৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মে ১০২০১৭
 
 ১০/০৫/২০১৭  Posted by

আহমেদ শিপলু’র একগুচ্ছ কবিতা ও কিছু প্রশ্নোত্তর

১। কবিতা দিনদিন ছোট হয়ে আসছে কেন? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টি ও চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কারণ কী? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টির দম-দূর্বলতা-ই কি ছোট কবিতা বেশি বেশি লেখার কারণ? নাকি, ছোট কবিতা’র বিশেষ শক্তি এর অনিবার্যতা? কী সেই শক্তি?

উ: আসলে কবিতার দৈর্ঘ্য ছোট বড় নির্ভর করে বিষয়বস্তুর উপর। প্রকাশ ভঙ্গির উপর। কবিতাকে শিল্পিত ও নান্দনিক বাক ভঙ্গিমায় ত্রিমাতৃক অথবা বহুমাত্রিক  অর্থবোধক করে তুলতে হলে কবিতাকে দীর্ঘ করার প্রয়োজন পড়েনা। কাহিনী কাব্য বা গীতি কাব্য ভিন্ন বিষয়। সেটি কবিতার চেয়ে দুর্বল মাধ্যম। তাই কবিতার দম-দুর্বলতা দৈর্ঘের পরিমাপে নয়, প্রকাশভঙ্গীতে।

২। এক লাইনেও কবিতা হয়, আবার সহস্র চরণেও। আকারে-অবয়বে দীর্ঘ বা ছোট হলেই কি একটি কবিতা দীর্ঘ কবিতা বা ছোট কবিতা হয়? ছোট কবিতা ও দীর্ঘ কবিতার বিশেষত্ব কী?

উ: দৈর্ঘের ছোট বড় আপাতদৃষ্টিতে তা-ই। তবে ছোট কবিতায় প্রতীক, ইংগিত, চিত্রকল্প, রূপক, উপমা ইত্যাদি অলঙ্কার এবং শব্দগঠনে চমৎকারিত্ব থাকে। কিন্তু, দীর্ঘ কবিতায় এসবের উপস্থিতি বিরক্তি উৎপাদন করবে। পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটবে। দীর্ঘ কবিতা উপাখ্যান নির্ভর। ছোট কবিতা শিল্পমান নির্ভর।

৩। ক) ছোট কবিতা’র গঠন-কাঠামো কেমন হওয়া উচিত মনে করেন?

উ: এটা কবির উপর নির্ভর করে। ছন্দ অথবা প্যাটার্ন নিতান্তই কবির নিজস্বতা।

খ) ছোট কবিতা পাঠে পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায় কি?

উ: পূর্ণ তৃপ্তি বলে কিছু নেই। এ এক অপার ডুব সাঁতার। পাঠক যদি ভালো সাঁতারু হয়, বেশিদূর যাবে। যদি দুর্বল সাঁতারু হয় কম দূর যাবে।

গ) ছোট কবিতায় কি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া সম্ভব?

উ: কেন নয়? ‘বনলতা সেন’ কবিতায় কি নেই সে ব্যাঞ্জনা? তবে সব কবিতায় তা না-ই থাকতে পারে।

৪। ক) আপনার লেখালেখি ও পাঠে ছোট কবিতা কীভাবে চর্চিত হয়েছে?

উ: প্রতীক এবং উপমায় নতুন শব্দযৌগ সৃষ্টির মাধ্যমে বিষয়ের বহুরৈখিক ভাবনাকে সহজ ভাষায় প্রকাশ করা। কারণ, আমি বরাবর-ই কবিতায় অহেতুক দুর্বোধ্যতার বিপক্ষে। আমি সাধারণ পাঠকের জন্যেই কবিতা লিখি। কোন কবির জন্য বা পণ্ডিতের জন্য নয়। কবিতাকে আমি দার্শনিক হাতিয়ার হিসেবেও দেখি। তাই, মানুষের সমাজ বাস্তবতায়, রাজনীতি, রাষ্ট্র, ধর্ম, প্রেম, কাম, পাপ ও পুণ্য এ সবই দেখার চেষ্টা করেছি তৃতীয় নয়নে। মানুষ যা দেখতে পায় না দেখাতে চেষ্টা করেছি। যা শুনতে পায় না শোনাতে চেয়েছি। যা বুঝতে পারে না বোঝাতে চেয়েছি।

