৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ১৪২০১৬
 
 ১৪/১২/২০১৬  Posted by
পরিতোষ হালদার

পরিতোষ হালদার

পরিতোষ হালদার -এর ২০টি কবিতা টানাগদ্যে


একাকী খনিজ

ভুলে গেছি সব। কোন হাতে পাত্র রাখি কোন হাতে সোনার গোলক। ঘনকুয়াশার বনে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে গেছে আমার সকাল। তিস্তা-বেগবতী-নিলাক্ষী কত শত নদীর নামে তোমারে ডাকতে গিয়ে প্রাণের শ্রাবণে কখন যে হয়ে গেছি জল। রূপালী শস্যের টানে সাঁই সাঁই উড়ে আসে পাখিদের ঝাঁক। ফরিঙের ঘাস দেহে উদ্যানের প্রগাঢ় মমতা। কেবল ছায়ারা ডাকে, পার হয়ে যাই রোদের বেলা। অনেক গোপন ঘেটে যা কিছু তুলে আনি তার দেহে শ্যামল আঁধার। বুকের ওড়নায় রাত্রি ঘুমিয়ে থাকে, তারে তুমি জাগালে না- জাগালে না সংঘমিত্রা ধ্যানে। অজস্র ধোঁয়ার মতো জ্যোৎস্না নামে- সারারাত ঘুমাতে পারি না, সারারাত চুরি হতে থাকে পাহাড়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা ঘ্রাণ। নক্ষত্র তারার নীচে সাড়ে চারশ কোটি বছর পড়ে আছি একা। তোমারে হারাতে গিয়ে অবশেষে জেনে গেছি তুমিও একা আর ভালবাসা একাকী খনিজ।  


উষ্ণতা

ভীষণ উষ্ণতা জাগে। চোখের চপল বেয়ে টলটলে ঘ্রাণ নিয়ে মৃৃত্যুর মতো রূপ নামে। মাথার উপর টাঙানো আকাশ। আমার সীমায় শ্লীল-অশ্লীল কিছুই নেই। শুধু চাঁদের পালান জুড়ে প্রান্তিক নক্ষত্র খোঁজা। কোনোদিন ঘুম ভেঙে জেগে দেখি মাঝরাত শুয়ে আছে আমার শয্যায়, ঠিক যেন বউয়ের শরীর। ব্রহ্মপুত্র জলে তিন তিন বার দেখেছি দেবীদের স্নান উৎসব, লাজধোয়া অমৃত শরীর। আমার গোপন খোয়া গেছে চতুর গোপনে। আমিতো বহরে হাঁটি যোজন যোজন। যাযাবর বিশ আঙ্গুলে খেলে বিংশতি পল-অনুপল। কোথাও হঠাৎ থেমে জীবনের পায়ে আঁকি অমরত্বের সুবর্ণরেখা। কখনো আবার অন্ধকার কামারশালায় জ্যোৎস্না বানাই একা একা- এই মৃত্তিকায়।


জলযাত্রা

মৃত্তিকার নিদাঘ শ্রাবণে তুমি কী ফোটাতে ছয়ঋতু ফুল। আদিরস পানে ব্যর্থ মন্দাক্রান্ত জল। কামরাঙ্গা সীমায় সীমায় নিদ্রা রেখে ছুটে গেছো রাতের ওধারে। তোমার মৃদঙ্গ তালে নীল ছলছল চন্দ্রমাতৃক হাওয়া। জলের গহনা গায়ে আমিও ছিলাম গহীন স্বদেশে- হেমগন্ধী বুড়িপ্রেম শিসে। যখন সাগর ছুঁয়ে যেতো হীমালয় তনু, তখনো লবণ চোখে দেখে নিতাম তোমার শরীর। সিন্ধু-শতদ্রুর ডুবতীর্থে অনাগত সোমেশ্বরী-সুগন্ধার ঘ্রাণ। তুমি বিন্ধ্য পর্বতে হনন রেখে স্রোতে ভেসে ভেসে খুঁজে নিতে দ্বীপকলি লোহিত মোহনা। তারপর পুষ্পহীন কোনো এক বৃক্ষতলে তুমি একা- আমি একাকার।


