৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ০৯২০১৬
 
 ০৯/১২/২০১৬  Posted by
যুগান্তর মিত্র

যুগান্তর মিত্র

কবি পরিচিতি
যুগান্তর মিত্র। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম-সমকালীন বর্ষে জন্ম। কলকাতার কালীঘাট অঞ্চলে। শৈশবেই নদীয়া জেলার কল্যাণীর উপকণ্ঠে সপরিবারে চলে আসেন। সেই থেকে সেখানেই বসবাস। শিক্ষা স্নাতকোত্তর। প্রয়াত পিতা ছিলেন রাজ্য সরকারি কর্মচারী। মা, স্কুলশিক্ষিকা স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে সরল সংসার। বাড়িতে পড়াশোনার চল থাকলেও লেখালেখির দিকে সেভাবে কেউ ছিলেন না। পারিপার্শ্বিক পরিবেশই কবিতায় উৎসাহিত করেছে। একটি প্রকাশনী সংস্থায় চিফ এডিটরের চাকরি করেন। এরই ফাঁকে লেখালেখির চর্চা। কবিতা দিয়েই সাহিত্যজীবন শুরু। সম্প্রতি গল্প ও অণুগল্পও লিখছেন।
প্রকাশিত গ্রন্থঃ ধ্বংসের দিকে যাত্রা (কবিতাগ্রন্থ)
কাফকার গল্পঃ (অনুবাদগ্রন্থ)
আত্মহননের কথামালা ~ (অণুগল্পগ্রন্থ)

যুগান্তর মিত্রের কবিতা-ভাবনা
কবিতা এক অমোঘ ভাবনা-ফসল, যা শব্দ ও না-শব্দে যা লেখা হয়। বস্তুত কবি তাঁর কবিতায় যে শব্দবিস্তার ঘটান, তার থেকে না-লেখা শব্দ অনেক বেশি থাকে, যেগুলো কবিতা-শরীরের আশেপাশে অদৃশ্য হয়ে ঘোরাফেরা করে, সেই কবিতার প্রতিই আমার টান বেশি। যে কবিতা পড়তে পড়তে, কবিতায় ডুবতে ডুবতে সেই শব্দ ও না-শব্দের বুদ্‌বুদ্‌ এক অন্য ভুবন রচনা করে, সেখানেই মুক্তির আনন্দ পাওয়া যায়। অনেক কবিতা-শরীর থেকে তুলোবীজ উড়তে দেখা যায়, আর সেই উড়ন্ত বীজবলয় ধরার চেষ্টা করি আপ্রাণ। কখনো ধরতে পারি, কখনো পারি না। তবু তুলোবীজের ওড়াওড়ির মধ্যে আনন্দ পাই। এই কারণেই কবিতার প্রতি নতজানু হই বারবার। এই আমার কবিতা-ভাবনা, আমার কবিতাস্বপ্ন। নিজে কবিতা লেখার চেষ্টা করি, তুলোবীজ ওড়াতে চাই, কিন্তু কিছুতেই পারি না। তবু অগ্রজ, সমকালীন ও তরুণ কবিদের কবিতায় স্নান করতে ভালো লাগে।

যুগান্তর মিত্রের কবিতাগুচ্ছ

[১]
ঘুমের ভাষা

ঘুমের ভাষা শিখছি,
আর উল্কাপাতের সূত্র।
ফলত স্বপ্নের গলিপথ
হারিয়ে ফেলি বারবার।
শোকসংবাদ এখন
উপদ্রবহীন ছায়াপাত।
তাই নদীর ধারে বসে
জল মাপছি
ঘুমের ভাষায়।

[২]
সম্পর্ক

রাত্রি পালক খসায় যত্নে,
একান্ত আড়ালে।
না-দেখার ভান কোরে চাঁদ
গোলগোল চোখ নিয়ে দেখে নেয়
পরদার গোপন বিলাস।
ভাঙা কলসির থেকে
সম্পর্ক গড়িয়ে পড়ে
নীচে, আরও নীচে …
মানুষচিহ্ন নিয়ে
কারা যেন তবু জেগে থাকে
গাছেদের মতো চিরকাল।