খ) আপনার একগুচ্ছ (৫-১০টি) ছোট কবিতা পড়তে চাই।


দৃশ্যের ওপারে

প্রত্যেক দৃশ্যের মধ্যেই দুটো ছবি থাকে। সকল ছবির পেছনেই থাকে দেয়ালের স্থিরতা। মাঝ সমুদ্রে ঝড়ের তাণ্ডব, উন্মত্ত ঢেউয়ের মাথায় দুলতে থাকে জাহাজ, নাবিকের চোখে তখন কোনো স্বপ্ন থাকে না। বাস্তবের ঘরে জেগে থাকা মানুষেরা অভ্যাসবশত স্বপ্নপ্রবণ।

সম্পর্কের দ্রাঘিমারেখা ধরে উড়ে যায় অবিশ্বাসের চিল। মধুরতম স্মৃতি গুলো ছোঁ মেরে তুলে নেয় অভ্যস্ত ঠোঁট। মানুষের শুকনো ঠোঁট লিপজেল ঢেকে দেয় চুম্বনতৃষ্ণা। গল্পের ভুলগুলো উড়ে যায় শূন্য ডিগ্রি ধরে- শাদা পৃষ্ঠার টুকরো টুকরো মেঘের মতো।

তারাজ্বলা রাত, আকাশের নিচে দুঃখের বার্বিকিউ। সংসার কামড়ে খায় মানুষের যৌবন! আশ্লেষে চেটেপুটে খায় বয়সের হাড়! পড়ে থাকে অ্যাসট্রে, জীবনের ছাই। চুলের শুভ্রতায় ঝুলে থাকে মৃত্যুর ঠিকানা।

১৭ ডিসেম্বর ২০১৬


চক্র

১.
ঝরনার উৎস দেখার কৌতূহলেÑদেখা হয় না সশব্দ জলপতন। প্রত্যাশিত মুখটি দেখার বাসনায় তার আসা যাওয়ার পথে পথ হাঁটলে লোকে তাকে প্রেম বলে। মানুষের পাড়ায় প্রেম নিষিদ্ধ বিষয়।

ক্লান্ত ডানায় রোদ্দুর মেখেÑআকাশের পথ পাড়ি দেয় ক্ষুধার্ত চিল। প্রেমহীন মানুষের ঘরে বেড়ালের ওম! বেড়ালেরা শান্তিপ্রিয়, এঁটো-কাঁটাখেকো, বড়জোর সুজোগ বুঝে- দুধের বাটিতে গোপন চুমুক…

২.
টুইন টাওয়ারে যাত্রীসমেত দুটো আস্ত বিমান ঢুকে গেলে! মরুমুখী লোকেরা প্রতিশোধের স্বাদ পায়! মিষ্টিমুখ করে! উল্লাসধ্বনি শোনা যায় ভিতর মহলে। ঘরের কোণে জেগে থাকে হলি আর্টিজান। পরলোকের মায়াঘোরবন্দি যুবকেরা রক্তের স্বাদ নেয় মরুবিদ্যার বশে।

বিজয় দিবসে শাহাবাগে ভিড় করা প্রেমিক-যুগল- জানে না দিবসের কারণ! রমনার সবুজ মাড়িয়ে অহেতুক মানুষের ঢল। পিরোজপুরে মুক্তিযোদ্ধার হাতে সম্মাননা তুলে দেয় রাজাকারপুত্র! লাইভ টেলিকাস্টে ঊর্ধমুখী টি আর পি রেট!

