৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুলা ১০২০১৬
 
 ১০/০৭/২০১৬  Posted by

মননশীল সহিত্য, অতিন্দ্রীয় ভাবনা, বাউল ঘারানা ও
মাদক আশ্রিতের ভিন্ন উপাখ্যান
– হাসান আহমেদ চিশতী

বিশ্ব মনন সাহিত্য ভাবনা কতটা Extreme এ চলছে এবং এর ফর্ম বা রিফর্ম ইভোলিউশন দিয়ে নাকি রিভোলিউশন এর কায়দায় তাড়িত হবে, তা শংকামুক্ত নয়। পাশাপাশি আভিজাত্যের নীলকন্ঠ কতটা স্বীকৃত এবং হলাহল পান করে শিবত্ব প্রাপ্তির অতিন্দ্রীয় ভাবনা কতটা জাগ্রত, তার অনুপাত স্মৃতি ও বিস্মৃতির পাতায় রয়ে গেছে। একজন ইংরেজীভাষিকে যদি বলেন- The sky has broken down on my head.!  সে কথাটার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারবে না, আপনার মাথার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকবে। একজন বাংলাভাষিকে যদি বলেন- আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে! দেখবেন সে হন্তদন্ত হয়ে জানতে চাইবে, কেন? কি হয়েছে? অর্থাৎ এ কথার অর্থ সে সহজেই বুঝতে পারে। এই হলো কালচারের লোকালাইজেশন গ্যাপ। আজকের পুঁজির বিশ্বে এটাই হচ্ছে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে গ্লোবালাইজেশন ফ্লপ।

এবার যদি বলা হয়, প্রকৃত অর্থে মননশীল সাহিত্য কি? এর ভাবার্থ বিশ্লেষণ করতে গেলে সাহিত্য ভাবনার অন্তর্গত স্বরূপের দীর্ঘ্যতম পথ পরিক্রমার ভেতর দিয়ে আসতে হবে। সাহিত্য ভাবনা কোথা থেকে এসেছে, তাও আবার মনন বা ক্রিয়েটিভ ও ক্রিয়াশীল। খুব সংক্ষিপ্ত করেও যদি বলা যায় তবে এর ধারা; তান্ত্রিক তথা জ্ঞানী এবং ধর্ম বাণী বা ধারণার ঘারাণার ধারাবাহিকতা থেকেই সাহিত্যের উদ্ভাবন।

কেননা প্রত্যেকটি ধর্মবোধই মানুষকে সংগঠিত করেছে। এটা হয়েছে গোষ্ঠিগত আপন আপন বলয়ে এবং তৎশাস্ত্রীয় কল্যাণকামীতার উলে­খ করে। সামাজিক ও রাজনৈতিক ধারায় ঐতিহাসিক মতান্তর হতে পারে। তবে মনন সাহিত্য কল্যাণকামিতার প্রেক্ষিৎ বিচারে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, সাহিত্য শব্দটির সহিত শব্দজাত লেখকের সহিত পাঠকের সাহিত্য এবং তা কল্যাণ কামিতায় সম্পৃক্ত। অপরদিকে বঙ্কিমচন্দ্রের মতে, স+হিত শব্দ থেকে সাহিত্য শব্দজাত, হিতকারিতা সাহিত্যের আদর্শ। মনন সাহিত্যের আদর্শগত দিক নিয়ে বহু বিচিত্র ভাবনারপ্রকাশ, লেখক সত্তায় অবিমিশ্র ধারায় রয়েছে। যেমন রবীন্দ্র বলয়ে আবর্তিত পঞ্চপান্ডবের কথা আমরা জানি ঠিক তেমন আবার তার বাহিরেও ভিন্নমাত্রার জ্ঞান অনুশীলনের মনন সাহিত্যের বিকাশও বিস্তৃতি কম নয়।
ড. মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ, প্রমথ চৌধুরী, মাইকেল মধুসুদন দত্ত, মোহিতলাল মজুমদার, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম, মীর মোশাররফ হোসেন, ফররুখ আহম্মেদ, সৈয়দ আলী আহসান, আকরাম খাঁ, আল মাহমুদ সহ অনেকেই মৌলিক সাহিত্যের অনবদ্য সৃষ্টিকৃত অনন্য অবদান রেখেছেন। অথচ প্রবৃত্তি থেকে চিত্তবৃত্তির সাহিত্য চারণ ভূমিতে প্রতিক্রিয়াশীল আর প্রগতিশীল কথার বিতর্ক এনে দশক বিভাজনে কেউ কেউ পান্ডিত্যের ক্ষুদ্র সরোবরে ডুব সাঁতার খেলতে বেশ পারদর্শীতায় পারঙ্গম হয়ে উঠেন। বরং সহজ শর্ত মেনেই আমরা বলতে পারি, মানুষের মনই হলো প্রার্থনার পাদপিঠ, মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, মঠ। অর্থাৎ মনের মানবিক বৈশিষ্ট্যের প্রকৃত চেতনাই মননশীল ক্রিয়া প্রকাশেই স্বরূপ নির্ণিত হয়। সুতরাং মনের মান উন্নয়ন অত্যাবশ্যক। সেই উন্নয়ন পরিচর্যায় কালের যাত্রার গতিধারাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। তারই কিছু আংগিক বিবেচনার মাত্রা বিশ্লেষণ নিয়ে “মননশীল সাহিত্য, অতিন্দ্রীয় ভাবনা ও মাদক আশ্রিতের ভিন্ন উপাখ্যান” আলোচনা খতিয়ানের খেরোখাতা খুলে বসেছি।

