৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
সেপ্টে ১৫২০১৭
 
 ১৫/০৯/২০১৭  Posted by

শিমুল মাহমুদ

প্রাইমেট

স্বর্গের বাগান থেকে নিজেকে মুক্ত করে প্রাইমেট-পিতা পৃথিবীর বাগানে সৃজন করে চলেছেন মানবশিশু। জৈব-স্থাপত্যকলা ‘ডিএনএ’ বিন্যাস। আমি বিন্যাসের সীমানায় আটকে থাকা বিষণ্ণ শরীর। প্রতিটি মানবদেহ শেষাবধি অসম্পূর্ণ আর ভয়ানক রহস্যে মোড়ানো।


আলফা থেকে ওমেগার দিকে ছুটছে ওরা। স্ট্যালিয়ন ঝড়ের বেগে একজন শি-প্রাইমেট তার হি-প্রাইমেটকে নিয়ে ছুটছে। রূপকথা কাঁপছে; জরায়ুতে কাঁপছে শিশু। দেহমিলন শেষে বালিশে মাথা রেখে শুয়ে আছে ওরা; একজোড়া অর্গানিক হার্ডডিক্স। চেতনার আতশবাজি।


অনন্তের দিকে এগিয়ে চলেছে সৌরগোলক। শার্ট পড়েছ তুমি, প্রাইমেট শিশু; লাল পোশাকে মোড়ানো ক্যান্ডি খাচ্ছ? মায়ের কাছে এসো। বৈশাখের আর মাত্র এক রাত বাকি। সৌরগোলক রেড-জায়ান্টে পরিণত হবার পর, কত শতাব্দী পাড়ি দিয়েছ তুমি?


আমরা যখন প্রেম করতাম তখন আমাদের মস্তিষ্ককোষ আমাদের কাছে ছবি পাঠাতো; চুম্বনছবি। ছিনেমার পর্দায় আমাদের মস্তিষ্কের দৃশ্যপট পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা সেই ছিনেমা দেখছি, প্রকৃত প্রস্তাবে নিজেকেই দেখছি। তোমাকে চুম্বনের অর্থ নিজেকেই চুম্বন; প্রাইমেটরা ভালোবাসে আর বিষণ্ণতায় কাঁদে।


সৌরশূন্যতা ঝুলে আছে জানালার গ্রিলে। খড়কুটো ঠোঁটে উড়ে আসে চড়ুই; ডিম ভেঙে উড়ে যায় সৌর ডানা। ওয়েব-পর্দায় ভেসে ওঠে ডানাওয়ালা পাখিদের সৌরসংবাদ। স্মৃতি থেকে মুছে ফেলি ভৌগোলিক সীমা। বায়োলজিক্যাল যুদ্ধে টিকে আছি আমি। স্তন্যপায়ী। জৈব প্রাইমেট।


ঘাসেদের জৈবদেহে লুকিয়ে রয়েছে সময়ের ছাপ। ডুবোজাহাজের কেবিন বেয়ে ভূমিতে উঠে আসে সমুদ্রকাছিম। সময়ের ডানা থেকে নিজেকে বিযুক্ত করে জেগে ওঠে প্রজন্ম-প্রাইমেট। আমার জন্মের পর এইসব স্তন্যপায়ী-পরিবার-কথা বহন করে এনেছিল কোন এক শি-প্রাইমেট।


হাইপার ইনডিভিজুয়াল মাস্টার ম্যামালদের আমি একজন। মনে করো আমার জমজ ক্লোন রয়ে গেছে কোন এক অচেনা গ্রহে; অথবা আরো একজন ‘আমি’ নামহীন কোন এক প্রজাতির ভেতর জন্মের প্রতীক্ষায় অপেক্ষারত। কোষবিভাজনের লাটারি খেলায় লক্ষ কোটি প্রজাতির মতো আমিও অপেক্ষায় আছি, কখন কতটুকু কোষবিভাজনে হয়ে উঠবো কতটুকু মানুষ!