২১ ডিসেম্বর ২০১৬


চুম্বন-নিষিদ্ধ নগরের গল্প

১.
চোখের কুলুঙ্গিতে সাজিয়ে রেখেছি তোমার কণ্ঠস্বর, তুমি তা জানো না। তোমার অগোচরে আমি তুলে নিয়েছি তোমার পদচ্ছাপ। হাসি লুকোতে চাওয়া সলজ্জ চাহনি রেখে দিয়েছি গোপন অ্যালবামে। একটা গোটা মহাযুদ্ধ আড়াল করতে পারে এমন একটি দৃশ্য! তুমি তা জানবে না কোনদিন।

২.
একটি প্রেমময় চুম্বন, থামিয়ে দিতে পারে শত্রুর ছুঁড়ে দেয়া ঘৃণা! বদলে দিতে পারে সভ্যতার গতিপথ। অথচ চুম্বনে আমাদের ভয়! দ্বিধান্বিত মানুষেরা ঘর বাঁধে চুম্বন-নিষিদ্ধ নগরে। কেউ কেউ গোপনে টাকায় কিনে নেয় অপরিচিতার উষ্ণ আলিঙ্গন, নিষ্প্রতিভ ঠোঁট।

৩.
আমাদের আকাশজুড়ে হেঁয়ালি মেঘ। জাতিসংঘে জরুরি সভা, বিশ্বের উষ্ণতায় উদ্বেগ, ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণে নিষেধাজ্ঞা। মানুষের ঘরে শীতবৃক্ষের চাষবাস। সম্পর্কের অনৈতিকতাবোধে অবদমিত জৈবিক কোলাহল। যৌবন তাড়িত হয় জীবিকাব্যাস্ত নগরের দিকে। পেছনে পড়ে থাকে ভাতঘুম, আয়েশি বিছানা, উষ্ণ আলিঙ্গন, নিবিড় চাউনি।

২৫ ডিসেম্বর ২০১৬


প্রাচীন প্রেমিক

হরপ্পার জলতেষ্টা নিয়ে বসে থাকি, মহেঞ্জোদারোবাসি জানতো সে খবর। অবিরাম পথ হেঁটেছি বহুদিন, চোখের নিচে নিদ্রাহীনতার চিহ্ন এঁকে দেয়া রাতের সঙ্গী হয়ে। অতঃপর একদিন- সিন্ধুর বুক চিরে ছুটে যাওয়া জলের পদচ্ছাপ ধরে চলে গেছি বেহুলার দেশে।

তখনো ইনকায় সূর্য ওঠে, পাথরে খোদাই করে নিপুণ শিল্পী। ঢালু পাহাড়ের কোল ঘেঁষে পাথুরে নগর। প্রেমিকার গাল বেয়ে নেমে যায় বিকেলের রোদ। ঝরনা জলের স্বচ্ছতায় তাকিয়ে থাকে প্রেমিক চোখ। চন্দ্রালোকিত পাহাড়ি পথে আমিও হেঁটেছিলাম গোপন অভিসারে।

মেক্সিকোর জঙ্গলে মায়ান পুরুষ শিকারের চোখে চোখ রেখে ছুঁড়েছিলো বল্লম! নির্দয় নৈপুণ্যে পশুবধের সময় ভয়ার্ত বুজে আসা আমার দু’চোখজুড়ে লোনাজল দেখেনি কেউ! জঙ্গলের পথ ছেড়ে গোপন অভিমানে নেমে গেছি নদীর নীলে! কোন এক মায়ান রমণী জানে সেই কথা।

তুমি জানবে কি কোনোদিন? আজো আছি আমি এই পৃথিবীতে। তোমাদের সংসারী ব্যস্ততার ভিড়ে আমাকে পাবে না কোনদিন। আমি আছি বিকেলের নরম রোদ্দুরের মাঠে, ভোরের অস্পষ্টতায় ক্ষেতের আল ধরে হেঁটে যাওয়া দুরন্ত কিশোর। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির ছুঁয়ে দেয়া উদাসী যুবক, এখনো খুঁজে ফেরে ভোলগার তটে হারানো কিশোরীর কোমল চাহনি, প্রেমময় স্পর্শ! আলিঙ্গনের শিহরণ…

৩০ ডিসেম্বর ২০১৬


দেখি রাজপথ, দেখি মরুঝড়

বৎসর যাপনের হল্লায় ঢাকা পড়ে বয়সের ক্লান্তি। আবার সেই কাজ, ব্যস্ততায় অভ্যস্ত জীবন। নদীর পারে ফেলে আসা সূর্যাস্তের বিকেল, উঁকি দেয় ডেস্ক ক্যালেন্ডারে। মনের কোণে পাতা ঝরার বিষণ্ণতা, চোখের পাতায় ক্লান্তির ঘুম।

