৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ২৬২০১৬
 
 ২৬/১১/২০১৬  Posted by

পরিতোষ হালদার -এর ৭টি কবিতা টানাগদ্যে

কবি পরিতোষ হালদার

কবি পরিতোষ হালদার


একাকার

খুব দেরী হয়ে যায়। মৃত জ্যোৎস্নার পরে, অন্ধকারে সীমার প্রচ্ছদ। আমাদেরও রাত্রি ছিলো, আমরাও অন্ধকার কুড়াতে কুড়াতে এসেছি। হরপ্পা নারীর হাতে তুলে দিছি পাহাড়ের সোমলতা জল- পৃথিবীর প্রথম উষ্ণতা। বুকের দ্রাবিড়ে জমে আছে অসমাপ্ত রাখাল বেলা। তাম্রলিপ্ত প্রেম, তোমার আলোর অগ্রে কতবার ছায়া হয়ে গেছে। দৃশ্যে দৃশ্যে ভেসে গেছে শাদা পৃষ্ঠার মতো পাপ। প্রগাঢ় স্তব্ধ ছিলো, গড়ানো মার্বেল থেকে খসে গেলো নিম অন্ধকাল। জীবন-আনন্দে নাচে কালপত্র, ধ্রুবময়ী নারী। পায়ে তার গোটা গোটা ঘুঙুর পিপাসা- শূন্যতার শব্দধ্বনি টান। অথচ কার গভীরে এতো অনু, দিগভ্রান্ত এতো একাকার।


টান

টান আছে- পাখির পাখনায় তাই শাদা শাদা হাওয়া। কোন কোন আলোকবর্ষ কুয়াশা কুচি। শিশিরের হীম হয়ে ঝরে পড়ে বসন্তের বনে। দেওয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়ি সেও কী জানে কোথায় সময়; আগামী ভেসে বেড়ায় জলের কুসুমে। রোদ্দুর ফুরাতে না ফুরাতে চিকচিক করে ওঠে দীর্ঘশ্বাস। শস্যের ধ্যানে বাড়ন্ত শ্রাবণ; দূরে কোথায় যেন ভাঙতে থাকে বরফ সভ্যতা। পাথরের সাথে জন্ম, প্রতিদিন তাই ঝরনা হয়ে থাকি। সমস্ত শরীর জুড়ে বেজে ওঠে ঝিঁ ঝিঁ পোকার মতো রাত। অন্ধকারে, অনু ও মানে আমিই স্রোত আমিও রাজহংস। জেগে থাকা তোমাদের সমুদ্রে ছিটিয়ে যাবো তৃষ্ণাতৃষ্ণা লাল।


দৌড়

অন্ধকার পুড়ে গেছে; দুইহাতে ছাইমাখা রাত। পুরানো ইচ্ছারা ছায়া হয়ে দৌড়ায়। আমার ঠিকানা পথ- পথে পথে ডাকবাক্স; কোনদিন ভোর খুলে দেখে নেবো রঙ। সরল নিসর্গ বনে আমিও শরীর হবো- পাতায় পাতায় বাতাসের ঘুম। কোন কোন পাহাড় চুষে নেয় বৃক্ষের ধ্যান। তমসার জলে অজস্র রমণী, শব্দের ভাঁজ খুলে যারা হয়ে যাবে পাখি। তোমার অপেক্ষায় আমিও ছুটতে ছুটতে এসে দাঁড়িয়েছি অসীমের তলে। চারিদিকে দলছুট গহিনের ছায়া। আমি পানপাত্রে ভিজিয়ে রেখেছি পাপ; চুমুকেই তৃষ্ণা। তুমি এলে আবার দৌড়াবো, আমাদের পায়ের পাতা ছুটন্ত কিছু লাল ঘোড়া।


