৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ০৯২০১৬
 
 ০৯/১১/২০১৬  Posted by
কবি জিললুর রহমান

কবি জিললুর রহমান

ফেরির ফেরারি
– জিললুর রহমান

বহু তদবির করেও যখন চট্টগ্রামে আসার চেষ্টা ব্যর্থ হলো ঠিক তখনই সরকারের পাতলা কাগজ আমাকে বরিশাল যাওয়ার নির্দেশ দিলো। সেই বহুকাল ধরে ঘুরছি রাঙ্গামাটি, কুমিল্লা, সিলেট – সপ্তাহ, বছর পেরিয়ে গেলো – ফেরা হয় না প্রিয় মাতৃভূমি চট্টগ্রামে। আবার ফিরেছিও তো প্রতি সপ্তাহেই। নিজেকে প্রায়ই মনে হয় যেন আন্তঃজেলা বাসযাত্রি সমিতির সভাপতি বুঝি! তবু সয়ে যাচ্ছিল সাপ্তাহিক এই আসা যাওয়া। তাই বলে বরিশাল? পানিতে ভাসতে ভাসতে কতোকাল চলবে এভাবে? একেবারে উল্টোরথে চড়িয়ে ছাড়লো দেখছি! তবু যেতে হয়, তবু চলে যাই মেঘনায় ভেসে কীত্তনখোলায় – ডাহুকের ঘুঘুদের দেশে।

খোঁজ নিয়ে জানলাম চাঁদপুর থেকে রকেটযাত্রি হলে রাত্রি পেরিয়ে আমি পৌঁছে যাবো ‘ধানসিঁড়ি’ বাড়িটির দেশে। সেই ১৯৮৮ সালে যখন আমি তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, বাল্যবন্ধু রাজুর সাথে গিয়েছিলাম বরিশালে –  তারপর বিশটি বছর। মনে পড়ে রাজুর সাথে বরিশাল গিয়ে দুর্গা-সাগরে দিগম্বর সাঁতার দিয়েছিলাম শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ আর বি এম কলেজের কিছু বন্ধু মিলে। সাঁতরে পৌঁছেছিলাম ওই সুবিশাল দিঘির মাঝখানের দ্বীপে। আবার ফিরতি পথে ঢোড়া সাপের তাড়াও খেয়েছি; বন্ধুদের পানি ঝাপটানোর বুদ্ধিতে পালিয়েছিলো সাপ। কিন্তু সে ভয় কি পালিয়েছিলো ? আজ মনে হচ্ছে যেন এই তো সেদিন! এতো তরতাজা স্মৃতি…..
মন খারাপ বিকেল দিয়ে যাত্রা হলো শুরু। কোথায় গিয়ে পড়বো এবার বক্ষ দুরু দুরু। স্বপ্নে কতো উথাল-পাথাল চিন্তা খেলে যায়, রেলের কুঝিক আওয়াজ কিন্তু ছুটেছে চাঁদপুরে। ফেনীর পরে লাকসামও পার, হাজিগঞ্জ ফেলে; মধ্যরাতের কাছাকাছি ঘন্টা যখন বাজে, রেল থেমে যায়, ঘাটের আওয়াজ ব্যস্ততাকে হাঁকে। এ যেন এক অন্য পৃথিবী – স্বপ্নে বোনা ভিন্ন কোনো রাত – গঞ্জের আলো আঁধারির জগত – এর গায়ে লেপ্টে লেপ্টে থাকে ক্লান্তির ফ্যাকাসে হলুদ। ছোট্ট দোকানির পসরা কেবলি চা-বিড়ি, কারও বা সিদ্ধ ডিমের হাঁক অথবা ইলিশ মাছের ঘ্রাণে গরম ভাতের গন্ধ …। তারই মধ্যে লঞ্চের ভেঁপু বাজে, কতো তরুণীর হাতে ধরে ছুটে চলেছে তাদের প্রণয়।