আলোকলতা

তবুও পথে পাথে ঘুরি। নিমকষ্টের বনে রাতের নিঝুম। জ্যোৎস্নাপোড়া ছাই নিয়ে হেঁটে যাবো, আমাদের হাতে হাতে চাঁদের পরাগ। সবুজের রঙ ছুঁই, সুবর্ণরেখার কোলে রূপের মহড়া। আমি পাথরে-পাহাড়ে-গুহায়-হাড়ে লিখে নেব তোমার কাওয়ালি- ষোল কলায় গাঁথা পূর্ণমান বাণী। তুমি আকাশে আকাশ হয়ে ডেকে যেও আমার বিস্ময়। জেনে রেখ আমি আর তুমি ছাড়া নিসর্গের সকলই পুরাণ। সকলই ছিল, আমাদের জন্মের অধিক আগে। জীবন-মৃত্যু থেকে উঠে আসা আমরা, যারা হাঁটতে হাঁটতে একদিন চলে যাবো অহমের দেশে, ফেলে যাব হাঁস বালিকার শাদা গন্ধ- জলডুবি দিঘি; যুগল জন্মের আলোকলতা।


দ্বাদশ তৃষ্ণা

ডুবসাঁতার থেকে জেগে উঠে দেখি চতুর হাওয়া বইছে বুকে। কাঁচভাঙ্গা শব্দের টুকরো টুকরো জীবন, চায়ের টেবিলে দ্বাদশ তৃষ্ণা। পূর্নদীর্ঘ পথের ওপাশে শুয়ে আছে ঘুম। কচ্ছ বণিকের মতো জল; চৌষট্টি নন্দন ছুঁয়ে থাকি, হাতের মুদ্রায় কৌণিক জ্যামিতি। একজোড়া উড়াল ডানায় কতোটা সুদূর থাকে, ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যায় পাখি। নীল অন্ধকার গায়ে কে তুমি পাথর, দীর্ঘশ্বাসের নামতা পড় রোদের চাতালে। সূর্যের পুঁজি থেকে প্রথম চন্দ্রগ্রাস তোমাকে দেবো, তুমি দশ আঙ্গুলে বাজিয়ে যেও শুন্যের সানাই। পকেটে সূর্যাস্ত নিয়ে দৌড়ে এসো, রেলগাড়ীর মতো তোমার শরীর, কেমন কু-ঝিকঝিক গন্ধ।  


উছল

রাত আসে, ছুঁয়ে যায় কামরাঙা নদীর আঁচল। কিছুদিন বৃক্ষতলে ছায়া হয়ে কাটিয়েছি মহুয়ার কুসুম নেশায়। পরাঙ্গী ধানের গন্ধে কতবার হারিয়েছি কৈশোরের নবান্ন সকাল। হেমন্ত উড়াল দিতো ধনেশের ডানায় ডানায়। আমারও পিদিম ছিলো, জ্বালিয়ে রাখতে গিয়ে নিভে যেতো প্রতি পূর্ণিমায়। পাখিদের বিমগ্ন শরীরে মিহিদানা চাঁদের পরাগ। কতটা বাঁধবে তারে, টপ্পার আসর থেকে যে সময় পালিয়েছে একা। যে সময় ফাঁকি দিয়ে নিয়ে গেছে কুমারী প্রাচীন- ছাতিমের প্রহর মৌনতা। তুমি যাই বলো অহল্যা জীবন ছেড়ে কোথাও যাবনা, আমিও  পাথরে পাথর হয়ে শুয়ে রবো দ্রাবিড় ধূলিতে। তুমি প্রাণ খুলে ডেকে যেও, ডেকে যেও বুকের সারস। জলাঙ্গী কী দেবে জল, রাতপোড়া রোদের উছল।


