৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মার্চ ২০২০১৭
 
 ২০/০৩/২০১৭  Posted by

কবি পরিচিতি

 কামরুল হাসান


কামরুল হাসান

কামরুল হাসানের জন্ম ২২ ডিসেম্বর, ১৯৬১। শৈশবেই পিতাকে হারান, রাজধানী ছেড়ে তার দুঃখিনী মা আশ্রয় নেন শরীয়তপুরের ডামুড্যা গ্রামে। মামাবাড়ির শিক্ষাবান্ধব, উদার পরিবেশে  শৈশব ও  কৈশোর কাটে বল্গাহীন আনন্দে। ছাত্রজীবনে মেধাবী ছিলেন, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার মেধাতালিকায় স্থানলাভ করেছিলেন। চিকিৎসক হবার আকাঙ্ক্ষায় ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। আবেগের বশবর্তী হয়ে মেডিকেল পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে সরকারি বৃত্তি নিয়ে ভারতে চলে যান। সেখানকার বিখ্যাত আইআইটি খড়গপুরে অধ্যয়ন করেন  এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং । পরবর্তী পড়াশোনা ব্যবসায় প্রশাসনে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ।

কর্মজীবনের শুরুতে যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশ বিমানে, প্রকৌশল প্রশিক্ষক হিসেবে। কর্মকর্তাদের খামখেয়ালিপনা ও নীচতার কারণে ছেড়ে দেন সে চাকুরি। এরপরে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করেছেন প্রথমে প্রশিক্ষক ও পরে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপক হিসেবে। বহুবার চাকুরি বদল করে উপলব্ধী করেন কর্পোরেট জগতে তিনি বেমানান। তখন  যোগ দেন শিক্ষকতায়। পড়িয়েছেন দেশের  বেশ ক’টি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি  বিশ্ববিদ্যালয়ে। গত এক যুগ ধরে পড়াচ্ছেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে।

লেখালেখির শুরু স্কুলের উঁচু ক্লাসে, চারিপাশের মানুষদের প্রভাবে। স্কুলজীবনে গোগ্রাসে পাঠ করেছেন বাংলা সাহিত্যের বিপুল ভা-ার। আশির দশকের কবি হলেও প্রথম কাব্য সহস্র কোকিলের গ্রীবা প্রকাশিত হয় নব্বই দশকের  দোড়গোড়ায় (১৯৯১)। গত পঁচিশ বছরে প্রকাশিত হয়েছে আরও ১১টি কাব্য। গত কয়েক বছর ধরে লিখছেন চতুর্পদী। কবিতার পাশাপাশি ছোটগল্প, প্রবন্ধ লিখেন এবং অনুবাদ করেন বিদেশি সাহিত্য। ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় কলামগ্রন্থ প্রহরের প্রস্তাবনা। ভ্রমণপিপাসু কামরুল হাসানের প্রথম ভ্রমণকথা বিলেতের দিনলিপি। উজবেকিস্তান ভ্রমণের উপর লিখিত আমির তিমুরের দেশে কোলকাতার একটি সাহিত্য পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের অপেক্ষায়। সম্প্রতি ঘুরে এসেছেন মহাদেশের মতো দেশ অস্ট্রেলিয়া। সহধর্মিণী লুবনা হাসান ও বিশ্ববিদ্যালয়গামী চার সন্তান নিয়ে তার কলকাকলিময় সংসার!

প্রকাশিত গ্রন্থতালিকা

কবিতা : সহস্র কোকিলের গ্রীবা (১৯৯১); প্রান্তসীমা অনন্তদূর (১৯৯২); ছুঁলে বিদ্যুল্লতা, না ছুঁলে পাথর (১৯৯৩); পাখি নই আশ্চর্য মানুষ (১৯৯৪); দশদিকে উৎসব (১৯৯৭); বৃক্ষদের শোভা দেখে যাব (২০০০); রূপচৈত্রের অরণ্যটিলায় (২০০৪); পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি আমার গ্রামে (২০০৭); ঈশ্বরের নিজ গ্রহ (২০০৯); ঘুমপ্রহরের মোমকূহক (২০১০); নির্বাচিত কবিতা (২০১২); খিলানের নিচে আলো (২০১৪); সহস্র চরণের ধ্বনি (২০১৬); বাছাই ১০০ কবিতা (২০১৭)