বৃষ্টি থেমে গেলে বুঝে যাই সবুজ পাতা কতটা সবুজ। পতিত পাতার গায়ে নাম লিখে ভাসিয়ে দিয়েছি আমি মালদার জলে। প্রাণকণায় জেগে উঠেছো আবার প্রিয় নার্গিস বেগম। স্মৃতিকোষে জেগে আছে ছবি; যে ছবি দেখনি কখনো তুমি। পাতাদের ‘ডিএনএ’ জেনে নিয়ে বুঝে গেছি আমি এক জটিল যৌগ; তিন গিগা স্মৃতি-র‌্যাম; বিভাজিত কোষ-কাঠামো।


প্রতিটি জৈবকোষের ভেতর দেড় গিগাবাইট তথ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছ তুমি তথ্য-অফিস বরাবর। তথ্য-অধিকার উড়ছে সরকারি অফিসের ধাতব ফলকে। সবুজ পতাকার কাপড়ে কাঁপছে তথ্যচোখ। তুমি এগিয়ে যাচ্ছ তোমার চল্লিশ ট্রিলিয়ন দেহকোষের ভেতর ষাট জেটাবাইট তথ্যসংকেত নিয়ে ভোট-বাক্সের দিকে। শাসক বদল শেষে মানবকোষের কাছে ফিওে যাচ্ছে মানুষ।

১০
আমাকে বুঝবে না! বিস্মিত হবার মতো কোন যোগ্যতা অর্জিত হয়নি তোমার। মস্তিষ্কে স্মৃতির জেলি। কোথাও কোনরূপ কথা নেই। তুমি অপরিকল্পিত মাংসপিণ্ড বিরামহীন কোষ-কলোনি।

১১
ঈানির উপরিতল ভেদ করে উঠে এলে তুমি, লাঙফিশ। প্রথম কোষবিভাজন শেষে কতটি প্রজন্মের কথা মনে আছে তোমার? প্রথম স্তন্যপায়ীর পর কতগুলি প্রজন্মের হিসেব জমা আছে স্মৃতিকোষে এখন? স্তন্যপায়ী মানব; স্মৃতিকোষ মুছে গেলে আর কোনো অবশেষ থাকবে না এই সৌরলোকে তোমার।

১২
জাদুর দরজা খুলে রেখেছো তুমি। সেই উন্মুক্ত দরজার ওপাশে তাকিয়ে রয়েছে ‘চোখ’। তোমার দৃষ্টিশক্তি প্রখর হতে লেগে গেছে কতো কোটি বছর! হাইপার ইন্টেগ্রেটেড্ প্রোটিন্স আর অ্যামিনো এসিডে স্থিও করেছো দৃষ্টি। অথচ তুমি বলছো এখন চিনতে পারছো না ‘মানুষ’।

১৩
সোনালি কবুতর খুঁটে খুঁটে খায় দারুচিনি ফল। ফলের গভীওে বীজ। বীজ ভেঙে দেখি উদ্ভিদশিশু। আমাদের চোখের ভেতর লুকিয়ে আছে আব্বাস আলির গোয়াল ঘরের দুধসাপ। আকাশে চাঁদ উঠেছে; নগ্ন শিকারি চাঁদ। আসলে ভেতরে ভেতরে সকলেরই শিকারি স্বভাব; উদ্ভিদ, পাখি, চাঁদ অথবা মানুষ।

১৪
পাখির ডানার লোভে হাতের বিকল্প খুঁজি। ডানা থেকে খসে পড়লে পালক, যৌনতা মুখ্য হয়ে ওঠে। সিড়ির দ্বিতীয় ধাপে পড়ে আছে খসে পড়া দুইটি পালক। সিড়ির তৃতীয় ধাপে পড়ে আছে খসে পড়া এক টুকরো চাঁদ। এইভাবে ক্রমশ খসে পড়া চাঁদ, খসে পড়া পালক অথবা খসে পড়া মানুষ হয়ে ওঠে এক একটি গল্প। চিরায়ত আর্কেটাইপ।

