৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ১৬২০১৬
 
 ১৬/১২/২০১৬  Posted by
কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম -এর ৯টি কবিতা টানাগদ্যে


নিষিদ্ধ মন্ত্রের গুপ্ত নির্মাণ

তার রাধুনি চোখ খুঁজে ফেরে নিষিদ্ধ মন্ত্রের গুপ্ত নির্মাণ কিংবা যা হতো একদিন সেইসব না হওয়া ধ্বনিদের বাড়ি, শস্যকেন্দ্র, জলের সংগীত; সে আর যাবে না কোনো রাজসভায় নতুন সংলাপে, সে এখন থিতু হবে দ্রোহে। তার পথে অনিদ্র পাতার শপথ, প্রজাপতির লুম্পেন উড়াল, ভুলের পেরেকে গাঁথা রক্তাক্ত সবুজ, স্রোতের ফাটল এবং জীবাষ্মের জ্যা ও ব্যাসার্ধের ভগ্ন কুটির – সে ঐ করমচা গাছের তলে আর সাজবে না অন্ধ বিবেক, অনুভবের সুতো ধরে সে এখন থিতু হবে দ্রোহে

২)
এসিড বৃষ্টিতে ভিজে যে পাখিগুলো হারিয়ে ফেলেছে উড়ার ছন্দ তাদের ডানায় ঝুলানো নীলরঙের এপিটাপ;  বেরসিক হাওয়ায় কৃষকের ঘুমের পলেস্তারা খসে পড়ে; উদ্বায়ু জননির্মিতি – মুনাফার পর্যটন টানে মৃত্তিকার মৌল স্বভাবে  জ্বলে উঠছে  দিগম্বর স্বর্ণ-প্রহর। …ই-বর্জের ছায়ায় পড়ে আছে রঙতুলি এলোমেলো স্বরে, চলে যাচ্ছে বাতাস অবাধ নৃত্যে, এদিকে মার্কিনি গো-শালায় ফুঁসে উঠছে যুদ্ধপ্রহর পুরনো খোলসে। মৌলবাদ পথে পথে প্রগতির চোখে – ভাঙে জল মৃত্তিকা তল – ঘুম নেই স্বজাতির ঘরে

৩)
উৎসমুখে নিরেট সন্ত্রাস তবু খুলে যায় অন্তহীন সৎকার পিচ্ছিল পথে, অচিকিৎস্য কাহিনিগুলো দাঁড়িয়ে আছে আয়বুড়ো মেঘের সিঁড়িতে; জানা আছে পালকের খড়-পোড়ানো মন্ত্র, নির্বিঘ্নে ঘরে ফেরার ক্রেজ কিংবা ধর্ষকামী সময় ধরে বেড়ে ওঠা অশান্ত ধূলোয়; ফেরা যাক ছুতারের ঘরে লৌকিক জ্ঞানে, সারস্বত সমাজের মুখে জেগে উঠুক পবিত্র আগুন;  মৃত সব ঢোলের বোল কুড়িয়ে এনে ভেঙে ভেঙে দেখে নাও প্রাচীন করোটির ক্যারিশমা- সাত জন্মের পাপ ধরে যে নিশাচর আমাদের কিচেন গার্ডেনে উড়াল গোধূলি, তাকে বলি এসো হে সখা, নীল হই

৪)
জিঘাংসায় মুক্তি নেই ভেবে আমি আমার জামার আস্তিনে লুকিয়ে রাখি রাত জেগে জমানো কিছু শোক – জানি খুনির আস্তানায়ও ঘাসফুল ফোটে, পরিচিত মানুষেরা খুনির পোশাকে রঙিন পাথর ছুড়ে মারছে আকাশে – পাখিরা পাথর হয়ে ফিরে আসছে ওদের হাতের মুঠোয় আর নিকারি কিশোরী বাঁশতলে পুঁতে রাখে  রতিক্লান্ত মন; গ্লোবাল ওয়ার্মিং কিংবা অস্থির গ্লেসিয়ার হয়ে ফিরে যাচ্ছে অভিন্ন ধর্ষকেরা প্রভাতের জগিং-এ। এদিকে কাদায় আটকানো গরুর গাড়ির বিনীত ছায়ায় আমাদের পুরনো পোশাকগুলো মুকস্থ করে  বিবিধ স্রোতের গল্প…অসংখ্য শ্যাডোলাইন ধরে পরিণত বীরগণ আজো সব রমণীয় ঝুলন্ত পথে…