ছোটগল্প : মধ্যবিত্ত বারান্দা ও অন্যান্য গল্প (২০০৫)

প্রবন্ধ : প্রহরের প্রস্তাবনা (২০১৫)

ভ্রমণকাহিনী : বিলেতের দিনলিপি (২০১৭)

অনুবাদ : Poems of Mujib Erom (2014)

সম্পাদনা : Postmodern Bangla Poetry 2003 (2003); (with Tushar Gayen and Samir Roychowdhury)

কামরুল হাসান-এর কবিতাভাবনা

কৈশোরে কবিতা নয়, আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম উপন্যাসে। তখন গোগ্রাসে উপন্যাস পড়তাম, কত বেশি উপন্যাস  পড়ে শেষ করা যায়Ñ তাই ছিলো অভীষ্ঠ। আমার তিনজন মামাতো ভাইয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে উপন্যাস পড়তাম। এদেরই একজন যখন কবিতা রচনায় হাত দেয়, তখন আমি প্রভাবিত হয়ে পড়ি। সে মামাতো ভাইয়ের আবার একজন মামাতো ভাই কবিতা লিখতেন। তিনি লিখতেন নজরুলের কায়দায় বিদ্রোহী ধাঁচের কবিতা, আর আমার মামাতো ভাই লিখতেন নরোম রাবীন্দ্রিক কবিতা। দু’জনই আমাকে প্রভাবিত করলেন। আমি আমার কিশোর বয়সেই অতিবাম রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছিলাম; আরেক মামাতো ভাইয়ের প্রভাবে। আমার জীবন খুব মামাতো ভাই প্রভাবিত। তিনি কবিতা লিখতেন না, কিন্ত পার্টির উঁচুস্তরের নেতারা কবিতা লিখতেন। তাঁরা আবার যাদের অনুসারী ছিলেন সেই মাও জে দুং, হো-চি-মিন প্রমুখ কবিতা লিখতেন। সব মিলিয়ে উপন্যাসের মুগ্ধ পাঠকটির মনে কবিতা গভীর প্রভাব ফেল্ল।

প্রথমদিকে, যেহেতু বিপ্লবী মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলাম, কবিতাকে ভাবতাম বিপ্লব সাধন ও শোষণ মুক্তির হাতিয়ার। আমার প্রথম দিককার কবিতায় বিপ্লবী ভাবাদর্শই প্রাধান্য পেতো। বিপ্লবের মোহভঙ্গ হলে আমি প্রেমে পড়ে যাই, আমার কবিতাও হয়ে ওঠে প্রেমের বাণী ও আবেগসম্বলিত। প্রেমের যা চিরায়ত নিয়ম বিরহ ও বিচ্ছেদের বেদনা, আমার জীবনেও তা ঘটে আর কবিতা আমার আবেগকেই অনুসরণ করে। সৌন্দর্য ও প্রকৃতি আমাকে খুব মুগ্ধ রাখে, যার প্রভাবে আমার কবিতায় রোমাণ্টিকতার আঁচ অনুমেয়। আধুনিক কবিতা পাঠ ও কালের অবক্ষয়, মানবিকতার বিপর্যয় বিশেব করে যুদ্ধের ভয়াবহ পৈশাচিকতা, ক্ষুধা ও দারিদ্র আমার কবিতাবে রোমাণ্টিকতার আবহ থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে। তবু আমি বলবো না তা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়েছে। আমার কবিতা দাঁড়িয়ে আছে এ দু’য়ের মিশোল হয়ে। পরবর্তীকালে উত্তর আধুনিকতার ছোঁয়াও লাগে আমার কবিতার গায়ে। এ হলো বিষয়ের কথা, প্রকরণের দিকে আমি নিটোল, আড়ালসম্পন্ন কবিতা পছন্দ করি, ক্যাটালগিং বা ফিরিস্তি দেয়া কবিতা আমার অপছন্দ। এটাও বিশ্বাস করি কবিতায় দার্শনিকতা ও মননশীলতা থাকা উচিৎ. তবে সবচেয়ে আাগে চাই প্রাণের আবেগ। বিশুদ্ধ তত্ত্ব দিয়ে কবিতা হয় না, কেবল আইডিয়া থেকেও ভালো কবিতা লেখা কঠিন। কবিতা মেধা ও মননের এমন এক সংমিশ্রন, বোধ ও অভিজ্ঞতার এমন এক মিশোল, যে কবি নিজেও জানেন না কীভাবে একটি কবিতা সংশ্লেষিত হয়।

