৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মে ০৭২০১৭
 
 ০৭/০৫/২০১৭  Posted by

তৈমুর খান-এর একগুচ্ছ ছোট কবিতা ও কিছু প্রশ্নোত্তর

১। কবিতা দিনদিন ছোট হয়ে আসছে কেন? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টি ও চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কারণ কী? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টির দম-দুর্বলতা-ই কি ছোট কবিতা বেশি বেশি লেখার কারণ? নাকি, ছোট কবিতার বিশেষ শক্তি এর অনিবার্যতা? কী সেই শক্তি?

অস্থিরতা, সাময়িকতা বা ক্ষণিকতা চেতনাকে সর্বদা সচল করে দিচ্ছে। অনুজ্ঞা প্রহরগুলি আত্মকথনের বিন্দু বিন্দু স্বর্ণরাগে প্রদীপ্ত, কখনো ধূসর, কখনো না-বলার শূন্যতায় ধ্বনিময় শব্দকুশলীর পথ বেছে নিচ্ছে। তাই কবিতা দিন দিন ছোট হয়ে আসছে।

দীর্ঘ কবিতা রচনার যে প্রেক্ষিত বা জীবন মহিমার প্রাজ্ঞতা দরকার তা আজকের দিনে আর নেই। এত ধৈর্য নিয়ে ক্লাসিক ভাবময়তায় কবিরা যেতে চান না। মহাকাব্য লেখার যুগ যেমন নেই, দীর্ঘ কবিতা রচনারও আর যুগ নেই। গীতিকবিতার অন্তঃসলিলায় নৈঃশাব্দিক গতি পেয়েছেন কবিরা।

ছোট কবিতায় বিন্দুর মধ্যেই সিন্ধু উথলে ওঠে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দুই মহাসমুদ্রের ইংগিতে মুখর। তাছাড়া এম্পটিনেস্ এবং নাথিংনেস্ এর দর্শনই বিষয়কেন্দ্রিকতা ও এক মুখীনতাকে আর ধরে রাখেনি। কবিতাকে বিষয়হীনতায় ও বহুমুখীনতায় মুক্তি দিয়েছে।

কবিতা প্রাণের বাজনা, বিষয়ের নয়। অন্তরের ভাব ও ধ্বনি, শব্দের বা ছন্দের নয়। এই শক্তিই ছোট কবিতাকে প্রাচুর্যমণ্ডিত করেছে।

২। এক লাইনেও কবিতা হয়, আবার সহস্র চরণেও। আকারে-অবয়বে দীর্ঘ বা ছোট হলেই কি একটি কবিতা দীর্ঘ কবিতা বা ছোট কবিতা হয়? ছোট কবিতা ও দীর্ঘ কবিতার বিশেষত্ব কী?

ছোট কবিতার ব্যঞ্জনা অথবা ব্যঞ্জনাহীনতাও বহুদূরগামী হতে পারে। অতিকথনের বিবৃতি বা ভার সেখানে থাকে না। বরং নিত্য নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষার সম্মুখীন হতে পারেন কবি। দীর্ঘ কবিতায় এই অবকাশ কম। দীর্ঘ কবিতায় গল্প এসে উপস্থিত হয়। ছোট কবিতায় না-গল্প, না-বিষয়, না-ছন্দও।

(৩/ক) ছোট কবিতার গঠন-কাঠামো কেমন হওয়া উচিত মনে করেন?

 ছোট কবিতা ছোট, আঙ্গিকগত কারণে এবং শব্দ ও চিত্রকল্পের বিনির্মাণে। ঐতিহ্যকে ভাঙা এবং স্বীকার করার মধ্যেও। সেক্ষেত্রে এক লাইন থেকে একাধিক লাইনেও হতে পারে। তবে ভাঙাগড়ার ক্ষেত্রটি থাকেই।

(৩/খ) ছোট কবিতা পাঠে পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায় কি?

অবশ্যই ছোট কবিতা পাঠেও পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায়। সিদ্ধি তো সেখানেই যেখানে পাঠক ও স্রষ্টার ভাবের মুক্তি।

(৩/গ) ছোট কবিতায় কি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া সম্ভব?

গতানুগতিক মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা নাও থাকতে পারে। তবে নতুন কিছু তো থাকবেই।

(৪/ক) আপনার লেখালেখি ও পাঠে ছোট কবিতা কীভাবে চর্চিত হয়েছে?