নদী ও হারিয়ে যাওয়া গল্প

তখন নদী মরে গিয়ে জন্ম নিতো অজস্র কবুতর। তারা বৃক্ষের ডাকবাক্সে চিঠি এনে দিতো। এখন রোজ টেলিফোনে কথা হয় তোমার সাথে- তাপমাত্রা ও পাখির মাংশের স্বাদুতা নিয়ে। যদিও তোমার অবস্থান এবং রান্নাঘর বিষয়ক কোন তথ্যই আমি জানি না।

ঠিকানা পেলে একদিন ট্রেন চালিয়ে চলে যাব তোমার বাড়ি।

শুনেছি অন্ধকার ভালোবাস তাই জোনাকীরাও তোমার শরীরে বাসা বাঁধে। দশ আঙুল না কী ফড়িংপাখি, কেবল উড়াল দিতে চায়।

সব পথই হারাতে জানে ; শুধু তুমি হারালে না।

এসো, ঝরা পাতার কাছে বসন্তের প্রার্থনা করি; নদীর কাছে নতজানু হই।
এসো, শিশুদের সাথে আরও একবার বড় হয়ে উঠি।


সূর্যাস্ত ও নির্জন ট্রেনের গল্প

সূর্যাস্তের দায় কম, তাই ফিরে গেছে দোলনচাঁপা।
ঊণপঞ্চাশ পাতায় যে বাতাশ বুনে রেখেছো তার নামতা এক একটি নুনগাছ।

আয়ু থেকে ধার করা কিছু রাইশষ্যের পাখি ঠোঁটে হেমন্ত নিয়ে উড়ে যাবে,
চারুকলা থেকে জাদুঘর।
এখানে পথ পরিবাহী কাঁচের মতো; তুমি অক্ষরের দিকে বেঁকে যাও।

শীতের শরীর থেকে রোদ্দুর আসে- জয়তুনে মৈথিলী শিস।
কোন গন্ধ মার্বেল পাথর নয়, তবুও শাদারঙ গড়াতে গড়াতে চালতাফুল।
হাত বাড়ালেই আহ্নিক গতি।

কাল এসো, এক নির্জন ট্রেন তোমাকে দেবো।


হেমন্ত ঋতু আমার ছদ্মনাম ছিলো

কাঠ চেরাইয়ের শব্দ আর গাছেদের ঘরবাড়ির কথা ভাবতে ভাবতে কখনও তারাবাজি হয়ে জ্বলে উঠি।

চায়ের টেবিলে কেউ কেউ জানতে চায় পাখিরা কোন কবির নাম জানে কি না। আমি হেঁটে যাই- ফুরিয়ে যাওয়ার আগে আর একবার নদী দেখতে যাবো। স্রোতের সাথে বন্ধুত্ব স্মৃতি হয়ে থাক।

এ শহরে করাত কলের মালিকেরা মূলত বৃক্ষপ্রেমী। তারা দ্রাঘিমায় হাত রাখলেই আকাশে নিজস্ব চাঁদ ওঠে। রাতের বৈঠকে তারারা বেড়াতে আসে।

আমার প্রেমিক হওয়া হবে না। আমি এখন ব্যক্তিগত ষড়যন্ত্রের শিকার। সার্কাস বালিকার মতো আমার উড্ডীন। আঙুলের ডগায় ডগায় বনস্পতি ফুল।

ভুলে যাই হেমন্ত ঋতু কখনও আমার ছদ্মনাম ছিলো।

১০
বিষণ্ণ ভায়োলিন

তোমার ঘরে এলেই বিষণ্ণ ভায়োলিন বেজে ওঠে….