ভালো কবিতা বলতে আমি সেই কবিতাকে বুঝি যা কাব্যশর্ত পূরণ করে, হেলে পড়ে না, কিংবা নয় গদ্যের মতো সরল, আর পাঠককে গভীরভাবে আন্দোলিত করে। তা যুগপৎ পাঠকের আবেগ ও চিন্তাকে স্পর্শ করে, পুনর্বার পাঠের প্রণোদনা জোগায়। ভালো কবিতাকে সংহত, পরিমিত ও আড়ালসম্পন্ন হতে হয়, তবে অহেতুক দুর্বোধ্য বা অর্থহীন আবোল-তাবোল লেখা যে কবিতা নয়, বড়জোর নিরীক্ষা হতে পারে- সে ব্যাপারে আমি নিঃসংশয়। কবিতায় আমি খুবই অপছন্দ করি চীৎকার, মুখের ভাষা ও ক্যাটালগিং। শ্লেষ বা হাস্যরস ভালো, কিন্ত ফাজলামী ভালো নয়। আর একথা তো সবাই মানেন গূঢ় অভিক্ষেপ ও দার্শনিকতা ছাড়া উৎকৃষ্ট কবিতা হয় না ।

কামরুল হাসান-এর কবিতা

 

লোকেরা দুর্গে নয়

লোকেরা দুর্গে নয়, রেস্তরাঁয় যেতে ভালবাসে
তাম্রমূর্তিটির চেয়ে কুুতূহলে দেখে উদ্ভিন্ন যুবতীকে
ধূসর অতীতের কাছে যেতে চায় কোন এক ব্যাখাতীত সাধে
পানাহার সাথে সাথে রাখে আর চায় দলছুট চপলা নারীটিকে
যেন সে জেনেছে সকল ভ্রমণ শেষে শুদ্ধ হবে গৃহের ছায়াতে।

লোকেরা গরল অতীত নয়, পানপাত্রের তরল ভালবাসে
গুহাচিত্রটির চেয়ে প্রাণভরে দূরবর্তী দূতীয়ালী দেখে
গুহার অন্ধকারে যেতে চায় কোন এক গুহ্যবাসনায়
প্রমোদের উপাচার সঙ্গে নিয়ে ঘোরে আর খোঁজে কাঠামো সুঠাম
যেন সে জেনেছে সকল ভ্রমণ শেষে রমণের পালঙ্কে জিরোবে।

তবু কিছু লোক প্রাচীন কিংবদন্তির কাছে রাত্রিদিন ঘুরঘুর করে,
অতীতে অনির্বাণ ধ্বংসস্তূপের কাছে গৌরবের আত্মচিহ্ন চায়।

নক্ষত্র আঁধুলির লোভে

সে ভিখিরি আঁধুলিও চেনে, যদি সিকি পাওয়া যায় দু’টো
ঠুঁটো জগন্নাথের মত মুখ করে বসে থাকা কেন হে বাওয়া?
চেয়ে চিন্তে খাওয়া ভাল? নৈঋতে জমেছে কালোমেঘ,
যে পথে জমেছে ধুলো, নুলো নদী পার হলে রূপালী ইলিশ!
সুদূর তারকার রূপ আজ এই যৎসামান্য মুদ্রায় চমকায়।
নিশুতিরাতের স্বপ্নঠাঁসা দেবযানী দেহটির মত আকাশগঙ্গায়
উঠে আছ দীপ্রদ্যুতির মেলা ঘুরে ঈশ্বরীর মুখ দেখে যাবে?
চাইলে তো সে প্রতিমা নক্ষত্র ঢেলে দেবে দয়ার্দ্র আঁজলায়
অতিদূর সে গবাক্ষের পানে ভিখিরির মত কেন চেয়ে থাকি
ফোটন কণার সাথে ছাপচিত্র রূপখ- ব্যাকুল যদি ঝরে পড়ে
পল্লবের নিচে যেভাবে লুকিয়ে থাকে অতিগাঢ় বসন্তদুহিতা
স্বর্ণালী মেঘের মাল্লার খুলে তাম্রলিপ্ত রাজার প্রাসাদ;
গান তাকে বের করে আনে, হাসির ধ্বনি সর্পিল-চিত্রিত
পথে পথে ঘোরে, সিকি কিংবা অর্ধচন্দ্র আঁধুলির লোভে।