৫)
আজ ভাবি কেন যেতে যেতে থেমে গেছি পুরনো বৃক্ষটির কাছে। এই সকালের রোদে নদী যখন রোদের বাইকে চড়ে তীর্থে যায় আমি সমস্ত দুপুর বেমালুম ভুলে থাকি ক্ষতগুলো। যে বিশ্বাস নিয়ে একদিন উঠে পড়ি নৌকোয় সেখানো দাঁড়ানো আছে ছাগল উন্নয়নের প্রকল্পগুলো হাফপ্যান্ট পরে, কখনো কখনো অনুভূতিগুলো ছাগল-বিয়ানো সন্ধ্যার ফিউশন; তেভাগার কথা ভুলে গিয়ে শুধু নিজের ভাগের দিকে তাকাচ্ছে যে মহান বিপ্লবী তাকে আজও বিড়ালমুখী নদীর জলে ভোরস্নানে দেখি; তাহলে মাটিই বলুক, আমাদের রাত কিংবা দিনের কোনখানে সত্তার অবাধ সাঁতারে জেগে উঠবে কুমোরের আদ্র শৈশব?

৬)
সার্কাসতাঁবু উড়ে গেলে বকুল গাছে নেমে পড়ে একঝাঁক রোদের সন্ত্রাস— চিন্তার চড়–ইসঙ্গম তালগাছে ওঠে – নদী ও মাছ আমাদের দু:খবিলাস; আবগারি আফিসের বারান্দায় দাঁড়াচ্ছে না সময় কিংবা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলাপচারিতা, ছুঁয়ে যায় মহল্লায় মহল্লায় ট্রেনের হুইসেল রাত বারোটায়, রিবনে জড়ানো প্রেম শেষতক চন্দ্রযানে চড়ে হাওয়া খেতে খেতে বাসা বাঁধে আকন্দার ঝোপে- মানবকল্যাণে আজ ভণিতাও টিকসই মূলধন – চমস্কির চেয়ে কে আর ভালো বোঝে একথা! আমার ঘরভর্তি আলোতে ফিতা কৃমির অদ্ভুত খেল শুরু হলে কাশ্মিরী শালে চড়ে শীত নামে সশব্দে শরীরে – বন্ধু গো, এই সন্ধ্যায় আমাকে নিয়ে চলো বিশুদ্ধ স্নানে…


গাছেদের কানকথা

একটি ক্লোন শালিখের সংসার ঝুলে আছে শীতসমৃদ্ধ সেগুনের পাতায়
ক্ষীণ, রতিময় জঙ্গলের ভেতর থেকে উঠে আসা ভয়ংকর মানচিত্রের
কঙ্কাল জাগিয়ে তুলছে লতাগুল্মের স্বয়ংক্রিয় পঠন-পাঠনের পাঠশালা
আমরা গাছেদের কানকথা নিয়ে ঘুমুতে যাচ্ছি মৃদুমন্দ পাতার কুটিরে…


আমাদের গোলাবাড়ী গ্রাম

নি:সঙ্গ দুপুর কিংবা চৈরি হাওয়া আমার চৈতন্যের শিরায় শিরায় জাগিয়ে তোলে বিমূর্ত সন্ধ্যার আঁধার; নদী ভাঙনের দৃশ্যাবলি- প্রত্নবেলার বৈচিত্র্যে খেলা করে বাউল কবির জ্বলন্ত নিউরনে। অনেক পরিচিত গাছগাছালির ভেষজ মমতায় আমার চোখে আজ নতুন কোনো ঈশ্বরের বৈরিতা ভেসে ওঠে – আমি স্থির বিন্দু ছেড়ে যাই – জলের কোন্দল থেকে সহসাই উঠে আসি ঝোপঝাড়ে  নিজস্ব আড়ালে, বিষাদের জ্যামিতি চষে অন্তর্লোকে খুঁজে পাই বালকের হৈচৈ স্নান, দেখি কত নিভে যাওয়া ভাসমান মুখ, অসম জীবনযুদ্ধ, মানুষের একাকীত্বের বিদ্যা ও দর্শন-

