে আমাকে ব্যথা দেয়। আমি টের পাই ব্যথাগুলো যাবতীয় প্রেমের মতো শুচি। ঘাসের ভেতরে ঘাস হয়ে জন্মানোর আকাঙ্খার মতো আনন্দ হয়ে ধরা দেয়। অতঃপর নিজেকে আবিষ্কার করি এক আলোবিদ্ধ ককপিটে। এরপর দেহের  গভীরে কোন এক প্রতিদেহে জন্ম নেয় স্বচ্ছ সুন্দর এক উজ্জ্বল প্রান্তর। যেখানে বৃক্ষেরা জীবিত, প্রাণীরা রহস্যময়। যার চারিধারে শুধুই ঝকঝকে কালো আবলুশের মতো প্রলম্বিত ছায়া।

তবু এই ছায়ার মাঝে শুন্য থেকে মহাশূন্যে, ইথার থেকে ইথারে, আলোতে, আঁধারে, কুয়াশামাখা হেলাঞ্চির প্রান্তরে, শিলা হয়ে খসে পড়া মেঘের মতো হাওয়াদের বুকে ভেসে তারার মতো অদৃশ্য হয়ে যাবার সুখ পাওয়া যায়। এভাবেই স্বরচিত শয্যায় সঙ্গীহীন হয়ে সহজেই আকাশ ভ্রমন করি কিংবা পিলসুজ হয়ে স্বপ্ন দেখি মেঘের দীঘিতে আলেয়ার। এভাবেই পাখিদের সমস্ত বিলাপ হয়ে ওঠে জোছনার গান।

এই গানকে মনে হয় নতুনের অনুভূতি, কোথাও একটা পৌঁছতে চাওয়া। স্বপ্ন কিংবা পেশার ভেতরে বেড়ে ওঠা উচ্ছ্বসিত হলুদ কিংবা মূল্যবান অন্ধকারে দুলে ওঠা আঁধার। এই গান তৃপ্তি, উপলব্ধি, এই গান ফিরে ফিরে আসা, চূড়ান্ত মুহূর্তের গল্প, অপূর্ণতার পূর্ণতা, রোমন্থন কিংবা আপাদমস্তক জোছনার রাতে মৃত্যু না হওয়ার সৌভাগ্য। এই গান শত বিপর্যয়ের পরও জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকা আলোর মতো বেপরোয়া, আশ্চর্যতম স্বচ্ছতার ভেতরেও যেখানে জন্ম নিতে পারে আত্মাদের প্রতিবিম্ব। এ যেন যতদূর ভাবা যায় ততদুর শরীরী হয়ে ওঠা আলেখ্য। কখনো সময়, কখনো দায়, কখনোবা জাম্বুরা ফুলের সম্ভাবনার মতো বেড়ে ওঠে সহসা। এ যেন সহজেই সঞ্চার করে আলো, বিস্তৃত করে আশা, বিম্বিত করে জীবনের সকল প্রতিধ্বনি, ভিন্ন ভিন্ন জীবনদর্শনের ভেতর রঙিন হয়ে ওঠে প্রতিটি সমুদ্র গোলাপের মতো।

এই গানই সকল অদৃশ্যের সৌভাগ্য।

অহ নওরোজ-এর কবিতা :


অথচ আমরা

জলের ভেতর বেড়ে ওঠা অন্ধকারের নাম
অজানায় রয়ে গেলো চিরদিন।
অথচ যখন জাফরান রৌদ্রালোক
ধীর হতে আরও ধীরে
গাড় হয় আরও,
আমরা পৃথক করি বিকেল-সন্ধ্যা।
অথবা পাহাড়ের ফাঁক গলে
রোদ নামলেই
নাম হয় ঊষা।

কিন্তু যখন
প্রবল জোছনায়; শশীদের জয়ে
আকাশ নীলিকার চমৎকার দাগ
ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত আকাশের গায়ে,
পাথরের গায়ে,
জলের গায়ে,
গাছেদের সব পাতায় পাতায়।
কিংবা যখন অচেনা অমাবস্যায়
পৃথিবী সরে যায়
জনপদ থেকে তিমিরে; নীহারিকায়
ক্ষুদ্র আলোয় গেঁথে গেঁথে
আকাশনকশী বানায় শুন্যের যত নক্ষত্র,
অস্তিত্বের খোলসে তারা যেন থেকে যায়
একই রাতের সংসারে,
নিঃস্ব জাতের মত অভিন্ন এক নামে।

(বস্তুত নিরাকার বাতাসে সকল জন্মশব্দের বিস্তৃতি
একই রকম
তবু জাদুবাস্তবতার খেলায় যতসব মাতামাতি)


