৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ২১২০১৬
 
 ২১/১০/২০১৬  Posted by

পানকৌড়িবোধে নিমজ্জন
– ইমরান কামাল

পানকৌড়িবোধ নিয়ে নিমজ্জিত থাকি… গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

জ্ঞানমার্গের কোন লোকে পরিভ্রমণরত অস্তিত্ব প্রকৃতার্থেই স্ব-চেতন? হাজার বছর ধরে চেতনার চেতনাকে বুঝতে বুঝতে চেতন জগতের ফাঁকিটা চিন্তামুণিদের চোখে বোধকরি ধরা পড়ে থাকবে। এতো পরিষ্কার, অপরের আশ্রয় ভিন্ন আদমের আত্মদর্শন হয় না। নিজেকে দেখতে আয়না লাগে। যাকে দেখা যাচ্ছে সে ‘আমি’ আর যে দেখছে সে ‘আমি’ এক হলে ফাঁকির কথাটা উঠতো না। কিন্তু যা দেখা যাচ্ছে সে তো প্রতিচ্ছবি। প্লেটোর ইউটোপিয়া মতান্তরে ডিসটোপিয়া (যদি ছবিটা কদর্য হয়ে থাকে)। আয়নার ভেতর যে প্রেত (বাস্তবতায় যেহেতু সে নেই) সে যার কারণে আছে তা আবার বাস্তব। ফলত বাস্তবতা আর আয়নাবাজির ব্যবধানটা বেশ স্পষ্ট। ব্যবধান আছে বলে দুয়ের মিলে এক নয়, দুইই একও নয়, পরস্পরের বিপরীতের ঐক্যে তারা এক (প্রতিচ্ছবি মানেই তো উল্টো ছবি)।

পানকৌড়িবোধ নিয়ে নিমজ্জিত থাকি; একটি মাছের উজ্জ্বলতায় দেখি জলজ রাজ্যপাট। দেখার জন্য নিমজ্জনকে অত্যাবশ্যক ভাবি। মৎস্যমগ্নতা প্রতিনিয়ত ঘটায় শ্বাসপ্রকৃতির রূপান্তর। উজ্জ্বল মাছের ব্যক্তিগত আয়নায় প্রতিফলিত হয় পানকৌড়ি চিহ্নিত পথ। পানকৌড়ির সাথে মাছের অতিপ্রাকৃতিক যোগ প্রস্তুত করে গভীর রং।…

এ বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালের ফ্রেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত গৌরাঙ্গ মোহান্তের কাব্যগ্রন্থ ‘ট্রোগনের গান‘-এর প্রথম কবিতাটি পড়তে গিয়েই থমকে দাঁড়াতে হয়। কবিতাটির নাম ‘পানকৌড়িবোধ’। সমান্তরালে সাজানো গদ্যকবিতা অথবা অনুভাব। সমগ্র কাব্যগ্রন্থ জুড়েই এমনটির দেখা মিলবে। কবিতার নাম-শব্দটিই চোখে আটকে থাকার মতো। পানকৌড়ি এমন পাখি যার জীবনের মূল সময় কাটে জলে ভেসে ভেসে। জলে তার ছায়া পড়ে। পাখি আপন প্রতিচ্ছবির ওপর ভাসে। পানকৌড়ি আহার ধরে জলের অন্তর থেকে। এতে এক আজব কাণ্ড ঘটে। প্রয়োজন মেটাতে গেলে পানকৌড়িকে নিজের প্রতিচ্ছবি অতিক্রম করতে হয়। যাকে বলা যায় দৃশ্যত রূপ তা ঘোলা না করলে পাখির জীবন টেকে না। যে বিপরীত, পাখির সাথে জলে ভাসে তা কিন্তু ভাঙে না, কেবল ক্ষণিকের মতো স্থানচ্যুত হয়। নড়ে যায়। ‘জলজ রাজ্যপাটে’র প্রকৃতদশা বুঝতে গেলেই জীবন অন্যরূপে ধরা দেয়। পাখি অন্তর্জলে যাত্রা জলের প্রতিচ্ছবি নাড়িয়ে দিয়েও কিন্তু আরো স্বচ্ছ কোনো আয়নায় ধরা দেয় (কবিতায় মাছের চোখ)। এই অভিযাত্রা একদিক বিচারে নিতান্তই প্রাকৃতিক, নৈমিত্তিক। কিন্তু বোধের প্রশ্ন যখন আসে তখন তা এক প্রতিফলন থেকে অন্য প্রতিফলনের দিকে ধাবমান গতির অনুরূপ বলেই মনে হয়। কিন্তু সেই প্রতিফলনও কি পূর্ণতা আনে? ‘মাছের সৌন্দর্যছায়া’তে কবি লেখেন,‘মাছেরা জলবক্ষে সাঁতার দিয়ে যায়। আমি অজস্র মাছের ভেতর অনন্ত সৌন্দর্যের ছায়া দেখি; রক্তের উজ্জ্বলতার জন্য ছায়াকে জরুরি বলে চিনি।’ এ দেখা বোধকরি পূর্ব থেকে ভিন্ন (দূর থেকে শব্দ দেখা আর শব্দের সাথে বোঝা পড়া ভিন্ন যে অর্থে)। আবার ‘সংখ্যাপদ্ম’ নামের কবিতাটিতে একটি বাক্য সাজানো হয় এভাবে,‘মেঘ আছে বলেই অন্তর্গত ড্যাসবোর্ডে তুমি দেখে নিতে পারো সচিত্র যাত্রাজ্যামিতি।’ মেঘে প্রতিফলন আছে বলেই জগৎ দৃশ্যগ্রাহ্য হয়। বাহিরে দেখা যায় যতটুকু অন্তরের ততটুকুই আয়ত দৃশ্যমান। যেহেতু ততটুকু সেহেতু অপূর্ণ ফলত যতটুকু রূপান্তরিত হলো না তা কবি ভাষ্যে,‘অপ্রকাশ্য বেদনা’ অথবা রূঢ় বাস্তব। শাক্যসিংহ এর সন্ধানই করেছিলেন। আর্যসত্যের প্রথম সিদ্ধান্তই – জগত দুঃখময়, কারণ জগৎ মৃত্যুময়। তাই আক্রান্ত হয় যা ছায়া নয় অর্থাৎ শরীর। শরীরে রোগ ধরলেই আত্মা রোগী হয়। পুনশ্চ ‘পানকৌড়িবোধ’ থেকে একটি বাক্য পুনরায় ছিনিয়ে আনা যাক,‘পানকৌড়ির সাথে মাছের অতিপ্রাকৃতিক যোগ প্রস্তুত করে গভীর রং।’ এখান থেকেই শুরু ‘অন্ধকার ও ট্রোগানের গান’ – আবির্ভাবের চেয়ে প্রস্থান নিশ্চিত – এ ঘোষণা পানকৌড়ির অন্ধকার পাখায় প্রতিধ্বনিত হয় বারংবার।