প্রথমেই বলে রাখি যে আলোচনার নাতিদীর্ঘ্য পথ পরিক্রমায় মিল বা অমিলের ধারাক্রম বিবেচ্য নয়। কারণ প্রকৃত বিষয়টির অবতারণা হয়েছে নানাবিধ লোকজীবনের বা ক্রসসেকশন পিউপুলের মৌলিক ভাবনার কথকতার সংঘাত থেকে। সুতরাং নামের সংযোজন বা বিয়োজন কিংবা কালবিভাজন সূচির সমান্তরালে থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। সে যাই হোক, বহু জনশ্র“তিতে পাওয়া যায় যে, মননশীল বা সৃজনশীল সাহিত্য সৃষ্টির স্মরণীয়-বরণীয় মানুষ যে, মাদক আশ্রিত হয়ে আত্মবিনাশের পথে হারিয়েছেন এবং তা কৌলিন্যের অগ্রজদের কাছে ধোঁয়াশার মতই ইতিহাস হয়ে আছে। বিশ্বব্যাপি লেখক-সাহিত্যিকদের বর্ণাঢ্য আত্মজীবনীর বিপুলায়তন ঘিরে যেমন বিপ্লবী আত্মত্যাগ মহিমান্বীত তেমন ক্ষেত্রবিশেষে মাদক আশ্রিত আত্মহননের জীর্ণতাও বিধৃত হয়ে আছে। এমনকি সাহিত্যের উপাদান-উপকরণ খুঁজে ফেরার পরিক্রমন বা পরিভ্রমণে লেখকের দ্রষ্টা নষ্টালজিয়ার শেষ দ্রষ্টব্যে করুণ পরিণতির শিকারও হয়েছেন এমন বহু বিচিত্র নজিরও আছে। সেক্ষেত্রে আমরা ব্যোদলেয়ার এর কথা জানি যে, তিনি ভারতবর্ষে এসে সিফিলিস্ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এ রকম একটি প্রসঙ্গ এনেই মনে হচ্ছে অনেকটা ফেঁসে গেলাম নানা কথার জটাজালে। কেননা অসাধারণ সাহিত্য স্রষ্টাদের প্রতিক্রিয়াশীলতা সহ মাদক আশ্রিত অতিন্দ্রীয় চেতনার বহমানতাও লক্ষণীয়। বিশেষ করে পশ্চিমাদের বিজ্ঞতার মহত্ত¡ম ধারাই আবর্তিত হয়েছে অনেকাংশেই ঐ পথে। যদিও জন মিল্টন মাদক বিরোধী জন্মান্ধ হয়েও সাহিত্যের ভেদগুন সম্পন্ন ছিলেন। অপরপক্ষে বায়রণ, কিটস্, ফিটজার ফিল্ড, ডব্লু.বি ইয়েটস্, এজরা পাউন্ড, টি.এস এলিয়াট, যোসেপ কনরাড, জেমস জয়েস, ডি এইচ লরেন্স, কাফকা, এলান মুর, গ্রান্ট মরিশাস, স্যামুয়েল বেকেট, রিল, হোল্ডার্লিন, জ্যাক কেরোয়াক, গিন্সবার্গ, নরম্যান মিলার, ডেনিস কপার, উইলিয়াম সিউওয়ার্ড ব্যুরো, চার্লস ডিকেন্স, এরিখ মারিয়া রিমার্ক, টলষ্টয় সহ আরও নাইজেরিয়ান চিনুরা অ্যাচেবে, কোরিয়ার কিম চিহা, পুর্তো রিকোর কবি পেদ্রো পিয়েত্রি, এল সালডাদরের কবি রোনা মেনদেজ, মেক্সিকোর কবি ভেরোনিকা ভলকো এবং ফুকো, দেরিদানাকাকে নিয়ে অনেক বৈচিত্রময়তার ধূম্রজাল থাকলেও এ সকল খ্যাতিমান সৃজনশীল সাহিত্যেরও তত্ত¡ প্রবক্তার মহাত্মাদের আত্মজীবনী পর্যালোচনার কথকতাকে কেন্দ্র করে বেশীর ভাগই চেতনা বিনাসী কোন না কোন মাদক আশ্রিত বলয়ে কারও কারও ভিষণ আসক্তির কথা জানা যায়।

এছাড়াও প্রতিক্রিয়াশীলতার প্রসঙ্গেতো রয়েছেই। যে কথার আলোকপাত করেছিলেন লায়োনেল ট্রিলিং তার Beyond Culture বইতে। এছাড়াও তাত্তি¡ক বিষয়ের আরও দু’একটি বইয়ের উলে­খ করা যায়, এডওয়ার্ড সাইদের ওরিয়েন্টালিজম ও কালচার এ্যান্ড ইসপিরিয়ালিজম। ম্যাথু আনল্ড এর Culture and Anarchy “সংস্কৃতি এবং অরাজকতা। বহুবিধ সব অদ্ভূত ধারণার বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করে সাহিত্যের বহু মাত্রিকতা বিস্তার লাভ করেছে, তার অনন্য সত্তায় কেউ ঈশ্বরবাদী, কেউ নারীবাদী, কেউ নিরিশ্বরবাদী, কেউ দৈব ধারণায় আত্মমগ্ন আবার কেউ বীর পুজারী। জীবন বোধের অন্তর্গত মনন দর্শনের পথ কোথাও সরলরৈখিক স্থিতিতে দাঁড়াতে পারে নাই। যে যখন আত্মঘাতি হয়ে মর্মমূলের প্রেষণায় পড়েছে তখন তার ক্রিয়াশীলতা গতিপথ বদল করেছে এবং মাদক আশ্রিত হয়ে কোন এক সত্যের সন্ধানে মুক্তির পথকে খোঁজার চেষ্টাই শুধু করেনি, নিজেকেও নিঃশেষ করেছে। প্রসঙ্গত: ইয়েটস্ এর উক্তিটি হলো- “Then in 1900 everybody got down off his silts : henceforth nobody drank absinthe with his black coffee,  nobody went mad,  nobody committed suicide : nobody joined the Catholic church : or if they did. I have forgetting.”

(২)

তখন সবাই নেমে এলেন জীবনের সমতলে, তাঁরা আর রণ-পা পড়ে হাঁটছেন না, তাঁরা আর মাতাল বা উন্মাদ হচ্ছে না, আত্যহত্যা করছেন না, প্রাচীন ধর্মে প্রত্যাবর্তন করছেন না- তারা স্বাভাবিক হয়ে উঠছেন, জীবনের বাস্তবতাকে গ্রহন করছেন।
পশ্চিমা সাহিত্যের মননশীল ধারাক্রমের প্রকৃত বোদ্ধাদের ব্যাপকতার বিন্যাস বিন্দু বিন্দু করে সমুদ্র মন্থনে উত্থিত হয়েছে এবং সৃজনশীল বিনির্মাণে ঋষিজ ধ্যানে ও লেখনির মূলমন্ত্রণা দিয়ে গেছেন অনেক লেখক।

চে গুয়েভারা, লুথার কিং, পাবলো নেরুদার আঙ্গিক বিশ্লেষণ ভিন্ন মাত্রায়। এছাড়া ন্যাচারের কবি ওয়ার্ডস্ ওয়ার্থ এর মেধা নিয়ে নানা কথায় জানা যায়, তার বোন ডরোথি কখনই তাকে ছেড়ে যায়নি। তার কথা এমনটাই ছিল যে, এই মেধাবী মানুষটিকে কেউ অযত্ন করলে কিংবা ঠিকমত দেখা শোনা না করলে মেধার তাড়নায় বোখে যেতে পারে। অনেক পরে হলেও ডরোথি না-কি তার মেধাবী ভ্রাতার সান্নিধ্যের জন্য খ্যাতি লাভ করেছে।

এ পর্যায়ে মনস্তাত্তি¡ক ভাববিশ্লেষণ এমন ধারণর জন্ম দেয় যে, রীপুর তাড়না যেমন জৈবিকতার দিকে শক্তির প্রায়োগিকতার প্রসার ঘটায়। অপরদিকে মেধার তাড়নাও যে কোন ধরনের অবদমিত ইচ্ছা বা আকাংখ্যার নষ্টালজিয়ায় ভ্রান্ত পথে আক্রান্ত হতে সহায়ক শক্তিরূপে কাজ করতে পারে। ফলে বহু মেধাবী মানুষকেই মাদক আশ্রিত চেতনা বিনাসী কার্য্য প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট হতে দেখা যায়। তারপরও তাদের সৃজনশীল কর্ম বা ক্রিয়েটিভিটি মাত্রা বজায় থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে অতিন্দ্রীয় ভাবের বা পরাবাস্তবতার শৈল্পিক মানের বিন্যাস ঘটান।

মহামতি মার্কস ইংরেজ না হয়েও লেখনির বিপ্লবাত্মক ধারা ইংল্যান্ড থেকেই শুরু করেছিলেন এবং ধর্ম গোঁড়ামীকে আফিমসম মাদকের সাথে তুলন করেছেন। অর্থাৎ দু’টো বিষয়কে একই মাপকাঠির আওতায় এনে নেগেটিভ ধারণা তৈরি করে দার্শনিক মতবাদ দিয়েছেন, বাস্তবভিত্তিক সামাজিক জীবন বোধকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে।