রেলের কুঝিক-ঝিক পৌঁছে দিলো মেঘনার ঘাটে চাঁদপুর।
ইস্টিমারের সিঁটি-‘এ ডিম ডিম. গরম গরম ভাত’ – কখনো লঞ্চের ভেঁপু
মধ্যরাতে এ কেমন শহর-বন্দর! আধো ঘুম চোখ জুড়ে-কখন রকেট আসে?
কেউ কেউ আগুন ধরিয়ে ঠোঁটে অন্ধকারে দেখেছে আকাশ নীল
গোল চাঁদ আলো ঢালছে ফ্যাকাশে রুপালি, চা’র কাপে প্রতিবিম্ব নাচে।

নিশি পথে হেঁটেছি একেলা – কাঁধে ঝোলা, বগলে কবিতা কিছু
চাঁদ ছোটে পিছু আর দীর্ঘ প্রসারিত ছায়া – মায়া, সব মায়া।
দু’দন্ড শান্তির জন্য ঘাটে – পাটাতনে বসি; সকল দৈবের ডর – চিবুকের ছায়া
আমার হৃদয়ে আজ এ কেমন উদ্ভ্রান্তির ঝড় তোলে সুমন্দ বাতাসে!

হঠাৎ সে রিনিঝিনি বাজিয়ে কাঁকন এলো
কোন ভিআইপি কেবিনের যাত্রী?
চাঁদ মেঘে লুকিয়েছে – বেজে ওঠে রকেটের বাঁশি
ডেকের যাত্রীরা বিছানার চাদর সরিয়ে নিলো – কুসুমিত পদক্ষেপ কুমারীর
কপোলের টোলে চাঁদ টলোমেলো, ছিটকে পড়বে যেন বা এখুনি।

ওদিকে আরেক কন্ঠ ভাটিয়ালী গান গেয়ে ওঠে আরেক ভেঁপুতে
আমি ভেসে পড়ি মেঘনার স্রোতে – চকচকে রুপালি প্লাবনে।
(রুপালি প্লাবন / শাদা অন্ধকার)

সে-ই যে ভাসলাম মেঘনায়, তারপর থেকে শুরু হলো এক নতুন মুগ্ধবোধের পাঠ। সেদিন ভরা জোছনা আমার মনের বিষাদ ভুলিয়ে গাইল নতুন গান – এ কিসের আহ্বান? রকেটের বিলাসি কেবিনে বসে নি তো মন, ছটফট করে ছুটলাম গলুই পানে – মেঘনার বুকে ঝরে পড়া অবারিত জোৎস্না গিলবো বলে। নিচে ডেকের যাত্রিরা গাদাগাদি বসে আছে, বুড়োদের সুপারি-পানের মুখে নানান আলাপ আর শিশুরা মায়ের স্তনে ক্রীড়ামত্ত; কোথাও লাজুক গ্রাম্য বধু আলগোছে পর্দা টানে ঘর্মাক্ত মুখে। দল বেঁধে যে সব তরুণ যাত্রিরা ভীড় করেছে তাদের নৈকট্যে গেলে মেঠো কন্ঠের ভাটিয়ালী শোনা যাচ্ছে বৈকি! আমি ধীরে গলুইয়ের কাছে পেতে রাখা চেয়ারে বসেছি-বেশ শীতল দখিনা বাতাস এসে ঝাপটা দিলো আমার ক্লান্ত অবয়বে। জুড়িয়ে গেলো মন প্রাণ – উপরে আকাশে গোল চাঁদ ভরা জোছনার আলো ঢেলে দিচ্ছে মেঘনার কোমল বুকে, তার সাথে স্রোতের কলস্বরে বুকটা হঠাৎ হু হু করে ওঠে কোন দূর পানে রেখে আসা প্রেয়সী আর আর সুমিষ্ট মেয়ে দু’টির জন্যে। মোবাইলে হাত এগিয়ে গেল – পরক্ষণে খেয়াল হলো রাত্রি দ্বিপ্রহর, ওরা ঘুমে কাদা হয়ে আছে হয়তো – ওদের স্বপ্নে আমিই কী এক রাজপুত্তুরের ভূমিকায় হাসছি কিংবা রয়েছি বিপদ বিতাড়নে মগ্ন! নাহ্, ওদের ঘুম আর ভাঙ্গালাম না। কিন্তু এই মাতোয়ালা রাতের জ্যোৎস্নায় কি করে ঘুমাব আমি? দূরে মনোলোভা গ্রামের পর গ্রাম, বনের পরে বন, সোনালী ফসলে ঝকঝক করা ধান ক্ষেত বাইস্কোপের মতো সরে সরে যাচ্ছে। আর সে-ই কলধ্বনি-মেঘনার তরঙ্গ-সংক্ষুদ্ধ সুমধুর জলধ্বনি-আহা! যেন আমি চিরকাল শুনি, যেন মেঘনার বুকে এই ভেসে থাকা শেষ না হয় জীবনপ্রভু!