মাছের চোখে পাখি আর পাখির চোখে মাছের প্রতিচ্ছবি – শিকার-শিকারীর, মরণ-মারণের, জীবন-মৃত্যুর। এই নিশ্চয়তা-অনিশ্চয়তায় দোলচালের একদিকে মৃত্যু জন্ম, জীবন কিংবা বেঁচে থাকার চাইতে যা নিশ্চিত। যেমন অনাদি অন্ধকার নক্ষত্রদের চাইতে নিশ্চিত। অন্যদিকে জীবন, জীবনের মধ্য দিয়ে জীবনের ভোগ অনিশ্চিত কিন্তু উজ্জ্বল। স্থিতি এবং ক্ষণের আশ্চর্য বিপরীত যাত্রা। কবিতায় এমন প্রশ্নও উচ্চকিত হয়,‘পৃথিবী কি বৈপরীত্যের আধার? জীবন-সূর্য ও মৃত্যু-তুষার নির্বিরোধ কি? আনন্দ আছে বলে কি অশ্রুপাত? নির্লিপ্ত যিনি তাকে কেনো কাঁদতে হয়?’ আবার কবিতার শেষাংশে লেখা হচ্ছে,‘প্রাপ্তি চেতনাবাউলকে পূর্ণতার চেয়ে শূন্যতার দিকেই নিয়ত করে চালনা। শূন্যতা ত্বরান্বিত করে মহাশূন্য মৃত্যুর প্রস্তুতি। অন্ধকার মৃত্যুর ধ্বনি তোলে; আলোয় জাগে তার প্রতিধ্বনি।’ ফলত মুগ্ধতাবশত যে পাখি প্রতিনিয়ত শিকার করে যাচ্ছে তার বৃদ্ধি ক্রমাগত ক্ষয়েরই অনুকূল। আবার বৃদ্ধি, হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা কিংবা বাসনা আছে শূন্যতা আছে বলেই (বৃদ্ধির গতিও কী শূন্যতা অভিমুখে নয়?)। ফলত আয়নায় যেমন জীবনও তেমন মৃত্যু প্রতিরূপ। মৃত্যুর উপলব্ধ হয় জীবনের মধ্য দিয়েই। যদিও সে উপলব্ধি অসম্পূর্ণ। জলের ওপর দৃশ্যমান মাছটি যেমন কখনোই প্রকৃত স্থানে থাকে না। নিরেট বাস্তবও নিজেকে লুকিয়ে প্রকাশ করে থাকে। এমতাবস্থায় কবিকে আশ্রয় নিতে হয় পানকৌড়ির বোধের কাছে। আধুনিক কবি ও কবিতা গ্রন্থে হাসান হাফিজুর রহমান যেমন বলেন,‘কবির কাছে সময় অনন্ত। কথাটার তাৎপর্য এই যে, কবির ধারণায় নিরঙ্কুশ বর্তমান বলে কিছু নেই।’ পানকৌড়িবোধ কী তেমন অনন্তের সাথে লীন হয়ে যেতে চায়? ‘বাস্তব’ আর ‘ইউটোপিয়া’র মাঝে অগুনতি ‘হেটেরোটোপিয়া’। সে কী ধারালো চোখ দিয়ে ভেদ করতে চায়? প্রতিটি মাছই তো এক একটি শব্দ। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে সেই শব্দের আয়নায় প্রতিবার বিষয়ীর মুখই ভেসে ওঠে, তার সাথে ভেসে ওঠে মৃত্যু – ভীতিরূপে অথবা পরিত্রাণ…। হয়তো জানান দেয় তেমন দৃশ্যেরও Birth on Tragedy-র Nietzsche যেমন দেখতে পেয়েছিলেন, The very best thing is utterly beyond your reach: not to have been born, not to be, to be nothing. However, the second best thing for your is: to die soon’। তবে কী মানুষ কেবলই বিষময়? অনন্তে লীন হওয়াই তার শেষকথা? তাহলে ‘হয়ে ওঠা’ কী? ‘হতে চাওয়া’ কেন? Martin Heidagger এক রকম সমাধান দেন ‘হয়ে ওঠা’কে ত্রিধা বিভক্ত করে। তাঁর কাছে ‘হয়ে ওঠা’ একাধারে ‘জগৎ-মধ্যে’, ‘সত্তা-মধ্যে/ক্রিয়া-মধ্যে’ ও ‘কে’ (যা যে অর্থে জগৎ-কাণ্ডে বিরাজমান)এর সাপেক্ষিক সম্বন্ধজাত ফল। এখন যদি এভাবে দেখি,‘উজ্জ্বল মাছের ব্যক্তিগত আয়নায় (জগৎ) প্রতিফলিত হয় (ক্রিয়া) পানকৌড়ির নিজস্ব পথ (বিষয়ী)’ তাহলে হয়ে ওঠার এক রকম অর্থ দাঁড়িয়ে যায় বইকি। এও বোঝা যায় এ সম্বন্ধে প্রতিফলনই প্রকৃত ক্রিয়ার কাজ করে। আয়নায় প্রতিফলিত রূপ ছাড়া বিষয়ীর নিজ সম্পর্কের বোঝাপড়া হয় না। ফলে স্ব-কে বুঝতে গেলে প্রতিচ্ছবি অনিবার্য। বিপরীত অপরের সাপেক্ষেই ‘আমি’ বোঝে সে অস্তিত্ববান। আবার বাসনা অর্থে ‘হতে চাওয়া’ না-বোধের বলে স্বক্রিয়। ইউটোপিয়াতে তা-ই থাকে ‘আমি’ যা হতে চায়। বেহেস্তে তা-ই পাওয়া যায় পৃথিবী যা দিতে অক্ষম। এই ‘হতে চাওয়া’ ক্রিয়ারূপে গতিশীল। তার গতি বিশেষণ থেকে ক্রমাগত আরো বেশি বিশেষণ অভিমুখে। ফলত প্রয়োজন যাকে নিয়ন্ত্রণ করে বাস্তব এবং যার ওপর আলো পড়ে বলে জন্ম হয় প্রতিচ্ছবির আর প্রতিচ্ছবি যা জন্ম দিয়ে থাকে বাসনার এবং যা ‘হয়ে উঠতে চাওয়া’র নামে ক্রমশ নির্মাণ করে চলে অথবা বিনাশ অভিমুখে নিয়ে চলে অস্তিত্বকে – এই দুই পরস্পর বিচ্ছিন্ন বিপরীত কাণ্ডে তাল ঠুকতে ঠুকতে ব্যক্তি সম্ভবত ব্যক্তি-পরিচয় সম্বন্ধে বোঝাপড়ায় এসে থাকে।

