৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ৩১২০১৬
 
 ৩১/১২/২০১৬  Posted by

সুভান দাস -এর কবিতাগুচ্ছ

১*
জলজসংসার

জলের ওপর দেহ ভাসিয়ে ছায়া তলিয়ে যাচ্ছে নিচে, কে কার নির্জনতার দিকে টেনে নিচ্ছি নিজেদের সংলাপঘন কুয়াশাচরিত্রদের, আলো মজুত রেখেছি, দূরেই কাঠের ঘর, আধপোড়া পুরোনো ঝরাপাতা, হিমঘরের ঠান্ডা আবহাওয়ায় যদি আরও একবার ঘর করা যায়, অর্ধেক বালিমাটি দিয়ে সে ঘর ভরাট করলাম আমি, অর্ধেক পাথর আর কাঠের গুড়ো দিয়ে ভরিয়ে দিলে তুমি।  নির্ঝঞ্ঝাট দুপুর ফুরিয়ে যাচ্ছে, জল তো কাচের মত, ভাসছে চতুর্দিকে, জল পার করে তুমি রোজ ছুটি নিয়ে আসছ ঘুমের আগে, ঘুমের জন্য থিতু হয়ে আসে রাত্রিকালীন মেঘ। তবু নিয়ম করে তোমার  হাতে নেমে আসে পাখিদের স্নান। যেভাবে নরম হও তুমি, জলও নামিয়ে নেয় আমাকে পাথরঅরন্যে। ভাঙা সমাধিস্তল পার হয়ে আসি, নামের ফলক আবছা হয়ে আসা একটা মনখারাপ তবু উদ্যান হয়ে ওঠে নিমেষে, জল ছুঁয়ে দেখছ তুমি, জল ও ছুঁয়ে দেখছে তোমাকে, আর আমি ক্রমশ অতল হচ্ছি তোমার জলজসংসারে…

২)
কেমন অদ্ভুত ভাবে পাগল হয়ে যাচ্ছি দিন দিন…. থেকে থেকে মনে হয়, একটা একলা দ্বীপে বসে আছি, আর সামনে শুধুই জল। দূর দূর অব্দি জল…. আর আকাশ…  মাথার ওপর দিয়ে মেঘ পার হয়ে যায় একটা একটা…  কেউ কেউ ছায়া দ্যায়। কোন মেঘ এসে বৃষ্টি রাখে মাথায়। কেউ কাধে মাথা রাখে। কেউ ছুঁয়ে থাকবে বলে আর ফিরে আসেনা। দূরের জাহাজ গুলো যখন হাতছানি দিতে দিতে চলে যায়, আমি ছোট ছোট কাগজের নৌকা বানিয়ে জলে ভাসিয়ে দি। কিন্তু ঢেউ এসে আমাকেই ফিরিয়ে দিয়ে যায় সব… আসতে আসতে রাত হয়, আলো কমে আসে, আর আমার কানে শুধু ভেসে আসে একটা কোমল স্বর।।। বালির ওপর শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে… হাতের মুঠো থেকে যেভাবে আমি খসে পড়ি প্রত্যেকদিন…যেভাবে জলস্তর বেড়ে যায় আমার চারদিকে… একদিন ডুবে যেতে হবে…  একদিন দেহ ভেসে উঠবে কোন এক প্রান্তিক দেশে…সেখানে প্রেম তুমি থাকবে তো?কোলে মাথা তুলে নেবে একবার???

২*
বিস্মৃতি

কথাক্ষয় হয়, যা বলার বলে দিতে ভয় হয়। ভয় মাটি খায়। কোথায় বিষাদ?  পাথরভরাট লাশঘর থেকে কবরের ঘ্রান ভেসে ওঠে, অন্ধ ছিঁড়ে যায়, দুহাত ভঙ্গুর, তার ভার বহন করতে করতে কাঁধে রক্তজমাট বেঁধে আসে। ঘড়ি ধরে মৃত্যুর আয়োজন হোক, তালা এসে ঝুলে পড়ুক বন্ধকদেহে। কি আছে আমার, বিষের পাত্র বারোমাস, খুঁজে পাওয়া মুখোশের রঙ সারাই। বর্ন কতদূর, ধ্বনিসংঘাত দিয়ে যেতে পারে,  প্রেম সামান্য কাল তুমি, তবু আজন্মকাল এই খিদে। দাড়াবার বৃত্ত থেকে পা ক্ষয়ে যায়। পা থেকে শব্দ ঝরে পড়ে। কথায় কথায় একদিন কথারা ভুলে যায়, কি যেন বলার ছিল, যা বলা হয়েছিল কোনো দিন।

