৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মে ২৭২০১৭
 
 ২৭/০৫/২০১৭  Posted by

আড্ডার খোঁজে
– জিললুর রহমান

বদলির আদেশটা হাতে আসা মাত্রই ব্যাপারটাকে ভাগ্যের বিপর্যয় বলে ধরে নিলাম। তার সাথে অবশ্য প্রমোশনের তৃপ্তিও রয়েছে। আমাকে রওনা হতে হলো সিলেট অভিমুখে-পেশাগত কারণে। সিলেট দেখলেই  মনে হতেদ থাকে-এ নিছক স্মৃতি আর স্বপ্নের পাখার ভর করে চলেছে। ডানে তাকাও মাজার, বামে মাজার, উপরে টিলার গায়েও হেলাল দিয়ে শুয়ে থাকে মাজার। স্বপ্নের মশারি জালে রঙিন আর গোলাপ জলের ঘ্রাণে মশগুল এক অতিন্দ্রীয় অনুভূতি। যে জায়গায়  থাকার ঠিকানা হলো তার নাম কাজলশাহ্, তাও এক মাজারের নামে। পাশে মধুশহীদ। কী সুন্দর সুন্দর নাম। সবচেয়ে বিচিত্র হলো জিন্দাবাজার। মৃত জিন্দাপীরের নামে যার নাম। বহুকাল পরে আবার কাগজ কলম নিয় বসলাম।

এসে, সুফি দরবেশের দেশে, ভালোবেসে
অলিতে গলিতে ঘুরি মুর্দা কী জিন্দা বাজারে
তোমার মুখশ্রী প্রিয় কল্পনায় এঁকেছি আপন ধারণায়
হাজার পক্ষীর ডানা উড়িয়েছে কপোত কপোতী।
স্বপ্নের মশারি টানা স্মৃতির অলিন্দ ঘিরে
বাবা শা’জালাল শা’পরাণ
আপন গরিমা ঘেরা কাজলশা’ মধুশহীদের নাম
তোমার রোশনাই দিক অযথা ছড়িয়ে…..
আঁতুরের খোঁড়া পায়ে ছুঁড়ে দেয়া আধুলি দু’খানি
আমাকে বেঁফাম দোয়া দরুদের হাতছানি দেয়া
তোমার ভ্রুকুটি রেখা বেমালুম করুক এখুনি।
হঠাৎ নাজিল হয়ে দুই পংক্তি কবিতা আমার
শাপলা ভাসিয়ে নাও, প্রসারিত ছন্দের নহর।
রেলগাড়ী থেমেছিলো একদিন আমার উঠোনে
বৃষ্টিধারা নেমেছিলো তোমার চিবুক জুড়ে
তামাটে বর্ণের গায় রুপালি স্বেদের বিন্দু
বিসর্গ নিসর্গ ভেঙ্গে ডেকেছে কি ব্যাঙের কেত্তন“
মধুশহীদের নামে এসো তবে জানাই মানত
আমার স্মৃতিরা পাবে স্বপ্নীল সৌরভ
নগরীর দ্রুতগামী গাড়ি
আমাকে তুলুক টেনে অন্যলোকে অন্য কোনোখানে
ধুকেধুকে ফিরে যাক ঘোরলাগা স্মৃতির শহর।

(স্মৃতির শহর / শাদা অন্ধকার)

যখন ভাগ্যকে অভিসম্পাত দিতে দিতে সিলেটের অলিতে গলিতে ঘুরছি আর ভাবছি, ফের কবে ফিরতে পারবো চট্টগাম। আমার চট্টগ্রাম। ঠিক তখন জিন্দাবাজারের কেন্দ্রে দেখি ‘বইপত্র’-একটি বইঘর। ঠিক যেমনটি ছিলো চট্টগ্রামের ‘কথাকলি’, যেমনটি ঢাকার ‘পাঠক সমাবেশ’, ‘বইপত্র’ তেমনি এক পুস্তকালয়, যা সাহিত্য পিপাসু একজন পাঠকের হৃদয় সহসা জয় করতে পারে। ঘুরলাম ‘বইপত্র’-এর ভেতরে। মনটা ভরে উঠলো।   অন্ততঃ সময় কাটানোর একটা জায়গা তো মিললো! ঘুরতে ঘুরতে আরও দুয়েকবার গিয়েছি সেখানে, অন্য কোনদিন অন্য সময়ে।

