৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ১৫২০১৬
 
 ১৫/১১/২০১৬  Posted by
কবি জিললুর রহমান

কবি জিললুর রহমান

জিললুর রহমানঃ বহুমাত্রিক সৌন্দর্যের প্রতিকৃতি
– আহমেদ শরীফ শুভ

আমাদের দেখা হয় না কথা হয় না অনেকদিন। কালেভদ্রে দেখা হয় বছরে দু’বছরে একদিন, তাও হয়তো কিছুক্ষণের জন্য। তবুও জিললুর আমার আত্মার আত্মীয়, চেতনা ও মননে আমার সবচেয়ে কাছের মানুষদের একজন। এই নৈকট্য কেবল কবি, প্রাবন্ধিক কিংবা চিকিৎসা বিজ্ঞানী জিললুর রহমানের সাথেই নয়, এই নৈকট্য তার সামগ্রিক সত্ত্বার সাথে। আমি কেবল তার বহুমাত্রিকতারই নয়, তার সৌন্দর্যেরও গুণমুগ্ধ।

জিললুরের সাথে আলাপ পরিচয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ক্যাম্পাসে আশির দশকের মাঝামাঝি। নিজেকে প্রকাশে কিছুটা অন্তর্মুখিতা থাকলেও বন্ধুত্ব ও পারষ্পরিক সম্পর্ক বিকাশে তার মধ্যে উদারতা ও বহির্মুখিতা লক্ষ করেছি সেই প্রথম দিনগুলো থেকেই। আর সেকারণেই বয়সের সামান্য ব্যবধানটুকু অতিক্রম করে সে আমাদের অনেকেরই অনুজপ্রতিম বন্ধু হয়ে উঠেছিল। এই পরিচয়টি জিললুরের কবিসত্ত্বার পরিপূর্ণ বিকাশের কিংবা প্রাবন্ধিক হয়ে উঠার আগে, চিকিৎসা বিজ্ঞানী হয়ে উঠার আগে তো বটেই। তাই অনুজপ্রতিম বন্ধু হিসেবেই জিললুর আমার কাছে সবচেয়ে বেশি পরিচিত।

কারো কারো কাছে কবি জিললুরকে জীবনানন্দ দাশের হালনাগাদ সংস্করণ মনে হতে পারে। উপরিতলার পাঠে হয়তো তেমনটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কবিতার গভীরে গেলে বোঝা যাবে সেখানে জীবনানন্দ আছেন বটে; কিন্তু সেটা তার জগতের আবশ্যিক উপাদান হিসেবে, এন্ড প্রোডাক্ট হিসেবে নন। কবিতার পথ পরিক্রমায় জিললুর সেখানে যোগ করেছেন নিজস্ব ভঙ্গী, ক্যানভাস বিস্তৃত করেছেন আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, উত্তরাধিকার, সমকালীন সমাজ, এমনকি স্বপ্নের আঙ্গিনা অবধি। তার পরিসীমায় কখনো আবুল হাসান (‘বুকের ভেতরে মুক্তা বেড়ে ওঠা জটিল ক্যান্সার’), কখনো লালন (‘সমন পাঠালে সকলেরই যেতে হয়’), এমনকি আইনষ্টাইনও (‘গাছগুলো পেছনে সরে যাচ্ছে, তার মানে আমরা অগ্রগামী?’) উঁকি দেন কখনো সখনো। এভাবেই তিনি হয়ে উঠলেন তার নিজস্ব ভূবনের মানুষ, বিভিন্ন উপাদান আর উপকরনের সমন্বয়ে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি অভিব্যক্তি। জিললুরের সাথে ভাব বিনিময় করলে বা তার সাথে কিছুটা সময় কাটালে মনে হবে, হ্যাঁ তাইতো, তিনিতো এমন কবিতাই লিখবেন। যারা তাকে চেনেন জানেন তারা নিঃসন্দেহে বলবেন কবিতার পরতে পরতে জিললুর নিজেই ছড়িয়ে আছেন আপন ব্যঞ্জনায়। সেখানে নিজেকে আর নিজের চারপাশকে প্রকাশের ব্যকুলতা আছে,কিন্তু বাহুল্য নেই। তাতে কোথাও কবিতার ব্যাকরণ কিংবা অলংকরণ বিঘ্নিত হয়নি। বরং এই পরিমিতিবোধের মধ্যেও প্রতিটি কবিতাই পরিপূর্ণ কবিতা হয়ে উঠেছে।