তবুও ক্লান্তি নেমেছে রাতের জোছনার ফাঁক গলে, তবুও চোখের পাতা বুঁজে এলো অনায়াসে, তবু প্রশান্তি স্বপ্ন জুড়েছে চোখে। হঠাৎ লোকজনের ক্লান্ত ছুটোছুটি হাঁকহাঁকি আমাকে জাগালে দেখি আদিত্য অদিতিকে দিনের প্রথম চুম্বনের আয়োজনে মগ্ন। কোথাও ছোট্ট চডুই পাখি আমাকে ছাড়িয়ে দূর দিগন্তের দিকে উড়ে চলে; হয়তো ভোরের দোয়েল ডেকেছে আমাকে কোনোদিক থেকে, আমি চিনিনিতো! জীবনানন্দের ঘাটে নামতে দেখি কীত্তনখোলার হাওয়ায় মেতেছে মন – এই হলো বরিশালে আমার প্রথম ভোর।

ভোর! স্টিমারের সিঁটি আমাকে জাগালো আজ
নেমে পড়তে হবে জীবনানন্দের ঘাটে, এখানেই আমার নিয়তি!
কী সবুজ আমাকে দুলিয়ে দিলে শীতল পরশ লাগে বুকে
কীত্তনখোলার হাওয়ায় মেতেছে মন – এ ভোর কেমন?
এই কী সে জীবনানন্দের ভোর? চোখে ঘোর!
ছোট্ট চডুই পাখিটা আমাকে ছাড়িয়ে উড়ে চলে
হয় তো ডাহুক ঘুঘুর হাতছানি এদিকে ওদিকে
সব পাখি চিনে নেবো বলে বসে নেই কবি –
ভোরের দোয়েল পাখি যখন ডেকেছে, আমি তাকে চিনিনি তো
যে চেনার তাকে আর চিনিবার নেইকো উপায়
হয়তো শঙ্খচিল, হয়তো বা নতুন শালিক বেশে
কবি আজ খুঁটে খায় ধান; আমি এই বরিশালে প্রথম ভোরের মুখে
শুনেছি কি সেই বাণী? হাজার বছর ধরে সকলেই যতটুকু জানি?
(ভোরে বরিশালে / শাদা অন্ধকার)

বরিশালের ভোর আমাকে লাগালো ঘোর। আমি তাই কিছুটা সুস্থির হয়ে কর্মস্থলে পৌঁছে গেলাম। আমাকে সহকর্মীরা জানালো সেলাম কতো কতো সাদর আবাহন! চারিদিকে ঘন সবুজে বুঁদ হয়ে আছে আমার কর্মস্থল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ। বহু জেলাতেই ঘুরেছি কাজের সুযোগে – এমন আলুথালু করা প্রকৃতির শ্যামলিমা, চারিদিকে সুউচ্চ সবুজ বৃক্ষেরা সারি সারি, এমন মন ভিজিয়ে দেওয়া ভেজা বাতাস আমি আর আগে কি দেখেছি কখনো? একটু পর পর পুকুর কী জলাশয়, ছিমছাম ঘাট, এ যেন শহরকে গ্রামীণ মডেলে সাজানো অদ্ভুত অপরূপ, আহা! এই সে জীবনানন্দের দেশ – কী সাবধানে আমার পদচ্ছাপ পড়েছে – ধীরে অতি ফেলেছি আমার পা। সব সময় মনে হতে লাগলো – এইখানে হেঁটেছেন কবি, রুপসী বাংলার কবি, সাতটি তারার তিমির তাঁকে এখনো কি এই বাংলায় – এই বরিশালে – ধান ক্ষেতে, নদী তীরে, ঘুঘুদের দেশে পথের নিশানা দেখায়? কবি কি এসেছেন ফিরে শঙ্খচিল শালিকের বেশে?