উলে­খিত বলয়ের দীর্ঘ্য সূত্রিতায় না এগিয়ে এবার যদি আমরা ভারত উপমহাদেশ তথা উত্তর আংগিক ঘিরে কিছুটা দৃষ্টিপাত করি তবে এখানেও বর্ণাঢ্য বৈচিত্রের মনন সাহিত্য বলয় এবং মাদক আশ্রিত অতিন্দ্রীয় ভাবনার ভিন্ন উপাখ্যান এর রমরমা চিত্র জানতে পারি। যদিও বলে রাখি এখানকার সাহিত্য বলয়ের নিজস্ব ধারা যেমন আছে, সেই সাথে পাশ্চাত্য, প্রতিচ্য বা পশ্চিমের প্রভাব এর আগ্রাসী চেতনার উন্মেষ ও গতিময়তা পেয়েছে। বিশেষ প্রচলন প্রকারন্তরে খ্যাতিমান মির্জা গালিব, কৃষ্ণচন্দর, কবির দাস, সাদত হাসান মান্টো এবং সেই সাথে কবি ইকবাল, কবি হাফিজ ও ওমর খৈয়াম এর উচ্চমান সাহিত্য মার্গ যেমন বোদ্ধা মহলের সৃজন প্রজ্ঞায় বিদিত ঠিক তেমনটাই আবার তাদের কারো কারো মাদক আশ্রিত জনশ্রুতির উপাখ্যানও কম বিদিত নয়।

প্রসঙ্গক্রমে মির্জা গালিবের মদ্যপানের কিছু গল্পের কথকতা জানা যায় যে, কোন একদিন শুক্রবারের মধ্যদুপুরে তার মদ্য পানের নেশা চেপে বসে। সে তার জনৈক ভক্তকে পাঠালেন ছোট একটি মদের বোতল আনতে। ভক্ত ফিরে আসার প্রতিক্ষায় গালিবের তর সইছিল না। পাশেই মসজিদ। জুম্মার নামাজীরা মসজিদে প্রবেশ করছে দলে দলে। এক পর্যায়ে গালিবও ঢুকে পড়ে মসজিদে। বারান্দায় সে সুন্নত নামাজ শেষে যখন ডান-বামে ছালাম ফেরাবেন তখন দেখেন তাঁর ভক্ত দেয়ালের ফোঁকর দিয়ে তকে মদের বোতল দেখাচ্ছে। গালিব শুধু সুন্নত নামাজ পড়েই চলে আসেন। খ্যাতির কারণেই হয়তো নামাজ শেষে অনেকেই তাকে কৌতুহল উদ্দীপক হয়ে জিজ্ঞাস করে, কি ব্যাপার গালিব তোমাকে তো নামাজ পড়তে দেখা যায় না। আজ জুম্মার দিন তুমি নামাজে গিয়ে শুধু সুন্নত পড়েই চলে গেলে, অথচ ফরজ নামাজ আদায় করলে না এর কারণ কি? গালিবের উত্তর হলো এর মাজেযা তো কিছু আছেই এবং সেটা হলো তোমরা নামাজে প্রভূর কাছে কিছু তো চাও, অন্য কিছু না চাইলেও বেহেস্ত চাও। আর আমি যা চেয়েছি তা সুন্নতেই পেয়ে গেছি। ঠিক এমন জনশ্রুতির আরও একটি গল্প আছে যে রাজদরবার থেকে সে কিছু মসোহারা পেত। একবার সব টাকার মদ কিনে বাড়ী ফিরলে তার স্ত্রী উচ্চ-বাচ্য করে বলে খাবারের জোগাড় হবে কিভাবে? তখন সে উত্তর দেয়। মেরা ইন্তেজাম ম্যায় কারলিয়া/জিনোওনে পয়দা কিয়া উনোওনে ভূখ মিটায় গ্যা। অর্থাৎ আমার ব্যবস্থা আমি করে নিয়েছি, যে সৃষ্টি করেছে খুধা সেই মিটাবে। এদিকে কৃষণ চন্দরের তো দামী মদের প্রতি না-কি প্রচন্ড ব্যাকুলতা ঝরে পড়তো। সাদত হাসান মান্টোর একটি গল্প জানা যায় যে, একবার সে একটি কমদামী হোটেলের কামরায় থাকার সময় দেখে জামা-কাপড় রাখার ব্রাকেটে কেউ লিখে রেখেছে ছোট করে- এখানে পাওয়া যায়। এরপর দুই কি তিন দিন সেখানে অনুসন্ধিৎসু অপেক্ষমান থেকে কোন কিছু না পাওয়ার আক্ষেপে লিখলেন- “দারো দিওয়ার পে, হাসরাত পে নজার কারতে হ্যঁ/খুশ রাহো আহ্লে ওয়াতান/হাম তো সফর কারতে হেঁ-।” দরজা ও দেয়ালের প্রতি নজর বা সাক্ষি রেখেই বলছি দেশের সবাই সুখে থাকো/আমি আমার যাত্রাপথে চললাম। এক্ষেত্রে ভাবনার বিশেষত্ব মনন ক্রিয়ায় কেমন হবে তা পাঠক মাত্রই আপন অর্জন-বিয়োজনে নির্ণয় করবে। শেখ সাদী বা মওলানা রুমী এখানকার প্রতিপাদ্য বিষয়ের অন্য ধারায় বিচরণ করলেও সাহিত্য অঙ্গনে তাদের ভিন্ন মাত্রার সংযোগ ঘটেছে। অপরদিকে ওমর খৈয়াম এর সংশ্লিষ্টতা পুরোমাত্রায় আলোচ্য বিষয়ের অনন্য সংযোজন। যদিও তিনি বলছেন,-
Here with a loaf of bread / beneath the bow / a flask of wine / a book of verse and thou / beside my singing in the wilderness / and wilderness is /paradise a now.  (রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে/প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে কিন্তু বইখানা অনন্ত যৌবনা/যদি তেমনটি বই হয়। অপরদিকে রোবাইয়াতে ওমর খৈয়াম তো আরো বেশি জটিল ভাবনার অন্তরায় বলে অনেকেই খেই হারায়। যদিও তিনি ইরানের কবিই শুধু ছিলেন না। তার পান্ডিত্য ছিল নানামুখি। তিনি খ্যাতিমান দার্শনিক হিসাবেও পারশ্য পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তঁর রোবাইয়াত বহু ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। মূল ফার্সী থেকেঃ

চুন দরগুজারাম্ বেহ্বাদেহ্ শোইয়িদ মারা
তলকিনষ শারাবে নাব গোইয়িদ মারা
খাহিদ বেহরোজ হাশর ইয়াবিদ মারা
আয্ থাকে দরে মীকদেহ্ জুইয়িদ মারা।।

গদ্য অনুবাদঃ যখন আমার মৃত্যু হবে আমাকে স্নান করিয়ে দিও দ্রাক্ষা সুরায়। আমার নির্দেশ হবে বিশুদ্ধ মদিরা। রোজ হাশরের দিনে তুমি কি আমার খোঁজ পেতে চাও? তাহলে আমাকে সন্ধান করো শরাবখানার দ্বারের মাটিতে।
ফিটজেরাল্ডের ইংরেজী অনুবাদঃ
Ah,  with grape my fading life provide,  And wash my Body whence the life has died.  And lay me,  shrouded in the living leaf.  By some not unfrequented garden side.

