৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুন ১০২০১৭
 
 ১০/০৬/২০১৭  Posted by

পরিতোষ হালদার-এর ১০টি কবিতা


নাচঘর

হরিণগুলি মাংসের শব্দ শোনে। তার সমস্ত ইন্দ্রিয়, প্রাণ স্মৃতির দিকে ধাবমান।
তবু তারা নাচকে প্রত্যাক্ষাণ করে না, ঘুঙুরকেও না।

সামান্য ওমের কাছে হেতালের বিষণ্ণ ছায়া।
মনে পড়ে ইতিউতি, ব্যক্তিগত কূটাাভাষ আর দৌড়ের জটিল জীবন।

তবু মৃগয়া এক উদ্ধত রসনার নাম।

রক্ত ঝরে পড়ে, হরিণের করুন চোখ তাকিয়ে থাকে।
নর্তকীর পায়ে শতাব্দীর স্ববিরোধ- মিথ্যা ও অমরত্বের মুদ্রা।
ঝাড়বাতির নীচে কতো চরিত্র- মাতাল, মুখোশ পড়া।

দেখতে দেখতে তার ঘৃণা থাকে না, কান্নার ইচ্ছা থাকে না, শুধু কিছু উজ্জ্বল ছুরির নীচে সমর্পিত হয় নির্দ্বিধায়।

শরীর, আঃ কী নির্জন মালকোষ।

একসময় চরিত্রগুলি ফিরে যায়, নাচঘর দাঁড়িয়ে থাকে, যেন দুইজন্মের ছদ্মবেশ।
যার চারপাশে শিল্প আর মাংসের ঘ্রাণ।


জাদু

পরিবেশ তখন পরকালের মতো বিস্ময়।

যে দিকে তাকায় মানুষ দেখে। মানুষগুলো মানুষের মতো-
জাদু ও বাস্তব।

হাততালির ভেতর থেকে দুশ্য বদলায়…..

মঞ্চে মুখোশ পড়া রাবণ, যিনি পাপ ও প্রেমের দশটি মুদ্রা দেখায়।
মুদ্রাগুলি কমলালেবুর মতো চাপা।

এভাবে রূপ খুলতে খুলতে একজন জাদুওয়ালা বিবস্ত্র হয়ে যায়।
দর্শকের চোখে তখন ঘোরলাগা মধ্যরাত।
তারা তাকিয়ে আছে ম্যাজিক ও নগ্নতার দিকে….

এবার মঞ্চ কাঁপিয়ে ঘোষণা আসে-
দর্শক, ক্রমাগত জাদুর থেকে নগ্নতাই লৌকিক।


ঘোড়া

নিজের ছায়ার সাথে খেলে সে। শরীরে ইহ ও পরার অজস্র নদীর নক্সা।
রটে যায় কোন এক জন্মে ঘোড়াটি আগুন ছিল।

সে আগে দৌড়াতো, পিঠে ধনুরাশির জাতক।
কন্যার আবর্তন জানে বলে ঘোড়াটি আজও ঘাস খায়। ঘাসের সাথে ঘাসের সম্পর্ক খোঁজে।

কেউ বলে কিংবদস্তি থেকে পালিয়ে এসেছে, ওর ছায়ায় মৃত্যুর রঙ।
কেউ চিৎকার দেয় ও সার্কাসের প্রাণী, শোন ক্ষুরে তক্ষশিলার শব্দ।
অনেকের সন্দেহ যুদ্ধ পরবর্তী এ এক মায়া।

সাহস করে এক কিশোর ঘোড়াটির পিঠে চড়ে বসে,
অমনি সে দৌড়ে পশ্চিমে যায়।

সেই থেকে গ্রামের মানুষ, অমরত্ব পাবে বলে খুব তাড়াতাড়ি ঘুমাতে চায়।


আয়না

একটি আয়না দুজন দেখছে। নারীটি স্বরবর্ণ, অন্যজন ফেটেপড়া শব্দ। তাদের সংসারের মতো হাত-পা-মাথা, চোখ যেন নদী, বাকী শরীর অরণ্য।

হঠাৎ আয়নাটা হাত থেকে পড়ে চৌচির হয়ে যায়।
দুজন লাফিয়ে ওঠে এবং টুকরো টুকরো কাচের ভেতর অজস্র সংসার-নদী-অরন্য দেখে, বস্তু ও প্রকৃতি দেখে।

তারা গুছিয়ে নিতে পারে না তাদের মহাজগৎ।

একসময় ক্লান্ত হয়ে পরাস্পরের দিকে তাকায়, দেখে তারা মূলত একজন এবং এক হাসিতে চমকে ওঠে।
ঠিক পূর্ববর্তী আয়নার মতো।


জায়া

শিকারকে ঘিরে যারা নাচতে থাকে, তারা ছির ঋতুপ্রাপ্ত ও আনেক বেশী কলাপ্রবন।
তারা জানে একমাত্র নারীই একজন পুরুষকে
সন্তানরূপে জন্ম দিতে পারে।

নাচতে নাচতে কেউ কেউ মরে গেল।
এটা খুবই ন্বাভাবিক বিশ্বাস যে , মৃত্যুই জস্ম নেয়ার পূর্বূশর্ত।