একদিন মনে হলো খোঁজ নিই পুরনো বন্ধু লিয়াকত শাহ্ ফরিদীর খবর এরা রাখে কি না। ফরিদীর সাথে পরিচয় চট্টগ্রামে ‘‘সবুজ হোটেল’’ আড্ডায়। অনেকের মতো ফরিদী কিন্তু পান করতো না বরং পান চিবাতো সারাক্ষণ। কবি হাফিজ রশিদ খানের সাথে তাই তার সখ্য খুব। আড্ডার পাট চুকিয়ে সবাই যখন বাড়ি ফিরতাম, এই দুই মানিক জোড় ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতো গুলজার সিনেমা মোড়ে একটি বিশেষ পানদোকানের দিকে। মুখ পুরে পান নিয়ে কতো কথার বুনন ছড়িয়ে অবশেষে বাড়ি ফিরতো তারা। আমিও সঙ্গী হয়েছি তাদের, কখনো সখনো। ফরিদী বাংলার ছাত্র ছিলো। কবিতাও লিখতো। বহুদিন যোগযোগ নেই। আমাকে কি তার মনে আছে ? শুনেছি সে এখন ঝানু সাংবাদিক-ব্যুরো চিফ।

নম্রস্বরে জিজ্ঞেস করলাম ‘বইপত্র’ এর দোকানিকে

-আপনার কাছে লিয়াকত শাহ্ ফরিদীর কোন ফোন নম্বর বা ঠিকানা আছে কি ? আমি চট্টগ্রাম থেকে এসেছি।

দোকানি এস্ত তার মোবাইল-এর ফোন বুক ঘেঁটে বললেন-‘নেই’। তবে তিনি অন্য কোথাও ফোন করে যোগাড় করে দিলেন একটি মোবাইল নম্বর যাতে ফরিদীর কন্ঠ পাওয়া যাবে। অনেকক্ষণ দ্বিধাগ্রস্ততায় কাটিয়ে শেষে ফোনটা করলাম। পরিচয় দিলাম-

-ফরিদী ভাই চিনতে পারবেন আমাকে ? আমি জিললুর। চট্টগ্রাম থেকে এসেছি।-ডাক্তার কেমন আছো ?

শুনে সমস্ত দ্বিধা এক লহমায় কেটে গেলো। তারপর কতো কথা। জানালাম কীভাবে তার নম্বর পেয়েছি। ফরিদী জানালেন তিনি গ্রামের বাড়ি আছেন, পরদিন আমার সাথে সাক্ষাৎ হবে। আর বললেন,-বইপত্রে তো দীন আছে, তার সাথে কথা হয় নি ?

মোস্তাক আহমাদ দীন-এই নামটি যখন আমি প্রথম জেনেছি তখন তিরানব্বই কী চুরানব্বই সাল। ‘লিরিক’-এ ছাপানোর জন্য কয়েকটি কবিতা পাঠিয়েছিলো। মনে পড়ে সম্পাদনা পরিষদের সভায় আমি বলেছিলাম-কী চমৎকার কবিতা, আমার যা লিখার জন্য এত কথা বলছি, এত চেষ্টা চালাচ্ছি সুনামগঞ্জের এই তরুণ তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার কবিতায় বুনন করেছে। সেই দিন থেকে মোস্তাক আহমাদ দীন তরুণদের মধ্যে আমার প্রিয় কবিদের একজন। পরে সম্ভবত ‘৯৫-এ এর মাঝামাঝি সময়ে একদিন দীন চট্টগ্রাম এসেছিলো। অল্প কিছু আড্ডাও হয়েছে তার সাথে সবুজ হোটেলে। তারপর দীর্ঘ ৯/১০ বছর আমি তার অনেক কবিতা পড়েছি আর মুগ্ধ হয়েছি কিন্তু বেমালুম ভুলে গিয়েছি তার চেহারা আদল।

