৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ২৪২০১৬
 
 ২৪/১০/২০১৬  Posted by

স্বপ্নাচ্ছন্ন এই আসা-যাওয়া
– কুমার চক্রবর্তী

কবি শামসুর রাহমান

কবি শামসুর রাহমান

কবির জন্যে কী ভূমিকা রাখে রাষ্ট্র, অথবা রাষ্ট্রের প্রতি কবির ভূমিকার স্বরূপটি কেমন? এ প্রশ্নের উত্তরে বিড়ম্বনাগ্রস্ত হতে পারেন অনেকে, কারণ এর কোনো দ্ব্যর্থহীন, স্পষ্ট ও বিশদীকৃত উত্তর নেই, উত্তর হয়ও না। রাষ্ট্র কবির প্রতি ভূমিকা-প্রশ্নে প্রায়শই বিলম্বিত, দ্বিধাগ্রস্ত ও শ্লথ ব্যবস্থার আয়োজক  হয় আর রাষ্ট্রের প্রতি কবির ব্যাপারে কবিরাও বহুস্তরী এবং বহুমাত্রিক জটিলতায় আক্রান্ত হন। আড়ষ্টতাগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র ও সরকার, ভেতরে ভেতরে পতিতও হয় গোলকধাঁধায়, মূল্যায়নের বিষয়ে তাই তারা খেই হারিয়ে বসে নিমিত্তে। অন্যদিকে কবিরাও ভোগেন চরম দ্বন্দ্ব ও দ্বিধায়, এবং আশাহীনতায়। নিজের ভেতরে যাঁরা আত্মার প্রদীপ জ্বালেন, যাঁরা অনন্য বিমূঢ়তায় থিতু হয়ে থাকেন হৃদয়ের পার্থেননে, যাঁরা জলের ওপর দিয়ে হেঁটে যান অজানা গন্তব্যের দিকে – তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রিক, সামাজিক, পারিবারিক ও রাজনীতিক দায়িত্ব এবং ভূমিকার বিচলনে তাঁরা আঘাতপ্রাপ্ত হন, এবং এর ফলাফল হিসেবে দেখা দেয় অভিমান ও আত্মপ্রত্যাহৃতবোধ। বস্তুত কবির প্রতি এই প্রচলিত মনোভাবগুলোই রাষ্ট্রিক নৈরাত্ম্যবোধের জন্য দায়ী। কিন্তু কেন?

আমরা যাকে জ্ঞান বলি তার নানামুখীন উৎকেন্দ্রিকতা এবং আবর্তন রয়েছে। সাধারণত জ্ঞান উচ্চারণের সাথে-সাথেই আটপৌরে ও প্রথাবদ্ধ মানুষ এর কুসংস্কারগ্রস্ত ধারণায় গর্বিত ও স্ফুরিত হয়ে ওঠে, তারা স্বচ্ছন্দ্যবোধ করে জ্ঞানের মহিমাক্রান্ত প্রতিপন্নের দ্বারা। তারা জ্ঞানমুখী ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজের কথা বলে যা মূলত আরব্ধ প্রথা ও সামাজিক পূর্বাবস্থান থেকে যেখানে জ্ঞানের সরলরৈখিক দিকটি ধাবিত। আবার আধুনিককালে তথ্য ও জ্ঞানকে একীভূত করে দেখারও চেষ্টা চলছে। কিন্তু জ্ঞানের যে একটি বিপ্রতিপন্ন ও বিষমমাত্রিক দিক রয়েছে, আপেক্ষিক অর্থে, জ্ঞানের যে কোনো পরিসীমা নেই, বা জ্ঞান যে কোনো চিরায়ত ধারণার অনুবর্তী নয়—তা সাধারণ সমাজ বুঝতে পারে না। এলিঅট তাঁর কবিতায় হাহাকার করেছিলেন এই বলে যে, কোথায় সেই জ্ঞান যা আমরা তথ্যে হারিয়েছি? বস্তুত তথ্যও জ্ঞান কারণ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে জ্ঞানের যে বিস্তৃত ও সম্ভাবনাময় পরিসীমা সেখানে স্বজ্ঞা বা স্বতঃস্ফূর্ত জ্ঞানের চেয়ে তথ্যগত জ্ঞান অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই আমরা ভাগ করে নিতে পারি জ্ঞানকে দুটো শাখায়: একটি অনুক্তজ্ঞান আর অন্যটি উক্তজ্ঞান। অনুক্তজ্ঞান মৌন, অব্যক্ত, অকথিত, উহ্য এবং নিভৃত; অন্যদিকে উক্তজ্ঞান সুস্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন, বিস্তারিত, খোলাখুলি এবং সুনির্দিষ্ট। অনুক্তজ্ঞান ব্যক্তিক, ভাবমুখী, অভিজ্ঞতাবাদী এবং  সদৃশ, তা উপমানির্ভর, আর উক্তজ্ঞান বস্তুমুখী, প্রাতিষ্ঠানিক, যৌক্তিক এবং কর্ম-সম্পাদন-উপযোগী হয়। আমরা যে তথ্যপ্রযুক্তিগত বস্তুবিশ্বে এখন বসবাস করছি তা এই উক্তজ্ঞানবাদী পৃথিবী, আর যে জ্ঞান অনুক্ত বা অব্যক্ত তার উৎসআধার হলো সাহিত্য-দর্শন-কলা যার বিবেচনা ও গ্রহণযোগ্যতা এই উক্তজ্ঞানবাদী সমাজে কম যদিও এটাই সবজ্ঞানের জননী। এই উক্ত-জ্ঞানের উপযোগিতা নির্ভর করে ব্যক্তি বা সমাজের বোধগম্যতা এবং গ্রহণমাত্রার ওপর; যে সমাজ এই অব্যক্ত জ্ঞানকে ধরতে বা বুঝতে পারে না, সে-সমাজে এই জ্ঞানের আধিকারিকেরা অবমূল্যায়িত বা অধঃমূল্যায়িত থাকেন। কবিরা হলেন সামাজের এই অনুক্ত জ্ঞানের ধারক, বাহক, প্রচারক; আর সমাজ যদি এই বিমূর্ত জ্ঞানকে মূল্যায়িত করতে সফল না হয় তাহলে সে-সমাজে কবিদের মূল্যগ্রাম যথার্থভাবে সঞ্চারিত হয় না, ফলে কবির দায়িত্ব ও সংগ্রাম অন্যমাত্রা পায়। কেউ কেউ জ্ঞানপ্রতিষ্ঠার সামাজিকীকরণের দিকে নিবিষ্ট হন, কেউবা নিজের জীবনের উৎস ও গন্তব্য হিসেবে অবলম্বন করেন এই জ্ঞানকে যা স্বীকৃতিবিমুখ প্রকৃতিগতভাবেই এবং তা অন্তরাশ্রিত।