(৩)

ওমর খৈয়ামের এমন রোবাইয়াত প্রায় বারোশত। অদৃষ্টবাদ চেতনা ও বস্তুবাদী ভাবনায় মৃত্যু পারের জীবন সম্বন্ধে এক নতুন ধারনার সৃষ্টি করেছেন। অপরদিকে কবি হাফিজের কথা হলো- “মোল্লার কাছে করো না কিন্তু মোর পিছে অনুযোগ/তারও আছে, আমারই মতন, শূরামত্ততা রোগ”। অপরাপর সাহিত্যের নিগুঢ় ভাবনায় কবি আল্লামা ইকবাল এর রচনাতেও পাওয়া যায় শরাব আর সাকির কথা। যেমন কুলদীপ স্যালিল তার “সিলেকটেড পোয়েমস অব ইকবাল” গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন-

“তেরে শিশো মে ময় বাকি নাহি/বাতা তু ক্যাঁয়া মেরা সাঁকি নাহি।”

অর্থাৎ তোমার শিশেয় মদ বাকি নাই। বল তাই বলে তুমি কি আমার সাকি নও।

There is no wine left in your chalich. Or is it that you are not my saqi. এখন প্রশ্ন হলো এই যে, মাদক আশ্রিত মনন ভাবনার তাত্তি¡কতা, কোন মনস্তত্তে¡র উপর ভিত্তি করে বাস্তবতায় ক্রিয়াশীল হবে এবং সৃজনশীল শক্তিকে কোন রূপরেখায় দাঁড় করাবে। অস্তিত্ববাদের ভূমিকাই যদি বিলুপ্ত হয়ে পড়ে তাহলে সাহিত্যের অপাঙ্কতেয় ধারাক্রমে মানুষ জীবনের সার্ভাইভ করা থেকে বিচ্যুত হয়ে ভ্রান্তির বেড়াজালে আটকে যাবে বলেই মনে হয়।

তারপরও উচ্চ মার্গিয় সাহিত্যের প্রসঙ্গ টেনে কেউ কথা বলতে চান না, নয়তো ভয় পেয়ে থাকেন কোন এক বিড়ম্বনা বোধের কারণে। কেউ কেউ আবার অতি উৎসাহী পান্ডিত্যের ভাব মগ্নতায় জটিল মনোস্তত্ত্বের কুটিল বাক্যবাণের প্রোরচনা দিয়ে গুরুতর মাত্রা বিশ্লেষণ করে থাকেন বা বোঝাতে সচেষ্ট হন। অথচ জীবন দৃষ্টি, সংস্কৃতি চেতনা আর ইতিহাস বোধের মূল্যমান যদি অনুপস্থিত হয়ে রূপক কিংবা দৈব ধারণার ঘোলা জলে ভাসমান হয় তবে সেখানে কোন কালচার থাকে না। অযাচিত অসম্ভবে ঘুরপাকে খাবি-খাবে। এজন্য Guide to culture এর পাউন্ড এর কাছে আসতে হয়- “The CULTURE OE AN AGE is what you can pick up and / or get in touch with by talk with.  The most intelligent men of the period”.

মেধাবী মানুষের লোক জীবন ঘিরে আছে সংস্কৃতি কিন্তু লেখকের ভীষণ এক নৈরাশ্যবাদীতা যখন তাকে পেয়ে বসে তখনই সে হযে ওঠে অতিন্দ্রীয় ভাবনার মুকুটহীন রাজত্বের রাজা। কোলরিজ থেকে টেনিসন, আর্ণল্ড কেটল, টি.ই হিউম, কিপলিং কার্লাইল জেফারসন, হেনরী এ্যাডামস, ব্লেক সুইফট এবং হোমার, দান্তে সহ আরো যারা সাহিত্যের খ্যাতি নিয়ে শিল্পবিচারে সুন্দর সুন্দর রচনা বা প্লট নির্মাণ করেছেন কিন্তু নৈতিক বিচারের মনন ধারায় কে কতটা বস্তুনিষ্ঠতা দেখিয়েছেন। তারই মানদন্ডে অতিন্দ্রীয় ভাবনা কিংবা কোন ভিন্ন মাত্রার উপাখ্যান জীবনের স্বপ্ন কল্পের পরিবর্তন ঘটায়। যেখানে কুসংস্কার কিংবা ফ্রয়েডিয় তত্তে¡র চেতন বা অবচেতন সম্পর্কের বৈচিত্রতার প্রচন্ড প্রকাশের ক্রম পরিণতি দেখা দেয়। যার করণে শিল্পের ম্যাথড হয়ে পড়ে- ক্লাসিসিজম, রোমান্টিসিজম, কসমোপলিটানিজমসহ অন্যান্য। এখানে বলতে হয় যে, একবার Uliysses সম্পর্কে ই.এম ফস্টার বলেছেন- The epic of groubbiness and disillusions. ভাবনার কোন সীমারেখা থাকে না মেধাবী মানুষের। বরং সে যখন মননের ট্রানজেকশন থেকে বঞ্চিত হয়ে নিঃসঙ্গতা বোধে আক্রান্ত অবস্থায় বিষাদ চেতনায় ডুবে যায়, হয়তো কেউ কেউ মাদক আশ্রিত হয় নয়তো অতিন্দ্রীয়তার শিল্পে মগ্ন হয়ে পড়ে। তখন কনরাডের Heart of darkness- এর একটি উক্তিই উচ্চারণ করতে মনে আসে-
“A man that is born falls in to a dream.  Like a man who fallse in to the sea,  If he tries to climb out into the air as inexperienced people endeavour to do he drowns ——- No!  I tell you the way is to the destructive element submit yourself and with the exertions of your armes. and feet make the deep.  Deep sea keep you up ——–.”

উঠতে চেও না, পড়ে যাবে, ডুবে মরবে, লেগে থাকো। গ্রহন করো, বিদ্রোহ করো না। পানি আছে তুমিও আছো এর বাইরে কোন আশা নেই। এ যেন সাধন ভজন তত্ত্ব দৈব ধারণার বিবেচনা প্রসূত মানবিক মূল্যবোধ। এ যেন মনচাষিদের মানস-ফসলের প্রবাহ। এর স্বভাব অনেকটাবায়ু প্রবাহের মত। জ্ঞান ও সংস্কৃতি সভ্যতার প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়েই এগিয়ে চলেছে। মানব সমাজের মননচাষের লোকালাইজেশন থেকে আজকের গোলকায়নের গ্লোবালাইজেশন এর তড়িৎ প্রবাহের সঞ্চার ঘটেছে। একসময় ছিল ভাগ কর শাসন কর, এখন হয়েছে সিলাই কর জোড়া দাও ব্যবসা কর সংস্কৃতির ঘোঁট পাকাও। আর এই ঘোঁট পাকানো নিয়েই যত্রতত্র কথা, দামী বিদেশী মদের বোতল ছাড়া আর আসর জমছে না-। ভাবের উন্মাদনা অনুভবের শুদ্ধ স্বরে কিছুতেই লাগছে না। অতিন্দ্রীয় ভাবনাও প্রকট হয় না। প্রসঙ্গতই আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছেই আসতে হয়। করণ তিনি কখনই মাদক আশ্রিত ছিলেন না। তাই বিশ্লেষকরা তার চরিত্রকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন- তাহলো (১) দম (খ) ত্যাগ ও (৩) অপ্রমাদ। রবীন্দ্রনাথ বলছেন- “আমাদের বিচার বুদ্ধি/ইংরেজ বাড়ীর বুলডগের মত/ধুতির কোচাটী দুলছে দেখলে ঘেউ ঘেউ করে ওঠে/ধুতির মহলে কোনটা ভদ্র ও তার হিসেব পায় না/বরঞ্চ খানসামার তক্মা দেখলে লেজ নাড়ে।