১৫
পানিতে অক্সিজেনের অভাব দেখা দিলে মাছেরা ভেসে ওঠে শূন্যে। চন্দ্রশূন্যতায় জল কৃষ্ণবর্ণ হয়। অক্সিজেন-রহস্য জানা হয়ে গেলে আমরা সতর্ক হবার কথা ভুলে গিয়ে ফিওে আসি গতির কাছে। আমাদের শিশুরা গতিপাঠ শিখবে ভেবে ভুলতে বসেছে নৃত্যমুদ্রা, জলের খালাতো বোন, চন্দ্র যার নাম।

১৬
পৃথিবীতে পা আটকে মহাশূন্যে ঝুলে আছি। কেন আছি এইভাবে মিছেমিছি ঝুলে? পাখির প্রাকপ্রাচীন ভাই ডায়নোসর তার নাম। তাহলে বিলুপ্ত নয়, বিবর্তনরেখা ভূমি থেকে শূন্যে ওড়ায়। পাঁচ কোটি বছরের পেছনে ভেসে থাকা কোন এক নক্ষত্রের বুক থেকে ভেসে আসছে দীর্ঘপথ আলোকরেখা। তিন হাজার বছরের চিন্তাসূত্র মগজে নিয়ে জেগে দেখি মানুষের প্রাণসূত্র জেগে আছে মহাকাশ-ছায়াপথ ঝাঁপটে ধরে। মনে করো সেইখানে সেই ছায়াপথে আমি আছি অথবা তুমি; প্রাণের বিবর্তনরেখা স্বপ্নে গেঁথে।

১৭
পৃথিবীর একমাত্র কন্যা চন্দ্র যার নাম। পাখির ডানার স্মৃতি মগজেি নয়ে ডানাহীন হাতের শেকড়ে জেগে ওঠে ছায়াপথ মহাশূন্যের বিস্ময়। তারপর মেয়েটি বলেছিল ছেলেটিকে, এসো ধওে রাখি বংশগতির ভেতর উত্তর-মানুষের প্রেম। ডারউইনের বিবর্তন সূত্র মিথ্যে হয়ে যায়, ভালোবাসি যখন তোমাকে।

১৮
জলের গভীরে গিয়ে বুঝে যাই আকাশের বিকল্প নেই। স্মৃতিকোষে জলগাথা গেঁথে নিয়ে ভেসে উঠি পৃথিবীর ডাঙায়। এইভাবে বহুকাল মাটিতে, বৃক্ষে অথবা অক্সিজেন-সীমায়। ঘুম থেকে জেগে দেখি কার্বন-মেঘে ছেয়ে গেছে আমাদের জীবন।

১৯
অবশেষে বুঝে গেছি, আমি এক জটিল যৌগ, বায়োক্যামিক্যাল সত্তা, বহুকোষী জীব। তোমাকে ভালোবাসার অর্থ মরণশীল দেহের জৈবকোষে চুম্বন রাখা। তুমি কি জেনে গেছো কোন্ গাছে কোন্ পাখি বসে? এসো জৈব যন্ত্রণা ভাগ করে নেই জৈব ভাষায়। তুমি অথবা আমি স্বর্গে ফিরতে পারবো না কখনো। স্বর্গ থেকে নেমে এসে আটকে আছি বায়োলজিক্যাল ঘড়ির ভেতর।

২০
আমাকে জাগিয়ে তোলা হচ্ছে; টেনে বের করা হচ্ছে জরায়ু থেকে। আমি জন্ম নিতে শুরু করেছি। জন্মের পর আমি এই প্রথম পাথরের স্বপ্ন দেখলাম; আমার জানা ছিল না পাথর নিজে কখনো স্বপ্ন দেখতে পাওে না। শুনলাম কারাগার থেকে সব পাখি চলে গেছে অতীতের দিকে। আলোর আঘাতে সমুদ্র গান গাইছে। আমার কপালের ভেতর দিয়ে সূর্য উঠতে শুরু করেছে। জৈবনিদ্রা ভেঙে যাচ্ছে। মহাকাশ সমান পরিধি নিয়ে পৃথিবী ঘুরছে। চোখের সামনে ভেসে উঠলো দিগন্ত বিহীন আকাশ। যেখানে একটিও পাখি নেই। শুধু বৃত্ত আর বৃত্ত।