[৩]
আগুনের স্বরলিপি

দস্তানা খুলে রাখছি,
তারপর নূপুর, রাতপোশাক।
শুধু নথ বাজি রেখে
নগ্ন হতে চাই।
মহাকাল, আমাকে সাঁতার শেখাও,
কচুরিপানা সরিয়ে
এগোনোর সূত্র খুঁজে দাও।
তারপর পুরুষ-পুরুষ চাঁদকে
ধর্ষণের অক্ষরমালা শেখাব।
যেখানে দস্তানা বা নূপুর
কোনোটাই সাজবাহারের পদ্ধতি নয়।
নথ থাকুক বা না-থাকুক
যৌথগীতি থাকবে সেখানে।
আর থাকবে আগুনের স্বরলিপি,
যাকে সব বোকারাই ভালোবাসা বলে।

[৪]
বয়ঃসন্ধি

আলোর সুতো ওড়াচ্ছে বয়ঃসন্ধি,
আর অন্ধ যুবতী তার ডানায়
লিখে রাখছে তেপান্তরের ইতিহাস।
কে বাঁশি বাজায় এই দুপুর রৌদ্রে ?
চৌকাঠে আছড়ে পড়ে তিলককামোদ।
আলোর সুতোয় জড়াচ্ছে
ধুলো-ধুলো কবিতা-অক্ষর।
অন্ধ যুবতীর ডানা দেখতে দেখতে
আমার বয়ঃসন্ধি পার হচ্ছে
পৃথিবীর নিরক্ষরেখা।

[৫]
প্রেমসংগীত

(১)
বাতানুকূল রাত্রির পাশে বসলেই
আমার প্রেমসংগীত জেগে ওঠে।
আর মৃত্যুপরবর্তী শোকসংবাদ বিছিয়ে দিয়ে
কারা যেন হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা হতে চায়।
যেন সুর ধরে হাজার হাজার ফেনা
হেঁটে আসবে পিছু পিছু।
আসলে যা আসে, তা এক জন্তু জন্তু খেলা,
জাদুদণ্ডের মায়াবিভ্রম।

(২)
ধূপধুনোর গন্ধে আমার প্রেমসংগীত
ক্রমশ ঘুমিয়ে পড়ে।
ঘুম-ঘুম রাত, যৌনগন্ধী কলস
আর আঁশটে হাওয়া জড়ো করে
আমি ফিরে আসি বৃত্তের মধ্যে।
সেখানে আলো গুনতে থাকে
দিনের যাবতীয় স্বেচ্ছাচার।

[৬]
সান্তাক্লজ

প্রতিদিন সান্তাক্লজ হয়ে বাড়ি ফিরি।
মোজা ঝোলে ঘরের জানালায়।
যা-কিছু সম্বল সব ঢেলে দিই,
বিনিময়ে জানু পেতে বসে ভালোবাসা
অন্ধকার সেতুর উপর।
আত্মহননের মতো এত তীব্র প্রেম
সবার জোটে না !

[৭]
কাঙালকথা

পাথর ঘসে ঘসে উঠে আসে
স্বগত সংলাপ।
মাতাল করা সন্ধ্যাগীতি
আলস্যের বিরহকুসুম গেঁথে রাখে।
তোমার কাছে গচ্ছিত রাখা রমণবিলাস
আমাকে আছড়ে ফেলে কাঙাল উঠোনে।
এই নাও পালক-জীবন,
এই নাও হা-ক্লান্ত বিকেল !
তরজা গান, রুপোলী চাদর
আর হলুদ পাতা,
সব বিছিয়ে দিলাম এই বিষণ্ণ মাদুরে।
সারা গায়ে আত্মহননের রঙ মেখে
এখন আমি পুনর্জন্মের গল্প খুঁজি।

[৮]
উল্টোরথ

ফুটনোটে লিখে রাখি এক্কাদোক্কা,
ছক্কাপুটের ব্যাখ্যা ও বিদ্রূপ।
উপরে আমোঘ জলের নাট্যকলা।
নিয়ন আলোয় কেউ কেউ মুখ ধোয়,
রাস্তায় লিখে রাখে
পারিবারিক উঠোনের ইতিহাস।
এসো, আমরা বরং উল্টোরথে চড়ি।
শব্দ ছুঁয়ে ছুঁয়ে সুর ধরে হেঁটে যাই,
যেখানে চৌরাশিয়ার বাঁশি বাজে
শীত-শীত চোরাটানে।