বেতের ফলের ঘ্রাণে নিভৃতে যাপিত কবি  
ফিরিবে না এ সবুজ করুণ ডাঙায় জানি
দোয়েলের ডাক তবু কান পেতে শুনে যাই
বনলতা সুরঞ্জনা ব্যাকুলতা দেখায় কখনো যদি
বোধ বুঝি জন্ম নেয় ডাহুকের শ্যামাঙ্গীর দেশে
নিতান্ত ফিঙের দেহে ফিরে যদি রুপসী বাংলার কবি
যতদিন মৃদু স্নিগ্ধ বায়ু বয় সবুজ ঘাসের গায়ে
স্রোত-সিক্ত ধাবমান ধানসিঁড়ি নদীটির জল
হয়তো হঠাৎ কবি মানুষেরই বেশে জন্ম নেবে
‘আবার এসেছি ফিরে’-বলে উঠবে লাজুক চিবুক।
(লাজুক চিবুক / শাদা অন্ধকার)

জীবনানন্দের কথা ভাবতে ভাবতেই মনে পড়লো একালের কবি হেনরি স্বপনকে। যোগাযোগ নেই প্রায় এক যুগেরও বেশি। অথচ এমনও গিয়েছে দিন – প্রায় দিনই ডাকপিয়ন বিলি করে যেতো হেনরীর পোস্টকার্ড অথবা সেই ‘জীবনানন্দ’ – হেনরী সম্পাদিত ছোট কাগজ। আমার মায়ের কাছে খুব পরিচিত নাম – কবি হেনরী স্বপন; আমার মা-ই সবসময় তার চিঠি গ্রহণ করতেন। হেনরীর মতো স্মৃতিশক্তি আমার নেই। তবু মনে পড়লো সদর রোডে তার ঠিকানার কথা। কিছুটা দ্বিধাও ছিলো, এতটা বছর পরে এখন হেনরী অনেক বিখ্যাত – আমাকে চিনবেন তো ? আমার মতোই কবি যশোপ্রার্থী অনুজ প্রতিম রুদ্র শায়কের কাছ থেকে জেনে নিলাম হেনরীর মুঠোফোনের নম্বর। আর তারপর? যোগাযোগ করে বেরিয়ে পড়লাম বৈকি।

কবিকে খুঁজতে খুঁজতে কাকলি সিনেমার কাছে, দেখি হল নেই – আছে এক ভগ্নস্তুপ; উন্নয়নের জোয়ারে সব ভেঙ্গে যাচ্ছে দিন দিন – এখন তো এপার্টমেন্টের হিড়িক। ‘বিডিএস’ চত্বরেই কবিকে দাঁড়ানো দেখে এগুলাম। কবি আর সে তরুণ নেই, চুলে পাক ধরেছে, মাথায় প্রশস্ত টাক। ভুড়িতে বুলিয়ে হাত হেসে উঠলেন – কতদিন পরে দেখা, তবু যেন সে-ই চিরচেনা কবি।

সাথে করে নিয়ে গেলো জীবনানন্দের ভিটায়। সে ভিটায় এখন আর ঘুঘুও চরে না। হায় মানুষ! এমন সর্বগ্রাসী প্রাণী পৃথিবীতে এর আগে আসেনি তো আর! কেবল ‘ধানসিঁড়ি’ নামের নমুনা রেখে, রেখেছে কবির মান! ডাহুকের ঘুঘুদের ডাক নেই, ঘাস ফড়িঙের ওড়াউড়ি নেই – ঘাই হরিণীরা নিতান্ত উধাও। শরীরে শরীর রেখে কেবলি বেড়েছে মানুষ। তবু মন উড়ে যায় বহুদূর ইতিহাস-ঘাটে, যেখানে গাংচিল উড়ছে আকাশে, বাতাসে মেঘের ঘ্রাণ মাতায় কবিকে।
তারপর আমাদের পা’ হাঁটতে হাঁটতে এগুলো সুবিশাল কীত্তনখোলার দিকে। কী বিমল বাতাসে বুক ভরে ওঠে। নৌকার মাঝি আনমনে গায় ভাটিয়ালী। যুবকেরা আড্ডা জমালো আঁধারের সাথে সাথে। খিস্তিও শুনেছি কিছু হঠাৎ বাতাসে। শশী মিষ্টান্ন ভান্ডারে নিমকি রসগোল্লা যোগে আমার অভিষেক করলেন কবি হেনরী স্বপন! তারপর থেকে আমি বরিশালের!