আমি তর্জমা করি নি:স্ব কৃষকের ঘেরাটোপ – দ্রোহনীল চোখে দেখি কমিউন ওড়াউড়ি আবদ্ধ মনীষায়, তর্জমাহীন, নি:স্ব; দু:খনদী জ্বলন্ত ক্ষুধায় গ্রাস করে আমাদের গোলাবাড়ী গ্রাম – রক্তহীন নিস্পন্দ আমি যেতে থাকি – যেতে যেতে পাড়ি দিই অনেক ভোর, দুপুর ও বিকেল পড়ে থাকা ভিটেমাটি ভাঙা চেয়ার, বিপন্ন তেলের শিশি, পুরনো স্যুটকেস পার হয়ে দেখি কত ভগ্ন-হৃদয় অপেক্ষার ঢেউ ভেঙে জ্বলে উঠছে অপার শূন্যে-

আহত সরালির চোখের সারল্যে ভেজা আলোগুলো রঙিন বয়েমে আজ বসন্তের ঘুম, এদিকে যখন নগর বাউলেরা সদ্য তৈরি সোলারিয়ামে দেহ কসরতে ব্যস্ত আমি দেখতে পাই মন্দিরা বাজিয়ে রামু গায়েন আমতলায় জড়ো করছে বাউল পাখিদের আর তার একতারা নিয়ে উড়ে যাচ্ছে একঝাঁক হরিয়াল ( তখন লালন ফকির মেঘের আড়াল হইতে আমাদের বিভঙ্গ মুখমণ্ডলে একবার উঁকি মারিল আমরা বুঝিলাম জীবনের আরো অনেকানেক পরিখা খনন করিতে হইবে ) জানা নেই অন্য কোনো ভাষা – হাল-চষা চাষী এক মেতে আছি বাতাসের উলঙ্গ চিৎকার কিংবা তাপদগ্ধ জমিনের একাট্টা পিরিতে; ধ্যানবতী জলকন্যার মৎস্যগন্ধী জালে আটকে আছে আমাদের পূর্বপুরুষের শ্বাস-প্রশ্বাস, কড়ির ঝোলা আর পবিত্র নুনুফল- চৈত্রধুলো জানে সেই কথা

চরের বাউড়ি কিংবা নতুন ঘাসের চৈতন্য ছুঁয়ে উড়ে আসা হারানো শৈশব ঈশ্বরের দোচালায় বসে হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে অন্ধকার আর কুপির আলোয় ভাসা ভাসা শোকের আদলে তৈরি হচ্ছে গ্রাম-নিধনের কথিকা; জিওল কিংবা মাগুর মাছের থৈথৈ ক্যানালের জলে ডুবে ডুবে জল খাওয়া কিশোরীর ভাসমান চুলের মতো মনে পড়ে একদিন এই গ্রামে এসেছিল সার্কাসের হাতি – জীবনতলার অন্ধকারে দেখি কজন কিশোরীর ফুলমুখে জমে আছে আহত মেঘ; লগেন ভুঁইয়ার লাল বাড়ি কিংবা পাকা ইঁদারার পাশের মাদারের লাল ফুল পড়ে থাকা পথে আজ মহাস্রোত- ভেসে যাচ্ছে কত সব বিপন্ন মানুষের কামনার স্মৃতি-

ছনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে হু হু করে ধেয়ে আসা উত্তরের ঠান্ডা হাওয়ায় শুষ্ক যৌবনে আজো কেউ দুধভাতের স্বপ্নটুকু জিইয়ে রেখেছে বুকের গভীরে; কোমলে কঠোরে বেড়ে ওঠা ইতিহাসের ছেঁড়াখোড়া পাতায় হেঁটে যাচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা – পাশাপাশি রহস্য ছায়ার চোখে দোভাষি অন্ধকার – এরকম দৃশ্যের মধ্যে বেজে ওঠে কুয়াশার ঘড়ি অন্য কোনো নেতির পাঠশালে আর গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে শকুন ও শুয়োর ত্রি-মাত্রিক দৃষ্টির ভারে, আমরা জলমহালের ওপর থেকে মুছে যেতে দেখি জেলেদের পৌরাণিক ছায়া; লাল বাড়ির সামন্ত আঁধারে প্রোজ্বল হ্যাজাকের আলোয় ষোড়শী যাত্রাভিনেত্রীর চুলের কৌলিন্যে আটকে আছে আমাদের সূর্যক্লান্ত মন, আমাদের শিরদাঁড়ায় জমে আছে ছাবের লাঠিয়াল কিংবা তার শ্যামল সাহস বংশপরম্পরায়-

অনচ্ছ অন্ধকার কিংবা স্রোতের গর্জনে হারানো তীর্থের গৃহায়ণ থেকে আমার রাখালি মন কুপির আলোয় দেখতে পায় ত্রিকালজ্ঞ বুড়ো নিমগাছ – চৈত্রের দুপুরে গামছা পেতে ঘুমিয়ে থাকা রাখালের পাশে আমিও ঘুমিয়ে পড়ি কখনই – আমার বুকের ওপর অজস্র পাকা নিমফল জমে আছে মেঘ হয়ে – আমি সে মেঘের বারান্দা থেকে কুলুঙ্গির অন্ধকার কিংবা জলচৌকির গল্পগুলো তুলে আনি কৌশলে, আমি শুনতে পাই আমার পিতাজান ধীরে ধীরে কাছে এসে মৃদু স্বরে ডাকছেন- ‘বাপ, ওঠো, এখন অনেক বেলা’ স্নেহের এই বৃষ্টির গানে আমি জেগে উঠি – দেখি কোনো গ্রাম নেই – চাঁদেলা রাত- একটি ছোট্ট ডিঙিতে আমি ভেসে যাচ্ছি অচেনা জলে আর আমাদের গোলাবাড়ী গ্রাম উত্তরের আকাশে এক নক্ষত্র পল্লী, যেন বহু যুগের অন্ধকার শেষে গাাভিন সূর্য দিয়েছে ছেড়ে আলোর নহ্বত; আমার পিতামহ উঠে আসেন অঢেল নির্জনতা ভেঙে, তখন ঝরাপাতা উড়ে যায় অসুস্থ জন্মজল ছুঁয়ে আর আমাদের বাড়িটি আমার কৈশোর ও শৈশবের স্মৃতিগুলো পোটলায় বেঁধে ডাকছে আমাকে সস্নেহে-

তখন নিয়তির পাড়ে খসে পড়ে বেলা-অবেলার দরদি বৃষ্টি – প্রাণের ভেতরে বেজে ওঠে নিজস্ব মানবীর নিরস্ত্র বেহালা – রক্তের উত্তাল স্রোতে জীবনের দাঁড় ভেঙে গেলে আমি শুনতে পাই রসিক মিস্ত্রীর বটতলায় বেহুলার ভাসান- ‘বিষের এমন জ্বালা, ও প্রাণ গেল রে …’ অত:পর আমার ডিঙিটি ভেসে চলে অসংখ্য রক্তময় নদী যার জলের চঞ্চলতা ভেঙে কোনো এক পরিশ্রান্ত ইউলিসিস ফিরতে চায় ইথাকায় – আমার অস্তিত্বের মোহনায় জেগে ওঠে লাল নীল সমুদ্রের স্মৃতি – তখন নিভু নিভু প্রদীপের আলোয় আমার শিহরে যেমুখ ঘোমটার তলে ঢেউয়ে ঢেউয়ে খোলে ভেজা চুল, তার কথা লিখে যায় পুরনো বিষাদে, ধূূসর কষ্টে-