বিশ্ব সাহিত্য পরিমন্ডলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত মননশীল মাত্রাগুণের ব্যাপকতর বিন্যাস এ পর্যন্ত কেউ তৈরি করতে সক্ষম হয়নি। বরং জানা যায় যে, বিভিন্ন মাত্রার নয়জন নবেল লরিয়েট এর রচনা সমগ্র একত্র করলেও কবিগুরুর রচনাসমগ্রই বেশী। অর্থাৎ তাঁর ধ্যান মগ্নতায় কৌলিন্যের ঋষিজ ধারা স্থির চিত্ত সাধন মার্গের দীর্ঘ্য জীবন লাভ হয়েছে এবং পিতৃতর্পণ, দেবতর্পণ ও ঋষি তর্পণ এর দায় মেটাতে সক্ষম হয়েছেন। অথচ আলোচনার একান্ত স্বার্থে অতিন্দ্রীয় ভাবের জন্য বা হ্যালুসিনেশনের ত্রিমাত্রিক জগতের সাহায্য পেতে- মাইকেল মধুসূদন দত্ত, জীবনান্দ দাস, কাজী নজরুল ইসলাম সহ আরো গতিময় সাহিত্যের অনন্য সাধকের জীবন যন্ত্রণা, মেধার তাড়না মাদক আশ্রিত অতিন্দ্রীয় ভাবনা বলয়ে বিচরণের কথা জানা যায়। কেবলমাত্র তাই নয় আমাদের লোকজ সাহিত্যের বিশাল ঐশ্বর্য্য বা ভান্ডার আছে। সেখানেও আমরা লক্ষ্য করেছি। ঐ সকল লোকগাঁথায় বাউল গানের চর্চায় যে বা যারা পথিকৃত হয়েছেন তাঁদের অধিকাংশই জানা গেছে ধুম্রজাতীয় গঞ্জিকা সেবনের মাহাত্ম্যে ইন্দ্রীয়ভাবের ঘোরে ডুবে থেকে অতিন্দ্রীয় সংলাপের প্রসার ঘটতে চেয়েছেন। প্রসঙ্গতই লালন ফকীরের কথায় যে সকল গান রচনা হয়েছে তার বেশীর ভাগই অতিন্দ্রীয় ভাবনার প্রকাশ। রবীন্দ্র চেতনাতেও অতিন্দ্রীয় ভাবের প্রকাশ আছে কিন্তু তারা ছিলেন প্রকৃত ধ্যানি ও ঋষি এবং ভাবযোগী। এছাড়াও বাউল তত্তে¡র যে নিগুঢ় ভাবনায় পাঞ্জু শাহ্ শীতলাংশাহ, আরকুম শাহ, মনোমহোন, রাধারমন, দ্বিজদাস শেখ ভানু, কোরবাণ, আব্দুল জব্বার, মদন গণি হাসন রাজা সহ বহু প্রতিভার আবেদন লক্ষ্যনীয়।

লালন ফকীরের বিখ্যাত গান “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়/ধরতে পারলে মনোবেড়ী দিতাম তার পায়।” রবীন্দ্রনাথের বদৌলতে শিক্ষিত মহলে খ্যাতি লাভ করেছে বলে প্রকাশ পায়। বহু বাউল গান ও গাঁথা সংগ্রহ করেছেন- মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, দীনেশ চন্দ্র সেন, শ্রী উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। যেখানে অতিন্দ্রীয় ভাব ও ভাবনার অনেক উপাখ্যান চরম ভাবেই লক্ষ্যনীয়। যেমন: লীলা দেখে লাগে ভয়/নৌকার উপর গঙ্গা বোঝাই/ডেঙ্গা বয়ে যায়-।

(৪)

এমন বিষয়ের লেখক বা স্রষ্টা এবং সংগ্রাহকদের ব্যাপারে কোন অভিব্যক্তি প্রকাশ না করেই বলতে চাই যে, সচারাচর এইগুলির চর্চায় লালন ভক্ত কিংবা যে সকল বাউলের দেখা পাওয়া যায় তাদের অধিকাংশই মাদক আশ্রীত অতিন্দ্রীয় ভাবের একান্ত অনুগামী। কেন জানি মনে হয় “শ্রী পরমহংস যোগানন্দের সেই উক্তিঃ We are actually helpless against the insurgents way of evil passion. (অশুভ বিদ্রোহের দোলায় আবেগে অসহায়)।

এছাড়াও কিছুটা জ্ঞান বিভাজনের কথা ভিন্ন মাত্রায় হলেও বলা যায় যে, বৈদান্তীক যুগের আচার্যরা জ্ঞানকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন। এমনকি তান্ত্রিক ধারাতেও একই বিভাজন। (১) পরাবাস্তব জ্ঞান অর্থাৎ মোট জ্ঞান (২) বাস্তব জ্ঞান বা একক জ্ঞান (৩) ভ্রমাত্মক জ্ঞান অর্থাৎ নিজস্ব মতের ভুল ভাবনা।

এখন প্রশ্ন হলো এই জ্ঞান মার্গের উচ্চ স্তরের বা অতিন্দ্রীয় ভাবনা সম্পর্কীত কিছু তথ্য উপাত্তের বর্ণনা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। সাধারণভাবে আমরা ৫ম ইন্দ্রীয় ও ৬ষ্ঠ ইন্দ্রীয়ের কথা জানি বা শুনে থাকি কিন্তু তান্ত্রিক সাধক বা যোগী ঋষি বা অতিন্দ্রীয় ধারার লক্ষ্যমাত্রায় দশম ইন্দ্রীয়ের কথা জানা যায়। যেগুলির থেকে মুক্তি লাভ না করলে প্রকৃত মোক্ষ লাভ সম্ভব হয় না। অর্থাৎ সাধন মার্গে পেঁছানো যায় না। সে ক্ষেত্রে তিনটি পথের নির্দেশও রয়েছে। (১) গভীর প্রজ্ঞা লাভ করা (২) ইন্দ্রীয় যোগ মার্গ বা ইন্দ্রীয়গুলির সাথে সংযুক্ত না হওয়া (অ-যোগ) (৩) তৃষ্ণা দোষক্ষয় অর্থাৎ বাসনা মুক্ত হওয়া।

এইগুলির পাকাপোক্ত বন্দোবস্তের জন্য আবার ৬টি যোগ রয়েছেঃ (১) প্রত্যাহার বা ইন্দ্রীয়কে দমণ (২) ধ্যান (৩) প্রাণায়াম (৪) তত্ত¡ সমাহিত হৃদয়ে ওঙ্কার ধারণ (৫) তর্ক যোগ অর্থাৎ আকাশকে পরমার্থরূপে চিন্তা। (৬) সমাধি-।
এই সকল সাধন মার্গের কথা বা পরমার্থ জ্ঞান বা অনির্বাণ ও মোক্ষ লাভের জন্য দেহাশ্রয়ী আত্মা সর্বব্যাপী পরমাত্মার সহিত লীন হওয়ার প্রানন্তকর প্রক্রিয়া। এই জীবন ধারণে ঋষিগণের কেহ ফলাহারী, কেহ মুলাহারী, কেহ সলিলাহারী, কেহ আবার বায়ূ আহারী এবং কেহ নিরাহারীও বটে। সাধান মার্গের যোগ মায়ায় যখন নিজের সম্বন্ধে অহংকার ধ্বংস প্রাপ্ত হয় তখন আত্মাটি বিশ্বজনিন আত্মার সঙ্গে সমসূত্রে গ্রথিত হয়।