আমার লেখায় ও পাঠে ছোট কবিতা বারবার আমাকে আকৃষ্ট করেছে। মনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপলব্ধির অবিন্যস্ত প্রজ্ঞাগুলি বেজে উঠেছে। তেমনি পাঠেও পেয়েছি বিস্ময় ও ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা।

(৪/খ) আপনার একগুচ্ছ (৫-১০ টি) ছোট কবিতা পড়তে চাই।

আমার একগুচ্ছ ছোট কবিতা

                    ১ .
                     বিশ্বাসের পাখিগুলি
                    _________________
তোমার বিশ্বাসের পাখিগুলি
            উড়ুক উড়ুক আকাশে আজ
                  জীবন শুধুই এক মহিমার ঘোড়া
                             এইখানে খেয়ে যায় নির্জনের ঘাস

             ২.
            প্রতীক
         __________
আলোর কন্যারা ফিরে আসে
             ঘরের চৌকাঠে হেসে ওঠে ঘর
                       পালাক পালাক
                               মধ্যযুগের নষ্ট অন্ধকার

                    ৩.
                   পরকীয়া
                __________
নদীটি ও পরকীয়া বোঝে
       বর্ষা এলে ভরসা পেয়ে
                    অন্যপথ খোঁজে

                   ৪.
                 সংশয়বাচক
              ______________
কিছুটা সহজ আর কিছুটা কঠিন
মাঝখানে কে আছে           ঈশ্বর না প্রেম ?
নিরুত্তর হেসে উঠছে          সংশয়বাচক অব্যয়

              ৫.
            সামনে অনেক রাত্রি
          __________________
কারো কাছে আলো নেই
             তবুও আলো চাই
              তবুও অভিমানে এঁকে দিই নদী

         দুই তীরে আমরা দুইজন
        গোধূলির রং দেখে ফিরি
        সামনে অনেক রাত্রি
          রাত্রিতে সবাই একাকী

               ৬.
               হাত
          ________
অনেক অনেক হাত
হাতে হাতে বন্ধুত্বের স্পর্শ ফিরে আসে
কিন্তু নির্ভরতা আসে কি কখনো ?

রোজ সন্ধেবেলা গলাদড়ি ঝুলতে থাকা
গাছটির পানে তাকাতে পারি না —
বউটি একাকী যেন শূন্যে ঝুলে আছে
গোধূলি রঙের শাড়ি তার
লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে
একটিও হাত তার দিকে কেউ বাড়িয়ে দেয়নি কোনোদিন

       ৬.
দূরদর্শী

      __________
পরজন্মে আমাদের ঘরবাড়ি হবে
বাড়ির উঠোনে বাগান
      বিকেলের রোমাঞ্চ আলোয়
     তুমি দরজায় দাঁড়াবে
    আমি ফিরে আসব
বেল্ বাজবে আমাদের স্বপ্নের সাইকেলে

         ৮.
       বিশ্বাস
   _________
আমরা বিশ্বাস পুষে রাখি
বিশ্বাস এসে আলো জ্বালে

আলোকিত ঘরে
আমাদের শিশুরা চাঁদ দ্যাখে

চাঁদ কি টিক্ দিয়ে যায় তাদের কপালে ?

দুধ নেই
দুধ খাওয়ার বাটি নেই

তবুও বিশ্বাস আছে আমাদের

——————-

কবি পরিচিতি

তৈমুর খান

তৈমুর খান

তৈমুর খান। জন্ম ২৮ জানুয়ারি ১৯৬৭, বীরভূম জেলার রামপুরহাট সংলগ্ন পানিসাইল গ্রামে। শিক্ষা বাংলা ভাষা সাহিত্য নিয়ে মাস্টার ডিগ্রি ও প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা নিয়ে পি এইচ ডি। পেশা :  উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহশিক্ষক।

প্রকাশিত গ্রন্থঃ আটটি >-  কোথায় পা রাখি, বৃষ্টিতরু, খা শূন্য আমাকে খা, আয়নার ভেতর তু যন্ত্রণা, বিষাদের লেখা কবিতা, জ্বরের তাঁবুর নীচে বসন্তের ডাকঘর, প্রত্নচরিত ইত্যাদি।

পুরস্কারঃ  কবিরুল ইসলাম পুরস্কার, দৌড় সাহিত্য সম্মান এবং সুখচাঁদ সরকার স্মৃতি পুরস্কার ইত্যাদি।

ঠিকানা :  রামরামপুর, শান্তিপাড়া, রামপুরহাট, বীরভূম, পিন কোড ৭৩১২২৪, পশ্চিমবঙ্গ। ফোন নম্বর ৯৩৩২৯৯১২৫০

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E