চারুতলায়, মৃত্যুবিষয়ক পাঠ

একটি কবিতা একটি মৃত্যুদৃশ্যের মতো উজান-ভাটির সখ্যে; ভাবনার বারুদ পুড়তে থাকে, চেতনার মাটি থেকে উদ্গত বৃক্ষ দাঁড়িয়ে যায় প্রতিস্বপ্ন হয়ে আর পাতাঝরার শব্দগুলো  বুনোবাতাসে ভাসতে ভাসতে পাখি হয়ে ফিরে আসে কবির সমুখে; পাখি কিংবা মেঘ এমন কোনো প্রত্যয় নয় যাতে চড়ে চর-হাশেমের বিবাদ থামানো যায়; যে বাড়িগুলো একদিন উড়েছিল বিলের বাতাসে তারা আজো নিশাচর, যে পথিকেরা সন্ধ্যা মাড়িয়ে গোর-খোদকের পোশাকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে  হারিয়েছিল আত্মার নদী তারাও যাবে আজ সাথে নিয়ে কবরের ঘ্রাণ- শুধু কোনো ওফেলিয়া থেকে যাবে দূরে

২)
খুন হবার মতো রক্তগোলাপেরা চলে গেছে শতাব্দী-প্রাচীন কান্নার ওপারে; ওদের নিদ্রা ও জাগরণ পাখিদের কলস্বরে ভেসে ভেসে শেষে সওদাগরী নৌকোয় দেখি নিসর্গের কিমা, অত:পর রক্তের ভেতরে মানবিক সিঁড়িগুলো বাঘের খাাঁচায়, ওদিকে বন্য হাতির ক্রোধ-মিশ্রিত প্রস্থান হয়ে রক্তবমন, জানা গেল এবারও ঘুমহীন রাত্রি বেয়ে ত্রিকোণ মেঘ এসে ভিজিয়ে দেবে খোলার ধান, মৃত সব সকালের দিকে নেমে যাবে বিবিধ বসন্তের কোমল মন্ত্রগুলো স্বয়ংক্রিয়তায়; ফুলের সারল্যে উড়ে যায় ছোট ছোট হ্রস্বতা ফুলপরি সেজে-

৩)
অত:পর মৃত্যুর গহিনে সে উপত্যকায় আমাদের যৌথ আত্মার আসরে তামাটে রঙের মোমবাতিগুলো নটী ও সারথী ; পাহাড়ি ঘাসের উৎপাতে আলোগুলো কাঁপে, ডামি পোশাকের মৃতরা মার্বেল খেলে গোধূলির পথে, আমার হাতের কব্জিতে জল-পতনের শব্দ, ফেরেস্তা-বাড়ির চৌবাচ্ছায় ঘুমিয়ে আছে আত্মদগ্ধ স্নান, এসব মিরাকল – পাপকলায় ; যে উত্তাপে আজো দাঁড়িয়ে থাকি সমুদ্রের হাওয়ায় সে আমার মুদ্রিত উড়াল খামির উজানে –  মৃত্যুর গহিনে হেমন্ত-রঙের বিশ্বাস, চিত্তস্বপ্নঘোর; নর্দমায় সূর্যের কূটনৈতিক সংসার, যাওয়া হোক অজস্র জোনাকির আগুনে ধৌত বিমল পোশাকে-

৪)
মৃত্যু আমাকে দাঁড়িয়ে রাখে বৈপরীত্যে, দাঁড়-ভাঙা জলে; মধুর স্বপ্নগুলো চঞ্চল মেঘের দেশে লক্ষ্যভ্রষ্ট তীর, হিমযুগের সনাতন পদ্যগুলো গ্রিনহাউস সন্ধ্যায় আবারো কোনো নৈ:শব্দ্যের কথা বলে – দাঁড়িয়ে আছি বিপন্নতায় শ্যামল কফিনে; বেঁচে থাকার সহজ কোনো সূত্র নেই, তবু যখন ঘাসের কার্পেটে দুটি শালিকের চঞ্চু-মেলানো দেখি, মৃত্যুর শীতলতা থেকে বেরিয়ে এসে দেখতে থাকি পুরাতন  যৌনকর্মীর মানবিক আশ্রম – এখানে দাাঁড়ানো যায় বিপুল সন্ধ্যায়, মৃত্যুদগ্ধ প্রাণে –