আত্মার জন্ম অজ্ঞানে এবং উহা জ্ঞান লাভ করিলেই মুক্তি অর্জন করবে। এছাড়া তান্ত্রিক সাহিত্যের বিচিত্র সব বিষয় রয়েছে। আমরা পঞ্চভূতের প্রসঙ্গ কিংবা এ সকল যোগমায়া আর মহামায়ার অতি গভীরে না এগিয়ে, অতিন্দ্রীয় ভাবনার সাহিত্য আলোচনায় মনোনিবেশ করাই শ্রেয় মনে করছি।

উলে­খিত তান্ত্রিক সাধনের বা সাহিত্যের ধারাক্রম থেকে আমরা কিছুটা উপলব্ধি করতে পারি যে, অনৈতিক ধারায় কিংবা চোরাপথে অতিন্দ্রীয় জগতে বিচরণের একমাত্র পথই হলো মাদক আশ্রীত হওয়া। অথচ এর পরিণতিও ভয়ঙ্কর। কারণ বিনা পাসপোর্টে সীমান্ত পাড়ি দেয়ার মত। অপরদিকে প্রকৃতযোগী হলে তো সে যোগমায়ায় আনন্দ লোক পাড়ি দিয়ে রূপ মার্গে পৌঁছতে সক্ষম হবে। প্রসঙ্গতই এই আলোচনার বিশদ বিবরণ এখানে সম্ভব নয়। বরং সাহিত্যের উচ্চমান বা খ্যাতিমানদের দিয়ে আমরা জেনেছি যে, তাদের বহুজন সমাদৃত সাহিত্য রচনায় মাদক আশ্রিত হয়ে অতিন্দ্রীয় ভাবের প্রকাশ অনন্য ধারায় সম্পন্ন করেছেন। যদিও এ বিষয়ে কোন গবেষণার প্রয়োজন না থাকলেও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অবশ্যই আছে। রবীন্দ্রনাথ বলছেন-

“রুদ্ধ করে দিয়ে দ্বার/ভ্রমটারে
রুখি/সত্যবলে আমি তবে/কোথা
দিয়ে ঢুকি।”

প্রকৃত অর্থে রবীন্দ্র সাহিত্য বলয় তো অন্তর্লোক, বহির্লোক, রস ও রূপকে সমান আঙ্গিক বিশ্লেষণের বিন্যাস দিয়ে সাজানো। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্যের পথে। গ্রন্থের বক্তৃতা প্রবন্ধগুলিতে বিশুদ্ধ সাহিত্যিক আনন্দ পরিবেশনকেই সাহিত্যের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন। তাঁকে বলা হয়েছে সচ্চিদানন্দ। এর মধ্যে আনন্দটিই হচ্ছে সব শেষের কথা- এর পরে আর কোন কথা নেই। সেই আনন্দের মধ্যেই যখন প্রকাশের তত্ত্ব, তখন এ প্রশ্নের কোন অর্থই নেই যে আর্টের দ্বারা আমাদের কোন হিতসাধন হয় কিনা-।

এখানে রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী রচিত “সৌন্দর্য বুদ্ধি” প্রবন্ধ থেকে জানা যায় যে, বহু মানব ধর্ম প্রকৃতিক নির্বাচনে বিকাশ লাভ করিয়াছে। ইংরেজীতে যাহাকে ইউটিলিটি বলে, প্রাকৃতিক নির্বাচন তাহাই দেখিয়া চলে। ইউটিলিটির বাঙ্গালা অর্থ হিতকারিতা, উপকারিতা, উপযোগিতা, কাজে লাগা। ইংরেজীতে যাহাকে ফাইন আর্ট বলে, বাঙ্গালাতে যাহাকে সুকুমার কলা বলা হইতেছে। ইংরেজীতে যাহাকে ইসথেটিক বৃত্তি বলে। বঙ্কিম বাবুর ভাষায় চিত্তরঞ্জিনী বৃত্তি। প্রাকৃতিক নির্বাচন রূপ মন্ত্রের অন্যতম ঋষি আলফ্রেড রসেল ওয়ালাশ এজন্য নিরাশ হয়ে বলছেন, মনুষ্যের সৌন্দর্যবোধের উৎপত্তি প্রাকৃতিক নির্বাচনে বুঝান যায় না। প্রাকৃতিক শক্তির অতিরিক্ত কোন অতি প্রাকৃত শক্তি হয়ত মানবত্বের অভিব্যক্তির মূলে বিদ্যমান রহিয়াছে, ওয়ালাশের চরম সিদ্ধান্ত এইরূপ। যদিও এখানে সেই অতিন্দ্রীয় ভাবের বিষয়টিই এসে দাঁড়ায়। এ পর্যায়ে কিছু বিখ্যাত মানুষের কাব্য ধারনার প্রসঙ্গ থেকে আলোকপাত করা যায়। কবি কোলরিজ কাব্য ও গদ্যের পার্থক্য নির্ণয়ের প্রসঙ্গে শব্দের উপর জোর দিয়ে কাব্যের লক্ষণ নির্দেশ করেন।
The best words in their best order.
অপরদিকে শেলি কাব্যের লক্ষণ expression of imagination, বলেই পর মুহুর্তে ভাষা দেহের উপর সমুদয় গুরুত্ব দিয়েছেন।
There language is vatally metaphorical —-/ A single sentence may be considered as a whole,  a single word even may be a spark of inextinguishable thought ”
THEODORE WATTS DUSTON এর কথা হলো-
“Absolute poetry is the concrete and artistic expression of the human mind in the emotional and rhythmical language.”

এদিকে মুকুন্দ কবি কঙ্কন এর ভাষায়ঃ
“প্রচারে যেমন কাব্য, লএ বা যেমন ভব্য”

ভারত চন্দ্রের কথায়ঃ

“যে হৌক সে হৌক ভাষা, কাব্য রস লয়ে”

প্রাথমিক বঙ্গদর্শন গোষ্ঠির পর ঠাকুর দাস মুখোপাধ্যায় পাঁচ কড়ি বন্দোপাধ্যায়, চন্দ্রনাথ বসু, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রবীন্দ্রনাথ, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, দীনেশ চন্দ্র সেন প্রভৃতি লেখায় ঐ পাশ্চাত্য রীতিই বাংলা সাহিত্যে বিচারে সুপ্রতিষ্ঠিত।

(৫)

অতিপ্রাকৃতি ভাবনার মত করে ওআর্ডস্ওআর্থ বলছেন-
Spontaneous overflow of powerful feelings and Emotions recollected in tranquility.
আসলে উচ্চমার্গীয় চেতনা উপচে পড়ার বিষয় যদি সাহিত্যে রূপলাভ করে তবে তা অতিন্দ্রীয় ভাবনাই তো বটে এবং সেটা মাদক আশ্রিত হলেও হতে পারে এমনটাও কেউ কেউ মনে করেন। হৃদযের কোমল বৃত্তির সৌন্দর্য আলোড়নে গোয়েটের মত হলোঃ The beautiful is higher than the good the beautiful in clouds in it the good.

আবার কীটস এবং কথা হলোঃ
A think of beauty is a joy forever.  Beauty is truth.