বরিশাল থেকে প্রতি সপ্তাহেই ফিরেছি চট্টগ্রামে। কখনো রকেটে চড়ে, কখনে ফেরি পারাপারের বাসযাত্রায়। দুপুর ২টায় অফিস শেষ হলেই মনটা আইঢাই করতো রওনা দেবো বলে। কিন্তু এ-তো বরিশাল! এখানে চাইলেই ছুট লাগানো যাবে না। জোয়ার ভাটায় ভাসে স্টিমার – মানে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতাম জাহাজ ঘাটে কতো ঘটনার কতো বেদনার সাক্ষ্য দিতে দিতে। কখনো সঙ্গী থাকে কবি হেনরী স্বপন, কখনো একান্ত একাকী। বাদাম ভাজা হচ্ছে, তারপর গরম গরম চিবানো, মটর দানা কিংবা ছোলাও। কীত্তনখোলার বায়ু স্বাস্থ্যকর নিশ্চয় – এতো ক্ষিদে লাগতো, আর এতো খেতাম! ছোট্ট চা দোকানে কী সুস্বাদু ডালপুরি হতো! আর ঘন চা’য়ের কাপে দিয়েছে হাজার চুমুক। তারপর দূর থেকে শোনা যেতো জাহাজের ভেঁপু। শুরু হয়ে যায় ত্রস্ত যাতায়াত, কুলিদের দৌড়াদৌড়ি। জাহাজ ভিড়তে সময় কতো লম্বা মনে হয়; একটা একটা করে তক্তার পর তক্তা বিছিয়ে জেটির সাথে সংযোগ হয়, প্রতি মূহূর্তে নিচের সুগভীর জলে তলিয়ে যাওয়ার ভয়। তারপর কোনো এক সময় জাহাজ ছাড়লে আমাদের ভেসে চলা শুরু। দু’পাশের গ্রাম ঘরবাড়ি আস্তে আস্তে দূর হারিয়ে গেলে কেবলি জলের রাজ্যে আমরা বিলীন। কখন যে কীত্তনখোলার বুকের আদর ছেড়ে মেঘনার ব্যাকুল জলরাশি আমাকে নিয়েছে টেনে বুঝতেও পারিনি। কখনো জোছনা রাত কখনোবা ঘোর অমানিশা – আমাদের জলপথ নতুন স্মৃতির ভান্ডার খুলে দূরের পথে এগিয়ে চলেছে।

এখানে কেবলি জল, বৃক্ষের সবুজ নেই, ফুল নেই, স্তব্ধ পাখির কূজন  
তুমি নেই, শিশুরাও নেই – অজস্র যতির মেলা – শাদা অন্ধকারে নিখোঁজ এখানে গতি
আমি ভাসি মেঘনার মাঝামাঝি জলযানে, কতে স্বপ্ন মনে মনে …
বেলা কতে হলো ? ঘাটের মেলে না দেখা, নিস্তরঙ্গ জলরাশি ভাসানে জোয়ারে
রুমি, মেঘনার বুকে আর কতো ভাসবো বলে তো ? আর কতো জল এসে কাঁদাবে আমাকে ?