জিললুরের কবিতার ক্যানভাসের দিকে দৃষ্টি দিলে স্পষ্ট হয়ে উঠবে আমাদের এই জনপদের অতীত বর্তমানের প্রায় সব অনুষঙ্গই উঠে এসেছে। আজানের ভোর, বেতফলের ঘ্রাণ, ডাহুক ঘুঘুর হাতছানি, স্মৃতির শহর – বাদ যায়নি কোন কিছুই। শুধু অতীত আর বর্তমানই নয়, একটা স্বপ্নের মধ্যে আমাদের টেনে নিয়ে গেছেন ভবিষ্যতের চিত্রকল্পে। যেখানে উপনিষদ, গৌতমের ঘ্রা আর পবিত্র কোরান আমাদের দিনলিপি লিখে দেবে; আবার লেনিনও থাকবেন সমতার সমাজ বুননে। আজকের প্রেক্ষিতে কারো কারো কাছে তা ইউটোপিয়া মনে হতে পারে। কিন্তু কবিতো স্বপ্নদ্রষ্টা, আগামীর অভিযাত্রী। স্বপ্ন না দেখলে আগামীর বিনির্মানইবা হবে কিভাবে!

কবিতার অবয়ব ও ব্যাকরণকে মোটেও ক্ষুণ্ণ না করে জিললুর তার কবিতাকে নিয়ে যেতে পারেন কবিতাপাঠকের কাছে। তার কবিতা ভিনগ্রহের দূর্বোধ্য কিছু শব্দসম্ভার মনে হয় না কখনো। উপরিপাওনা হিসেবে আছে অন্তর্নিহিত ছন্দের সাবলীলতা। পড়তে গিয়ে কোথাও ছন্দপতন মনে হবে না। মনে হবে মাঝরাতের আঁধার চিরে ঢাকা মেইল এগিয়ে চলেছে ঝিক ঝিক। কবিতা পড়া শেষ হলেও পাঠকের মনে দুলুনিটা থেকে যাবে বেশ কিছুক্ষণ।

তিনি যে সময়টাতে ক্যাম্পাসজীবন পার করেছেন সে সময়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া ছিল প্রচলিত ধারা। জিললুরের ছাত্ররাজনীতিতে জড়িত থাকার সময়টা খুব সংক্ষিপ্ত ছিল বটে, কিন্তু চিন্তার ভিত্তিটা প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল স্থায়ীভাবেই। তার সূত্র ধরেই কবিতায় টেনে এনেছেন সমাজের অবক্ষয়, সংকট আর অসঙ্গতি। তবে প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গে নয়, তিনি তা দৃশ্যায়িত করেছেন ক্ষোভ, হতাশা আর অভিমানের তুলিতে। একজন রাজনীতিনির্ভর কবির সাথে এখানেই তার পার্থক্য। কারণ, তিনি মূলত কবি। তার দায়বদ্ধতা সচেতন কবিতাপাঠকের কাছেই। তাইতো আস্থাকে আকাশ কুসুম ভাবলেও কিংবা আমাদেরকে শাদা অন্ধকারের ভেতর দিয়ে পরিক্রমণ করালেও এক সময় মনে করিয়ে দেন চকচকে রুপালী প্লাবণের কথা, স্বপ্ন দেখান ‘শ্যামল ছায়াতে দেখো আবার প্রশান্তি দেবে নতুন নীলিমা…’।