আপাতকুমারী

অতঃপর নদীর ধারে
কিংবা চাঁদের রাতে
এই আমরা যারা প্রেম করি;
বারবার মরে যেতে থাকি।

আমরা মরে যাই
জলের উপর কেঁপে কেঁপে ছায়াফেলা
অদ্ভুত সব তাঁতমেঘ কিংবা
বর্গাকার শহরের চতুষ্কোণে।
আমরা মরে যেতে থাকি
শশীদের মিথ্যা বিশ্বাসে।

আমরা লুকিয়ে রাখা কান্না
কিংবা রক্তাভ হয়ে ওঠা লজ্জায়
অভ্যস্ত হয়ে যাই।

এই আমরা যারা প্রেম করি
নদীর বুকে চকচকে আলোর বদলে,
আলোয় বোনা রাতনগরের
ঝিলিমিলি ঝালর দেখি।
দেখি মরা আলেয়া
ও তার অন্তরীপে ভাসা মৌসুমিসূচ।

পাপড়িসকাল তাই রয়ে যায় অধরা।

তবু এই আমরাই
নতুন আশায় নিজেকে গুছিয়ে
উন্মুখ হয়ে বসে থাকি,
এ যেন সবকিছু হারাবার পরও
আপাতকুমারী।


প্রতিহত

একটা আলো ছড়ানো বারান্দায়
রোদের দাগ কিংবা পূর্বরাগ
এভাবে মুছে যাবে সহজেই,
আমি ভাবিনী।

আমি ভাবিনী, মধ্যগগনে আলোর অন্তরীপে
মিথ্যা বিশ্বাসের ছায়াপথে
সায়াহ্ন এসে যাবে।
আমি ভাবতেও পারিনী
বাঁশটিয়া, বাঁশরঙা টিয়া
দগ্ধ হয়েও ঢিমেতালে
নকশা করবে সবুজের।

কেন যে কাগুজে সম্পর্কেই
দ্রুবীভুত হয়ে হয়ে যাই রমণীর শরিরাধারে
জানা হয় না।
কুয়াশামুখী কিংবা আকাশমুখী যা-ই হোক
ঘোমটা বৃত্তের রহস্যেই
সম্পর্ক হয়তো থাকেনা।
তবুও সৌরভের গল্প ভাসে,
অতঃপর এই সৌরভ চমৎকারভাবে গেঁথে যায়
গলে যাওয়া সময়ের প্রতিটি খ-ে।


ভিন্ন আলেয়া

কবিদের এত অসুখের পরও
আবেগের রেহেলে ভেসে ভেসে
যারা ভেবেছিল নারী মানেই প্রেম,
নারী মানের ফাগুনের আকাশে
চমৎকার বসন্ত রোদ,
নারী মানেই বৃষ্টির শহরে
আকাশমুখী জলফানুস,
যারা ভেবেছিল নারীতেই প্রাপ্তি,
নারীতেই আবছা কুয়াশার গায়ে সৃষ্টির দাগ
স্টিমারের ফোকাস লাইটের মত
উজ্জ্বল হয়ে উঠে,
তারা আজ জানুক; জেনে নিক।

অমাবস্যার খিড়কি খুলে
যখন নক্ষত্ররা তাকায়,
অথবা মরুপরিখার বিশাল খাঁদে
যখন হাজার জোনাকি ওড়ে
কিংবা টঙদোকানের ঝাঁপিটার নিচে
হেলিয়ে আসে অমল রোদ,
তখন কি এই আলোড়নে
পর্যাপ্ত দ্রুবীভুত হওয়া যায়?
হতে হয়?
একটি মৃত্যু তো অসংখ্যবার আসতেই পারে।


প্রসূনের গান

নিভিয়ে দিলাম মোমের শিখা।
অতঃপর
মদের মতন আবহাওয়া,
মুক্তার মত রঙ; নরম আলো,
আর নিরব অন্ধকার আকাশ
আমায় ঘিরে ধরে।

হায় নিঃসঙ্গতা !
এক শহর লোকের মাঝে
আমি বড় একেলা।
ভাগ্যিস!
মায়া ছিল,
ছায়া ছিল,
প্রেম ছিল,
আনন্দ ছিল ফাল্গুনের।
রঙ আর সুরভী ছিল প্রসূনের।

আহা প্রসুন!
কারো জন্মরঙে চেরি ভেলভেট
কারো রক্তলাল সিল্ক,
কেওবা তুষার বনফুল।
যেন রকমারি উজ্জ্বলতায়  ভরা
প্রতিটি প্রসূন।

এদের রঙ
আমাকে বর্ণালী বিস্ময় ও
আগ্রহ দিয়েছে জীবনের।

এদের ঘ্রান
সুগন্ধির তসবীর দিয়েছে জ্যোৎস্নায়,
কিংবা সংজ্ঞাহীন আনন্দ দিয়েছে
বর্ষায়।