একটি বেড়াল শিশু

একটি বেড়াল শিশু অতীতের অজস্র বেড়ালের মুখ ধরে আছে
সেসব বেড়াল পিতা-মাতাদের হাঁড়, প্রপিতা-মাতার কার্বন
যৌগের সাথে মিশে এক অলৌকিক ছাপযন্ত্রে মুদ্রিত হতে থাকে
ছানাটি, কি এক ঐশ্বরিক ছাঁচে ফেলে সেওতো বেড়াল এক হুবহু
চোখমুখ, গুম্ফময়, অবিকল প্রাগৈতিহাসিক, আর সে সহাস্য লাফিয়ে ওঠে
বাতাসের পোকাটি ধরে আর ধেয়ে যায় ফুলতোলা প্রজাপতিটির পিছু
অন্যসব বেড়ালের মত আদুরে মাদুরে শোয়, খুব প্রিয় মাছের কাঁটাটি।
পিতৃপুরুষ মরে গেছে কবে ভূত তেতুলের গাছে, রেখে গেছে তাঁদের প্রতিভূ
অদৃশ্য ফটোকপিয়ারে অজস্র বেড়াল শিশুর মুখ মুদ্রিত হতে থাকে
আজো তাকে তেমনি অলস দেখি গুটিশুটি মেরে বসে থাকে এক কোনে
সহসা তীরগতি লাফ দিয়ে ওঠে রৌদ্রে কোন এক তেলাপোকাটির
দেখি সে বাস্তবিক বাতাসের পনির কেটে চলে চড়ুইকে তাড়ায়
আলসে থেকে তরিৎ লাফিয়ে নামে নাদিয়া কমিনিচি, আশ্চর্য জিমনাষ্ট
আজো দুধ পেলে মুগ্ধ মিউ স্বরে জানায় কৃতজ্ঞতা, মাছের স্বপ্ন চোখে
যেভাবে তার পিতৃপুরুষেরা হেঁটে গেছে মৎসগন্ধময় ছায়ার চাতালে
পৃথিবীর পথে, দুধের বাটির পাশে পরিতৃপ্ত, আর ঘুম কোমল শয্যায়।

সিংহীর সদুপদেশ

আমি যে সিংহ তাতে সন্দেহ কী?
হরিণীরা ঘোরে চারিধারে,
ভীষণ পাহাড়া দেয় সিংহী আমার
চারিধারে গড়ে তোলে বধির খামার।

বলে : চোখ রাখো ছানাপোনাদের দিকে,
তাদের বর্ধিত করে ছেড়ে দাও পৃথিবী প্রান্তরে
তোমার কি সে বয়স আছে, সেই দর্প কেশরের রূপ?
বাঘিনী প্রেমের দিন, হরিণী শিকার শেষ হল, খুলে রাখ সাজ
নতুন সিংহ ঘোরে, নবীনা হরিণীরা বাতাসে সওয়ার
নিয়েছে ডোগর বেশ, বনে বনে বাঘদের ভারী আলোচনা।

তোমার থাবার তেজে কতকাল আমিও তো রয়েছি বেহুশ,
এখনো স্বপ্ন দেখ শীর্ষ সবুজের, নাই বুঝি হুশ?
দেখ নক্ষত্রমণ্ডলে আমাদের অতিকায় পিতা শুয়ে আছে।
ভাবো তাকে, আর জেনো তোমাকেও শুতে হবে মহত্ত্বের ঘাসে
নিরবধি শুয়ে থেকে দেখে যেও মদমত্ত পৃথিবীর লীলা
তোমার শাবক যত তাড়িয়ে ফেরে ভীরুকম্প হরিণীর মেলা।