দুটি বিবেচনাতেই তিনি একক ও অনন্য। জ্ঞানের এই নিভৃতমুখী ধারার প্রতিষ্ঠা এবং নিজের জীবনে এই জ্ঞানকে চিরধ্রুব করা, এ দুটো বিবেচনাতেই শামসুর রাহমান আমাদের আদর্শ।

দিনানুদৈনিকতার ভীষণ আবর্ত থেকে সমাজমনস্কতার চূড়ান্ত অবস্থা—এই সার্বত্রিক  পরিভ্রমণেই তিনি থাকতে চেয়েছিলেন কবি হয়ে; জীবনযাপনের প্রতিটি পলে ও পরাভবে হতে চেয়েছিলেন সেই অব্যক্তজ্ঞানের ধারক যা এ সমাজে শুধু নিজেকে পরাজিতই করে। পরাজিত করে কারণ এ সমাজ কবিদের জন্যে স্পেস দিতে চায় না, চায় না এমনকী স্বস্তি দিতেও। কবিদের প্রতি এ সমাজ হেয়ালি এবং ভ্রুভঙ্গিসম্পন্ন। উপেক্ষিতদের তালিকায় তাঁদের নাম সর্বাগ্রে। সমাজ এড়িয়ে যায় এ সমস্ত মনোবাসীদের, এবং ভুলে যায় তাঁদের যত্নশীলতার ব্যাপারটি। তারা ভাবে , কবিরা অন্যজগতের বাসিন্দা, তাঁদের প্রয়োজন নেই প্রাত্যহিকতার, তাঁরা ভুলভাবে জীবনে ও জগতে ও পার্থিবে প্রবেশ করেছে। এই উদাসীনতা ও প্রত্যাখ্যানের অন্যতম কারণ হলো, জ্ঞানের পরাগত ধারণা সম্বন্ধে সর্বসাধারণের অজ্ঞতা। কবি যে জ্ঞানমুখিতার একটি ব্যাপ্ত বিষয়ের সাথে জড়িত, তা তারা বুঝতে পারে না কারণ অনুক্তজ্ঞানকে বুঝতে গেলেও ন্যূনতম অর্জনের  প্রয়োজন যা আমাদের সমাজের নেই। ফলে ব্যর্থ সমাজ ও ব্যর্থ তার রাষ্ট্রের কাছে কবি মূল্যহীন হয়ে ওঠেন অধিকাংশ সময়ে। কিন্তু আমাদের কাছে ব্যতিক্রম তিনি, অথবা মূল্যবান অর্জন, যিনি জীবিতাবস্থাতেই জনপ্রিয়তা ও রাষ্ট্রিক স্বীকৃতির একেবারে মধ্যবিন্দুতে পেীঁছে গিয়েছিলেন, এবং কবিতা যে জ্ঞানের উৎস হতে পারে বা কবিতা লিখে যে জীবনকে মধুময় করা  যেতে পারে, তার এক রহস্যময় বৈভবব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। এ উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতা অনন্যসাধারণ যখন ব্যক্তি প্রবিষ্ট হচ্ছেন কবিতায় অথবা কবিতা প্রবেশ করেছে ব্যক্তির গভীরে, আর এই একাকার ও আন্তরূপান্তর এমন এক নিকষিত বিভাসের জন্ম দিচ্ছে যাকে প্রস্থানভূমি করে কবিতার এক ফ্যাশন বাংলা কবিতায় দেখা দেবে যখন তরুণেরা এমন এক সংরাগে উদ্ভাসিত করবে নিজেদের, যখন কবি হওয়ার মধ্যে নিহিত থাকবে পরম সার্থকতা। প্রকৃতপ্রস্তাবে, শামসুর রাহমান এমনই সংরাগের উৎসব্যক্তিত্ব।