তাই সমস্ত নিঃসঙ্গতা যখন
নেমে এসেছে ধিরে,
আমার বক্ষের প্রতিটি নালি,
শরীরের প্রতিটি ঘ্রাণেন্দ্রিয়,
মস্তিষ্কের সকল নিউরনে
এদের গান বেজে চলে অবিরত।
আমি বেচে থাকি,
ভাল থাকি,
সুখে থাকি
এইসব প্রসূন সন্ধ্যায়।


মহাশ্বেতা নেই

বনের ধারে, জোছনার কাছে
কোন এক কুয়াশায়
তার সাথে দেখা না হলে
কখনই হয়তো জানতাম না
কথা থাকে চোখে, ঠোঁটে, ভুরুতে;
কথা থাকে ইনসমনিয়ায়।
হয়তো জানতাম না
আদরের ওম কেমন,
কেমন সে ও তার কথামালা।

তাজ্জব!
নারী মানেই নাকি
নাভির নিচে গভীর জলরাশি; সমুদ্রমন্থন,
নারী মানেই নাকি
রৌরবের তাব্রিজ শহর;
শতাব্দীর রেহেলে ভেসে থাকা অদ্ভুত সৌরভ।

কিন্তু আমি বলি
নারী মানেই টান,
মায়া;
নারী মানেই
রেটিনার ককপিটে অশরীরী মুদ্রণ।
নারী মানেই যেন সিল্কের কাজ করা নীল কুশন,
পাহাড়ের বুকে বেড়ে ওঠা হরিণীর মতন
আদিগন্ত প্রান্তর দেখায় শান্তি।
নারী মানেই যেন
রৌদ্রজ্জ্বল প্রসঙ্গে প্রলম্বিত ছায়া,
যার প্রকোষ্ঠে
আমরা এক রমণীয় শিশু।


মাতম

আলোফোঁটা রোদের দিনে রঙিন এই শহরে
গমস্ত দেহ যখন আদরে, অবসরে
শান্তির মত যখন সকল রহস্যের ওপারে
আলোড়িত হতে থাকে মধুর আবেশে,
কিংবা মহানীল রাতে সকল অন্ধকারের ভেতর
ঝকঝকে তারা যখন
শেফালীর মত নরম হয়ে ফোটে,
তখনো আমার মস্তিষ্কে আক্ষেপের সকল বিন্দু
হারের দানার মত এক হয়ে মালা গাঁথে দুঃখের।

হায়!
আমার দাঁতগুলো যদি হলুদ হয়ে যেত!
আমার নখ, লোমকূপের সকল রঙ যদি
হিংস্রপশুরঙে ধূসর হয়ে যেতো
আমি হয়তো শান্তি পেতাম;
শরীরে একরাশ মৃত্যু পুষে রেখে
তবু বোধহয় একটুখানি স্বস্তি পেতাম।

জন্তুর ভেতর বসে থেকে থেকে মানুষ হয়ে কি লাভ?


আপেলবীথি

দিনের পর দিন কাত হয়ে পড়ে থাকে মদের পিপে,টকটক গন্ধের ভেতর ডুডুক বাজুক কিংবা জয়নদ্বীপ জ্বলুক, কি এসে যায় !
কি খবর তাদের ?
এয়ারকন্ডিশনে যারা ঘুমায়।
আশ্চর্য সব প্রকোষ্ঠের মতো ঘরে মানুষ ঘুমায়; শহরে, নগরে, সমস্ত পৃথিবীতে। তারা যেন ভাবে নরকের গভীরে একটি মাত্র স্বর্গ; একটি মাত্র অনুরাগ।

আমার মেজাজ নষ্ট হয়।

ফুল অথবা অশ্রু, হাত অথবা হুর কখনো আলাদা থাকেনা। আলাদা থাকে শুধু
মানুষ এবং মানুষ।

………………………………………….
কবি পরিচিতি :

অহ নওরোজ

অহ নওরোজ

অহ নওরোজ ১২ই জুন তারিখে বাংলাদেশের ঝিনাইদহে জন্মগ্রহণ করেছেন। বেড়ে উঠেছেন যশোরের অভয়নগরে। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় বাস। লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। মূলত কবি, এছাড়া দুইবাংলার বিভিন্ন দৈনিকে বিভিন্ন বিষয়ের উপর নিয়মিত ফিচার লিখে থাকেন। এর মধ্যে শিল্প-সংস্কৃতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভ্রমণ, ধর্ম, সৃষ্টিতত্ব এবং সিনেমা উল্লেখযোগ্য। ‘নীল নৌকার নারী’ এবং ‘রোমন্থনের সনদ’ তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E