বিভক্ত মন্দিরের ঈশ্বর

তোমার ঈশ্বর তবে তোলা থাক বিভক্ত মন্দিরে
দেহরতি আত্মার পরাগে মেখে অনিবার্য সাধুকে পেয়েছ
সন্ত ভূ-গোলকে এত তীব্র বাসনা মেখেছ
বুঝি চাই বিপুল সহাস্য ধরে দেবীর গোলকে
অতিধূর্ত চড়ে আছে প্রহ্লাদের পরম প্রাসাদে।

তুমি যদি আমি হই, আমি তবে তুমি
তোমার আমার নামে কেঁপে ওঠে ভূমি।

আমার ঈশ্বর তবে পূজ্য হোক বিবিক্ত গীর্জায়
আত্মার পুষ্পদানে পরমার্থের অলীক মেখেছি
ভ্রান্ত কক্ষপথে এত অগুণিত নক্ষত্র ছুটেছে
বুঝি আলো বিপুল পেখম মেলে দেবীর বাগানে
প্রভাসে প্রকাশিত বৃক্ষমণি শত গানে গানে।

ভুবনে সকল জাতি গলাগলি ভাই
ঈশ্বরে ঈশ্বরে কোন ভেদাভেদ নাই।

স্বাস্থ্যনিবাসে এসে

স্বাস্থ্যনিবাসে এসে মুখ গুঁজে পড়ে থাকি কোমলতা, বিপুলতা পাই
এখানে পাহাড় খুব স্স্থু কোমল, মলিনতা চারপাশে নাই
শস্যশোভার কাছে পড়ে থেকে দেখি নীলোৎপল আকাশ টাঙ্গানো
ঈশ্বরীর মুখের নিকটে ভাসে চাঁদপনা মুখের গোলক
এখানে বসন্ত খুব নিকটবর্তী, অনুপুঙ্খ নক্ষত্রলোক
যে ঘ্রাণ আবিষ্ট রাখে তাকে ফেলে উঠে পড়া দায়
যে প্রাণ আবিষ্ট রাখে তাকে ছেড়ে চলে যাওয়া দায়….

সকল সুপান্থ শেষে সন্তানের মুখ ধরে ফোটে
সকল দৌঁড়ের মাপ জায়া বেঁধে রেখেছে চৌকাঠে
অনির্র্বচনীয় নির্বাচন শেষে এসে গেছি ঘোরের প্রদেশে
ঘুম থেকে জেগে উঠে অন্য এক ঘুমের জগতে; মাঝে

পান্থনিবাসে এসে চোখ মুদে পড়ে থাকি দেবারতি, তেজারতি পাই
সমতল দূরে দূরে ঘোরে, পাহড়ের কাছে এসে দাঁড়াবার সাহস তো নাই
নক্ষত্রশোভার কাছে উল্টে থেকে দেখি এক মখমল দিগন্ত বিছানো
মৃন্ময়ীর দেহের নিকটে ফেটে চিন্ময়ীর শরীরি ভূগোল
সেখানে কবিতা খুব নিকটবর্তী, অনুপুঙ্খ দেবীর বর্ণন
যে প্রকৃতি জড়িয়ে রাখে তাকে ফেলে চলে যাওয়া দায়
যে প্রেম জড়িয়ে রাখে তাকে ভুলে পদ্য লেখা দায়…

রাত্রির কনভয়

গাড়ির আলো ঘুরতেই-
হুলো বেড়ালের মত
মাটি থেকে ঝাঁপিয়ে ডালে উঠল ছায়া।
কারো কারো মাথায় আলোর একটি কদম ফুল
                                           ফুঠে উঠল,
গোমড়াকালো লোকালয়ের মুখ ফর্সা করতে করতে
চল্ল রাতের গাড়ি।

আলোর সংবেদনে ধরা পড়বার আগেই-
ঘনিষ্ঠ দাঁড়ানো গাছগুলো সরে গেল
একের হাত ছেড়ে গেল অন্যের কটি।
ঘরে আগুন লেগেছে ভেবে
ঝট্পট্ বেরিয়ে পড়ল কিছু ঘুমভাঙা পাখি,
ভূমিকা ভুলে মাঠে শুয়ে ছিল আকাশ
আলোর বেলচা এসে তুলে দিল আবার আকাশে।

গোমড়াকালো জনপদের মুখ ফর্সা করতে করতে
যান্ত্রিক গাড়ি পাড়ি দিল মানবিক পথ।

কৈবল্যধাম থেকে বিষাদসিন্ধুর

সেই তো আলো, তুমি নিয়ে গেলে দূরে
মুখশ্রী অপরূপ, তারপর অন্ধকার, তারপর দূরতর পথ
কৈবল্যধাম থেকে বিষাদসিন্ধুর রেখায়িত জল
তারপর নচিকেতা, তারপর অনন্ত বিধূর!