একজন বৃদ্ধ ভারি চশমার ওপাশ থেকে ক্রমশ ঝাপসা হতে থাকা পৃথিবীকে দেখে স্থির নয়নে। একটা দুরন্ত মাছ শূন্যে লাফ দিয়ে দেখে নেয় মানুষের পৃথিবী। আমার চার বছরের কন্যা রোদসী, অজস্র প্রশ্নের কৌতূহল নিয়ে বেড়ে উঠছে চোখের সামনে। আর আমি দেখি আমার চারপাশে প্রশ্নের নিষিদ্ধতায় মোড়ানো প্রাচীন অন্ধকার। নিয়মের নেকাব গ্রাস করছে কিশোরীর চঞ্চলতা! কালো হাত মোজায় ঢেকে যাচ্ছে শৈশবের দুরন্তপনা!

সারসের দীর্ঘ ঠোঁটে ধরা পড়া ছোট্ট পুঁটিমাছের অস্থিরতায় এই সভ্যতার কিছু যায় আসে না! মানুষ রসনার তালিকাতেও রাখে নির্মম বাসনা। একুশ শতকের রাজপথে টাঙাওয়ালার মরুযাত্রা! সিলেবাসজুড়ে মরুঝড়! মরুধুলোর তাণ্ডবে ঢেকে যায় রবীন্দ্রনাথ, বেগম রোকেয়া, নজরুল, হুমায়ুন
আজাদ…

পরিযায়ী পাখিদের সাথে আমাদের শীতকালীন চড়ুইভাতি জমজমাট! আজিজ মার্কেটে দেখি বিষণ্ণ বদনে একা একজন আবুল কাশেম ফজলুল হক।

১ জানুয়ারি ২০১৭


যখন ঈশ্বরের কোন ঘর ছিলো না

সদ্য আগুন জ্বালাতে শেখা মানুষেরা তখন রাতের অন্ধকার আর হিংস্র পশু তাড়াতে তাড়াতে পোড়া মাংসের স্বাদ নিতে শিখেছিলো।

গাছের বাকল ছেড়ে পরেছিলো পাতার পোশাক। স¤পর্কহীন সঙ্গমে কোনো পাপ ছিলো কিনা, তা না জেনেই আদি মানব-মানবীগণ বেঁধেছিলো ঘর।

লোকাচারে গড়ে ওঠা সমাজে কোন মন্দির গড়ে তোলার আগে ইশ্বরের কোন ঠিকানা জানতো না কেউ। সংবিধানবিহীন, রাষ্ট্রবিহীন পৃথিবীজুড়ে মানুষের চলাচল শুধু খাদ্যের উপাসনায়।

একটা আহত হরিণ সমবণ্টনে ক্ষুধা নিবারণই অলিখিত নিয়ম। গোত্রপতির নির্দেশিত পথেই তাদের খাদ্যযাত্রা। প্রকৃতির সকল উৎসই ঈশ্বরসম। ভয় ব্যবসা তখনো শেখেনি মানুষ।

তখনো ঈশ্বর গৃহহীন, ঈশ্বর বন্দনায় লেখা হয়নি কোন পদ্য। প্রকৃতির অস্থিরতায় গুহাবাসী মানুষ তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে। আস্থাহীন চোখ খুঁজেছিলো আশ্রয়। সূর্যের দিকে তাকিয়ে, জ্বলজ্বলে তারার দিকে তাকিয়ে তাদের অনন্ত অনুসন্ধান।

৬ ফেব্র“য়ারি ২০১৭


ফেসবুক জীবন

১.
পেন্সিলের পশ্চাতে থাকা ইরেজারÑআনমনা কামড়ে বিক্ষত! ধারালো ব্লেডে সুচালো পেন্সিল। উইন্সন পেন এর নীল কালিতে ভেজা বুকপকেটের কোণ, ক্যালেন্ডারের পাতায় মোড়ানো পাঠ্যবই আর চারআনার চালতার আচারে জিভের জল। উড়ু উড়ু কৈশোর! দুরন্ত শৈশব! অম্লান সুখ!