নিঝুম

নিঝুম ছিলো- দৃশ্য ফোটার সাথে ঝরে গেছে আমাদের জলের প্রহর। তুমি যেন পৃথিবীর প্রথম কিশোরী, বুকের ভূমিতে হাত রেখে বেছে নিলে জননী জীবন। সূর্যের চিহ্ন আঁকা রাত, কমলালেবুর বনে তুমি আজ চন্দ্রতোয়া নারী; শরীরে এলাচগন্ধ নিয়ে হেঁটে যাও। তোমার গমন পথে একা হয়ে থাকি, পায়ের মুদ্রায় নিষাদ ব্যস্ততা। বাতাসের বিপরীতে পুষে রাখা দীর্ঘশ্বাস, চিলপাখি উড়ে যায় ডানায় ডানায় তার জন্মান্তর ছায়া। কে যেন আসবে বলে ঝিঁঝিঁর শব্দের সাথে মিশে থাকে জ্যোৎস্নার কুচি। চোখের তৃষ্ণা খুলে একদিন ফিরে যাবে অন্ধকার- ধানিরঙ বসন্তের অনেক ওধারে।


আজ রাতে

আজ রাতে বৃষ্টি হবে। জলে ভেজা কোন পাখি আজো রয়ে যাবে পাতার আড়ালে। প্রথম মৃত্যুর মতো ডানা তার ঝাপটাবে বুঝি, ডানা তার প্রাচীন দিনের হাওয়া। নদীও সমুদ্র হবে- দুই কুলে জলের বাগান। ডুমুর গন্ধের ঘ্রাণে ভেসে যায় জন্মান্ধ যমজ পরী। জলও একা হয়, একার মতো সমুদ্র নেই যেন আর। পাহাড়ে পাথর কাঁদে, ছিন্ন ভিন্ন মেঘের উৎসব। নিঝুম ছায়ার বুকে টলটলে আরশির ঘুম। কবে কার শুরু ছিলো পতনের নিশা। এমন রাত্রি আজ, আজ রাতে পৃখিবীর সবাই একা- অন্ধকার। পথে পথে বিবিধ বিনাশ- মৃত প্রজাপতি আর দশকোটি বর্ষার ঘোড়া। আজ রাত জেগে রবে অনন্ত নির্ঘুম।


জোড়া অন্ধকার

কোন কোন রাতও ঘুমিয়ে থাকে। কুমারীর খোলামেঘ গায়ে তার রেখে যায় শিশিরের ঝাঁঝ। রূপের পালিশে টুকরো টুকরো হিম- বিছানায় শাদা ফুল, অজস্র জন্মের কণা উড়ে যায়, উড়ে যায়। শিকারী পাখির ঠোঁটে উষ্ণরেখা- ক্লন্তিময় বৃক্ষবৃক্ষ বাস। গহনের সিঁড়ি পথে সরল শৈশব, কতোটুকু ছিলো তার ডানার উড়ালে। ঘড়ির কাঁটায় জমা দীর্ঘশ্বাস, ঘুরে আসে সমগ্র সময়। তবুও দৃশ্য ঘুমিয়ে থাকে, তবুও নির্জন শেষে রয়ে যায় শব্দের প্রথম অনু। অভিমানী হাতের রেখা, কোনদিন বেঁকে যাবে সমুদ্রের দিকে। জলেশ্বরী- একবার তৃষ্ণা দাও; আমিও রাত্রি হবো, তোমার চোখে মতো জোড়া অন্ধকার।


অপেক্ষা

প্রথম স্রোতের সাথে জন্ম নেয়া দীর্ঘশ্বাস। তিমির তমসা থেকে মিশে আছো মানসের জলে। অরণ্যের বনে সুশীতল রাত নেমেছিল। লাল-নীল ফড়িঙের দল উড়ে উড়ে খুঁজে নিলো অফুরান আলো, প্রাগ অতীতের মতো একবার ছুঁয়ে গেছে ঘুমের স্বদেশ। তুমি তার আঁচল উড়ানো প্রেম। আগুন সেলাই করে আকাশে আকাশে আজো নক্ষত্র বানাও। তোমার দর্জিবাড়ি অজস্র গহীন- গ্লাসভর্তি নির্জনতা মদ। ক্রমিক তৃষ্ণায় ঝরে পড়ে চুরচুর শ্রাবণ সুনীল। অথচ তোমার তুষারে আটকে আছে আরও একটা ব্রহ্মপুত্র। তুমি জানো না আমি সেই স্রোতের অপেক্ষায় আছি- আজো একা।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E