৩*
টুম্ব অফ দা টু ব্রাদারস

১)
এই গল্পের প্রথমেই মৃত্যু; মৃত্যুর ঘরে একই রঙের দুটো দেহ, নীল , এই মুহূর্তে ওদের নাম হোক খ্‌নুমহোটেপ ও নিয়াঙ্খ্‌নুম অথবা আমি আর তুই, এই ঘর; ঘরের ভেতর ভিড়, আলোর ঝলক, তোকে কিছুক্ষন আগেই নিচে নামানো হয়েছে দড়ি থেকে, আমি ঝুলে আছি এখনও নিচ থেকে কেউ তুলে ধরছে আমায়…   

২)
হাতের শিরায় লেখা আছে ধমনীর রঙ বিপর্যস্ত যতটা দূরে আমাদের খোলা ঝিল সাঁতারের স্রোত দেখো গোলাপি ঠাণ্ডাঘর হয়ে ফিরে আসি যে যার ঘরের ভেতর আর আলো জ্বলছে যখন ফ্যনাদের পিছু নিয়ে বুদবুদ নেমে আসে কাঁচের গ্লাসের কিনারায় এই ঘর থেকে যদি ঘাম মুছে যায় শুধু আমাদের নীল-নীল শরীরের ছায়া ঘিরে ধরে গল্পের গাছ একদিন ক্ষত দের স্নান দেখতে দেখতে ঘুম প্রিয় হবে আমাদের, আমার বা আমারই মতো সমশরীরে স্বপ্নরা রাস্তায় নামবে চুমু খাবে  মাছরাঙা পালকে…

৩)
ত্বকের ভেতরে প্রবেশ করে গেছে ছায়া এই চোখের কথাদের নিয়ে ঘর ভরলাম দেহের কোলাজ জুড়ে জুড়ে মন পাল্টে নিচ্ছে সন্ধ্যে কিংবা উদ্বায়ী দেহরং এখন আমি আর আয়নার মধ্যের পাতলা আচ্ছাদন ছিঁড়ে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা ঘন কুয়াশাসেক্টর পেরিয়ে যাচ্ছি মরুঘর পেরিয়ে যাচ্ছি আঙুল ছুঁয়ে নিজের মুঠোতেই চেপে ধরছি অনন্ত সুখ-বিষাদ…

৪)
নিকষ অন্ধকার এত স্যাঁতস্যাঁতে যেন পিচ্ছিলবৃত্তে ক্রমশ ঢুকে যাচ্ছি সামান্য উচ্চারণ থেকে রক্তে গতিবেগ দ্রুত ওঠানামা সিঁড়ি ধরে সাঁতরাচ্ছি ভাসোমান ঘরে তুমি স্থির আর শিথিল আর মৃত পালক জুড়ে জুড়ে ডানা ফিরে পেতে চাইছো এই জলজ শৃঙ্খল ঢেউ টেনে টেনে ধরা পা গভীরতা ছিঁড়ে যাক আমাদের আড়ালের ছায়া ধীরে ধীরে ফিরে যাবে ছোট ঘরে; ঘর যা কিনা আমাদের নয় ঘরের মেঝেতে করা বিছানা থেকে বালি ঝরে পড়ছে যেন দুটো ভিজে মাংসের দেহ ঝুলে রয়েছি কামড়ায়।