একসময় আগুন জ্বলে উঠলো এবং অরণিবৃকোষর কাছে ঊণপঞ্চাশ ঠারে প্রার্থনা জানালো নারীরা।
এভাবে শরীরে রাত এলো, তুলতুলে জ্যোৎস্না এলো এবং তারা এক একজন পছন্দের পুরুষকে ডেকে নিলো।

মাতৃত্বের জন্য কোন আঁড়াল নিলো না।


পাখি

কবির সাথে তার ভাব হয়ে যায়।
কবি তাকে রোজ কবিতা শোনায়, কবিতার গল্প শোনায়।

পাখিটি ক্রমশ জেনে যায়, পুরাণ-এপিক-ইতিহাসে তার ভূমিকা।
ক্রোঞ্চ, কপোত, রাজহাঁসের জন্য গর্ব হয়।
বুঝতে পারে কবিতায় আছে অজস্র পাখির শব্দ, অজস্র নন্দন।

একদিন কবির ঘরে আরো কবি এলো।
কয়েকপদ পাখির মাংসের রসনার সাথে আলোচনায় এলো
চর্যাপদ থেকে আধুনিকতা।
মদপর্বে পিজিয়ন ফ্রাই।

পাখিটি জেনে গেল- কবিরাও পাখির মাংস খায়।

পাঠপর্বে তাকে ডাকা হলো, পাখি এলো না, বাল্মিকরাগ পরিবেশনেও
সে এলো না।
কবির অন্তর কেঁদে উঠলো এবং একসময় সে জেনে গেল-

অরণ্যের পথে যেতে যেতে পাখিটি শিকার হয়ে গেছে।


আপেল-এক

আপেল পতনে কেঁপে ওঠে দুজন এবং তাদের আত্মদর্শন
শরীরদর্শনে এসে দাঁড়ায়।
দেখে আপেলে মাধ্যকর্ষণের মাংস।

কোন এক জন্মে আবার পতনের নিশ্চয়তা দিয়ে আপেলটি ফিরে যায় বোটায়।
ঠায় দাঁড়ানো দুজনার বোধে তখন একজন নিউটন ও একটি
প্রাচীন পুষ্পহীন গাছ।

তারা ফিরে আসে সংসারে- মেষপালন আর চাষাবাদের কাছে, জন্মের বিবিধ ঋণের কাছে।

তবুও স্বপ্নে কিছু আপেলগাছ রোজ বড় হয়, রোজ তারা নতুন করে বুঝতে পারে-
আপেল একটি চুম্বনগামী ফল।


ত্রিভূজ

তৃতীয়জন প্রেম নিবেদন করে প্রথমজনকে।
প্রথমজন তা ফিরিয়ে দেয় কারন সে ভালবাসে দ্বিতীয়জনকে, যে একজন মানুষ।

প্রত্যাক্ষিত তৃতীয়জন উদ্যানটিকে ধ্বংস করে দিতে থাকে; সে মনে করে সে যা সৃষ্টি করেছে
তা ধ্বংস করার অধিকার তার আছে।
এমনকি সে প্রথম ও দ্বিতীয়জনকে সৃষ্টি করেছে অতএব তাদের ভোগ করার মালিকও সে।

একটি ফলবান বৃক্ষের তলে প্রণয়পর্ব শেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয়জন দেখে উদ্যানটি ধ্বংস হয়ে গেছে।
তারা তৃতীয়জনকে অভিশাপ দেয়- সে বীর্যহীন হয়ে পরে।

শাপগ্রস্থ তৃতীয়জন সেই থেকে ব্যাপক সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করে।


আয়না-দুই

নিজেকে দেখা শেষ হয়না তার।

আরো স্বচ্ছ, আরো নিমগ্নের ইচ্ছা জাগে।
এবার মেয়েটি বানিয়ে ফেলে একটি আয়নাঘর, যার ছয় দিকেই প্রতিবিম্বের কাঁচ।

দিন যায়, রাত যায়- আত্মদর্শন যায়না তার।

সাড়া না পেয়ে একদিন দরজা ভেঙ্গে বের করা হলো মেয়েটিকে।
প্রচাার হয়ে যায় তার দিকে তাকালে যে কেউ অন্তত একবার ভবিষ্যৎ দেখতে পাবে।

এ খবরে প্রায় সবাই হুমরি খেয়ে পড়লো মেয়েটির মৃত শরীরের কাছে।

১০
জাদুকর

লোকটি সবাইকে ডেকে বলে- দেখো, একটু আগে একজন এসে আমার মুখোশ খুলে নিয়ে গেছে।
হাতে যে গোলপাত্র ও গোলক ছিল তাও নিয়ে গেছে।
আর অশত্থগাছের নীচে যে ঘোড়াগুলি দেখেছ একটু পরে তার কয়েকটা
আমাকে নিতে আসবে।

কথা শুনে পরিবারের সবাই সবার দিকে তাকায়, দেখে তারা একরকম
ঠিক লোকটার মতো।

মনে হয় দূরে কোথায় যেন লাল কাপড় উড়ছে….

ঘোড়াগুলি আসতে থাকে- তারা কাঁদতে চায় কিন্তু চোখে জল আসে না।
সামনে তাকায় দেখে-

মুখোশ খোলা লোকটা যেন শান্ত ছাতিমগাছ।

পরিতোষ হালদার

পরিতোষ হালদার

পরিতোষ হালদার
যোগাযোগ : ০১৭১২-৮৯৯১৪৭
paritosh.a.halder@gmail.com

 

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E