অনেকদিন আগে, সেই ১৯৬৩ অব্দে প্রকাশিত রৌদ্র করোটি  কাব্যে তাঁর একটি কবিতা আছে ‘দুঃখ’ নামে, যেখানে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে এক ‘রোম্যান্টিক বহিরস্থিত’ কবিকে যিনি রোম্যান্টিক ও আধুনিক কবিতার সীমান্তভূমির অন্তিম নীরবতায় স্থানু হয়ে বসে থাকেন কোনো অভাবিত বোধের বিচ্ছেদে নয়, বরং বি্ষণ্ণতা ও অসুস্থতার একটি ধ্রুব রংকে উন্মোচন করতে যা তাঁর শিরায়-শোণিতে ধাবমান অশ্বের মতো দৌড়ে যেতে চায়। বস্তুত, প্রকৃতই আমরা অনুধ্যান করি সেই অনায়াসঋদ্ধ সন্তাপনিয়ন্ত্রিত যন্তণাবোধকে যার চেতনাটি রোম্যান্টিক আর উদ্ঘাটনটি আধুনিক। রোম্যান্টিকেরা দুঃখকে মহিমাময় ভাবতেন, ভাবতেন কবির জন্মই হয় দুঃখকে বরণ করা ও মহিমান্বিত করার জন্যে, আর আধুনিকতাবাদীরা দুঃখকে বিষাদে পরিণত করেন, রূপায়িত করেন যন্ত্রণাকে ফলাফলহীনতার তীব্রতম অনুভূতিতে। এ দুঃখ বিষাদময় ও নীল, জলরঙে যেন আঁকা হয়েছে তার চেহারা ও অবয়ব। মনে পড়ে মার্কেসের গল্পের সেই নগররক্ষী কর্মচারীটিকে যে কালো বিষণ্ণ মেঘের দিকে রাইফেল চালায় বৃষ্টিকে আনয়নের জন্যে, কিন্তু মেঘ আসলে ভেসে চলে যায়। এরকমই একটি ফলাফলহীনতা যা বিমূর্ত কিন্তু অনিবার্য, অদৃশ্য অথচ অন্তর্গত। দুঃখকে মনে হয় ব্যাপ্ত ও বিধুর, এ যেন কবির অন্তঃপুর ও অন্তস্তলে সম্প্রসারিত; আমরা বুঝি এর দুর্মর অবশ্যম্ভাবিতা যার ঘনিষ্ট ছায়ায় বেড়ে ওঠে আধুনিক মনের প্রাণভোমরাটি। কবিতাটির কয়েকটি পঙ্ক্তি আমরা এখন উদ্ধৃত করতে পারি:

কখনো না-দেখা দূর আকাশের
মিহি বাতাসের
সুন্দর পাখির মতো আমার আশায়
হৃদয়ের নিভৃত ভাষায়
দুঃখ তার লেখে নাম ।

আসলে এসবই পূর্বনির্ধারিত  নিয়তি, লেখক-জীবনের এক অস্তমিত অনুরাগ যেখানে তিনি স্বাভাবিক ও স্বতশ্চল। এর গভীরেই তাঁর বিস্তার ও উড্ডয়ন। এ হলো সেই মহান ইকারুসের পূর্ববোধ যা প্রতিটি বিশুদ্ধ  কবিরই অন্বিষ্ট। আমরা এখন স্মরণ করব অস্কার ওয়াইল্ড-এর সেই মহার্ঘ উক্তিকে যা অমোঘ হয়ে দেখা দেয় সৎ কবির জীবনে: শৈল্পিক জীবন হলো এক দীর্ঘ একাকী আত্মহত্যা, আর এটা এরকম তার জন্যে শিল্পীরা  দুঃখিত হন না মোটেই। লেখক-জীবন  ইকারুসের মতোই এই উড্ডয়ন ও আত্মহত্যার জীবন যেখানে আনন্দের স্বাধীনতার ভেতরে জন্ম নেয় দুঃখ ও পতন। শামসুর রাহমান তা জানতেন আর তাই তিনি দুঃখকে দেখেন স্ফটিক-সৌন্দর্যে, জীবাশ্মের রূপে মহনীয় অনস্বীকার্যতায়। শৈল্পিক জীবনের শুরুতেই তিনি এই সম্ভাব্যসূত্রটিকে ধরতে পেরেছিলেন তাই প্রথম কাব্যগ্রন্থের ‘অপাঙ্ক্তেয়’ কবিতায় বলে দিয়েছিলেন সেই মহৎ মীমাংসিত বাণীটি যা প্রতিটি কবিরই এক প্রতিজীবনী যাতে নিমগ্নতা পায় তার অপর-সত্তার চূড়ান্ত অভিলাষটি:

জীবনকে সহজ নিয়মে নেয়া যেতো প্রথমতো,
কিন্তু তবু জ্যামিতির নেপথ্যে মায়াবী গুঞ্জরণে
মজেছি স্বতই দুঃখে অর্থ থেকে অর্থহীনতায়।