তুমি দূরত্বের মতো একা- তোমার নিঃশ্বাসে অক্সিজেনের নাকফুল।
শরীর ভর্তি চারশো কোটি ক্যালেন্ডারের তারিখ।
আলনায় দিগন্ত ঝোলানো শাড়ি- জমিনে পুরাণের কারুকাজ।

আমি জানি, তুমি একদা দ্রৌপদীর সতীন ছিলে।

সাজানো পুতুলগুলো অ্যাপ্রোন পড়া নার্সবোন। যেন হাসপাতালের মর্গে বসে ঘড়ির সময় গোণে আর আবেস্তা ভাষায় রবীন্দ্রনাথের গান গায়।

করম্চা ফুলের মতো তোমার শিশির, ছোঁয়ার আগেই সামনে এসে দাঁড়ায় এক প্রাচীন আয়না। বলে- আমি তোমার বউ গো…. বউ।

আমি শরীরের ধূলো সরিয়ে দেখি-
বউয়ের ভেতর আমার চার কলসি জীবন।

১১
তীব্র নৈঋত

নিমবন- আহা নির্জন ও ছায়া।

ইচ্ছা হয় দূরকে কানামাছি বলে ডাকি। কেমন অন্ধ রোদ্দুর, চারপাশ মর্মরধ্বনি
ছুঁয়ে দিলে কোন কোন নদীও সন্ধ্যাতারা।
    এই পথে বেকে গেছে ঘুম- একটু দূরে রাত্রির বাড়ি।

কিছু অভিমান নিয়ে নিমফল ঝুলে আছে শ্রাবনের দিকে।

ঋতু বদলের মতো একা, এই চুম্বনবেলা; অজস্র বিশ্রাম শেষে জলঘুঘুও বেড়াতে আসে
ডানায় সাঁতারচিহ্ন- তীব্র নৈঋত।

এখানে ক্লান্তি নিমিশেই চিল- পাতা ঝরে গেলে আয়ুরেখায় আটকে থাকে শ্বাস।

১২
লালঘোড়া ও শৈশবের ছায়া

শুনেছি লালঘোড়ার শরীরে প্রথম বসন্ত আসে, তারপর অরণ্যে, আরও পরে কবিতায়।

শহরের ক্যাসিনোতে যখন রাত নামে, নাচের আঙুলগুলো আশ্রয় নেয় নিজস্ব তরলে। তখন আটটি ঘোড়া দৌড়ে আসে রমনার বাগানে।

রমনা কি নদী, নাকি পাহার ছিল; নইলে জাদুঘর জুড়ে এতো জলের স্মৃতি কেন?

একবার হারিয়ে গিয়েছিলাম- প্রথমে আমি, তারপর ফিঙেপাখি আরও পরে সাঁওতাল রমনীরা।
ফিরে এসে দেখি, তোমার আইফোনে অমরত্বের ছবি
    তুমি সরলরেখার মতো লম্বা ও নি:সঙ্গ।

আমি মূলত তোমাদের শৈশবের ছায়া। পাতার বাঁশি বাজাই আর খুব গোপনে খুঁজি ফিরি পৃথিবীর প্রথম অশ্বারোহী।
    ঈভ…. নাকি অদিতি।

১৩
পৃথক খনিজ

কার কাছে নতজানু হই, রেখে যাই আমুল প্রার্থনা। হেলেঞ্চা লতার বনে শিশিরের মুক্তি ও মৃত্যুর ঘ্রাণ। তীব্র উষ্ণতায় গলে শতাব্দীর আম্রপালি তৃষা। এই নাও ইহজন্মের প্রথম পরম, যারে বেঁধেছিলাম শূন্যতার গোপন সূতায়। প্রতিদিন উড়ে যায় গন্ধর্ব পরাগ- ঘুম বদলের প্রাচীন কাহানী। হাজার বছর শুয়ে থাকে মৃত্তিকা ও কালো অন্ধকার- একই আগুনে পোড়া পৃথক খনিজ। আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাসের অক্ষরে নৈঃশব্দ্য লিখে রাখি, লিখে রাখি বিপন্ন রাতের নিশা। গোলপাতা বনে হরিণের চিরল উৎসব। অববাহিকায় নেমে আসেন ঊর্বশী। পায়ে রাঢ় বাংলার নদীর মুদ্রা। স্রোতগন্ধে ভেসে যায় জন্মান্তরের মাতাল ছায়া। ও গাঙবালা- কোন পাহাড়ের বউ তুমি, না কী প্রেমভর্তি বিপুল পলল।