কবি ভাষ্যে ‘উৎস ও অনিবার্যতার মধ্যকালে সংবেদনার প্রাকৃত রূপায়ন মানুষের শ্রেষ্ঠ কীর্তি’, এমন সিদ্ধান্তে এক রকম অর্থের মিলও ধরা পড়ে। তাহলে এই প্রতিফলন বা ক্রিয়াপদটুকুই ‘হতে চাওয়া’। কিন্তু এ ক্রিয়ায় নির্দিষ্ট দূরত্বের প্রয়োজন। ‘সমস্ত মৃত নক্ষত্রেরা কাল জেগে উঠেছিল- আকাশে এক তিল ফাঁক ছিল না;/পৃথিবীর সমস্ত ধূসর প্রিয় মুখও সেই নক্ষত্রের ভিতর দেখেছি আমি’, ক্ষণিকের জন্য, ভ্রম রূপে হলেও বনলতা সেন এর জীবনানন্দের পৃথিবীতে যারা নেমে আসে, যূথবদ্ধ একক আলোকে পরিণত হয়ে যারা আসে তারা গৌরাঙ্গ মোহান্তের পৃথিবীতে অদ্ভুতভাবে একা হয়ে থাকে। এই প্রকৃতিবিরুদ্ধ, ভাষা নিয়ন্ত্রিত, অন্ধকারাশ্রিত একাকিত্বে তাঁর নবরহম যেন মহাদূরবর্তী, বিচ্ছিন্নতমা। প্রতিফলনেই মৃত্যুর জীবন আর জীবনের মৃত্যুর অনুভাব হয়তো তার ‘শ্রেষ্ঠ কীর্তি’ হয়ে থাকে।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E