অন্ধতো ছিলাম ভালো, চক্ষুস্মান হতে গিয়ে পুনরায়
                         আলোর বাগানে হোঁচট খেলাম
আলোকের বর্শা খুব তেজীরূপে মর্মে এসে বিঁধে
বলে, বল তুই হবি কি জ্যোতিস্মান?

আমার অপারগতা বুঝে বলেছি আঁধার ভালো
তুমি নিয়ে এসেছিলে রূপ, তুমিই ফেরালে
আলোকষষ্ঠির দণ্ডি ঐ ঘূর্ণিপাত্রে অবিরত চিত্রিত
ছায়াপথ জুড়ে অজস্র আলোকপি- দানা বেঁধে আছে।

দূরতম কোন এক নক্ষত্রজগৎ ঐ মুখাবয়বে চিত্রিত
অতিলৌকিক প্রেম এনেছিলে লৌকিক বস্তুনিচয়ে
এখন তাদের দেহে অতিনীল অভিনব তেজস্ক্রিয় ফোটে
তারপর অনন্তলোক, তারপর নক্ষত্র সুদূর!

প্রেম ও জীবন

কী এক ঝট্কায় বুড়ো হয়ে গেলাম,
ভাবি কখন যে যুবক ছিলাম;    
কখন পদ্মপাতার মত চোখ তুলে দেখতো যুবতীরা
সে কোন যুগে, তাপবাহে, সে কোন বরফঅঞ্চলে?

পিপড়ের মূহুর্তগুলো যদি পাওয়া যেত
                                 পতঙ্গের পাখার কম্পন
একেকটি মূহুর্ত হত কয়েকটি যুগের সমান।
তোমাকে যে ভালবাসি – সে তো এক শতাব্দীর গান!

শতাব্দী শতাব্দী জুড়ে পুড়ে পুড়ে মরি;
ভাবি এ সহস্রাব্দে পাব না তাকে, পাব অন্য কোন আধাঁর-খিলানে।
যদি সে এ গ্রহের নয়, নক্ষত্রের বিন্দু কিছু হবে;
অপার মুহুর্তসব ডানার ফোটনকণারূপে পাড়ি দেব নক্ষত্রপরিধি!

আলোকবর্ষ পাড়ি দিয়ে তবেই তো ভিড়ি ঐ উপল বন্দরে
আমার আলোকযান উচাটন অন্ধকার পাড়ি দিতে থাকে।

তোমাকে চিনবে না কেউ

তোমাকে চিনবে না কেউ
না বৃক্ষ, না নদী, না নীলিমা।

কৃতবিদ্য সার্জন ছিলে
সুক্ষ্ম আঙ্গুলে পরম মমতায়
সেলাই করে দিয়েছিলে
বৃক্ষের হৃদয়-ফাটল,
নদীর বুক-চেরা চর,
নীলিমার অশেষ উদর।

শুশ্রুষা পেয়ে ওরা ফিরে গেছে হাসিখুশি
ভুলে গেছে তোমার অবদান, রূপরাশি।

তোমাকে ভালবাসত এক রূপমুগ্ধ কবি
শব্দে ভরত সে বৃক্ষদের নীরব দীর্ঘশ্বাস
গানে গানে ভরে দিত নদীদের দুধেল দুপাড়
নীলিমার সন্ত নীলে উড়াত ছন্দের মন্দ্র কবুতর!

ওরা মুগ্ধ দেখেছিল সে কবির কবিতার অশেষ প্রান্তর
বিহ্বল হয়ে শুনেছিল তার অবিনাশী সুর, অনন্য গান
উপমা-রূপকে ভরা কবিতার পাখিদের আশ্চর্য তান!
 
তোমাকে চিনবে না কেউ প্রেমহীন প্রাণ
না বৃক্ষ, না নদী, না নীলিমা
তোমাকে চিনবে শুধু নিঠুর সার্জন,
অচঞ্চল হাতে কবির হৃদয় কেটেছিলে!

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E