কবিতা নিয়ে পড়াশুনা করতে গিয়ে তার নিজের উপলব্ধি ও মূল্যায়ন প্রকাশ করতে গিয়ে জিললুর প্রবন্ধ লেখায়ও হাত দিয়েছেন। বিশেষ করে উত্তর আধুনিকতা এবং নন্দনতত্ত্ব নিয়ে বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি। নন্দনতত্ত্ব নিয়ে তার কিছু অনুবাদও রয়েছে। এই মৌলিক ও অনুবাদ প্রবন্ধগুলো তার প্রতিভার ঝুলিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

পেশাগত জীবনে জিললুর একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানী। পেশাগত প্রশিক্ষণের সময়ই তার সাথে আমার খানিকটা পথ পাশাপাশি হাঁটতে হয়েছে। সেখানেও শেখার স্পৃহা ও পেশার প্রতি একাগ্রতায় তাকে একজন মেধাবী প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে দেখেছি। তার জের ধরেই জিললুর আজ একজন সফল চিকিৎসা বিজ্ঞানী। উচ্চতর গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি অর্জন করেছেন পিএইচডি ডিগ্রি।  কবি ও চিকিৎসকের এই দ্বৈত সত্ত্বাটি তিনি লালন ও সমন্বয় করেছেন অত্যন্ত সাফল্যের সাথে। হয়তো কখনো একে অপরের চলার পথকে অমসৃণ করে তুলেছে, কিন্তু পথ রোধ করে দাঁড়ায়নি কখনো।

কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, চিকিৎসক এই পরিচিত পরিচিতিগুলোর বাইরেও জিললুরের প্রতিভার আরেকটি মাত্রা আছে যা আমরা অনেক সময় চিহ্নিত করিনি। তাকে যতটুকু জেনেছি, যতটুকু পড়েছি তাতে তার মধ্যে একজন দার্শনিককে দেখেছি। কেউ কেউ বলেন কবি মাত্রই দার্শনিক। সবার বেলায় এ কথা প্রযোজ্য বলে আমি মনে করি না। কিন্তু জিললুরের কবিতায় একজন নিখাঁদ দার্শনিককে খুঁজে পাওয়া যাবে। তিনি নিজেকে দেখেন বহুবিধ রূপকের ঝাপসা একক হিসেবে। কবিতার গাঁথুনিতে তিনি দর্শন ব্লেন্ড করেছেন অসামান্য মুন্সিয়ানায়।

জিললুর রহমানের এই যে বহুমাত্রিকতা তাকে পূর্ণতা দিয়েছে ব্যক্তি জিললুরের মানবিক সৌন্দর্য। অনেক প্রতিভাবানকে দেখেছি অহংকারী হয়ে উঠতে, বিনয় হারিয়ে ফেলতে এবং পরিমিতিবোধ বিসর্জন দিতে। এতে তারা নিজেরাই তাদের প্রতিভার প্রতি অসম্মান করেন, সৌন্দর্য ক্ষুণ্ণ করেন। এর কোনটাই জিললুরের মধ্যে দেখিনি কখনো। তিনি যখনও চিকিৎসা বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক হয়ে উঠেননি, স্বীকৃত কবি হয়ে উঠেননি তখন যেমন হাস্যোজ্জ্বল বিনয়ী সজ্জন ছিলেন, আজও ঠিক তেমনটিই রয়ে গেছেন সৌজন্যে ভাস্বর, ব্যক্তিত্বে অমায়িক এবং প্রকাশে প্রাঞ্জল। সে কারণেই জিললুর আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের একজন, দূরে থেকেও কাছের মানুষ।

১৬ই নভেম্বর জিললুর রহমান তার জীবনের অর্ধশত পূর্ণ করছেন। একজন প্রিয় মানুষের জন্মদিনে অফুরন্ত শুভ কামনা। তিনি আমাদের কবিতার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধতর করুন। তার বহুমাত্রিক সৌন্দর্য আরো বিকশিত হোক।

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E