১৪
নৈঃশব্দ্যের বাড়ি

এরপর তৃষ্ণা এলে আমি পান করে নেবো ক্যানভর্তি ঘুম। গোয়েন্দার কাছে ফাঁস করে দেবো আপেলতত্ত্ব আর পতনের লাল ডায়েরী। নারীকে প্রীতিভোজে ডেকে দেখাবো জল ও দীর্ঘশ্বাসের পাথর। এইভাবে সব উড়াল অংক সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে নেমে যাবে। আর একটা শাদা বাড়িতে কী সুন্দর বাস করতে থাকবো আমি একা, অন্ধকার। তুমি কাঞ্চি পাথরে শরীর আঁকতে আঁকতে হয়ে যাবে যুগল দহন। সময়ের সোমরাতে এসো, মুগ্ধ নিষেক ছুঁয়ে ডাক দিও- আমি দিয়ে দেবো আমার নৈঃশব্দ্য।  

১৫
উড়াল

এখনো ভীষণ তৃষ্ণা। কপোতাক্ষ মরে গেছে বুঝি বুকের চড়ায়। পাতাঝরা উষ্ণ অভিমান- ঋতু আসে ঋতু যায়; নির্জন ঘুমিয়ে থাকে নিষাদ জঠরে। যে যাবে যেতে দাও, জিরাফের উঁচু চোখ কোনদিন খুঁজবে না তারে। বাতাশের হাওয়ায় ওড়ে পাহাড়ের আদিবাসি ঘুম। কুয়াশারা ডুবে যাবে বালিকার তুমুল শ্রাবণে। মৃত্যুও অমরত্ম পাবে এইসব খেয়ালী বেলায়, জ্যোৎস্নার তামাম বুকে মৃত অন্ধকার। বাল্মীকির ধ্যানে শরবিদ্ধ অন্য পাখি। ফুরাতে ফুরাতে দীর্ঘ হয় সময়ের আয়ু- শূন্যতার লবঙ্গ উড়াল। আমিও রাত্রি জাগি, রাতভর্তি আপেল গড়ায়।

১৬
অথৈ পুরাণ

দূরে যাব। বিষণ্ণ রাতের মত দূর। গোল অন্ধকারে দাঁড়িয়ে নিজেকে ডাক দেবো ফের। অজুদ অতল থেকে খুঁজে নেব মেঘনাচের অথৈ পুরাণ। রাংতা পাতার বনে কুসুমের মৃত হাহাকার- চন্দ্রধ্বনি নিশা। অগ্নিপারা ছুঁয়ে যাবে যৈবতীর প্রথম সন্ন্যাস। আরো দূরে সময়ের অস্থির পালক। নক্ষত্র পরীর ডানায় ছোপ ছোপ সারেঙ্গী হাওয়া। যে পাথরে হাত রাখি তার নাম নীলা। নদীও পাথর হয়, জলের গোপন জলে চূর্ণ পরকীয়া। আজ রাতে উজ্জয়নী ছেড়ে যাবে অসংখ্য রমণী; আজ রাত ফেটে যাবে গুচ্ছ গুচ্ছ অলকায়।

১৭
লাটিম

শিকারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি স্তব্দ বেড়াল, আমার ছায়া।
তবুও দাঁড়াতে পারিনা-
পিতামহের চৌহদ্দি, বালিকার হেতালসন্ধ্যা; কোথায় পা রাখি।
    সারারাত পাঁকতে থাকা ডুমুরের শব্দ, আমাকে তাড়াতে থাকে।

পাতার অবেলায় যে মান্তুল ছিল, আজ তা নিঃসঙ্গ জিরাফের গলা। ভ্রমণের ক্লাসে বেজে ওঠে সাঁতারকাটা জাহাজের ভেঁপু।