খুব অসাধারণ সরলবাচনের মধ্যে আমরা কূটাভাস লক্ষ্য করেছি যা লীন হতে চাচ্ছে ভ্রান্তিহীন পরম ব্যঞ্জনায়। প্রথমেই বলেছেন  তিনি সাধারণ জীবনকে পরিত্যাগের কথা যা নিজেই ভাস্বরিত করে দেয় কবিজীবনকে যে জীবন গাণিতিক অগ্রগমন ও নিয়মে বন্দি নয়,—তা ব্যতিক্রম ও বেদনাজনকভাবে  অন্যরকম। কিন্তু দ্বিতীয় পঙ্ক্তিটি আপাত দুর্বোধ ও হেয়ালিময় মনে হতে পারে: ‘জ্যামিতির নেপথ্যে মায়াবী গুঞ্জরণে’ মজার অর্থ আর কিছুই না ব্যতিক্রম জীবনের অসহনীয় আবর্তে মজা, কারণ তিনি ত্যাগ করেছেন গাণিতিক জীবন যা পুনঃপুন ধারাবাহিকতায় আবর্তিত ও ক্লিন্ন। জ্যামিতিক প্রচ্ছায় হলো স্বনির্মিত অর্থহীনতার আবর্তন যখন ব্যক্তি জীবনের উদ্ভটত্বের শিকার হয়। খুব সম্ভবত, কবিতাটি লেখার সময়, রাহমান আক্রান্ত হয়েছিলেন আলব্যের কামু কথিত অ্যাবসার্ডিটিতে যার ফলাফল হিসেবে দানা বাঁধে এই নান্দনিক অর্থহীনতা। জীবন সম্প্রসারিত হচ্ছে, স্থানান্তরিত হচ্ছে; আমরা সবাই দণ্ডিত পুরাণের সিসিফাসের মতোই, যা নিষ্ফল নয় আবার ব্যর্থও নয়, তা আসলে ফলাফলহীন। আমরা খুব সফলভাবেই সক্ষম হই বুঝতে যে, শামসুর রাহমান এ বঙ্গে বীজ বপন করেছেন আধুনিকতার, ও এর অনুপূরক কয়েকটি প্রপঞ্চের: অস্তিত্ববাদ ও নিরর্থকতাবাদের।

আমরা জানি, অধিকাংশ জীবন, জীবনের নিয়মনীতি, কিছুরই অর্থ প্রকাশ করে না। আসলে আমরা বেঁচে থাকি মূল্যহীনতার মূল্যারোপ করে। এ এক সংবেদনা যেখানে কবিরা অসহায়, তারা বুঝে ফেলেন সেই তাৎপর্য ও বেদনাকে, যাকে ঘিরে স্থির অনিবার্যতায় দোল খায় জীবন। কবি প্রশ্নমুখী হন :

আমাকে গ্রহণ করো তোমাদের নিকানো উঠোনে
নারী আর শিশুর ছায়ায় আঁকা রক্তকরবীতে।
আমার জীবনে নেই তৃপ্তির গৌরব, আর আমি
অর্থ খুঁজি চক্রে চক্রে, সমর্পিত মহাশূন্যতায়।

কী অর্থ নিহিত তবে নিপতিত গাছের পাতায়?

আসলে এ এক নিস্তব্ধতার কাছাকাছি চলে যাওয়া, কেননা তিনি জানেন, এ একাকী নির্জনতম পথ যেখানে যেতে হয় শব্দহীন অধিকারবোধে। এ পথে আসলে আর ফেরা যায় না। এ সেই গ্রিক পুরাণের বিখ্যাত গোলকধাঁধা যার থেকে বেরুনো দুষ্কর। একে বলা যায় একা হওয়ার সাহস যাকে অর্জন করতে হয় প্রত্যেক মহৎ কবির, এ হয়ে যেতে পারে এক জীবনব্যাপী ভুল কিন্তু কবিকে তা গ্রহণ করতেই হয়; আর সম্ভবত এ এক নির্বাসন ও নিঃসঙ্গতা যখন কবি তাকে করেন জীবনের ধ্রুবতারা। শামসুর রাহমান বুঝেছিলেন ও গ্রহণ করেছিলেন এই বোধকে, এবং বারে বারে নিরীক্ষাও করেছিলেন। উপর্যুক্ত কবিতার অনেক পরে লেখা ১৯৮২ অব্দে প্রকাশিত ইকারুসের আকাশ কাব্যগ্রন্থের শিরোনামধারী কাবতাতেই দেখি  এই নিয়তিনির্দিষ্ট ভ্রমণের কথা, যাকে তিনি বলেছেন ‘আমার নিজস্ব পরিণাম’, এটা আসলেই  কবির পরিণামিতা যখন তিনি বস্তুগত অদৃশ্যমানতার বশবর্তী হন কবিতাকে শিরোধার্য করে। তা জীবনকে এক অর্থে স্বউদ্যোগে ব্যর্থ করে দেওয়া, অস্বাভাবিক ও অসুস্থ করে দেওয়া, এক মনোবিকলনিক উৎসারের দিকে সবেগে ঠেলে দেওয়া। তিনি তা করেছেন মুহুর্মুহুভাবে, তাই আবারও বলেছেন:

কখনো মৃত্যুর আগে মানুষ জানে না
নিজের সঠিক পরিণতি। পালকের ভাঁজে ভাঁজে
সর্বনাশ নিতেছে নিশ্বাস
জেনেও নিয়েছি বেছে অসম্ভব উত্তপ্ত বলয়
পাখা মেলবার, যদি আমি এড়িয়ে ঝুঁকির আঁচ
নিরাপদ নিচে উড়ে উড়ে গন্তব্যে যেতাম পৌঁছে
তবে কি পেতাম এই অমরত্মময় শিহরণ?