প্রসঙ্গ থেকে প্রসাঙ্গান্তর পেরিয়ে বহু মত ও বিবিধ বিশ্লেষণ আছে এবং চলতে থাকবে। ভারতবর্ষে পদুমাবৎ এর আশ্চর্য অনুবাদক আলাওল এর কৃতিত্ব সর্বাগ্রগণ্য। কবি ও কাব্য সম্পর্কে তিনি লিখছেনঃ

না কহিলে দোষ হয় কৈতে বাসি ডর।
তেকারণে কহি কথা সুধীর গোচর।।
বিচারি পাইলে দোষ অক্ষর শুধিও।
না বুঝিয়া আমার কবিত্ব না দুষিও।
এক পদ গুথিতে যতেক দুঃখ হয়।
তাহার মরম পুনি মহত্বে জানয়।।
কাব্যসিন্ধু, শব্দ মুক্তা, কবি সে ডুবার,
বহু যত্নে ডুবি তোলে রতন সুচার।।
যার যোগ্য যেই মত সে জনয় ভাল।
হেম রত্ন গঠিতে না পারে পাটিয়াল।।
বাক্যসুত দিয়া যেন বান্ধবে পবন।
তাহার মরম জানে সেই মহাজন।।
অন্যত্র, সুগুণী পড়িলে কাব্য সকল সন্তোষ।
অগুণী পড়িলে কবি কাব্য লাগে দোষ।।

মূলত: বিষয়গুলি সবই মননচর্চার অন্তরায়, যদি তা হয় চিত্তসাধনার অনন্য উপায়। এমনই আবার লোকায়ত জীবনের যে চিত্র চর্যাপদের পদ সমূহের উপমা রূপক চিত্রকল্পে প্রকাশিত হয়েছে তা আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নান্দনিক উপকরণ। সংগ্রাহকদের কথায় যৎ শ্রুতং তৎ লিখিতং মধ্যযুগের পাঁচালী, কাব্যগাঁথা লোক সাহিত্যের ধারায় অপরাপর রচনাও অভিন্ন চেতনার দ্যোতক। নিধু বাবু, ঈশ্বরগুপ্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যসাগর, রাজা রামমোহন, বিহারীলাল সহ অনেকেই ভাবের ভেলায় এগিয়ে দিয়েছেন সাহিত্য আলয়। তারপরও সাহিত্যের অঙ্গ বেয়ে বহুজনের বিচরণ, যেমন- অশোক মিত্র, সুবল চন্দ্র মিত্র, জ্ঞানেন্দ্র মোহন দাস, হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়, শৈলেন্দ্র বিশ্বাস, অমলেশ ত্রিপাঠী, বিরেন্দ্র চক্রবর্তী, কিরণ শংকর, ভবতোষ চট্টোপাধ্যায়, ভবতোষ দত্ত, ক্ষেত্রগুপ্ত, আবুল কাশেম চৌধুরী, শশিভূষণ গুপ্ত, প্রবোধচন্দ্র সেন, অক্ষয় কুমার দত্ত, কালীপ্রসন্ন সিংহ, মানিক বন্দোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র, বিভূতীভূষন, তারাশংকর বন্দোপাধ্যায়, কাজী আব্দুল ওয়াদুদ, কায়কোবাদ, মহিতলাল মজুমদার, সজনীকান্ত দাস, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, সমর সেন, সুকান্ত, বিষ্ণু দে, জসিম উদ্দিন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালিউল­াহ্, আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক, আহমেদ ছফা, আবু ইসাহাক, মাহমুদুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবু রুশদ্, হুমায়ুন আজাদ, রশিদ করিম প্রমূখ। প্রসঙ্গতই কবি ইকবাল এর ভাষায় বলতে হয়ঃ

Thou art an ocean limitless of a little stream only.
Either absorb me or make me boundless like thee.

অর্থাৎ তুমি তো মহা সমুদ্র আমি ক্ষুদ্র প্রবাহ মাত্র হয় আমাকে তোমার মাঝে বিলিন করে নাও নয়তো এক কিনারায় ফেলে দাও।।
সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে চলিষ্ণুতা, আত্মীকরণ ও আত্ত্বকরণের অনিবার্যতা এবং পরিবর্জনের স্বাভাবিকতা কিন্তু কখনো কখনো ইন্দ্রীয় অনুভূতি গতিবেগের প্রান্তরেখায় কাব্যশৈলীর ছবি এঁকে যায়। Intuition expression বাদী লেখক ‘ক্রোচে’ শিল্পের বহির্বিন্যাস কৌশল ও প্রসাধনাদির প্রতি গুরুত্ব দেননি-। Croce এর আন্তর কথা হলোঃ

The illigitimate division of expression into various grades is known in literature by the name of doctrine of ornaments or of rhettorical categorius.

উর্বর মস্তিস্কের খ্যাতিমান লেখকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, তারা বিপুলায়তন জীবনের প্রতিটি স্পর্শকাতর বিষয়ের কোন একটি প্রত্যাহার না করে, তার অন্তর্গত রূপের গভীরে প্রবেশ করবার প্রত্যয় ধারণ করেছেন। সেটা ইন্দ্রীয় চেতনা কিংবা অতিন্দ্রীয় ভাবনার যে কোনটির মনন শীল্পের শৈলী বা নন্দন তত্ত্বের ভিত্তি থেকে রূপ কল্পের আঙ্গিক বিশ্লেষণ নির্মাণ কলার কৌশলে পদার্পণ করেছেন।
এদেশীয় আধ্যাত্মবাদী মনীষী শ্রী অরবিন্দ। তাঁর সাহিত্য সম্পর্কিত লেখনিতে বলেছেন। সাহিত্য কলার বিষয়বস্তু কিছু নয়। কলার রূপটাই সর্বস্ব এমন অভিমতের অযৌক্তিকতা দেখাতে চেয়েছেনঃ

” Just as technique is not all.  So Vern beauty is not all in art.  Art is not only technique or form of. Beauty.    not only the discovery or the expression of beauty.  It is a self expression of consciousness under the conditions of acoustic vision and a perfect execution,  or to put it other rise,  there are not only acoustic voice,  but life values, mind values, soul values that enter into art.”

(৬)

সুতরাং শিল্পকলা যে ধারায় হোক, সাহিত্য চেতনায় শেকড়ের সন্ধান শিল্পের মজ্জাগত মান ও মননের বিকাশকে অবশ্যই ত্বরান্বিত করে। যে সাহিত্য জন সম্পৃক্ত নয় এবং সমাজ জীবনের কোন অংশেই চিন্তা-চেতনের ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল হতে পারে না কিংবা মনন বিকাশে সহায়ক নয়। তার আধুনিকতা, উত্তরাধুনিকতা, বা আদিরূপের প্রকাশে কি কোন অর্থ হয়; বলে মনে করা যায় না। একজন লেখকের প্রকৃত স্বরূপই হলো সমকালিন সামাজিক দায়বদ্ধতা। সে যে ধারার লেখকই হোক না কেনও। লেখক কোন কাল দ্বারা বিভাজিত নয়। কারণ হিসাবে যদি একশত বছর কিংবা পাঁচ শত বছর পেছনে যে প্রকৃতি বা জনসংখ্যা ছিল এবং সামাজিক অবস্থা ছিল। সেই সময় যে কোন লেখক ঐ প্রেক্ষাপটের দায়বদ্ধতা থেকে তার লেখনীতে উত্তীর্ণ হয়েছেন। সেটা যেমন সত্য, সেই একই সত্য আজকে যাঁরা উত্তির্ণ হবেন এবং কাল উত্তির্ণ এ সমস্ত লেখকই দেবতুল্য ঋষির আসন পেয়ে ইতিহাস হয়ে থাকবেন। আমাদের দীর্ঘ্য পদযাত্রা সেই আদিম বা কাল্পনিক অন্ধকার যুগ থেকে মধ্য বর্বর যুগ, চর্যাপদের থেকে শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলী, চৈতন্য মাণষ, রামায়ন, মহাভারত ও দেবদেবীর অর্চনা গণ্ডী পেরিয়ে মানবীয় প্রেম রসাত্মক কাব্য বা আদিম কামধেনু, আরাকান- রোসাঙ্গ সাহিত্য এবং পালি, পাঁচালী, টপ্পা, লোকগীতি, বাউল, জারী-সারী এমন বহুমাত্রিক ধারায় সাহিত্যের প্রলাপ, বিলাপ, অপলাপসহ মোহ ভঙ্গের নানা শিল্পরূপ ধারাক্রমে অনন্য হয়ে আছে। অপরদিকে ১৯২২ সালে এলিওটের কবিতায় যদি আধুনিকতা হয় আবার ১৮০০ শতকে কোলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মানদন্ডে যে আধুনিকতার কালযাত্রা বিবেচনা করা হয় তাতে সম্ভাবনাময় সাহিত্যের শিল্প চর্চায় অগ্রপথে বহু মতান্তর ক্রিয়াশীল। তারপরেও সাহিত্যের মৌলিক কর্মধারা বিস্তৃতির পথে অগ্রগামী।

