৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ২৫২০১৬
 
 ২৫/১০/২০১৬  Posted by

‘স্বপ্নের উদ্গমধ্বনি’ ও গৌরাঙ্গ মোহান্ত
– উমাপদ কর

কবি উমাপদ কর

কবি উমাপদ কর

জলময়ূরের শত পালক

বদলাতে চাওয়াটা স্বাভাবিক জীবনের অভিসার। স্থিতাবস্থা থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে মানুষেরই। এই অভিসার আর ইচ্ছের মধ্যে দুলতে থাকা মানুষদের কষ্ট আর যন্ত্রনা কবিতায় দেহ রাখে যখন, মূর্ত আর বিমূর্ততার মধ্যে তখন তুমুল সংরাগ। শান্ততারও একটা তাপ আছে। স্নিগ্ধতার আছে বাতাস। স্মিততায় আলো। শুদ্ধ জল তখন গড়ে তোলে প্রাণ। আলো হয় পথের দিশারী। প্রচলিত পুরোনোর মধ্যেও প্রাণ। সেখানেও আলোর উদ্ভাস। শব্দ নির্বাচন যতই প্রচল আর প্রায়সই সাধুভাষা-ভার বহন করুক, তাতেও রচিত হতে পারে ভাবনার কল্পিত ময়ূরপাখাটি। “জলময়ূরের পালক জাগিয়েছে বুকে অপার উত্তাপ।/ হৃদয়-সূত্রে গেঁথে যাবো অরুণাভ কিংখাপ।’ বা ‘দুর্বহ কান্নায় অদূরে নেমে আসে আকাশ।/ সজল হিজলের শাখায় জাগে সন্তাপী আভাস’। আবার আঙ্গিকের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে অভ্যাসে হোক আর টানাপোড়েনেই হোক টানা গদ্যের মধ্যেও পুরে দেওয়া যেতে পারে সাধুর গম্ভীর স্মিততা আর নিজস্ব কবি প্রকৃতির শান্ততা। ‘ক্রমাগত গতিশীল হতে থাকে বালুর রুপালি ও কৃষ্ণ কণা – তারা নির্বৃক্ষ প্রান্তরে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মেডুজার করাল চুলের অবগুন্ঠন রচনা করে।’ কল্পিত পাখাটি ব্যাঞ্জনাময় হয়ে ওঠে। ভালো লাগে। এও এক ভিন্ন স্বাদ। এক ছিটকে বেরোনোর প্রয়াস অভিসার।

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

এই কবিতার বইটি পড়তে পড়তে আমার উপরোক্ত কথাগুলো মনে হয়েছে। আমি এই কবির যে কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ পড়েছি, তাতে অভিসার কথাটি খুব যায়। আসলে বলতে চাইছি কবিতা যাত্রার কথা। এ যাত্রায় হয়ত কোনও বহেমিয়ান ভাব নেই, নেই কোনও বিজ্ঞাপন। কিন্তু একটা সতত প্রবাহ আমি লক্ষ্য করি। কিসের এই যাত্রা? কোথা থেকে কোথায়ই বা? নিজেকে পাল্টাবার, বদলাবার এই যাত্রা। যেখানে নিজের সমকালিন স্থান, সেখান থেকে নিজেকে ছাপিয়ে অনাবিষ্কৃত কিছুটা অনিশ্চিতে যাওয়ার প্রয়াস। তাহলে প্রশ্ন ওঠে কেন? উত্তর, আমার মতে সন্ধান। কিসের সন্ধান? স্বপ্ন সন্ধান। সেই স্বপ্ন, যা রোজ চোখে অন্য যাপনের সুর্মা লাগায়। সেই স্বপ্ন, যা একটি স্বপ্ন-কবিতার জন্য প্রতিদিন নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকে। সেই স্বপ্ন, যা জেগেও দেখা যায়। সেই স্বপ্ন, যার বিকল্প সূক্ষ্মতা শুদ্ধি আর মোহমুক্তি।

আমার ভালোলাগা একটি কবিতা।

ডা য় ম ন্ড  ব্লে ড

ব্যথাতুর মৃণালে জেগে আছে স্নো-পদ্ম। ভাইবারে ভেসে ওঠা শুভ্র দ্রাঘিমা ক্রমশ উন্মোচন করে ইলেকট্রন-অঙ্কিত ত্রিভুজতত্ত্ব। বহির্ফ্ল্যাটে ডায়মন্ড ব্লেড কেটে চলে স্বপ্নবর্ণ টাইলস। ঝনঝনায়মান আকাশের শীর্ষে ওড়ে পদধ্বনিময় রুমাল। চেতন-অবচেতনকে কাঙ্ক্ষিত ব্লকে কেটে জন্মগন্ধময় মৃত্তিকায় খাড়া করবার চেষ্টায় থাকি নিয়োজিত। অনুচ্চ ভবনের পাশে পড়ে থাকে শুকনো, পচা, তাজা রক্ত। রক্তসাক্ষ্য স্বীকার করে না ম্লানতা; ধুলোকণায় রেখে যায় মিহি উজ্জ্বলতা, বাতাসে সতেজ স্নো-স্বপ্ন।