আমরা শুরুতে বলেছিলাম অনুক্তজ্ঞানের আধিকারিক হিসেবে কবিদের কথা, যে জ্ঞানের উপযোগিতা নির্ভর করে সমাজ বা সভ্যতার অনুশীলনময় প্রস্তুতি-জ্ঞানের ওপর। যে সমাজ অগ্রবর্তী থাকে তার কাছে এই জ্ঞান উপযোগ ও অবলম্বন নিয়ে ধরা দেয়, আর পেছানো সমাজের কাছে তা থাকে অধরা। শামসুর রাহমান এই দ্বন্দ্বটিকে ধরতে পেরেছিলেন, তাই তিনি এ ব্যর্থতার যুক্তিকে প্রতিপন্ন করতে চাইছেন এইভাবে:

এই বলিদান, শুধু অভীপ্সার ক্ষণিকের গান
গেলাম নিভৃতে রেখে ঝাঁ ঝাঁ শূন্যতায়।
অর্জন করেছি আমি অকাল লুপ্তির বিনিময়ে
সবার কীর্তনযোগ্য গাথা,
যেহেতু স্বেচ্ছায়
করেছি অমোঘ নির্বাচন
ব্যাপ্ত জ্বলজ্বলে, ক্ষমাহীন, রুদ্র নিজস্ব আকাশ।

ঠিক এই মোড়ফেরাবিন্দুটিকে শনাক্তকরণের সাথে-সাথেই রাহমানের বৈশিষ্ট্যটিকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায় যা এ অঞ্চলের পরম্পরাশ্রিত কাব্যভাষার সাথে নতুন ও ভবিষ্যতের কবিতার বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেয়। ভাষার যে মনোজগৎ, সময়ের যে লুপ্ততা, ভাবের যে বিষমতা—এই তিনটি অন্যোন্য বিবেচনায় শামসুর রাহমান প্রত্যাখ্যান করেন তাঁর অব্যবহিত কবিতাকে, এবং তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন সেই প্রস্থানবিন্দুটির ওপর যেখান থেকে বাংলা কবিতা এতদিনকার সীমাবদ্ধতার ঘেরাটোপটিকে ভেঙে-গুড়িয়ে নতুন উদ্ভিন্নতায় আত্মপ্রকাশিত হয়। এই এন্ট্রপি আধুনিকতার এক মহৎ বৈশিষ্ট্য যার বীজ রোপিত হয় রাহমানের দ্বারা। কিন্তু এর অন্তর্বাহী রূপটিকে খোঁজ করা জরুরি।

আধুনিকতার দু’টি প্রত্যয় রয়েছে, একটি হলো এর অনুশীলন আর অন্যটি হলো সাঙ্গীকরণ। সময়ের অগ্রসরমানতাকে বুঝেও একটি বিবেচিত হয় ‘সমসাময়িক’ হিসেবে অন্যটি বিবেচিত হয় ‘আধুনিক’ হিসেবে। এই দু-য়ের যোগসূত্র থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে। পাউন্ড জোর দিয়েছিলেন ‘নতুন’ হওয়ার ওপর; মূল লাতিন শব্দ মডার্নাস বোঝায় পুরোনো থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া। এই পৃথক হয়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কেননা তা না হলে চিহ্নিতকরণের প্রক্রিয়াটির অনুপস্থিতি দেখা দিতে পারে। সুতরাং প্রয়োজন নতুন কাব্যধারণার, ও শৈলীর। আধুনিকতা অনেকটা স্তম্ভিত এক অনন্য আন্দোলন যা তার ইতিপূর্বেকার সাহিত্য-আন্দোলনগুলোর সাথে সমঝোতা না করেই বেরিয়ে আসে। আধুনিক লেখকেরা দাবি করেন আধুনিকতা, এবং ব্যক্ত-ও করেন আধুনিকতা। শামসুর রাহমান বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম সার্থক কবি যিনি ধরতে পেরেছিলেন আধুনিকতার দ্ব্যর্থক, উদ্বিগ্ন, এবং নান্দনিক খণ্ডীকরণ ও অস্তিত্ববাদী অর্থহীনতার বিষয়গুলোকে। আর তিনি অনতিবিলম্বেই সচেতন হয়ে উঠেছিলেন এর ভিত্তিতে সংগঠিত চেতনাকে কবিতায় প্রতিষ্ঠা করতে। প্রধান কবিকে সৃষ্টি করতে হয় কবিতার জলবায়ু যেখান থেকে অসংখ্য সৃষ্টিশীলতা দেখা দিতে থাকবে, অসংখ্য কবি ও কবিতার জন্ম হতে থাকবে। কবিতায় অনেক কিছু গুরত্বপূর্ণ: ভাষা, ব্যঞ্জনা, বোধ, লোকজতা, চিত্রকল্প, উপমা, চেতনা, ইত্যাদি ইত্যাদি। এর জন্যে প্রধানকে নিতে হয় দায়িত্ব কারণ বীজতলা নির্মাণের দায়ভার তাঁর, কিন্তু ফসল ফলার পর বীজতলার প্রত্নরূপকে অনেকে ভুলে বসে, তবে তাতে তার ঐতিহাসিক মূল্যায়নের তেমন ক্ষতি হয় না। বেদনা ও বিচ্ছিন্নতা কবিরই প্রাপ্তি কারণ তা তাঁর সৃজনশীলতার জন্যে অপরিহার্য।