২.
ফেসবুকে বয়ে যায় জীবনের স্রোত। ঝলমলে হাই রেজুলেশন দৃশ্যে সুখময় সেলফি! কারো উদাসী প্রোফাইল ছবি। স্ট্যাটাসজুড়ে মানুষের বেদনার ভাড়ার! কত শত পাওয়া না পাওয়ায় হাহাকার! কতশত গল্প! দিবসের ডামাডোলে ভেসে যায় মানুষের নৈঃসঙ্গ। টাইমলাইনজুড়ে রঙের বাহার! সুখী মানুষের ঢল! এইসবে ঘুচে গেছে একা হওয়ার বাসনা।

৩.
তার সাথে দেখা হয় প্রতিদিন, মহান জুকারবার্গের জাদুকরি মোহনায় ঘুরপাক! ম্যাসেঞ্জারে গোপন-ডুবসাঁতার! আমাদের অজান্তেই প্রতিদিন যোগ হয় মিউচুয়াল বন্ধু! আদৌ কোনোদিন বন্ধু ছিলাম কি? এই সংশয় প্রশ্ন রয়ে যায় উত্তরহীন। বন্ধু উপচে পড়া আইডিতে কেবল বেড়ে যায় ফলোয়ার।

৪.
রমনার সেই নিভৃত বেঞ্চে বসা হয় না কতকাল! কতদিন একা একা হাঁটি না সেই ভীষণ একলা পথে।

১৪ ফেব্র“য়ারি ২০১৭


পতাকা

পতাকা হাতে দৌড়াচ্ছ তুমি
উল্লাস করছো তুমি
হে তরুণ!
টিশার্টের বুকে লাল সবুজ এঁকে
মিছিলে হেঁটে যাওয়া যুবক
সবুজ জমিনে লাল পেড়ে শাড়ি পরিহিতা চঞ্চল যুবতি
তুমি কি দেখো ওই সবুজে
ওই লাল বৃত্তের ভেতর
হাজার বছর সংগ্রামের ইতিহাস!
রক্তাক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ।
দেখতে কি পাও?

গাঢ় সবুজের মাঝে রক্তিম বৃত্ত
কখনো টগবগে লাল সূর্য
কখনো তাজা তরুণের রক্তের ছোপ!
ধর্ষিতার কাতর চিৎকার!
এখানেই রয়েছে বায়ান্নো
একাত্তর
মার্চ এর কালরাত!
বিজয়ের ডিসেম্বর!
রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি!
তাকালেই দেখা যায় বিশাল গণমিছিলের ঢেউ
কারফিউ ভেদ করে আছড়ে পড়েছে  রাজপথে।

ওই লাল বৃত্তের দিকে তাকালেই দেখা যায়–
উত্তাল উনসত্তর!
আগরতলা ষড়যন্ত্র!
মাওলানা ভাসানি,
বঙ্গবন্ধু!
তর্জনী উঁচানো সাত-ই মার্চ!
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম!
এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম!
ওই সবুজের মাঝেই রয়েছে মুজিব নগর
তাজউদ্দীন
আর ত্রিশ লাখ শহিদের বুকে গজিয়ে ওঠা
ঘাসের ঠিকানা।

বাঙালির মুক্তি আর মুক্তচিন্তার ঠিকানা ছিলো
যেই লালসবুজের খামে!
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিজয়ের সনদ ছিলো
যেই রক্তাক্ত চিঠিতে।
অশুভ পঁচাত্তর!
পঙ্কিল আগস্ট!
কেড়ে নিয়েছিলো সেই খাম!
ছিঁড়ে ফেলেছিলো সেই চিঠি!
প্রতারক বুলেটে ঝাঁজরা হয়েছিলো
শান্তির ডাকপিয়ন!

পতাকা হাতে দৌড়াচ্ছ তুমি
উল্লাস করছো তুমি,
হে তরুণ!
টিশার্টের বুকে লাল সবুজ এঁকে
মিছিলে হেঁটে যাওয়া যুবক
সবুজ শাড়িতে লাল পাড় পরিহিতা চঞ্চল যুবতি
তুমি কি দেখো ওই সবুজে
ওই লাল বৃত্তের ভেতর
হাজার বছর সংগ্রামের ইতিহাস!
রক্তাক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ।
দেখতে কি পাও?