ট্রোগনের গান

যে কথা বলছিলাম। সন্ধান। বদলানোর সন্ধান। নিজেকে একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে রেখে, নিজেকেই ছাপিয়ে যাওয়া। অনির্ণিত ও অনিশ্চয়ে পা বাড়ানো। বোধ অনুলিখনে সূক্ষ্মতা। অনুভব প্রতিফলনে শুদ্ধির পারঙ্গমতা। এখানে কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত একটা নিজস্বতাকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি বই-এর প্রথম কবিতার নাম রাখছেন ‘পানকৌড়িবোধ’। চিন্তা চেতনাকে যখন বাড়িয়ে নেওয়া যায় বা সম্প্রসারিত করা হয় তখন পানকৌড়িবোধ অনুভবে আসে। আবার শেষ কবিতার নাম ‘পাখিসত্তার ক্রন্দন’। এই সত্তাটি যে কবির নিজের বা যে পাঠক পড়ছেন এবং পুনঃসৃজন করছেন তার, সে কথা বলে দিতে হয় না। এ কোনও প্রচল ছাঁদের কবিতা নয়। টানা গদ্যে লেখা অনুভবের অনুবর্তন। বিবরণ ও বর্ণনাহীন। নাটক ও বলে ফেলতেই হবে এমন বিষয়বিহীন। পদ্যের গোটাভাব গোদামূর্তি আলুনি বক্তব্য এখানে অপ্রতুল। বুঝে ফেলতে হবে এমন প্রেরণা যেমন অনুপস্থিত, তেমনি প্রসারিত স্পেস-এ মৌহর্তিক অনুচেতনার সহস্র কিরণে নিজের রশ্মিটিকে মিলিয়ে নিতেও কোনও বাধা নেই। আমি তো এই বই-এ সেভাবেই বেজে উঠেছি বারবার। সমমেলে এবং সমান্তরালেও। কখনও থম মেরে বসেছি, ভেবেই গেছি, তারপর ইঙ্গিতের আড়ালের কোনও টোকা, কোনও মোচড় আমাকে আবার বহতা নদী করেছে। কখনো আলো এসে পড়েছে ভেতরের অন্ধকারে অনাবিষ্কৃতে। চমকে চিনেছি নিজেকে, প্লুত মনে হয়েছে নিজেকে, কী আহ্লাদ কী আহ্লাদ! কবিতার কাছে আর কীই বা চাইতে পারি আমি! হ্যাঁ, প্রকরণের যেমন শেষ নেই, শুদ্ধিও অন্তহীন। কিছু শব্দে, বা পরপর শব্দ সাজানোয় হোঁচট খাওয়া তাই থাকতেই পারে। ভাবনাকে যে শৈলী বয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেখানে শব্দের ধার ভার প্রক্ষেপণ একটা ফ্যাক্টর তো বটেই। বিশেষতঃ কবিতার শ্রাব্যতার কথা ভাবলে। অবশ্য সেও কবি থেকে কবি, পাঠক থেকে পাঠকে বড়ই আপেক্ষিক। যেমন আমার, ‘পাখিসত্তার ক্রন্দন’এর চেয়ে ‘পাখিসত্তার কান্না’ অনেক বেশি হৃদয়গ্রাহী মনে হয়। আরেকজনের তা মনে নাও হতে পারে। পরপর দুটো ভারী শব্দের বুনন, হয়ত আমার কান ঠিক নিতে পারে না। আরেকজন নিতেও পারেন। ক্রন্দনের চেয়ে কান্নার আকূতি ও কষ্টানুভূতি আমাকে যেভাবে আকূল করে অন্যের কাছে সেটা ফ্যাক্টর নাও হতে পারে। ফলে এসব নিয়ে তর্ক চলে না।

এবার তবে একটা কবিতা হোক।

জ ল ঘু ড়ি

এ বাতানুকূল কক্ষে রং ছড়িয়ে রাখে না আরব সাগরের ঝিনুক। তবুও সমস্ত শ্বাসযোগ্য বাতাসে ওড়ে ঝিনুকের জলঘুড়ি। ঘুড়ির আশ্চর্য উড়ালরেখা ভরে থাকে হিমচাঁপার আলো আর গন্ধে। চাও ফ্রাইয়ার বক্ষে টাল খেতে খেতে শেষ বেলা চলে যাবো কোনো এক ভিড়প্রবণ স্কাইট্রেন স্টেশনে। স্কাইট্রেনের সাথে পাল্লা দিয়ে উড়ে যাবে জলঘুড়ি— হিমচাঁপাকোমল উজ্জ্বলতায় জেগে থাকবে আমার জল-মৃত্তিকা-বাতাসহীন ব্যক্তিগত পথ।

বিঃ দ্রঃ – এই জলঘুড়ি ব্যাপারটা কী? খায় না মাথায় দেয়? এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। সহৃদয় পাঠক, অনুরোধ করি, অনুধাবন করুন। সেটাও হোক খোঁজের একটা অংশ।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E