ফিরে এলাম বইপত্রে ফরিদীর সাথে আলাপের পর। দোকানি প্রশ্ন করলেন –

-ফরিদী ভাইকে পান নি ?

-হ্যাঁ পেয়েছি। ইয়ে আচ্ছা, এখানে মোস্তাক আহমাদ দীন কে ?

-আমি মোস্তাক।

-আমি জিললুর।

-ভাই আপনি আগে পরিচয় দেবেন না ? আমি তো ভেবেছি ওনার ভার্সিটির বন্ধু কেউ হবেন।

এভাবেই পুনঃআলাপ শুরু। একটু পর সন্ধ্যাবাতি জ্বললো দোকানে। দীর্ঘ দেহী এক লোক প্রবেশ করলেন। পরিচয় হলো হান্নান ভাইয়ের সাথে। অনেকের প্রিয় এই হান্নান ভাইয়ের কাব্যিক নাম শুভেন্দু ইমাম। কবি শুভেন্দু ইমাম আর দীন মিলে বইপত্র চালান। এলো পেঁয়াজু-গরম গরম, এলো চা, আড্ডা জমে উঠলো। বাইরে ফিন ফিনে বৃষ্টি আর হালকা বাতাস লিটল ম্যাগাজিনের পৃষ্ঠাগুলো উল্টে-পাল্টে দিলো। আমার চোখে নতুন কবিতার ঝাপটা এসে লাগলো। আমি ফের কবি হয়ে উঠলাম। বগল দাবা করে নিলাম অনেক লিটল ম্যাগাজিন আর হৃদয়ে তরতাজা নতুন আড্ডার ফুরফুরে মেজাজ। কে বললো সিলেটে তেমন কোন আড্ডা নেই। কবিরা এখানে আড্ডা জমায় না! এরপর থেকে প্রায়ই ছুটে যাই বইপত্রে। একদিন দেখা হলো কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার-এর সাথে। শুভেন্দু পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমি তো কতোবার তাকে চিনেছি কবিতায়। দেখলাম, তিনিও আমাকে চিনতে পেরেছেন ‘লিরিক’-এর জিললুর বলার সাথে সাথেই। ‘লিরিক’ যে পাঠক লেখক কবিদের কাছে এত প্রিয় তা হয়তো আমি সিলেট না এলে এভাবে বুঝতে পারতাম না। ‘লিরিক’-এর পেছনে যে অক্লান্ত শ্রম ও প্রচুর সময় একদিন আমরা ক’জন তরুণ ব্যয় করেছি তার প্রভাব যে বহুদূরে গিয়ে পৌঁছেছে তা আরও পরে জেনেছি তরুণ থেকে তরুণতর কবিদের সাথে পরিচয় হওয়ার ফলে। সুদূর সুনামগঞ্জে বসে অতিক্রান্ত কৈশোরের কবি সৈয়দ আফসার লিরিক পড়েছেন – এমন-এমন আরও কথা ধীরে ধীরে জানতে পারি। যাই হোক, ফিরে আসি আড্ডায়।

কিশওয়ার দীর্ঘদিন সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগে এখনো চিকিৎসাধীন আছেন। তিনি তার স্বপ্নময় অনুভূতিগুলোর কথা বলেন আড্ডায়-মনে হলো, এ আরেক জগত-সুস্থ লোক যার ঠিকানা জানে না। আমারও খুব লোভ হয় সিজোফ্রেনিক হতে। কারণ, কবিতার জন্য দৃশ্যকল্প চিত্রকল্প এসব ভেবে বের করতে হয় না তাকে। এসব তার চারপাশে হুড়মুড় করে দুদ্দার বেগে আসে। প্রায় সন্ধ্যাতেই আমি এখানে আড্ডা দিতে আসি, আর নিয়ে যাই নতুন স্বপ্ন, নতুন সম্ভাবনা।