১৭ ফেব্র“য়ারি ২০১৭


বায়স্কোপ

ধনুকের মতো বাঁকানো দেহ। কৌতূহলী কিশোরের সম্মোহিত চোখ, স্থির রহস্যবাকশের ভিতরে। লালবাগ কেল্লা থেকে তাজমহল, কত অজানা উপাখ্যান। খঞ্জনির তালে হেলে দুলে একটানা বলে যেতেন বয়সী বায়স্কোপওয়ালা।

অ্যান্ড্রয়েড যুগে আঙুলের ¯পর্শে পাওয়া যায় মাধুরী কিংবা ম্যাডোনা। প্রেমিকার হাসি, স্মৃতিময় টাইমলাইনে প্রিয়মুখ, প্রিয় সংগীত-সিনেমা, বন্ধু, স্বজন চেনা বা অচেনা। সোজা ঢুকে পড়া যায় কারো বেডরুমে, বারান্দায়, ব্যক্তিগত অ্যালবামে।

জীবনের মাঠে শুয়ে থাকে লুকানো কথামালা। নিষিদ্ধের দেয়ালে গোপন উঁকিঝুঁকি। লেখ্য ভাষায় অহেতুক কথা কপচানো। সময়ের নিদারুণ অপচয়!

ঢেঁকিতে পা রাখা চঞ্চল কিশোরীর চোখে যে রঙ খেলা করে, তার দেখা পায় না বয়সী বধু। বায়স্কোপে রাখা কিশোরের কৌতূহলী চোখ আজীবন খুঁজে ফেরে প্রেমময় চাহনি, গরদের মসৃণ স্পর্শের মত প্রেমিকার হাত।

২২ মার্চ ২০১৭

১০
চাষার গল্প

দুপুর ঘুমিয়ে গেলে ছায়ারা দীর্ঘ হতে থাকে। দিগন্তজুড়ে ছোপ ছোপ সুখÑমেঘের কার্নিশে পা দুলিয়ে হাসে। সুনসান সড়ক, ফসলি জমিন, পোয়াতি স্বপ্ন ঘিরে গৃহস্থের দিন যাপন।

ছায়ার দৈর্ঘ্য দেখে বেলা মাপে কৃষক। ক্ষেতের আলে বসে জিরনো প্রহরে বাতাসের স্পর্শে টের পায় ঋতুর আগমনী বার্তা। খরা-বন্যা, ঝড়-বৃষ্টি অথবা পূর্ণিমা-অমাবস্যার হিসাব মেলাতেই ঘুরে আসে বৎসর।

ধর্ম অবমাননার দায়ে একজন কবির মৃত্যুদণ্ড! সে খবর না জানায় কিছু যায় আসে না তার। আÍঘাতী বিস্ফোরণে মধ্যপ্রাচ্যে একশ চল্লিশ জন নিহতের ঘটনায়, হামলাকারী এবং নিহতদের স্রষ্টা একজনই কি-না তা নিয়েও নেই কোনো প্রশ্ন।

তাঁর সংশয়জুড়ে শিলাবৃষ্টি, কালবৈশাখী, পোকা নিধন। তাঁর স্বপ্নজুড়ে পোয়াতি মাঠ। ঘরে তোলার অপেক্ষায় শস্যের ঘ্রাণ! বেনারসি জড়ানো পুত্রবধূ।

২৪ মার্চ ২০১৭

————————–
পরিচিতি

আহমেদ শিপলু

আহমেদ শিপলু

আহমেদ শিপলু
পিতা: জাহাঙ্গীর আলম খান
মাতা: সুফিয়া বেগম
জন্ম: ১৭ জুন ১৯৭৬, শ্রীনগর, মুন্সীগঞ্জ।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : বসন্তের অপেক্ষায় (১৯৯৯), কোথাও তুমি নেই (২০০১), ক্রাচে ভর দেয়া যৌবন (২০০৫), মন পাখিটার ডানা কাটা উড়তে মানা (২০০৯), নির্বাচিত কবিতা (২০১৩), বালিকার আকাশ (২০১৫), প্রজাপতিরা ফিরে গিয়েছিলো (২০১৭)।
প্রকাশিতব্য : কাব্যকল্প (আবৃত্তির ক্লাসের জন্য সম্পাদিত গ্রন্থ)।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E