৫)
ভেসে যায় বেহুলার দেশে, পরবাসে বন্ধুদের ডাক শুনি; গতায়ু জ্যামিতির সূত্রগুলো পড়ে থাকে বারান্দায়, আমার ঘুম ঘুম চোখে বেদেনীর ধূসর যন্ত্রণা উসকে ওঠে, আমি টের পাই বিশুদ্ধ জাগরণে স্বস্তি নেই, তাই শ্রাবণের রাতে ফেরারি হয়ে যায় নিজেরই হত্যাকারী অশান্ত জলে; যেতে যেতে মোনাফেক স্মৃতি, হাঁসের পালক-ওড়া বিকেল গুনমুগ্ধ শিষ্যের মতো আমাকে জাগিয়ে রাখে মেঘের আশ্রমে,  আমি মেঘ হয়ে ভেসে যায় বানভট্টের ডেরায়-

৬)
সমুদ্র হবোনা, নদীগুলো বুকে গেঁথে হয়ে যাবো গথিক আঁধার; বেতবনের অন্ধকারে হারানো আকাশ খুঁজে নিয়ে আরেকবার মাছেদের কষ্টগুলো বুনে বুনে সাঁতরে যাবো ঈশ্বরের বাড়ি; বিস্ফোরিত নক্ষত্রের মতো মানুষের মৃত্যু, মানুষ চলে নক্ষত্র-ঘুমে; মরচুয়ারির সান্ধ্য আয়োজন, গ্যালাক্সির মতো সিলুয়েট, ঐসব ছায়ার অতলে  আজরাইল তিন তাসে মগ্ন; ভাতের হাঁড়িতে যাদের সূর্যাস্ত জিনকোডের গোপন বাক্স খুলে দেয় সেখানে মৃত্যু এসে দাঁড়ায়, হৈ-হুল্লোড়ে পাতা ঝরে, মৃত্যুর ওপারে দীর্ঘ জীবনের সাঁকো রণনীতি মানে; যতই গভীরে যাই আলো আসে জল ভেঙে, হিমাগারে পাখিপ্রেম জমে-


অন্ধকারে জ্বলে ওঠে বিষ

অন্ধকারে জ্বলে ওঠে বিষ, আমি নিজের ভেতরে টের পাই কালো বেড়ালের চোখ অত:পর ঝিনুক-হৃদয়ের গান বাজে হাওয়ায়…লুন্ঠিত হৃদয়-কুলে জাগরণ, ভাদ্রের প্রখর রোদে খুদে জেসাসের চোখে জ্বলে ওঠে ক্রুশ, অনেক রক্তে ডিঙা বায় মাছের দেবতা আয়ুহীন জলে যখন বিষ তার উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে দেয় শস্যভ্রুণে। মাঝরাতে হারানো চাঁদ ফিরে আসে মাতৃজঠরে আর সুকান্তদেহী সন্ধাতারারা নেমে আসে আমলকি বনে, ঘাসে ঘাসে উড়তে থাকে তারাদের জেলিফিশ মন। বিষের উজ্জ্বলতা ধরে কতশত ভাবুক প্রেমিক সাঁকোর ওপারে হেঁটে যায় – যেতে যেতে  জেনে ফেলে সন্ধাতারারা অন্ধকারে ঘুম থেকে জাগে আর বিবেকের আস্তাবলে ঘুমোয় অঘোরে… বিষের হাওয়ায় বিষ বড়ো শূন্যতা বোঝে – হৃদপিণ্ডে, বৃক্কে ও যকৃতে বিষের কার্নিভাল। আমরা যারা অনেক রোদসী নদী পাড়ি দিয়ে মিশে গেছি জলের কল্লোলে তাদের নিউরনে জমাকৃত নীলকন্ঠ মৃত্যুরা বিষজালে খুঁজে পায় অধিক মরণ – তখন পাপের মূর্তিগুলো সিঁড়ি ভাঙে জল পতনের দৃশ্যে- আলোয় বিয়ানো শব এসে দুিলয়ে যায় মন –