কবির জীবন কোনো ‘ডলচে ভিটা’ নয়, নয় অলসগমনপরিণত। পক্ষান্তরে প্রতিটি মহৎ কবির জীবনই এক সুগভীর অতলান্তিক যার ওপরে অজস্র-বিশাল তরঙ্গরাশি আর অন্তস্তলে সুপ্তিময় রত্মরাজি। কবির এই দুটি রূপ তাঁর ব্যক্তিসত্তা আর কবিসত্তার প্রতিভাস হয়ে দেখা দেয়। তিনি গভীর-গোপনে ধরে রেখেছেন মণিমুক্তো যা উদ্ধার করার জন্যে প্রয়োজন ডুবুরির। প্রচলিত অর্থে কোনো ‘ডিফিকাল্ট’ কবিতাও তিনি লেখেননি, কিন্তু তাঁর কবিতা, প্রকৃতপক্ষে, পঞ্চাশের দশকের আমাদের যে আধুনিকতার অভিজ্ঞতা, তাকে সঙ্গত করে। আমরা বুঝতে পারি, ভাব ও ভাষা বদলে যাচ্ছে, আসছে নতুন চেতনা, কবি হয়ে উঠছেন ব্যাপক, বিশাল, অপ্রত্যক্ষ, ইঙ্গিতময়, যখন ভাষা তার অর্থের মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছে।

শামসুর রাহমানের কবিতা যেন এক সম্মিলনস্থল, melange adultere de tout; এখানে মিলেছে অতীত, বর্তমান, বোধ, মেধা, মিথ, রাজনীতি, সমাজ, তথ্য এবং সম্পর্ক। আর এ জন্যে তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে বহুলপঠিত, নানাস্তরের ও নানামাত্রার পাঠকের কাছে। এই পাঠ সাধারণগোছের নয়, বরং সমীহ-উদ্রেগকারী; শিল্পমান ও জনপ্রিয়তার প্রচলিত ভেদরেখাকে তা ঘুচিয়ে দিয়েছিল, এবং কবিতা ও জীবন যে একটি অপরটির আধার এবং উৎসস্থল হয়ে উঠতে পারে তার সম্বন্ধকে আমাদের কাছে উদ্ভাসিত করেছিল।

কবিতাকে নতুন হতে হয়, র্যাঁবোর মতে কবিতাকে হতে হয়, ‘সম্যকভাবে আধুনিক’ যেন তার পরিসীমা চিহ্নিত করে আত্ম-অবনয়নকে, যেখানে আত্মমুখী কবিতা, যেখানে নতুনের সংবেদনায় কবিতা শিহরিত হতে থাকে। শামসুর রাহমান এই আত্মমুখী কবিতার নতুন স্বরের অন্যতম স্রষ্টা। কিন্তু রোম্যান্টিকতা বা নির্বেদ নয়, পরবর্তীতে তিনি প্রসারিত হয়েছিলেন প্রতিরোম্যান্টিকতা ও সদর্থকতার সার্বভৌমত্বে যেখানে জীবনের মঙ্গলভাবনায় ব্যক্তিলেখক সামাজিক-লেখকে পরিণত হয়। শামসুর রাহমান এই দুই ধারার এক ঝুলন্ত সেতু, এবং তিনি এই বহমানতার এক সবল উদাহরণ হয়ে আছেন বাংলা কবিতায় যেখানে জীবন ও বাস্তবতা সমূলে দৃঢ়ীভূত হয়ে আছে শিল্পে।