আমার ভেতর ঘূর্ণি বলে কিছু নেই, তবু রাশিচক্রে আমিই লাটিম। কন্যার পরকিয়ায় কেবল হাঁটতে থাকি সরাইখানার দিকে।

এপথে তুমি এসো না, যাত্রাবিরতী হবে।
    আমাদের জোড়া ঘুম আপেলের আরও একটি পতন।

১৮
প্রজাপতি ও মানচিত্রের পৃথিবী

চোখ খুলে আরও একবার দেখে নিতে পারো, তোমার নাচের  মুদ্রায় যে রঙ ছিলো তার নাম অন্ধকার। সাতটি প্রজাপতির সাথে নিজেকে ছেড়ে দিলে-  রোদ্দুর তোমার ছায়া।

একবার ছদ্মবেশে গাঁয়ের নদীও ঘুরে যাবে ইস্কুলবাড়ি। ভূগোলদিদির চোখ ফাঁকি দিয়ে মিশে যাবে সমুদ্রের জলে। শুধু ঈর্ষাকাতর মানুষেরা বুঝবে না কী ভাবে ঘড়ির কাঁটা ঘোরে।
তোমাকে দেখার জন্য কেন প্রতিমাসে চাঁদ পূর্ণিমা হয়।

শিকারী পাখিরা জানে পৃথিবীর কোনপাশ চাপা। কোনদিকে ফুটে আছে চাঁপাফুল, মশলা ও  উষ্ণতার মায়া।

তবু জানি, কোন দেশের মানচিত্রে কোনদিন প্রজাপতি আঁকা হবে না।

১৯
আট কামরা ও দশ দরজার রেলগাড়ি

খুব কাছ থেকেই তুমি দীর্ঘশ্বাস। তোমার ভেতর ইস্কুলবাড়ির কোলাহল, ছেঁড়া-খোড়া চৈত্রের বসন্ত। শুরু ও শেষের ঘণ্টা তুমিই বাজাও।

ইতিহাসের শাদা ঘোড়ার মতো তুমিও অবসাদ পুষে রাখো;
কখন ছুঁয়ে দেবে পাথরের প্রথম পাতা।

একদিন গল্পের সন্ধ্যায় তুমি চারুপাঠ হয়ে উঠলে। শরীরভর্তি স্বরবর্ণ আর একতারার বাজনা। হাত নেড়ে জানালে তুমি মূলত একটা সড়ক, একে বেঁকে কোথায় যাবে জানো না।

তারপর থেকে আমিও জ্বেলে রাখি কালো আগুন।
চোখের সামনে রেশমী সূতায় বোনা রাত।

এভাবে দূর খুঁজতে গিয়ে এখন আমি আট কামরা ও দশ দরজার রেলগাড়ি।

২০
সাঁওতালি নদী

আমার জন্মের পরে যারা শাঁখ বাজিয়েছিল, তারা কেউ আজ বেঁচে নেই। অথচ রোজ ক্যানভাস থেকে উড়ে যায় সাতঝাঁক পাখি।

মায়ের চোখের গভীরে যে চৈত্রমাস ছিল, তার একপ্যারা অনুবাদ আমি।
আজও জন্মের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালে ঘুমের মতো ভেসে ওঠে
প্রথম দেখা মায়ের মুখ- কেমন খুশিখুশি জাফরান কন্যা।

আমি যখন প্রথম কেঁদেছিলাম- দাদি-দিদারা তখন খুব হেসেছিলেন।
বড় হতে হতে সেইসব নারীদের আর দেখিনি-
তবুও তাদের জন্য এক সাঁওতালি নদী বুকের ভেতর রোজ বড় হয়।

রোজ নক্ষত্রের ওপার থেকে নেমে আসে মাঠ, নেমে আসে বেহালার সুর।
খুঁজে ফেরে তাকে, জন্মমাত্র হেসেছিল যে; যার বুকে অজস্র জলের শব্দ।

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E