৫)
বদ্ধঘর থেকে একদিন বেড়িয়ে আসছি আমরা ঠিকরে আসছি আলো যেন ঘূর্ণির পর স্থির হয়ে এলো পাতা ফুল ঝিনুকের মালা পরিহিত বাগানের পর পালকের রথে বসে ভেসে আসছি উনাসের ত্রিকোণবৃত্তে ক্ষনিকের হাসির রঙ দেওয়ালে ঈষৎ লালচে খয়েরি হয়ে খষে পড়ছে একটু কাছেই অদৃশ্যকাল সমাধির নিচে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রেম অথবা সমাহুতি…
(প্রথম সমপ্রেমী যুগল হিসেবে ইতিহাসে উল্লেখ্য ২৪০০ খ্রি-পূ তে মিশরের খ্‌নুমহোটেপ ও নিয়াঙ্খ্‌নুম এর সমাধিকে টম্ব অফ দা ব্রাদার্স/ বা ম্যানিকিওরিস্ট হলা হয়।)

৪*
তরুণ কবির ডাইরি থেকে

কিছু দিন অতিক্রান্ত হতেই রাস্তায় টেনে এনে ছুঁড়ে ফেলার অভ্যাস হয়ে গেছে জনতার, শুকনো পাতার ওপর মচ মচ শব্দে ছুটে যাওয়া কালো ছায়াদের দেখে বাতাস পিছু নেয়। গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে গোড়ালির কাছে এসে বিশ্রাম নেয় ঘাম। এরকম অবস্থায় খুব দ্রুত চেতনার বিষ নির্গত হয় ধোঁয়া নেমে আসে নেশাচ্ছন্ন ঘরে। মাটির দখল নিয়ে গোষ্ঠী সংঘর্ষে হাসছি মৃত ক্ষণিকের ক্ষোভ। এলাকার পর এলাকা কার্যত শব্দহীন চাওনির আড়াল হয়ে গেছে। আমরা তো প্রথম থেকেই মাথা ছিঁড়ে ছিঁড়ে সাজালাম বাগানের পর বাগান। এখন কয়েকটা হিম যুগ গিলে খেয়েছে ক্ষুদ্র মশাল। এখন মর্মস্পর্শী ক্ষততে পোড়া নিমগাছ বেড়ে উঠছে। পিছনে অন্ধকার আর দুঃশব্দের কান্নাঘর। কি লিখছো তরুন ? নরম মন, নরম রাত আর আলেয়ার মোহ? প্রেম তো বৃষ্টি হয়ে বর্ষা পেরোলো মেঘ হয়ে মিশে গেলো তলপেটে, যুবতীর। প্রেম তো মিছিলের পিছনেই থেকে গেলো। নিষ্প্রাণ হল যাবতীয় উন্মাদ মুহূর্ত। কলম।

নিজেদের লজ্জার পাতলা চামড়ার নিচে ফিন ফিন করছে রক্ত। এই সময় বরাবর পরস্পরের পিঠে চাকু মেরে বড় হচ্ছি কেউ কেউ। নিজেদের ধাক্কা মারছি মাঝ রাস্তায় । করাতের ধার বুঝে ছায়া কেটে পড়ছে নিশ্চুপ ভাবে। তবু বুকের ভেতর ক্ষরণ হচ্ছে অহংকারের বিষ, মনিহারে সেজে এসো অপচয় আর বিচ্ছিন্নতাবাদ। এভাবে দ্রুত সন্ধ্যে নামছে শব্দখোর তরুন তুমি দুঃসাহস দেখাবে বলে চিৎকার করছো প্রান্তিক বরাবর। কিন্তু থমকে গেলেই আঙুলের মারপ্যাঁচে ভেঙে যেতে পারে গোপন চিত্রকল্প, ইস্তেহার। এযাবৎ অপরাধময় হয়ে গেছে ভালো দিন, স্নেহরস। ক্ষত গভীর হতে না হতেই পুরনো হাসি ফিকে হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। কাঁধে নেমে আসছে অবৈধ উচ্ছাস। উড়োমতলব কারা যেন এসে গুঁজে দেয় পকেটের ভেতর। টুকরো হয় রক্তকেলাস। এখন বরং পথটা বেছেনি। খালি পায়ে দৌড়ে বেড়াই নগর চৌপথ। মাটি কাটছি, রাস্তা থেকে রাস্তা কেটে ছিঁড়ে ফেলছে স্পর্ধার হাত।