কিশওয়ার বর্তমানে কিছুটা ধার্মিক, কিছু ডানপন্থী চিন্তার সাথে সংশ্লিষ্ট। তিনি নাকি হামদ-নাতও লিখেন। একদিন কিশওয়ার তর্ক করার ভঙ্গিতে বললেন ‘কবিতা আল্লার দান’। আমি তর্ক এড়ানোর ভঙ্গিতে উত্তর দিলাম-‘আমিও স্বীকার করি কবিতা নাজিল হয়। তবে কবির সাথে নবীর তফাৎ হচ্ছে-কবি তার এই কবিতা পরিমার্জন করতে পারেন, নবীর পরিমার্জনের স্বাধীনতা নেই’। কিশওয়ার তর্ক বাড়াতে পারেন না। তবে আড্ডা এগিয়ে চলে হরেক রকম নানান কথায়।

বন্ধু ফরিদীর ‘সমকাল’ অফিসে গেলাম একদিন। পরিচয় হলো কয়েকজন তরুণের সাথে। তাদের মধ্যে ইমরান শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও রিপোর্টার, আবার ফিল্ম সোসাইটির সংগঠকও। মুহূর্তে আপন করে নেওয়ার মতো তরুণ। বন্ধুত্ব হয়ে গেল সহসা। ইমরানের মাধ্যমে আর একদিন পরিচয় হয় তরুণতম কবিদের একজন সবুজ আরেফিন এর সাথে, চোখের তারায় যেন সম্ভাবনার অদ্ভুত উজ্জ্বলতা খেলা করে। সবচেয়ে ভালো লাগলো যখন শুনলাম-এরা আমাদের ‘লিরিক’-এর ভক্ত। এরা কেউ শুনেছে, কেউ জেনেছে। কেউ-বা-পড়েছে ‘লিরিক’। লিরিকের উত্তর আধুনিক কবিতা সংখ্যাগুলো তাদের চিন্তায়ও যুগিয়েছে কবিতার খোরাক। সবুজ উপহার দিলো তাদের পত্রিকা ‘ডাক’। ইমরানের কাছ থেকে পেলাম ‘প্রক্ষেপণ’। তরুণ লেখকের লেখায় যে স্বতঃস্ফূর্ততা, যে প্রাণময়তা তা আমাকে দীর্ঘদিন পরে আবার যেন কৈশোর পেরুনো তরুণ করে তুললো-ফের লিখতে বসলাম কবিতা। ইমরানের অনূদিত ইরানী চলচ্চিত্র ‘The Wind Will Carry Us’-এর বর্ণনা পড়তে পড়তে আমি ভেসে যেতে চাইলাম সময়ের অনন্ত স্রোতে-

আমাকে ভাসিয়ে নাও সময়ের স্রোত
অনাগত শিখার আগুন হোক সবার প্রতীতি।
বিমূর্ত চিত্রের পাশে দাঁড়িয়েছো
জয়নুলের ক্যানভাস ছেঁড়া হাভাতে কিশোরী
সময যৌবন লতায় বিদ্ধ তোমার ভৈরবী।
দালির ঘড়িতে যদি কালের বারোটা বাজে
প্রভাতের কতো দেরী শবরী বালিকা জানে খুব!
নিধুবনে নৃত্যপটু ময়ূরীর মায়াবী পেখম
বর্ষার আভাসে আজ রঙধনু আঁকবে সরবে
চিত্রকলা ভেদ করে জাগরুক সুলতানী পেশল পুরুষ …
ভাসতে ভাসতে জাগলো লখিন্দর
সত্যবানও প্রাণ প্রায়-সাবিত্রির দারুণ সহনে
অনাগত শিখার আগুন আজ তোমার প্রতীতি
আমাকে ভাসাও কাল-সময়ের স্রোত।