আয়ুষ্মতী মেঘের তলে দাঁড়িয়ে

‘জল পড়ে পাতা নড়ে’-র মতো শৈশবে আমরা যারা কচ্ছপের পৃথিবী থেকে উঠে আসতে চেয়েছি একটু স্পন্দনে তাদের জন্যে একগুচ্ছ গাঁদাফুলও রাখেনি কেউ বন্দরের ডকে। তাই আজো আমি কিংবা আমাদের সহযাত্রী পথিকেরা নিজেদের প্রথম মাস্টারবেশনের কথা ভাবতে ভাবতে একঝাঁক হরিণের আত্মহত্যার করুণ সংবাদ পাঠ করি পত্রিকায়। এদিকে আমাদের বলপেনগুলো উগরে দিচ্ছে নেতির জঞ্জাল আর মৃত মৃত হরিণের চোখের সাঁতারে জড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের উচ্ছল যৌবন- আমরা ভুলে যাই পাতা নড়ার ঐশ্বর্য, পতনের পালছেঁড়া মুখ কিংবা বালিহাঁসের রক্তস্নাত উড়াল। আমাদের পৃথিবী দুমড়ে যায় আমাদেরই আত্মার খোঁড়লে আর শৈশবের রন্ধনশালায় জমতে থাকে জংধরা ক্রন্দনগুলো বিনয়ী সাঁতারে। আয়ুষ্মতী মেঘের তলে দাঁড়িয়ে আমরা ও আমাদের পৃথিবী আজো সমস্বরে পাঠ করি আমাদেরই শৈশব-


রাখালের জীর্ণ অপেক্ষা

পিঠেগাছ তলে যে রাখাল দাঁড়িয়ে আছে সন্ধ্যা অবধি আমি তার অপেক্ষাটুকু উড়িয়ে দিলাম মুক্ত আকাশে, অত:পর মাছরাঙা দুপুরে পাখিদের অবাধ ওড়াউড়ি থেকে জেনে নিলাম পালকের রিফ্লাক্স ধ্বনি- রাখালের ম্যাজিক খোয়াবে জড়িয়ে আছে কিশোরীর বেণীর মতো দুলতে থাকা শস্যাালি মাঠ- একটি আউলা চুলের মেঠোপথে উড়তে থাকে বেহুলার মেটেরঙ শাড়ি- আঁচলে বাঁধা কিছু হোমমেইড অসুখ- বনমোরগের সৌখিন চঞ্চলতা, গাঙের উত্তাল ঢেউ- এরকম গল্পের আড়ালে জেগে আছে গোপন বাড়িটি, নিভে যাওয়া জলসাঘর আর করতলে অপেক্ষামান সুতোকাটা ঘুড়ি যেন সেই নি:শব্দের বিড়াল অবাধ পিপাসা চোখে দেখতে থাকে শুঁয়োপোকার ভাবের স্কুল আর কচি পাতার সবুজ রেনেসাঁয় বনের অর্কেস্ট্রা বুকে নুয়ে পড়া পিঠেগাছ অতীতের রামধনু চিতায় –
রাখালের জীর্ণ অপেক্ষা পাতাকুড়োনির ঘুম হয়ে জেগে আছে পিঠেগাছ তলে


দাঁড়িয়ে থাকি নির্ভার অচিন ভূগোলে

সন্ধ্যারাতে পুতুল কিনে বাড়ি ফেরার কথা
আমার ছোট মেয়ের পুতুল বিয়েতে বড়ো ধুমধাম হবে,
দ্বিধাময় অন্ধকারে ফিরে দেখি বাড়িটি সময় হারিয়ে অফুরন্ত জলে,
উঠোনে পান্ডা ঢেউ – সোঁ সোঁ স্রোত – প্রেতনৃত্যে বদলে যায় দৃশ্য
হঠাৎ দেখি ডিঙি নৌকোয় বেজে ওঠে সানাই- নৌকোটি জলের
গহিনে ঢুকে আবার বেরিয়ে আসে – নৌকোটি রঙ বদলায় আর
আমার মেয়েটিও বেশ বড়ো হয়েছে – জলে ও জ্যোৎস্নায় মানুষ
একদা হয়ে ওঠে কেবলই সংগীত আর এরকম সময়ে
আমার মেয়েটির চোখে বন্দরগামী জাহাজের সঞ্চয় – আবারও
বেজে ওঠে সানাই
আমার মেয়েটি লাল বেনারসীর অন্ধকারে মেঘ হয়ে ভাসে-
আমার ইতিহাসচেনা চোখের আলোয় ভেসে এলো শতাব্দী-প্রাচীন
ভাঙনের শব্দ – আমার মেয়েটি চলে গেল শশুর বাড়ি – আমি তার
নতুন পুতুল শূন্যে উড়াতে উড়াতে ভুবন-ভাঙা ঢেউয়ে ঢেউয়ে
দাঁড়িয়ে থাকি নির্ভার অচিন ভূগোলে –