এতদিন ছুঁয়ে দেখেনি কেউ বিদ্যুৎবিদ্বেষ, চিটকে যাওয়ার ভয় নিয়ে শুকনো কাঠের ওপর চড়ে সতসং আলোকিত হল দলে দলে। আঁতর গোলাপজলে সৌজন্যতা বাড়ল। সখ্যতা নেমে এলো গলায় গলায় থেকে পায়ে পায়ে। এতদিন চুপ করে কেটে গেলো আলগা দিন। শ্লথরুপী মুচমুচে হাসিক্লাবে কবিতা পাঠ হল । আকাদেমি অনুমোদিত পোশাকে করমরে শব্দ । কাগজের বাজারে শব্দ বিকোচ্ছে সস্তায়। ছোট ছোট কাগজের ভিড়ে ঘুণপোকা খুশি তাহলে। রঙিন ছবি ও পুরস্কার বিনিময়ের মুহূর্ত ফুটে ওঠা কাগজের দুর্গন্ধ অসহ্যকর। কি করলাম বলতো তরুন? এতদিন এইঘর ওইঘর করে কি পেলাম? বেলাগাম তকমা আর ফুটো মাদুলির মোম?

৫*
তোমাকে এভাবে দেখিনি কখনো…

আঙুল ভাবতে ভাবতে উঁচু ঘাসফুলে সন্ধে নেমে এলো, এরপর পাথর জড়িয়ে নদী হয়রান হবে গাছের ছায়ায় খালি হয়ে যাবে কথার শরীর, আর জন্ম-জন্ম নিস্তার পাবো না। মগ্ন হই চলো আমাদের প্রশ্ন হই আর উত্তর ফিরিয়ে ঘুরিয়ে ছিড়ে ফেলি ঘুম। দিলদার হই, বেহায়া বাতাসে এসো চুমু রাখি আগুনে তোমার অথবা আড়ালে, পোশাক ছাড়িয়ে ছুটে যেও ঘনগাছ; শরীরের কথা গোপন জানলো, ইশারার কথা জানলো না কেউ। সন্ধের পর জল ফাঁকা হল, উৎসবে চন্দ্রবোধন… মাটি তুলে রাখা হল এভাবে একক, অনেক ভাঙনে তোমাকে আটকাই। কাঠামো থেকে নেমে আসো তুমি, দু হাতে অন্ধকার। এসো কালোবিষাদে হাত রাখি মোহ, আর নি:সঙ্গতা উপড়ে এনে ফেলি দু ঠোঁটে তোমার, দেখো নগ্ন হচ্ছি মঞ্চস্থ হচ্ছি দেহজ নাটক, তোমাকে ছুঁতেই আবিষ্কার করি নিজেকে নিজের ভেতর… তোমাকে এভাবে দেখিনি কখনো… চোখ থেকে দেহে বহুদিন আজও  হারিয়ে যাইনি  কোথাও, আজ  দেহ  থেকে চিকন সুতোর কারুকাজ খুলে রাখতেই তুমি নেই… কতটা পাগল সরিয়ে রেখেছ বলো,  কতটা লুকানো কিশোরীতে উন্মাদ। এভাবে  কখনো ছুঁইনি তোমাকে আর, সেসব না ছোঁয়া লেগে আছে ঘরময়। তবু  তোমাকেই  ভাবি আলোমাটি,  তবু যেন ঘিরে ধরে খাদের চতুর্পাশ… একা উদ্দ্যান, আর দীর্ঘ অন্ধকাল,   তুমি  তো জানো আর আড়ালে তছনচ ভালোবাসো। আসলে এই দেখে ফেলাটুকুই  চরমসর্বনাশ, ক্ষতিকর স্নান, ভিজে আলো…

*************
কবি – পরিচিতি

সুভান।
ঠিকানা – প্রযত্নে স্বর্গীয় যোগেশ্বর দাস
                 ডি. আই. ফান্ড মার্কেট, নিউ সিনেমা রোড
                 ডাকঘর –  শিলিগুড়ি টাউন
                 জেলা – দার্জিলিং – ৭৩৪০০৪
                 পশ্চিম বঙ্গ, ভারত
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ – ঈশ্বরহীন স্তবক ও এথিওস কবিতাগুচ্ছ (২০১৫)

যোগাযোগ – (+৯১) ৯১২৬৬৯৬০০২
ফেসবুক লিংক – www.facebook.com/suvankard

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E