(ভাসান / শাদা অন্ধকার)

সত্যিই তো সময় এক সঞ্জীবনী যেন। মানুষের অনন্ত সম্ভাবনা সময়ের সাথে একদিন ঠিকই বেরিয়ে আসে। একদিনের দুঃখ হতাশা ক্লেদ ক্লান্তি, পরবর্তী একদিন ম্লান হয়ে যায়। এই প্রতীতি-ই তো সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়, নিযে এসেছে এতদূর। কিন্তু খুব শীঘ্রই আমি অধীর অধৈর্য হয়ে পড়ি। কালের দোহাই টেনে হাত পা ছেড়ে বসে থাকবো, আর অনাগত শিখার ঔজ্জ্বল্য আপনি এসে ধরা দেবে এমন ভাবনা আমাকে বেশিক্ষণ তাড়িত করে না। মনটা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। আমি অত সইতে পারি না।

ঝিনুক সইতে পারে আমি তো সইবো না।
মনসা ছোবল তুমি দিও না এ দুর্দৈবের দেশে
আমি তো বেহুলা নই, ভেলা ভেসে গাঙ পাড়ি দেবো
সাবিত্রীও নই আমি, হানা দেবো যমরাজপুরী।
সাফেন ভাতের গন্ধে আমি তো আকুল
পাখির কাকলি শুনে দিনের দু’বেলা করি পার।
ঝিনুক সইতে পারে আমি তো সইবো না
বুকের ভেতরে মুক্তা বেড়ে ওঠা জটিল ক্যান্সার
দেবে না দু’দন্ড শান্তি দারুণ বর্ষায়!

(ঝিনুক সইতে পারে / শাদা অন্ধকার)

সইতে পারছি না বলে রক্তাক্ত হচ্ছি হৃদয়ে মগজে। কিন্তু সারা দেশ জুড়ে যে নারকীয় আয়োজন ক্লাইম্যাক্সের প্রায় চূড়ান্তে এসে পৌঁছাচ্ছে , তার কোনো সমাধান তো নজরে আসছে না। জানি না সময়ের অনাগত স্রোত আমাদের কোন ভেলায় ভাসিয়ে দেয় কোনো এক কৃষ্ণ দশমীতে।

কবিতার মায়াবী পর্দায় দুলতে দুলতে আমি এক নতুন ঘোরের মধ্যে হারিয়ে ফেললাম নিজেকে-একের পর এক কবিতার হাতছানি যেন আমাকে ডাক দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে পরিচয় হলো পিয়াস ওঝা’র সাথে, সবুজের বন্ধু। দু’জনেই প্রতিদিন সতেজ কবিতা নিয়ে হাজির হতে লাগলো আমার চিলেকোঠায়। শুরু হলো নতুন ধরনের আড্ডা। কবিতার অড্ডা-কবিতার বিষয়, প্রেক্ষিত ও বক্তব্যকে আলোচনা করে আমরা গড়ে তুলি এক হার্দ্য পরিবেশ। এই তরুণ কবিরা এমন ধরনের আড্ডা আগে দেয় নি-তাদের ভাষ্য। আমিও কি পেয়েছি তরতাজা তারুণ্যের এমন সাহচর্য? বিকেল না হতেই আমার ঘরে একে একে তারা এসে হাজির হয়, আর শুরু হয় আড্ডা-ঘরে বাইরে ঘুরে ঘুরে ফিরে আড্ডা। শেষ হতে হতে মধ্যরাত, বিষয়ের তো শেষ নেই-কবিতা, দর্শন, ফিল্ম, গল্প, রাজনীতি, রিপোর্টিং নানা অনুষঙ্গ এসে ভীড় করে। মাঝে মধ্যে Norton Anthology থেকে পাঠ করি বিশ্বখ্যাত ইংরেজি কবিতা, মাঝে মধ্যে চলে যাই আরেফিন এর ডেরায়-দেখি বার্গম্যান, ক্রফোর ছবি। তারা আবার এর মধ্যে তৈরি কর সেমাই আর চা।