[৯]
বিবাহবাসর

বোধনের পরেই
রতিবিলাসের ফ্ল্যাগমার্চ…
বেলুন ফোলানো অহংকার।
বাঁশিওয়ালা এখন তাঁবুর আস্তানায়,
নিজে-নিজেই মাথা দোলায় সাপ।
উপহারের মতো রাংতা খুলে
জরিপাড় আলপনা চোখের আলোয়
মেলে ধরছে কি কেউ !
বিবাহবাসর দেখো সেজে উঠছে
শ্লেট পাথরের কারুকাজে।

[১০]
দশক

নির্বিকার ছন্দে নদী এগিয়ে যায়,
ছলাৎছল ভ্রম ও ভ্রমণ।
জলস্রোতে মিশে যায় বিকেলের রঙ,
দশক-শব্দের মৃতদেহ, ধুলো।
মুঠোভর্তি চাঁদ থেকে গলে পড়ছে
মধ্যরাতের আঠা।
কেউ কেউ রন্ধনপ্রণালী
লিখে রাখে হিসেবি খাতায়।
ভরসা এটুকুই, সাহসী মেঘেরা ওড়ে
পাতাবাহারের ধার ঘেঁসে…

[১১]
সম্পর্ক

সেলোফেন পেপারে মোড়া সম্পর্ক
খুলে দেখি মাঝে মাঝে,
আবার সযত্নে বেঁধে রাখি।
ইনবক্সে ‘শুভ সকাল’ আলো ছড়ানোর বদলে
সুতো হয়ে ঝুলে থাকে।
সুতোর মাথায় ঝোলে নাকছাবি, চিকচিক।
বন্ধ ঘরে আলো জ্বালানো নিষেধ,
আমি ভুলে যাই বারবার…

[১২]  
অনভ্যাসের গান  
                         
অভ্যাস গুছিয়ে রেখেছি নীল খামে।
অনভ্যাসে সাড়া দিচ্ছে শিরা ও ধমনী।
ফটোফিনিশে কেউ কেউ প্রথম থেকে
ছিটকে যাচ্ছে দ্বিতীয় শ্রেণীতে।
আর তখনই ছিঁড়ে যাচ্ছে গিটারের তার।
ধানের শীষে প্রহর নামে,
রাতপাখি ভুলে যাচ্ছে সুর।
অভ্যাস আর অনভ্যাসে
ভেঙে পড়ে আগুন-বিলাস।
আহা গান, দৃষ্টি ভুলে যাও…

[১৩]
খেলা

প্রথমে মেঘ লিখছি, তারপর বৃষ্টি
আকাশের গায়ে।
নীচে শামিয়ানা টাঙিয়ে
আঁশটে গন্ধে লিখে রাখি
আষাঢ়শ্য প্রথম দিবস।
আসলে এসবই লোকদেখানো খেলা
আর নানা সরঞ্জামের উল্কি আঁকার কৌশল।
এভাবে রাত বাড়লে
নকশা বদল করা যায়,
মানুষ-মানুষ পুতুল তৈরি হয় না মহারাজ !

[১৪]
সময়

সকাল মানেই স্কুলগেটের শিশু উৎসব নয়,
স্কুলপালানো ঈশ্বরও থাকে।
রাত গড়িয়ে গেলেই
রতিক্রিয়ায় গড়িয়ে পড়া নয়,
নদীসভ্যতার গোপন ইতিহাসও।
সময় মানে নির্দিষ্ট রন্ধনপ্রণালী
কিংবা প্রসাধনী সাজিয়ে রাখা।
সময় আসলে চলাচলের বাউল-উৎসব।
আমি এসবের কিছুই বুঝিনি কোনোদিন…

[১৫]
কৃষ্ণগহ্বর

দৃষ্টি এফোঁড়-ওফোঁড় করে
ছুটে যাচ্ছে ফোটণকণা,
কৃষ্ণগহ্বরের দিকে
সময়ের ঢেউ।
তুমি কাছে এলেই মনে হয়
কিছু কি বলার ছিল ?
কিংবা কোনো অসম্ভব কাজ ?
ফোটনকণা থেমে গেলে বুঝি তুমি এলে,
কৃষ্ণগহ্বর থেকে উঠে আসবে
তৃতীয়ার চাঁদ।
আমি তখন তুমি হয়ে উঠতে চাই,
রাধিকাসংবাদ বুকে নিয়ে।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E