এখানে আধুনিকতা, উত্তরাধুনিকতার প্রশ্ন অবান্তর। মানুষ যখন থেকে ভাবতে শিখেছে, প্রায়োগিক বুদ্ধিতে ক্রিয়া ভিত্তিক কর্মযোগে মনোনিবেশ করেছে, তখন থেকেই আধুনিক, এখনও তাই।সময়ের বিকাশমান ধারা তার আপন রীতিইে আবর্তিত হয়ে চলেছে মহাকালের চাকায়। কারণ প্রকৃতির সকল সম্ভাবনা, দুরন্তপনায় স্রোতের মতই প্রবাহমান। সুতরাং আজ আধুনিকতা, কাল উত্তরাধুনিকতা, এরপর অতিআধুনিকতা, তারপর মহাআধুনিকতা- এভাবে কতদুর বলা যাবে? বরং এ ধারণাটাই এক ধরনের বিভ্রান্তী, মিথ্যাচার, ভূয়াবাজী। মানুষ এক সময় নদীর পানি অনায়াসে পান করতো এবং ভাত ও পাক্ বা রান্না করতো। এখন বোতলজাত মিনারেল ওয়াটার কিনে পান করে এটা উত্তরাধুনিকতা, না-কি প্রয়োজনে বুদ্ধির প্রায়োগিক ক্রিয়া। যদি তাই হয় তবে সাহিত্যের ক্ষেত্রেও অন্যথা নয়। সুতরাং বাংলা সাহিত্য তার আপন ধারায় চেতনা বিকাশের মনন ক্রিয়ায় বিকশিত হতে পিছ-পা হবে না। এটা যেমন সত্য বিশ্ব সাহিত্যও তাই।

সাহিত্যের ভাবনা বলয়ে বহু বিচারীক বিষযের অবতারণা হতে পারে, বিশ্লেষণ ও হতে পারে কিন্তু এই পরিসরে তিনটি বিষয় নিয়ে সামান্য কথকতার বর্ণনা দিয়ে মনন সংশ্লিষ্টতার রূপ রেখা চিহ্নিত করতে চেয়েছি। প্রথমত : মনন সাহিত্য নিয়ে সমকাল, সমাজও জীবনের বহু বিস্তৃতির ধারাবাহিকতা রয়েছে। দ্বিতীয়ত: অতিন্দ্রীয় ভাবনা যেমন সাহিত্যের ভেতরে ভিন্নতর এক জীবন বোধের শিল্পরূপ তৈরিতে সক্ষম হয়েছে তারও বিচিত্র সব উপাখ্যান সর্বকালেই চলমান। তৃতীয়ত: মাদক আশ্রিতের প্রসঙ্গ। বহুখ্যাতিমান শিল্প সাহিত্যের মানুষই কোন না কোন মাদক এর আসক্তিতে আক্রান্ত হয়েছে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে যারা খ্যাতি পাননি কিন্তু সাহিত্যের সৃষ্টিশীল চর্চায় চলমান তাদের ক্ষেত্রেও যে কোন মাদক এর চর্চা হতে জানা যায়। খুব ছোট করে হলেও বলা যায় যে আমাদের কবি নির্মলেন্দু গুন তার একটি কবিতায় সিডেটিভ ঔষধের হ্যালুসিনেশন অনুভবের অনেক ভাব প্রকাশ দিয়ে লিখলেন- আজ হলিডে/আজ ম্যানড্রেক্স শুধু ম্যানড্রেক্স। এমনকি তিনি ফেনসিডিল এর ফিলিংস নিয়েও লিখেছেন। এখন প্রশ্ন হলো লেখকদের কেন মাদক আক্রান্ত হয়ে হ্যালুসিনেশনে যেতে হয়। এ ব্যাপারে বহু তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ রয়েছে তার বিস্তারিত বর্ণনায় যাওয়া সম্ভব নয়। তবে দু’একটি বর্ণনা এমন আছে যে, লেখক সত্তা যখন তার মতো করে ভাবের বিনিময় করতে ব্যার্থ হয়ে প্রচন্ড একাকিত্বের দুর্দশায় পতিত হয়ে নিজেকে অসহায় মনে করে তখনই সে মাদক আশ্রিত হয়ে ত্রিমাত্রিক ভাবের হ্যালুসিনেশন এ পলায়নপর হয়ে ওঠে। আমরা সুনিল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখায়ও দেখেছি যে তিনি নিজেই বলছেন গঙ্গার ধারে বসে দেশী মদ খাওয়ার স্মৃতি। এমন অনেক কথার রেশ পরিশেষ আছে। তবে এ লেখায় মূলত: আমি কোন সমাধান বা বিশ্লেষণ দিতে আসিনি। শুধুমাত্র যে কথাটি প্রথমেই বলে নিয়েছি যে সাহিত্যের বিপুলায়তন ঘিরে যে রকম-ফের রয়েছে তার খতিয়ান খুলে কিছুটা দেখা না দেখার আকাঙ্খা মাত্র। পরিশেষে রবীন্দ্রনাথের গোরা উপন্যাসের একটি উক্তি বলতে চাই- “বিধাতা আসক্তির রূপটা আমার কাছে স্পষ্ট করিয়া দেখাইয়া দিলেন; দেখাইলেন তাহা শুভ্র নহে, শান্ত নহে, তাহা মদের মতো রক্ত বর্ন ও মদের মতো তীব্র; তাহা বুদ্ধিকে স্থির থাকিতে দেয় না, তাহা এককে আর করিয়া দেখায়, আমি সন্ন্যাসী, আমার সাধনার মধ্যে তাহার স্থান নাই।”

রাজনৈতিক ঔপনিবেশিকতার অবসান ঘটে কিন্তু আমাদের অন্তর্লোকের তামসিকতার অপনোদন সম্ভব হয়ে ওঠে না। তখনই বলতে হয় লর্ড চেষ্টার ফিল্ড এর সেই উক্তিটি- “Let block heads read What block heads wrote.”

হাসান আহমেদ চিশতী
লেখক ও প্রাবন্ধিক
ঈশ্বরদী, পাবনা।
সেলঃ ০১৭৩৪-২৮৫৬২০

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E