মেঘের জাহাজে তবে দাপাদাপি হোক ক্ষণকাল! ঢেউয়ের ফেনায় কিছু চন্দ্রকথা চাই
অশান্ত নদীতে রাগী প্রবল বাতাস আলুথালু, ডিঙ্গির জোনাক দূরে বেদনার কুপি জ্বলে
‘এমন দিনে তারে বলা যায় …’ রবীন্দ্র সঙ্গীত ক্ষীণ-কন্ঠ তরুণীর সেল-ফোনে
ইঞ্জিনের গোঁ গোঁ, কাতর বাতাস, নদীর ছলাৎ ঢেউ আমাকে পৌঁছে দাও ভাই…
পথ চেয়ে বসে আছে অনুভা অদিতা … আমাকে ভিড়াও ঘাটে।
শেষ হলে টুপ করে নরম বিকেল – মেঘের আড়াল চাই বিপন্ন লজ্জায়……
(এখানে অনেক জল /  শাদা অন্ধকার)

ফেনার জলের দাপাদাপি দেখতে দেখতে আমরা স্বপ্নে বুঁদ হয়ে রই। আমি যেন ভিন গ্রহের কোনো স্বপ্নরাজ্যে পর্যটক। নদীর দু’পারে কতো শিশু আর নারীর স্নানের নিত্য আয়োজন ভোরে। সেই কাকভোরে আমি চমকে জেগে উঠি – তখনো শিউলি তলায় শিশিরের গায়ে রোদের ঝিকিমিকি খেলেনি। তখনো ঘুমে কাদা হয়ে আছে তোমার বুকের কাছে আমার অদিতা। আমি জেগে উঠে প্রস্তুতি নিই নামার। দূর দিগন্তে দু’চোখ ছুটিয়ে ফিরি – বুঝি ওই দেখা যায় চাঁদপুর ঘাট।

চমকে চমকে উঠি আজানের ভোরে, দোয়েল তখনো মগ্ন নিস্তরঙ্গ ঘুমে
শিউলি তলার ফুলে শিশিরে লাগে নি রোদ, শিশু অদিতার হাত খুঁজে ফিরে
তোমার নরম বুক
ঝাঁক ঝাঁক শাদা শাপলা জলাধারে ধানের সোনালী ঘিরে …..
অবিন্যস্ত বিস্তৃত জলাতে – কচুরিপানার দেশে শাপলার পবিত্র শাদা
কোথাও বকের ধ্যান – তপস্যা একপায়ে …..
(এখানে অনেক জল / শাদা অন্ধকার)

সেই আধোঘুম চোখে টলতে নেমে খুঁজতে হয়েছে চট্টগ্রামের বাহন। আন্ত:নগর বাস থেমে আছে দূরে কোনো মোড়ে – আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে ছুটে চলি সেদিক পানে। তারপর আমরা শেষরাত্রির নতুন উদ্যমে যাত্রা শুরু করি – আমাদের দু’পাশের সারি সারি গাছগুলো পশ্চাৎ যাত্রায় সরে সরে যাচ্ছে আমরা ক’জন মোহগ্রস্ত ভোরের পথিক – সত্যিই কি এগিয়েছি কিছুদূর?

গাছগুলো পেছনে সরে সরে যাচ্ছে, তার মানে আমরা অগ্রগামী ?
চাঁদ কিন্তু মাথার উপরে সাথে সাথেই আসছে
তবে কি আমাদের অগ্রসরতা অর্থহীন ?
ওই শোনা নবজাতকের আর্তনাদ; ওঁয়া-য়া…‘কেন এলাম? কেন এলাম?’
তোমার ঠোঁটের দিকে এগিয়ে যাই তবু
দখিনের জানালা গলে হাওয়া শোঁ…..শোঁ….
চলো চলো …………. বহুদূর যেতে হবে বৈকি!
(ভোরের পথিক-২ / শাদা অন্ধকার )

এরই মধ্যে যখন সুবেহ সাদিকের পূর্বাকাশ ফর্সা হতে থাকে মুয়াজ্জিনের আজান ভেসে আসে মনোরম! পথপার্শ্বে দু’য়েকজন স্বাস্থ্যলোভী প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছে-আর আমার আলুথালু মন তোমার বুকের ওমে আশ্রয় খোঁজে প্রিয়া। নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হয়, খুব শ্রান্ত মনে হয়।