আবেদ মাঝির ঘাট
( সখি, কী ঘুমই ঘুমাইলি তুই নদীপাড়ে শ্রাবণের রাতে…)

শ্যামসখা ঢেউ এসে লাগে। এই ঘাটে। পাড়ে দাঁড়ানো গাছগুলো অন্ধকারে মেঘ-তাড়িত সুখ। কানে আসে ‘আমার যেদিন গেছে ভেসে’ দুয়ারে দাঁড়ায় মাঠের হারানো কেচ্ছা  তরমুজের মাঠ কিংবা বিষাদের ঘন জ্যামিতি, ঘোষপাড়ার সুতারের মলিন মুখ। বাবলা তলার বাউলের গান ‘ঘর নাইরে বাড়ি নাইরে’ অতঃপর ট্রেনের ঝিকঝিক, মাঠের স্বপ্ন উড়ে যায় ভাঙনে ভাঙনে- এমনি করে শরীরে জাগে ক্লান্ত মাছের ঘুম। মেলাভাঙা মন কী চাই সাঁতারে? উত্তরে ঝড়- এই ঘাটে পড়ে আছে রূপের মোহর রাতের কামনা, ঘুমের খোলসে অন্যতর আকাশ।নদী আজ জেগে নেই, পাখিদের ভুল ভুল উড়ার ছন্দে গেঁথে আছে পরিশ্রান্ত ঘুম, ওরে ও বাউড়ি বোন, কোন সাঁতারে রেখেছিস তোর পিরিতের মন? টুপটাপ স্মৃতি ঝরে জলভাঙা আঁধারে আর যে কোনো বর্ষায় আমরা পেয়ে যাই মৃত্যুর প্র্যাতাহিক গন্ধ – কসাইয়ের চোখের আঁধারে কার খোঁপা ভেসে ওঠে অন্ধ সাঁতারে? মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে পুরনো বেলা, পথ নেমে যায় দূরের ভাগাড়ে, আহারে-বিহারে খলসে-পুঁটিরা ভুলে যায় জালের ক্যারিশমা। পাকুড়ের সবুজ পাতারা নিভে যেতে যেতে জলমন্ত্র ফেলে যায় পথের ধুলোয় আর নৈ:শব্দ্যের রঙ মেখে দাঁড়িয়ে থাকা নদীটি খুবলে খায় সহজ কেচ্ছা। আমরা যাই, যেতে থাকি স্বচ্ছ জীবনের ওপারে – বোনারা বতকের দিকে কেঁপে ওঠে পলাতক বন। নিঝুম বালিকারা সন্ধ্যা ভেঙে রাঙায় কত নিরিবিলি ভোর এপারে ঝিঙেফুল প্রাচীন হাওয়ার পয়ার হয়ে ভেসে যায়, ভোর হয় নদীর ভাঙনে আর কোনো উড়াল পাখির চোখের তারায় ভেসে ওঠে সখের পিরিত। ঘরভর্তি মৃত্যুর ঝকাশে  পালিত সুখের দিকে পাল ওড়ে, যোগেন দাসের মুদির দোকানে  কারো কারো ঘুম যেন অতলের অধিবাস, আমরা জেনে নিই রক্তমাখা ঘুড়ির নিয়তি। কতশত শাওনের রাত জমে আছে এই ঘাটে, গাছে গাছে দোলে ওঠে পরাজিত মেঘ ক্লোলোফিল শোকে, জমে ওঠে গীতল সন্ধ্যা মাঝিদের চোখে

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E