মৃত্যু অবলুপ্ত করে উপস্থিতি আর উজ্জ্বল করে উপস্থিতি – এ এক রহস্যময় কূটাভাস যা আমার মনে এসেছে রাহমানের মৃত্যুবিভাবে। কবিতার বড়ো শত্রু হতে পারে এই উপস্থিতি, যে উপস্থিতি ব্যক্তির, তার বর্তমানতার; কারণ কবি যখন থাকেন শারীরিক তখন তার সৃষ্টি দ্বন্দ্বের ও বিতর্কের আবর্তে পড়তে পারে। তিনি অপঠনের ও অপপঠনের অক্রিয়তায়ও পড়তে পারেন কেননা ব্যক্তিসত্তা অনেক-সময় আড়াল করে রাখে তাঁর সৃষ্টিশীলতার উৎস-আধারকে। আবার ব্যক্তিসত্তা ভুলভাবে প্রযত্নায়িতও করে নিজ সৃষ্টিকে। ফলে ব্যক্তির মৃত্যু তাঁর সৃষ্টির যথাযথ মূল্যায়নের বাধাকে অপসারিত করে এক অর্থে। বস্তুত মৃত্যুর পরই শুরু হয় লেখার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন। মৃত্যু লুপ্ত করে জীবন কিন্তু উন্মোচন করে তার সৃষ্টির বৈভব। যে-কবিতা ছিল শ্বসিত তা উড়তে শুরু করে আর যে কবিতা ছিল অশ্বসিত তা নড়াচড়া শুরু করে দেয়। মৃত্যু বিনাশকারী কিন্তু পুনর্জীবন দান করে কবিতার। বড়ো ও প্রধান কবির জীবনই অনেক সময় তাঁর কবিতার প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় কারণ, প্রতুল লেখা, অতি প্রাতিষ্ঠানিকতা ও সমাজসম্পৃক্তি সৃষ্টি করে এক অন্তরাল যেখান থেকে সৃষ্ট মহৎ-পঙ্ক্তিগুলো বেরিয়ে আসতে পারে না। এই অর্থে মৃত্যু আমাদের নৃতত্ত্ব বিষয়ে ভূমিকাশীল করে। আমরা প্রকৃতিবিজ্ঞানীর মতো খুঁজে বের করি সেই উদ্ভিদটিকে যে লোকচক্ষুর আড়ালে গন্ধ ছড়ায় রাতে আর নক্ষত্রের সাথে নিবিড়তায় আশ্লিষ্ট হয়।

রাহমানের কবিতার জ্বলজ্বলে নক্ষত্রের পাশাপাশি আছে কিছু রাতজাগাপাখি যাদের দেখা যায় না, কিন্তু শোনা যায়:

ক.     আমি চেয়ে দেখি মৃত্তিকায় করোটিতে
জ্যোৎস্না জ্বলে
বিষণ্ণ স্মৃতির মতো, দ্বিতীয় মৃত্যুর ধ্বনি ভাসে।

খ.     হারিয়েছি কতো বিকেলের মতো নারী,
বহুবার আমি হারিয়ে ফেলেছি
পাখির দেহের রঙে ঝিলমিল, স্নেহে-ছাওয়া ঘর;

গ.     আকাশ তো এক মস্ত একটা গর্ত –
সেখানে ঢুকবো নেংটি ইঁদুরের মতো

ঘ.     সঙ্গীত সাধক, কবি, চিত্রকর অথবা ভাস্কর, কাউকেই
খুব বেশি ভালো থাকতে নেই।

ঙ.     সভায় এনেছি ব’য়ে অন্তহীন আশ্চর্য বিষাদ।

ইত্যাদি অসংখ্য উদ্ধৃতি দেওয়া যায় তাঁর, যেখানে কবিতার বিশুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি অপলকে চেয়ে থাকে, যা আমাদেরকে নিবিড় হতে সাহায্য করে, আত্মঅনুভবে লীন হতে প্ররোচিত করে, আর আমরা ঘনিষ্ট হই, সেই পরামুহূর্তটির যখন ‘জ্বলি অনিবার নিজেরই অন্ধকারে।’

দীর্ঘ জীবনপ্রবাহের নানা অন্ধবিন্দু, বিবিধ ত্র্যহস্পর্শের ভেতর দিয়ে তিনি এগিয়েছেন। এই যাত্রাপথে অন্তর্বর্তী সময়কেই তিনি স্পর্শ করেছেন। তিনটি রাজনৈতিক কালধারায় চূর্ণিত তাঁর জীবন – স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের বোবানীরবতার ব্যূহ ভাঙতে হয়েছে তাঁকে। কবি হিসেবে এ তাঁর এক ব্যাধির বিরুদ্ধে সংগ্রাম, অন্তিম বিনাশের আগে এক অনন্যসাধারণ সম্পাদন যা তাঁকে মানবতার অবিকল্প যোদ্ধার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। ফলে যত পরিপক্ব মৃত্যুই হোক না কেন সবার নিকটই তা তার সমূহ উদ্ভটত্ব নিয়ে হাজির হয়। মৃত্যুকে নিয়ে চিন্তাও করেছিলেন তিনি, নিজ মৃত্যুদিন নিয়েও ভাবিত হয়েছিলেন, বলেছিলেন—‘সেদিন বর্ষায় যেন না ভেজে শহর।’ হয়েছিলও তাই, শ্রাবণোত্তরই তিনি চলে গিয়েছিলেন অসংখ্য মানুষের অশ্রু আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে। তাঁর জীবন ও সৃষ্টি অন্যোন্য এবং অবিচ্ছেদ্য, এই পার্থিব ভ্রমণের প্রতিটি শূন্যতায় ও স্বস্তিতে তিনি এক অতিমানবীয় গরিমায় নিয়োজিত ছিলেন মূঢ়তা ও নির্বোধতার দুঃসহ অবস্থাকে অতিক্রম করতে যা প্রতিটি মানবিক মানুষের অসীম প্রেরণার উৎসস্থল হয়ে থাকবে। কিন্তু তাঁর এই অর্জন অনিবার্যভাবেই ছিল আত্মবিসর্জনের তীব্রতম দহন ও সংরাগে উন্মথিত। এলিঅটের মৃত্যুর পর তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ভ্যালরি স্বামী সম্পর্কে বলেছিলেন: He felt he had paid too high a price to be a poet, that he had suffered too much।  মনে হয় শামসুর রাহমানের জন্যেও তা যথাযথ। জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা সাপেক্ষে, কবিতার জন্যেও তাঁকে দিতে হয়েছে চড়া মুল্য।