পূর্বাকাশ কিছুটা ফর্সা, মেঘের দাপাদাপি চলছেই, মোরগ ডেকেছে ঠিক,
আজানও পড়েছে মসিজিদে ….. এখনো ফোটেনি সূর্য গোলাপ। এ সময়ে প্রাতঃভ্রমণ স্বাস্থ্যকর – তবু এসো আরেকবার জড়াজাড়ি করে আরেকটু শুয়ে থাকি; বেজে উঠুক ভোরের সানাই!
(ভোরের পথিক-২ / শাদা অন্ধকার)

বাসের যাত্রায় ঢুলুনি আসে – আসে তন্দ্রা কী নিদ্রা। আবার কখনো চোখের কোণায় রৌদ্রালোক খেলা করে চকিতে জাগিয়ে তোলে। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি দূরে সারি বেঁধে কিছু তালগাছ জোড়ায় জোড়ায় দাঁড়িয়ে-আমাকে উসকে দেয় শৈশব স্মৃতি। তবু আজ আর তালগাছ আমাকে টানে না। আমি এই ভ্যাপসা গরমে ঘামতে ঘামতে ফিরে পেতে চাই বাড়ির আরাম আর তোমার সান্নিধ্য।

রবিঠাকুর লিখার পর থেকেই তালগাছ জোড়ায় জোড়ায় জন্মে, বিশ্বাস না
হলে নানাবাড়ির পুকুর পাড়ে দেখে এসো। তারপরও তালগাছের নিসঙ্গতা
কাটে না। দুয়েকটা বাবুই চডুই ক্ষণিক আনন্দ দেয়, পাশের গাছটি পাশেই
রয়ে যায়। রুমি, আরও কাছাকাছি এসো, আমার শ্বাসের কাছে, তুমি তো
তালগাছ নও……….
(ভোরের পথিক-৩ / শাদা অন্ধকার)

বাসযাত্রা আস্তে আস্তে একসময় শেষ হবে। সূর্যের আলোও জাঁকিয়ে বসছে বসুধার বুকে – মুখের ভেতরে না ঘুমানো রাত্রির এঁটো অবসাদ। একসময় খুব চা’র তৃষ্ণা লাগে। এককাপ গরম গরম চা – আহা যদি জুটতো কপালে!

এইভাবে ভোর হয়ে গেলো। সারা রাত ইস্টিমারে ছটফট করতে করতে
চাঁদপুর …. তারপর চাটগাঁর বাস – দিগন্ত লাল করে আগুনের থালা ভেসে
উঠলো পূর্বাকাশে। আমার দু’পাশের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, দূরে কাঁটাতারের বেড়া………
পেছনের সিটে বাচ্চাটা জানালা হা-খুলে দিলো প্রবল বাতাসে। তুমি কোন বিছানার চাদরে লেপ্টে আছো ? আহ্! এই ভোরে এক কাপ গরম চা জুটলো না প্রিয়তমা ….
(ভোরের পথিক-৪ / শাদা অন্ধকার)

চা আর জোটেনিকো সেই দিন অথবা ভিন্ন কোনো দিন। আমার রসনা কতোদিন অতৃপ্তির দিন গুনে পার হয়ে গেছে! আর এভাবেই এক সময় বাস আমাকে প্রতি সপ্তাহেই নামিয়ে দেয় চট্টগ্রামের ক্রোড়ে। তারপর আবার নতুন সপ্তাহের নতুন উদ্যমের যাত্রা।

পরে পরে বরিশাল থেকে এই রকেটে ফেরার এতো প্রলোভনও আমাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বরিশালে আটকে রাখতে পারেনি। দুপুর সাড়ে তিনটায় বাসে চড়ে পাটুরিয়া ফেরির দিকে ছুটেছি কখনো, কখনোবা মাওয়া ফেরির যাত্রি হয়েছি। আবার নদী শান্ত দেখলে স্পিডবোটে চড়েও হয়েছি মেঘনা পারাপার। জানি না কতোকাল আমাকে থাকতে হবে ফেরির ফেরারি।

(রচনা ২০০৯)

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E