২১
পনেরো বিলিয়ন বছর পর বিগব্যাঙের সৃজনধ্বনি বুঝতে চেয়েছো তুমি; কীভাবে বুঝবে ‘মানুষ’? মহাশূন্যে আতশবাজির পরিণাম আজকের পৃথিবী। আমাকে পেয়ে যাবে, এগিয়ে যাও আতশবাজি বরাবর। আত্মগোপনে দক্ষ বলে জানি যাকে, আমাদের পাড়ায় তাকে ‘ঈশ্বর’ নামে ডাকে।


শিমুল মাহমুদ

শিমুল মাহমুদ

শিমুল মাহমুদ। জন্ম ৩ মে ১৯৬৭, সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে পাঠ গ্রহণ শেষে ইউজিসি-র স্কলার হিসেবে পৌরাণিক বিষয়াদির ওপর গবেষণা করে অর্জন করেছেন ডক্টরেট ডিগ্রি। বর্তমানে তিনি রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, চেয়ারপারসন ও কলা অনুষের ডিন-এর দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত বই : কবিতা— মস্তিষ্কে দিনরাত্রি [কারুজ, ঢাকা: ১৯৯০] সাদাঘোড়ার স্রোত [নিত্যপ্রকাশ, ঢাকা: ১৯৯৮] প্রাকৃত ঈশ্বর [শ্রাবণ প্রকাশন, ঢাকা: ২০০০] জীবাতবে ন মৃত্যবে [শ্রাবণ প্রকাশন, ঢাকা: ২০০১] কন্যাকমলসংহিতা [ইত্যাদি, ঢাকা: ২০০৭] অধিবিদ্যাকে না বলুন [ইত্যাদি, ঢাকা: ২০০৯] আবহাওয়াবিদগণ জানেন [চিহ্ন, রাজশাহী: ২০১২] কবিতাসংগ্রহ : সপ্তহস্ত সমুদ্রসংলাপ [রোদেলা, ঢাকা: ২০১৪] স্তন্যপায়ী ক্ষেত্রউত্তম [অচেনা যাত্রী, উত্তর ২৪ পরগণা: ২০১৫] বস্তুজৈবনিক [নাগরী, সিলেট: ২০১৬] গল্প— ইলিশখাড়ি ও অন্যান্য গল্প [নিত্যপ্রকাশ, ঢাকা: ১৯৯৯] মিথ মমি অথবা অনিবার্য মানব [পুন্ড্র প্রকাশন, বগুড়া: ২০০৩] হয়তো আমরা সকলেই অপরাধী [গতিধারা, ঢাকা: ২০০৮] ইস্টেশনের গহনজনা [আশালয়, ঢাকা: ২০১৫] নির্বাচিত গল্প [নাগরী, সিলেট: ২০১৬] অগ্নিপুরাণ ও অন্যান্য গল্প [চৈতন্য, সিলেট: ২০১৬] উপন্যাস— শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী [ইত্যাদি, ঢাকা: ২০০৭] শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী [ধানসিড়ি, কলকাতা: ২০১৪] শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনি [চৈতন্য সংস্করণ, ২০১৬] প্রবন্ধ— কবিতাশিল্পের জটিলতা [গতিধারা, ঢাকা: ২০০৭] নজরুল সাহিত্যে পুরাণ প্রসঙ্গ [বাংলা একাডেমী, ঢাকা: ২০০৯] জীবনানন্দ দাশ : মিথ ও সমকাল [গতিধারা, ঢাকা: ২০১০] বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ধারার কবিতা [গতিধারা, ঢাকা: ২০১২] মিথ-পুরাণের পরিচয় [রোদেলা, ঢাকা: ২০১৬] ই-মেইল : shimul1967@gmail.com

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E