ইমরান খুব মজার ছেলে।  নানা ধরনের মানুষের সাথে তার যোগাযোগ। একদিন বললো চলেন, এক জায়গায় যাই। নিয়ে এলো এক এনজিও অফিসে, ভদ্রলোকের নাম রুহুল। সপ্রাণ আপ্যায়ন শেষে ডেকে আনা হলো আরও দু’জন বন্ধুকে। সবাই মিলে চলে গেলাম গলফ মাঠে, টিলার চূড়ায়। চাঁদনি রাতে বসে যখন কেবলি নস্টালজিক হয়ে উঠেছিলো, মন, তখন গলা খুলে রাধা রমণের গান গেয়ে উঠলো রুহুল। অন্যরাও তাল দিলো, গলা মেলালো। এই অদ্ভুত মায়াবী নিশি-আড্ডা চললো গভীর রাত পর্যন্ত সেদিন। ইমরানের সাথে আরও বেড়িয়েছি পরে। একবার আমার স্ত্রী-কন্যারা সবাই সিলেট এলো। ইমরান আয়োজন করে গাড়ি নিয়ে জাফলং ভ্রমণের। ফটো সাংবাদিক মনসুর-এর প্রাণবন্ত চালনায় আমরা এক সময় জাফলঙে এক বাগান বাড়িতে এসে উঠলাম, যার বারান্দা থেকে দেখা যায় মেঘালয়ের সীমান্ত ডাউকি-র ঘরবাড়ি, মানুষের আনাগোনা, শিশুদের দৌড়ঝাঁপ খেলা। সন্ধ্যা হবে হবে এমন সময় একগুচ্ছ মেঘের পাহাড় ডাউকির সীমান্ত পেরিয়ে আমাদের আঙিনা দখল করে নিলো। আমরা মেঘের সমুদ্রে স্নাত হলাম, আর্দ্র হয়ে উঠলো পোশাক ও শরীর, আর্দ্র হয়েছে মনটাও। মেঘেদের নেই কোন ভিসা পাসপোর্ট। তারা অবলীলায় পাহাড় ডিঙ্গিয়ে এদেশ ওদেশ ভেসে বেড়ায়। সীমান্তরক্ষীদের বন্দুকের নল মেঘের গতিকে থামাতে পারে না। আমি যদি ওই মেঘ হতাম!