তাঁর ব্যক্তিসান্নিধ্যে এসেছিলাম কয়েকবার, ঋদ্ধ হয়েছিল জীবন সে-সব স্মৃতিতে। অনেকবছর আগে, সেই ’৯১-এর ডিসেম্বরে তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলাম এক অনুষ্ঠানে, সাথে ছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। অনুষ্ঠানে তিনি পাঠ করেছিলেন তাঁর ‘দুঃসময়ের মুখোমুখি’ কবিতাটি, আর বলেছিলেন কবিতা সম্পর্কে  নিজ উপলব্ধির কথা। রাতে অবস্থানের পর পরদিন সকালে তাঁকে এগিয়ে দিয়েছিলাম আমার ডায়েরিটি, অনুরোধ করেছিলাম একটি কবিতা লিখে দিতে। তিনি চোখে চশমা দিয়ে জানালার ওপারে তাকালেন আর অতঃপর লিখে দিলেন আট-পঙ্ক্তির একটি শিরোনামহীন কবিতা, নিচে তারিখ ও স্বাক্ষরসহ। রেখে দিয়েছিলাম তা চির যত্ন করে, ভেবেছি তাঁর প্রস্থানের পরই উন্মোচন করব কবিতাটির। কারণ কবিতাটিতে ফুটে উঠেছিল চলে যাওয়ারই কথা। আজ তিনি নেই, কিন্তু  সেই অচিহ্নিত কবিতাটি যেন তাঁরই অনুপস্থিতির বিভাব ছড়াচ্ছে আর বলছে, ‘স্বপ্নাচ্ছন্ন এই আসা-যাওয়া’।

ডিসেম্বরে আমার ঘুমের মধ্যরাতে বৃষ্টি পড়ে
অবিরাম; স্বপ্নের আড়াল-করা মুখ
ভিজে যায়। একটি বিপন্ন পাখি ডানা
ঝাপ্টায়, কাতর চোখে তাকায় আমার
নিদ্রার গোপন অন্তঃপুরে। ভোরবেলা
কচি রোদ গাছের পাতায়
আনন্দ গচ্ছিত রাখে। এখনো প্রস্তুতি বাকি, আজই
যেতে হবে, স্বপ্নাচ্ছন্ন এই আসা-যাওয়া।

এখনও সত্যিই ভাবি। কোন প্রস্তুতিই পূর্ণ করে না জীবনকে। সব যাওয়াই আচমকা, বস্তুত প্রস্তুতিহীন। আমরা যাই কেননা উদ্বেলিত হাওয়ায় হাওয়ায় জীবনের বোবা হাসি ও বেদনারা রং মেখে যায়। আমরাতো অদৃশ্যে হারাই। সব দৃশ্যমানতার চূড়ান্ত সম্পূরণ ঘটে অদৃশ্যমানতায়। সব উপস্থিতির সংক্রান্তি ঘটে যবনিকাবৎ অনুপস্থিতিতে। আমরা আছি, কেননা, আমরা কোথাও নেই।

……………………………………………………………….

কবি কুমার চক্রবর্তীর কবিতাভাবনা ও একগুচ্ছ কবিতা

কবি কুমার চক্রবর্তী

কুমার চক্রবর্তী: কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। জন্ম ২ চৈত্র ১৩৭১ বঙ্গাব্দ, কুমিল্লা, বাংলাদেশ। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলো–কবিতা:
লগপুস্তকের পাতা (১৯৯৮), আয়না ও প্রতিবিম্ব (২০০৩), সমুদ্র, বিষণ্ণতা ও অলীক বাতিঘর (২০০৭), পাখিদের নির্মিত সাঁকো (২০১০), হারানো ফোনোগ্রাফের গান (২০১২). তবে এসো, হে হাওয়া হে হর্ষনাদ (২০১৪); প্রবন্ধ: ভাবনাবিন্দু (২০০২), ভাবনা ও নির্মিতি (২০০৪), মাত্রামানব ও ইচ্ছামৃত্যুর কথকতা (২০০৫/২০০৬) /অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা (২০১২), শূন্যপ্রতীক্ষার ওতপ্রোতে আছি আমি, আছে ইউলিসিস (২০০৯) , মৃতদের সমান অভিজ্ঞ (২০০৯), কবিতার অন্ধনন্দন (২০১০), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৫), আত্মধ্বনি (২০১৬) ; অনুবাদ: আমি শূন্য নই, আমি উন্মুক্ত: টোমাস ট্রান্সট্যোমারের কবিতা (১৯৯৬/২০০২/২০১২), নির্বাচিত কবিতা: ইহুদা আমিচাই (২০০৫/২০১৩), মেঘ বৃক্ষ আর নৈঃশব্দ্যের কবিতা: চেসোয়াভ মিউশ (২০১৪), বহু হই ব্রহ্মাণ্ডের মতো: ফের্নান্দো পেসোয়ার কবিতা (২০১৬)।

পুরস্কার: হুমায়ুন আজাদ কবিতা পুরস্কার (২০১০), লোক সাহিত্য পুরস্কার (২০১০) ।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E