একদি সবুজ আরেফিন এসে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে আম্বরখানায় এক মার্কেটে শাড়ির দোকাে এসে হাজির হলাম। ভাবলাম, বোধ হয় সে কিছু কেনাকাটা করবে। পরে দেখলাম, সে পরিচয় করিয়ে দিলো দোকানি কবি সৈয়দ আফসার এর সাথে। আমি জানতাম একদা কবি এজাজ ইউসুফী হোটেল ব্যবসা করতেন। কিন্তু কোন কবি কাপড়ের দোকানি-এই প্রথম দেখলাম। তরুণ এই কবি ‘অর্কিড’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকাও সম্পাদনা করেন, আর কাপড়ের দোকানে যেহেতু একটা প্রশস্ত বেদী থাকে, তাই আড্ডা জমতেও কোন অসুবিধা হয় না। মুড়ি, পেঁয়াজু, চানাচুর মরিচ ইত্যাদি চমৎকার মিশ্রণ তৈরি করে খেতে ডাকলেন কবি জাহেদ আহমদ-এক এনজিও কর্মী। চমৎকার উচ্চারণ ভঙ্গি এবং গভীর বোধ ও দৃষ্টি তার। মুড়ি, পেঁয়াজু খেতে খেতে আড্ডায় মশগুল হয়ে গেলাম সবাই। এই আড্ডাটা আমার খুব পছন্দ হয়ে যায়-প্রশস্ত বসার জায়গা আর বহু বর্ণিল তারুণ্যের সম্মিলনের কারণে। প্রায়ই রাত আটটার দিকে আমি চলে যাই আম্বরখানার ‘গ্রামীণ শাড়ি ঘর’-এ। স্মিত হাস্য মুখ সৈয়দ আফসার বসে থাকে। মুড়ি প্রস্তুতে ব্যস্ত জাহেদ, চঞ্চল তরুণ ‘উজান গাঁ’ সম্পাদক চ্যবন দাশ, কবি অনন্ত সুজন, মাঝে মাঝে দীনও এসে হাজির হয়। আলোচনা হয় নানান বিষয়ে, পাঠ হয় অনেক কবিতা। আমি মাঝে মধ্যে অভিযোগ তুলি তাদের কবিতায় ছন্দজ্ঞান ইত্যাদির দুর্লক্ষ্যতা নিয়ে তাতে অবশ্য তাদের তেমন কিছু বোধ জাগে কিনা বুঝতে পারি না। তারুণ্যের টগবগে ঘোড়া একটু বেহিসেবী পা ফেললোই বা! মোস্তাক আহমদ দীনের একগুচ্ছ নতুন কবিতা পড়লাম এই আড্ডায়। পরে ‘‘উজান গাঁ’ তে এই কবিতাগুলো প্রকাশিত হয়। সৈয়দ আফসার শুরু করে ‘অর্কিড’ প্রকাশের আয়োজন। আমাকেও তারা লেখার জন্য বললো। আমিও যেন তাদেরই একজন হয়ে পড়ি। একটানে লিখে ফেলি বাংলা কবিতার ভাষা শৈলী প্রসঙ্গে।

‘অর্কিড’ এখনো ছাপা হয় নি। তবে কাজ প্রায় শেষ। এর মধ্যে হঠাৎ শোনা গেল বিদায়ের ঘন্টাধ্বনি। না, আমার নয়-অর্কিড সম্পাদক ‘গ্রামীণ শাড়ি ঘর’ আড্ডার কর্ণধার সৈয়দ আফসার-এর ভিসা হয়েছে, লন্ডন চলে যাবেন। এভাবেই কালের মন্দিরা বেজে ওঠে। যেতে হয় এক একজনকে এক এক দিকে। আমিও হয়তো নতুন আড্ডার খোঁজে বের হবো অন্য কোনোখানে।

*(প্রথম প্রকাশঃ নিসর্গ, ২০০৬। সম্পাদকঃ সরকার আশরাফ)*


জিললুর রহমান

জিললুর রহমান

জিললুর রহমান। চট্টগ্রামে জন্ম, নিবাস, কর্ম। পেশায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষক। আশির দশকের শেষ দিকে থেকে লিখালিখি। লিটল ম্যাগাজিন ‘লিরিক’ এর সম্পাদনা পরিষদ সদস্য। উত্তর আধুনিক কাব্য চর্চার পথিকৃৎদের একজন। মূলত লিরিক, নিসর্গ সহ বিভিন্ন ছোট কাগজে লিখে আসছেন দীর্ঘদিন। গ্রন্থ সংখ্যা-৫ঃ- অন্য মন্ত্র (কাব্যগ্রন্থ, ১৯৯৫), উত্তর আধুনিকতাঃ এ সবুজ করুণ ডাঙায় (প্রবন্ধ সংকলন, ২০০৩), শাদা অন্ধকার (কাব্যগ্রন্থ, ২০১০), অমৃত কথা (প্রবন্ধ সংকলন, ২০১০), আধুনিকোত্তরবাদের নন্দনতত্ত্বঃ কয়েকটি অনুবাদ (২০১০)।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E